গোয়া ইনকুইজিশন – পর্তুগিজ শাসনের কালো অধ্যায়

২০ মে ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে কালিকট বন্দরে এসে ভিড়ে পর্তুগিজ জলদস্যু ভাস্কো দা গামার জাহাজ। এটি ছিল ইউরোপ থেকে ভারতবর্ষে আগত প্রথম জাহাজ। স্থানীয় রাজার অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে ভাস্কো দা গামা কিছুদিন লুটপাট ও লুণ্ঠন শেষে পর্তুগাল ফিরে যায়[1]। ১৫১০ সালে আলফানসো দ্য আলবুকার্ক নামে আরেক জলদস্যুর নেতৃত্বে পর্তুগিজদের নতুন একটি বাহিনী এসে উপস্থিত হয় দক্ষিণ ভারতের উপকুলে। আলবুকার্কের নেতৃত্বে পর্তুগিজ জলদস্যুদের প্রায় ২০টি জাহাজ ছিল। এসব জাহাজে বড় বড় কামান স্থাপিত ছিল যা দিয়ে সহজেই মাইলখানেক দূরে গোলা নিক্ষেপ করা যেত।

ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি আল বুকার্কের বাহিনী মান্দবি নদী অতিক্রম করে পানজিম নামে ছোট একটি দুর্গে আক্রমণ করে। দুর্গের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রহরীরা প্রাথমিক প্রতিরোধের পর গোয়ার দিকে পালিয়ে গেলে পর্তুগিজরা কেল্লাটি দখল করে। দুই মাস পর বিজাপুরের সুলতান ইউসুফ আদিল শাহ ৬০ হাজার সৈন্যের বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসেন। এক সপ্তাহের যুদ্ধে আলবুকার্কের বাহিনী পরাজিত হয়ে পিছু হটে। কিন্তু পিছু হটার সময় সে আশপাশের এলাকায় আক্রমণ করে এবং অল্পকিছু শিশু ও ধনী ব্যক্তি বাদে সকল মুসলমানকে হত্যা করে[2]। এক্ষেত্রে তারা নারী, শিশু, বৃদ্ধ কোনো তোয়াক্কা করেনি। এটি ছিল ভারতবর্ষের বুকে ইউরোপিয়ানদের প্রথম গণহত্যা[3]।
হত্যাযজ্ঞ সেরে গোয়া থেকে প্রায় আঠারো মাইল দক্ষিনে সরে যায় পর্তুগিজরা। সে সময় তারা খাদ্যসংকটের মুখে পড়ে। আল বুকার্ক চাচ্ছিলেন কিছুদিন অপেক্ষা করে পর্তুগিজ থেকে আসা জলদস্যুদের সাহায্যে ইউসুফ আদিল শাহর বিরুদ্ধে লড়াই করতে। কিন্তু আগস্টের শেষদিকে ইউসুফ আদিল শাহ মারা গেলে পরিস্থিতি আবার নাটকীয় মোড় নেয়। সিংহাসনে বসেন সুলতানের নাবালেগ ছেলে ইসমাইল আদিল শাহ, রাজ্যশাসনের কোনো দক্ষতাই যার ছিল না।
নভেম্বরের ২৫ তারিখ চুড়ান্ত আক্রমণ চালায় পর্তুগিজ জলদস্যুরা। অনভিজ্ঞ ইসমাইল আদিল শাহ পরিস্থিতি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন এবং তার সেনারা যুদ্ধে পরাজিত হয়। পর্তুগিজরা দ্বিতীয়বারের মত পানজিম দখল করে, এরপর তারা মান্দবি নদী ধরে এগিয়ে যায় গোয়ার দিকে। গোয়া দখল করতে তেমন বেগ পোহাতে হয়নি আলবুকার্ককে, এক সপ্তাহের যুদ্ধের পর পিছু হটে সুলতানের বাহিনী। বিজয়ের নেশায় উন্মত্ত হয়ে শহরে প্রবেশ করেন আল বুকার্ক। বিজয় উদযাপনের জন্য নৃশংস এক পদ্ধতি বেছে নেন তিনি। শুরুতেই নির্দেশ জারই করেন শহরের সকল মুসলমানকে হত্যা করতে হবে।
নির্দেশ জারি হতেই গোয়ার পথঘাটে বসানো হলো একের পর এক ফাঁসির মঞ্চ। ঘরবাড়ি থেকে ধরে আনা হলো মুসলমানদের। একের পর এক ঝুলিয়ে দেয়া হলো ফাঁসিতে। লোকগুলো জানতেও পারলও না কী অপরাধে তাদের মৃত্যু দেয়া হচ্ছে। টানা তিনদিনে প্রায় ৬০০০ মুসলমানকে ফাসি দিল আল বুকার্কের সেনারা। বেশকিছু মহিলা ও শিশুরা আশ্রয় নিয়েছিলেন পুরনো একটি মসজিদে। মসজিদে আগুন ধরিয়ে দিল পর্তুগিজরা। নির্মমভাবে পুড়ে মারা গেলেন সবাই[4]।
১৫১২ সালে আবারও আদিল শাহের বাহিনীর সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে পর্তুগিজরা। প্রায় এক মাস যুদ্ধের পর সুলতানের সেনাবাহিনী পিছু হটে। সৈন্যসংখ্যায় সুলতানের বাহিনী এগিয়ে থাকলেও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহারের দিকে পর্তুগিজরা এগিয়ে ছিল। বিশেষ করে তাদের দূরপাল্লার কামানগুলো সুলতানের সেনাবাহিনীর প্রচুর ক্ষতি করে। আদিল শাহের বাহিনী পিছু হটলে গোয়া ও আশপাশের এলাকায় পর্তুগিজদের শতভাগ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
গোয়ায় পর্তুগিজদের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি মজবুত হতেই এখানে এসে উপস্থিত হয় ক্যাথলিক চার্চের প্রতিনিধি। চার্চ সে সময় জলদ্যসুদের মাধ্যমেই নিজের প্রভাব ও শক্তির বিস্তার করতো। ক্যাথলিক চার্চ চাচ্ছিল দ্রুত এই অঞ্চলে খ্রিস্টান উপনিবেশ গড়ে তুলতে এবং জনগণকে ধর্মান্তরিত করতে। শুরুর দিকে পর্তুগিজ জলদস্যুরাই অস্থায়ী চার্চ নির্মান করে নিজেরা সেগুলোর দেখভাল করতো। ১৫৩৮ সালে প্রথম একজন বিশপ এসে উস্পস্থিত হন গোয়ায়। তার আগমনের পর থেকে খ্রিস্টধর্ম প্রচারে জোর দেয় পর্তুগিজরা। শুরুর দিকে তারা মুসলমানদের উপর গণহত্যা চালালেও হিন্দুদের সাথে শত্রুতা করেনি। এর কারণ ছিল আঞ্চলিক হিন্দু রাজাদের অনেকেই পর্তুগিজদের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন এবং যুদ্ধে তাদের নানা সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু বিশপের আগমনের পর বেশকিছু পদক্ষেপ থেকে স্পষ্ট হতে থাকে পর্তুগিজরা হিন্দুদেরকেও আর ছাড় দিবে না।
১৫৪০ সালে পর্তুগিজরা মন্দির ও মসজিদ ভেঙ্গে ফেলার আদেশ দেয়। সে বছর প্রচুর মন্দির ও মসজিদ ভাঙ্গা হয়। এক্ষেত্রে কোনো প্রতিবাদে কান দেয়া হয়নি। ১৫৪২ সালে ভারতবর্ষে আসেন প্রথম জেসুইট ফ্রান্সিস জেভিয়ার। তিনি ছিলেন খুবই ধর্মান্ধ একজন ব্যক্তি। তিনি এসেই স্থানীয়দের চাপ দেন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করতে। যারা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তাদের জন্য ব্যবস্থা করেন নির্মম শাস্তির। মাত্র এক মাসে তিনি জোরপূর্বক দশ হাজার হিন্দুকে খ্রিস্টধর্ম গ্রহন করতে বাধ্য করেন। একবার একদিনেই একশো হিন্দু মুসলমানকে খ্রিস্টান হতে বাধ্য করেন তিনি।লোকজনকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করেই ক্ষান্ত হয়নি পর্তুগিজরা। তারা ধর্মান্তরিতদের উপর নজরদারি শুরু করে। তাদের জীবনে পুরনো ধর্মের কোনো ছাপ রয়ে গেছে কিনা সেদিকে রাখা হয় কড়া নজর। ১৫৪৫ সালের ১৬ মে রাজাকে লেখা এক চিঠিতে ফ্রান্সিস জেভিয়ার বলেন, খ্রিস্টানদের জন্য জরুরি জিনিসটি হচ্ছে পবিত্র ইনকুইজিশন। এখনো অনেকে ইহুদি ও মুসলমানদের মতই জীবনযাপন করছে। তাদের মনে ঈশ্বরের ভয় নেই, নুন্যতম চক্ষুলজ্জাও নেই। রাজা যেন ভারতের এই বিশ্বস্ত প্রজাদের জন্য এই জরুরি জিনিসের ব্যবস্থা করেন[5]।
ফ্রান্সিস জেভিয়ারের এই পত্র ছিল ইনকুইজিশনের সূচনাবিন্দু। ১৫৬০ সাল থেকে শুরু হয় স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের[6] আদলে গোয়া ইনকুইজিশন। ইনকুইজিশন ছিল মূলত একটি ধর্মীয় আদালত। যেখানে ধর্ম অবমানাননা বা এ ধরণের অভিযোগ তুলে যে কাউকে যে কোনো শাস্তি দেয়া যেত। এক্ষেত্রে তথ্য প্রমাণ যাচাই বা সাক্ষ্য প্রমাণের কোনো দরকার হত না। সাধারণত ইনকুইজিশনের আদালতে কারো নামে মামলা হলে শাস্তি এড়ানোর কোনো সম্ভাবনা ছিল না। প্রত্যেকের জন্যই বরাদ্দ হত নির্মম শাস্তি।
আদিল শাহের পুরনো একটি প্রাসাদে বসে ইনকুইজিশনের আদালত[7]। ১৫৬০ সাল থেকেই আদালতে উপস্থাপন করা হয় একের পর এক মামলা। সে বছর ৫ ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের পরেও গোপনে নিজেদের পুরনো ধর্ম পালন করছিল। ভয়ভীতি ও শাস্তির মাধ্যমে চলতে থাকে ধর্মান্তকরন। শুধু হিন্দু মুসলমান নয় ইহুদিদেরকেও বাধ্য করা হয় খ্রিস্টধর্ম গ্রহণে। ইনকুইজিশনের মূল্য লক্ষ্য ছিল নব্য খ্রিস্টানদের মন থেকে পুরনো ধর্মের রীতিনীতি ও সংস্কৃতি একেবারে মুছে ফেলা।
খ্রিস্টধর্ম গ্রহণকারী মুসলমানদের ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখা হত গোপনে সে নামাজ আদায় করে কিনা, রমজান মাসে পানাহার থেকে বিরত থাকে কিনা, ঘরে কোরআনুল কারিম কিংবা অন্য কোন ধর্মীয় গ্রন্থ আছে কিনা। হিন্দুদের ক্ষেত্রে খেয়াল করা হত তারা ভাতে লবন দেয় কিনা[8], বাড়ির সামনে তুলসী গাছ আছে কিনা, ঘরে কোনো দেবদেবীর মূর্তি আছে কিনা, পূজার দিনগুলিতে তারা উৎসব পালন করে কিনা। বিষয়গুলো নিশ্চিত হওয়ার জন্য ইনকুইজিশনের লোকজন যখন তখন যে কারো গৃহে তল্লাশি চালাত।
একজন মসজিদের ইমামকে ধরে আনা হয় তার এক আত্মীয়ের ঘর থেকে। খ্রিস্টান হওয়ার প্রস্তাব দিলে ঘৃনাভরে প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। শহরের চত্বরে এনে গাছের সাথে বাধা হয় তাকে। ধারালো ছুরি দিয়ে তুলে নেয়া হয় বুকের চামড়া। তড়পাতে তড়পাতে মারা যান তিনি। তার লাশ ছুড়ে ফেলা হয় নদিতে। একজন বৃদ্ধ মহিলাকে তার স্বামীসহ জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। অভিযোগ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার পরেও বাড়িতে এক কপি কোরআনুল কারিম রেখেছিলেন তারা।
নির্যাতনের জন্য গোয়া ইনকুইজিশনের আদালত বেছে নিয়েছিল ভয়াবহ কিছু পদ্ধতি। এর অনেকগুলোই স্প্যানিশ ইনকুইজিশন থেকে অনুকরণ করেছিল তারা। সবচেয়ে নির্মম শাস্তি ছিল জীবন্ত পুড়িয়ে মারা। এক্ষেত্রে নারী, শিশু, বৃদ্ধ কাউকেই ছাড় দিত না পর্তুগিজরা। উঁচু করে স্থাপিত কাঠে ঝুলিয়ে আরেকটি শাস্তির পদ্ধতি বের করেছিল তারা। এক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির দু হাত বেধে একটি উঁচু কাঠে বেধে দেয়া হত। তারপর তাঁর দুই পয়ায়ে ঝুলিয়ে দেয়াক হত ভারি পাথর। পাথরের চাপে লোকটির পুরো শরীর ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হত। এভাবে নির্যাতন চালালে অনেক সময় লোকটির শরীর ছিঁড়ে গিয়ে সে মারাও যেত। অনেকসময় বন্দিকে উল্টো করে ঝুলিয়ে তার মুখের ভেতর ঠেসে দেয়া হত কাঠের টুকরো, গলায় বেধে দেয়া হত লোহার ব্যান্ড। তীব্র শ্বাসকষ্টে ছটফট করতে সে। একজন পাদ্রি এসে নিত তার স্বীকারোক্তি। স্বীকারোক্তিতে কোনো ভুল প্রকাশ পেলে ঘোষণা করা হত মৃত্যুদণ্ড। অনেক সময় লোহার গদা দিয়ে পিটিয়ে বন্দিদের হাত পা থেঁতলে দেয়া হত। কখনো উত্তপ্ত লোহা গলিয়ে ফোটা ফোঁটা ফেলা হত বন্দির হাতে। তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করতে থাকতো সে, বাতাসে ভেসে বেড়াত চামড়া পোড়া গন্ধ। অনেককে শহরের উন্মুক্ত চত্বরে এনে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হত। অনেক সময় বন্দির শরীরের হাত পা বেধে দুই অংশ দুই ঘোড়ার পয়ায়ের সাথে বেধে দেয়া হত। এরপর ঘোড়া দুটিকে বিপরীত দিকে ছুটানো হত। মাঝ থেকে ফেটে যেত বন্দির দেহ। ফিনকি দিয়ে ছুটতো রক্ত, তা দেখে উল্লাসে মেতে উঠত পর্তুগিজরা।
অনেককে ইনকুইজিশনের কারাগারে বন্দি রাখা হত মাসের পর মাস। চার্লস ডেলন নামে একজন ফরাসি চিকিৎসককে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে বন্দি করা হয় ১৬৭৪ সালে। প্রায় তিন বছর ইনকুইজিশনের আদালতে বন্দি থাকেন তিনি। নির্যাতনের কারণে কয়েকবার তিনি আত্মহত্যার চেষ্টাও চালান। ১৬৭৭ সালে মুক্তির পর তিনি ইনকুইজিশনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি স্মৃতিকথা লেখেন। সেখানে তিনি বলেন, নভেম্বর ও ডিসেম্বরের ভোরগুলোতে বন্দিদের তীব্র আর্তচিতকার শোনা যেত। আমার পাশের কক্ষেই তাদের নির্যাতন করা হত। নারী পুরুষ সব ধরণের মানুষকেই দেখেছি কারাগারে। শাস্তির ক্ষেত্রে কাউকেই ছাড় দেয়া হয়নি। অনেককে এমনকি উলঙ্গ করেও শাস্তি দেয়া হত[9]। ডেলনের বর্ননা থেকে জানা যায় আদিল শাহের প্রাসাদের প্রায় দুইশোটি কক্ষে লোকজনকে বন্দি রাখা হত। এসব কক্ষের বেশিরভাগে আলো বাতাস প্রবেশের কোনো সুযোগ ছিল না।
গার্সিয়া ডিওর্তা ছিলেন একজন পুর্তগিজ উদ্ভিদবিদ। তিনি ছিলেন ইহুদি ধর্মের অনুসারী। পর্তুগালে অবস্থানকালে তার পরিবারকে জোরপূর্বক খ্রিস্টান বানানো হয়। তিনি গোয়ায় এসে উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা করেন। ১৫৬৩ সালে প্রকাশিত হয় তার লেখা বই ইন্ডিয়ান মেডিসিনাল প্লান্টস। ১৫৬৮ সালে তিনি মারা যান। পরের বছর ইনকুইজিশনের নজর পরে তার পরিবারের উপর। অভিযোগ তোলা হয় তিনি মনেপ্রাণে খ্রিস্টান হতে পারেননি, গোপনে ইহুদি ধর্ম পালন করতেন। তার সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। আত্মীয় স্বজনদের বন্দি করে তীব্র নির্যাতনের মুখোমুখি করা হয়। ১৫৬৯ সালে তার বোনকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। এতেই ক্ষান্ত হয়নি ইনকুইজিশনের আদালত। ১৫৮০ সালে সমাধি থেকে তোলা হয় গার্সিয়ার মৃতদেহ। আগুনে পুড়িয়ে ছাইগুলো ফেলে দেয়া হয় ময়লার ভাগাড়ে[10]।
পর্তুগিজরা গোয়ায় ​​​​​​কোংকনি, আরবি, মারাঠি ও সংস্কৃত ভাষার বইপত্র নিষিদ্ধ করে। মুসলমানদের ধর্মীয় সকল প্রতীক নিষিদ্ধ করা হয়। মসজিদগুলো আগেই ধ্বংস করা হয়েছিল, কেউ ঘরে একাকী লুকিয়ে নামাজ পড়বে সে উপায়ও ছিল না। রোজার দিনে লক্ষ্য রাখা হত কেউ পানাহার থেকে বিরত থাকছে কিনা। আতংকের সেই দিনগুলিতে অলিগলিতে টহল দিচ্ছিল পাদ্রি ও গির্জার লোকেরা। সামান্য সন্দেহ হলেই তুলে নিয়ে যাচ্ছিল ইনকুইজিশনের আদালতে, যেখান থেকে ফেরার কোনো উপায় ছিল না। গোয়ার মুসলমানদের জন্য ইনকুইজিশনের এই সময়টি ছিল দুঃসহ অভিজ্ঞতা। তাদের অনেকে আশপাশের এলাকায় হিজরত করেছিলেন। যারা তা করতে পারেননি, তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল নির্মম শাস্তি। একে একে সবাইকেই শাস্তির মুখোমুখি করা হয়েছিল।
১৬৬৯ সালে রাজার পক্ষ থেকে নির্দেশনা আসে অনাথ হিন্দু মুসলমান বালকদের গির্জার অধীনে দিতে হবে। তাদের উপর তাদের পরিবারের কোনো কতৃত্ব চলবে না। শুরু হয় অনাথ বালকদের ধর্মান্তকরনের প্রক্রিয়া। সে সময় হিন্দু মুসলমান সবার মধ্যেই দাসপ্রথা চালু ছিল। পর্তুগিজরা ঘোষণা করে কোনো দাস যদি খ্রিস্টাধর্ম গ্রহণ করে তাহলে তাকে মুক্ত করে দেয়া হবে। তার উপর মালিকের কোনো কতৃত্ব থাকবে না। শুরু হয় দাসদের মধ্যে ধর্ম পরিবর্তনের হিড়িক।
হিন্দুদের ধর্মিয় আচার ও অনুষ্ঠান বন্ধের জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল পর্তুগিজরা। ১৫৬৪ সালে গোয়ার একটি নদিতে হিন্দুরা একত্র হয় স্নান করার জন্য। জেসুইট জানতে পেরে নির্দেশ দেন একটি গরু জবাই করে তার রক্ত নদিতে ফেলা হোক। আদেশ বাস্তবায়িত হলে হিন্দুরা সরে যায়। গরুর রক্তমেশা পানিতে স্নান করতে রাজি হয়নি তারা।
কোর্ট অব ইনকুইজিশন চালু ছিল প্রায় তিনশো বছর। ১৮১২ সালে গোয়া ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণে এলে বন্ধ হয় কোর্ট অব ইনকুইজিশন। স্বধর্মের লোকদের অপরাধ গোপন করতে ইংরেজরা পুড়িয়ে ফেলে কোর্টের সকল নথিপত্র। ফলে ঠিক কত লোককে ইনকুইজিশনের মুখোমুখি করা হয়েছিল তা আর জানা যায়নি। তবে এটুকু জানা যায়, ১৫৬১-১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় ১৭ হাজার মানুষকে ইনকুইজিশনের আদালতের মুখোমুখি হতে হয়। বলাবাহুল্য, তাদের প্রত্যেককেই দোষী সাব্যস্ত করে কঠোর শাস্তি দেয়া হয়।
উগ্র হিন্দুত্ববাদিরা আজকাল সুলতান আলমগিরের নামে মন্দির ধ্বংসের বানোয়াট অভিযোগ করলেও রহস্যজনকভাবে পর্তুগিজদের সম্পর্কে তারা নিশ্চুপ। অথচ পর্তুগিজদের হাতে গোয়াতে অন্তত ৫০০ মন্দির ধ্বংস হয়েছে। গবেষক শেফালি ভদ্র জানাচ্ছেন, বর্তমানে গোয়ায় পর্তুগিজ শাসনের পূর্বে প্রতিষ্ঠিত শুধু একটি মন্দির টিকে আছে। অন্য যেগুলো আছে সবই পর্তুগিজ শাসনের পরে প্রতিষ্ঠিত। গোয়াতে বর্তমানে প্রচুর খ্রিস্টানের বসবাস[11]। এদের বেশিরভাগের পুর্বপুরুষ ছিল হিন্দু। জোরপূর্বক তাদেরকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা হয়েছিল।
গোয়া ইনকুইজিশনের অন্যতম কালপ্রিট ছিলেন ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স। কিন্তু তার অপকর্মের কালো ইতিহাস মুছে দিতে মিশনারিরা গ্রহণ করেছে নানা পদক্ষেপ। তাকে মহান ধর্মপ্রচারক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বিশ্বের নানা দেশে তার নামে প্রতিষ্ঠা করেছে স্কুল কলেজ। ২৯টি দেশে ফ্রান্সিস জেভিয়ার্সের নামে স্থাপিত হয়েছে ২৭৭ টি স্কুল ও কলেজ। শুধু ভারতেই স্থাপিত হয়েছে একশোর বেশি। বাংলাদেশেও আছে এই খলনায়কের নামে স্কুল। পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে ১৯১২ সালে মিশনারিরা প্রতিষ্ঠা করে ​​​​​​সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স গার্লস স্কুল। এসব স্কুলের শিক্ষার্থীদের সামনে ফ্রান্সিস জেভিয়ার্সকে উপস্থাপন করা হয় মহান সাধু হিসেবে, আড়ালে রাখা হয় তার মানবাতাবিরোধি অপরাধের বিশাল আখ্যান।
ব্যাসিলিকা অব বোম জেসাস নামে প্রায় চারশো বছরের পুরনো একটি গির্জা আছে গোয়াতে। এই গির্জায় একটি কাচের বক্সে সংরক্ষণ করা হয়েছে ফ্রান্সিস জেভিয়ার্সের মৃতদেহ। এখনো বিশেষ বিশেষ দিনে খ্রিস্টানদের দেখানোর উদ্দেশ্যে বের করা হয় এই মৃতদেহ। শ্রদ্ধার সাথে সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয় খ্রিস্টানরা। সাম্রাজ্যবাদী লুটেরারা নিজেদের অপরাধীদের নিয়ে গর্ব করলেও আমরা নিজেদের সত্যিকারের হিরোদের নাম মুখে নিতে লজ্জিত হই, আমাদের এ লজ্জাও সাম্রাজ্যবাদের শেখানো।
সূত্র
[1] ভাস্কো দা গামার লুণ্ঠন ও নৃশংসতা সম্পর্কে জানতে পড়ুন, এ জার্নাল অফ দ্য ফার্স্ট ভয়েজ অব ভাস্কো দা গামা, দ্য রাইজ অব পর্তুগিজ পাওয়ার ইন ইন্ডিয়া ১৪৯৭-১৫৫০, দ্য লাস্ট ক্রুসেড – দ্য এপিক ভয়াজেস অব ভাস্কো দা গামা।
[2] দ্য থেফট অব ইন্ডিয়া, ২৯,৩০।
[3] বন্দি শিশু ও ধনী ব্যক্তিদেরকে পরে জোরপূর্ব খ্রিস্টান বানানো হয়।
[4] দ্য থেফট অব ইন্ডিয়া, ৩০।
[5] ডকুমেন্টা ইন্ডিকা, ৪/১২৩।
[6] ১৪৯২ সালে স্পেনে মুসলমানদের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল গ্রানাডার পতন হলে সেখানে শুরু হয় ইনকুইজিশন।
[7] শেফালি ভদ্রের লেখা থেকে জানা যায় এই প্রাসাদের অবস্থান ছিল গোয়ায়, সেন্ট ক্যাথরিন চার্চ ও ব্যসিলিকার মধ্যবর্তী স্থানে। আদিল শাহের প্রাসাদটি বর্তমানে অবশিষ্ট নেই।
[8] হিন্দুরা সাধারণত খাবারে লবণ দিত না। খ্রিস্টানরা দিত। এখনো গোয়ার দুই ধর্মের লোকজনের মাঝেই এই পুরনো অভ্যাস টিকে আছে।
[9] রিলেশন দে ইনকুইজিশন দে গোয়া, ৪৫।
[10] দ্য থেফট অব ইন্ডিয়া, ৩৭।
[11] ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে, ১,৪৫৮,৫৪৫ জন জনসংখ্যার, ৬৬.১% হিন্দু, ২৫.১% খ্রিস্টান এবং ৮.৩% মুসলমান । প্রায় ০.১% শিখ, বৌদ্ধ, বা জৈন ধর্মের অনুসারী।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button