ইসলামিক গল্প

হোঁচট

১.

“তোর সাথে জান্নাতের অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াবো।“

টেক্সটা দেখেই মনের মাঝে আনন্দের সুবাতাস বয়ে গেলো। এত সহজ করে সুন্দর কথাগুলো যাঈদ লিখতে পারে, মনের ভেতর ধাক্কা লাগে কোথাও। ওকে না পেয়েও হারানোর ভয় লাগে মিথিলার। ওর কন্ঠে যেমন মাদকতা, ওর টেক্সটগুলোর প্রতিটা শব্দ যেন মনে বসে যায়।

রিপ্লাই এ “ইন শা আল্লাহ্‌ “ লিখতে গিয়েও কোথায় যেন আটকে যায় মিথিলা। পবিত্রতা আর অনুশোচনার অনুভূতি একই সাথে চেপে ধরে ওকে।

যাঈদ ওর ক্লাসমেইট, ওদের এই নতুন গজানো সম্পর্কটার ব্যাপারে কেউই জানে না শুধুমাত্র আল্লাহ ছাড়া। আল্লাহর কাছে জবাবদিহির ভয়ে মনটা সংকুচিত হয়ে আসে ওর। আবার একই সাথে যাঈদের সাথে আখিরাতের স্বপ্ন বুনতে গিয়ে ও পবিত্র প্রেমের এক অনুভূতি পায়। মিথিলা ঠিক জানে ও আবারো ভুলে জড়াচ্ছে।

আতিকের সাথে সম্পর্কটা ভেঙ্গে যাওয়ার পর ও তওবা করেছিল মন থেকে, আর এই ভুলের পথে নয়। আতিক চলে যাওয়ায় অপমানিত বোধ করার সাথে প্রশান্তিও লেগেছিল ওর। অনার্স ফোর্থ ইয়ারে এসে হঠাৎ দ্বীনের বুঝ পায় মিথিলা। দ্বীনকে ভালোবেসে নতুনভাবে জীবন গড়ার স্বপ্ন ও আতিককে নিয়েই দেখেছিল। কিন্তু আতিক ওর সালোয়ার-কামিজ এর উপর নতুন নেয়া বোরকা দেখে বলে উঠতো, “তুমি তো দেখি বেশি মোল্লা হয়ে যাচ্ছো, সৌদির ইসলাম বাংলাদেশে কেন?”

আতিক কখনোই মেনে নিতে পারেনি মিথিলার পরিবর্তন। আতিক এই মিথিলাকে চিনে না, একে ও কোনোদিনই ভালোবাসেনি। মিথিলাও বুঝাতে পারেনি যে, ইসলাম শুধু নির্দিষ্ট কোনো ভুখন্ডের না। আতিকের সাথে শেষমেষ ব্যাটে-বলে মিলল না। মিথিলা হাফ ছেড়ে বেঁচেছিল। হারাম প্রেম বিয়েতে গড়ালেও আজীবন হারাম স্মৃতি রোমন্থনই হতো দুইজনের। প্রথম স্পর্শ, প্রথম দেখা কোনো স্মৃতিই যে পবিত্র হতো না। দুইজন পরস্পর গায়ের মাহরামের সাথে সঙ্গী হিসেবে তৃতীয়জন যে শয়তান! মাঝে মাঝে আতিকের উপর খুব রাগ উঠলেও মানিয়ে নিয়েছিল মিথিলা।

দ্বীনচর্চা একটু একটু করে বাড়াচ্ছিল। কিন্তু আবারো পা পিছলে গেল। ক্লাসে, আর ফেইসবুক গ্রুপে যাঈদের কথাগুলো ওকে চুম্বকের মত টানতো। একদিন ক্লাসের কি একটা নোটিশ দিতে যাঈদকে পারসোনালি ইনবক্স করেছিল গ্রুপে না করে। শুরুটা ওই থেকেই। একদম ঠিক হচ্ছে না, মনের ভেতর থেকে কী একটা বলছিল মিথিলাকে। তবু সে ভুল করে ফেলল।

২.

হিজাব শুরু করলেও আগের টমবয় লাইফের ছাপ এখনো লুকাতে পারেনি মিথিলা। টমবয় মুডের সাথে দ্বীনের মিশ্রণ, যাঈদের কাছে ওকে লাগে এক চিড়িয়া। চিড়িয়াটা আকর্ষণীয় বটে। বোরকা পড়া মেয়েদের বরাবর ভালো লাগে যাঈদের, সম্মান করতে ইচ্ছা হয় ভেতর থেকে। যাঈদের রুপা বোরকা পড়ত। যাঈদ হিমু না। কিন্তু রুপার জন্য ও হিমুই ছিল। এইতো সেদিন রুপার বিয়ে হয়ে গেলো। রুপার সাথে বিয়ে হওয়া সম্ভব না বুঝে আগেই দূরত্ব তৈরী করে নিয়েছিল যাঈদ। কত মেয়ের সাথেই তো বন্ধুত্ব ছিল, কিন্তু রুপার স্থানটা আর কাউকে দেয়নি ও। বন্ধুত্ব আর ভালোবাসা তো এক নয়!

মিথিলার সাথে কথায় কথায় রুপার সব গল্প বলে দিয়েছে যাঈদ। মিথিলাও ওর আতিকের গল্প করেছে। আতিকের প্রতি প্রচন্ড রাগ হয় যাঈদের। এত ভালো একটা মেয়েকে কিভাবে আতিক কষ্ট দিল। আসলে যাঈদ মফস্বলের বলে হয়তো পর্দা করা মেয়ে ভালো লাগে, ঢাকার ছেলেদের সাথে ও মিশে দেখেছে। ওরা একটু অন্যরকম। এগুলো সবই অবশ্য যাঈদের নিজস্ব অভিজ্ঞতালব্ধ মতামত। মিথিলা দ্বীন ইসলামকে খুব ভালোবাসে। বেশিরভাগ সময়ই ওদের কথা হয় দ্বীন কেন্দ্রিক।

যাঈদও ছোটবেলায় কিছুদিন মাদ্রাসায় পড়েছিল। ইসলামী একটা দলের মাহফিলও তার ভালো লাগে। আগে যাওয়াও হত মাহফিলে। ঢাকার যান্ত্রিক জীবন যেন যাঈদকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। মিথিলা ওকে প্রায়ই ইনবক্সে ওর প্রিয় আলেমের লেকচার দেয়। ওর স্টেটাসগুলো থাকে ইসলামের প্রতি ভালোবাসায় পূর্ণ। এইতো সেদিন ছেলেরা কেন দাঁড়ি রাখে না তাই নিয়ে মিথিলা লিখেছিল। যাঈদের লজ্জাই লেগেছিল। আজকাল নামাযই মিস হয়ে যায়, দাঁড়ির চিন্তা কখন করবে! মিথিলা যেন বিশাল এক চালিকাশক্তি হয়ে যাঈদের জীবনের ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ছে।

৩.

রিক্সা করে টিউশনিতে যাচ্ছে মিথিলা। রাস্তায় এক দোকানে গান বাজছে, “শোনো মন বলি তোমায়, সব করো প্রেম করো না! প্রেম যে কাঁঠালের আঠা, আরে লাগলে পরে ছাড়ে না!” কি চটুল লিরিক্সরে বাবা! গান শোনা ছেড়ে দিয়েছে অনেক আগেই মিথিলা। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন হয় রাস্তা ঘাটে উলটাপালটা কোনো গান শুনলো আর সেটাই মাথায় ঢুকে গেলো। প্রেমের কথা ভাবতে গিয়ে যাঈদের কথা মনে হল। যাঈদ ছেলেটা একটু উদাসীন ভাবের। স্পষ্ট কোনো কমিটমেন্টের কথা না বললেও যাঈদ বুঝিয়ে দিয়েছে ও মিথিলাকে চায়।

মিথিলা খুব ভয় পাচ্ছে , আতিকের স্মৃতি এখনো ও ভুলতে পারে না। এর মাঝে যাঈদ এসে যেন ওর ক্ষত সাড়িয়ে তুলছে মসৃণ এক তুলি দিয়ে। আতিকের মত যাঈদও যদি ছেড়ে চলে যায়!

স্টুডেন্টকে পড়াতে পড়াতে পর্দার প্রসঙ্গ উঠল হঠাৎ। ওর ছাত্রী খুব মিষ্টি দেখতে। মেয়েটা বোরকা পরে। কিন্তু হিজাবের সাথেই খুব সেজে বাইরে যায়। পর্দা যে শুধু এক টুকরো কাপড় নয় এটা বুঝাতে চায় মিথিলা। বুঝাতে গিয়ে নিজেকে চোরের মত লাগে ওর। পর্দা করে কি প্রেম করা যায়? গাইর মাহরামের সাথে সারা রাত টেক্সটে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বোনা যায়! মিথিলা মনে মনে বলে, “হে মহা ক্ষমতাবান, আমি পাপকে ঘৃণা করি, কিন্তু দূর্বল বান্দা বলে পাপে ডুবে যাচ্ছি, আমাকে উদ্ধার করেন।“

৪.

সকাল থেকেই মন বিগড়ে আছে মিথিলার। যাঈদকে ওর প্রিয় আলেমের লেকচার দিয়েছিল। জিজ্ঞেস করেছিল কেমন লাগল। যাঈদ বলল, ওর প্রিয় আলেমদের যাঈদের পছন্দ না। এদের মাঝে নাকি হাক্কানী নূর নেই। হাক্কানী নূর কী জিনিস এটা বুঝতেই মিথিলার অনেকক্ষণ লাগলো।

গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত যাঈদ মিথিলাকে জিজ্ঞেস করেছে, সে কি ছেলেদের মত নামায পড়ে নাকি মনে করে মেয়েদের নামায ভিন্ন রকম? মিথিলা জানে, বুঝেও; তাদের দুইজনের দ্বীন মানার পদ্ধতিতে অনেক পার্থক্য আছে। তাদের জ্ঞান নেয়ার উৎস এক না। কিন্তু তাই বলে কি তারা একসাথে ঘর বাঁধতে পারবে না! যাঈদ কেমন একটা কিন্তু কিন্তু শুরু করে দিয়েছে! মিথিলা বুঝতে পারছে না সামনে কী হতে যাচ্ছে। মিথিলা যতই বুঝাতে চায় , যাঈদ বেঁকে বসে।

একসাথে পথ চলার আরো বাঁধা চলে আসছে। যাঈদের নাকি ইচ্ছা মা এর পছন্দে বিয়ে করা। এতদিন কোথায় লুকিয়ে ছিল এই ইচ্ছা মিথিলা কিছুই বুঝতে পারছে না।

বিকালে একটা রেস্টুরেন্টে দেখা করে ওরা। যাঈদই ডেকেছে মিথিলাকে। এই প্রথম ওরা একসাথে বাইরে কোথাও বসল। যাঈদকে সুন্নাতি দাঁড়িতে অনেক বেশি নূরানী লাগে। যাঈদ কফি অর্ডার করে। মিথিলার পার্স আর ওর মানিব্যাগ একত্র করে যাঈদ একটা ছবি তোলে। মিথিলার মনে আশা উঁকি দেয়। মিথিলা বলে, আমাদের বিয়ে হলে এটা কভার ফটো দিব! কি বলিস?

যাঈদ মৃদু হাসে, ওর হাসিতে মিথিলার মন ভালো হয়ে যায়। মিথিলা বুঝে ক্রাশ খাওয়া কাকে বলে! দ্বীনের বুঝ আসার আগে চোখের পর্দার কথা ভাবতোই না। তাই ধুমধাম একে ওকে ভালো লেগে যেত। আর এখন দ্বীনদার এক ছেলের উপর ক্রাশ খেয়েছে সে। ঢেঁকি নাকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। যদিও ঢেঁকির স্বর্গে যাওয়ার প্রশ্ন নেই, তবু মিথিলার জন্যে এই প্রবাদ পারফেক্ট।

কফি আসলে আস্তে আস্তে কথা শুরু করল যাঈদ। কেন দুই মানহাযের দুইজন এক হতে পারে না তা নিয়ে আধা ঘন্টা কথা বলল। তারপর মা বাবার পছন্দে বিয়েতে কতটা প্রশান্তি আসতে পারে তাই নিয়ে আরো কিছুক্ষণ। মিথিলা নির্বাক। কোনোমতে কফিটা গিললো, এত তিতা কেনো কফিটা!

সব কথার সারমর্ম হল, জিনার গুনাহতে লিপ্ত হয়ে কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়া মিস করতে চায় না যাঈদ। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর দেখানো পথেই সে চলতে চায়। মিথিলা যেহেতু তার প্রতি এতই দূর্বল হয়ে গেছে যাঈদ এক্ষুণি মিথিলাকে ফোনে ব্লক করে দিচ্ছে। মিথিলার ভালোই চায় যাঈদ।

মিথিলা একটা কথাও বলেনি। আসার আগে শুধু বলেছে, “দাঁড়িটা কাটিস না।“

“দাঁড়ি আমি তোর জন্যে রাখিনি”। জবাব দিয়ে দেয় যাঈদ।

রিকশায় উঠে মিথিলা ভাবছিল, “আহ! ওকে তো বলাই হলো না, ছেলে হলে যেন নাম রাখে সাঈদ। তাহলে সাঈদ বিন যাঈদ মানে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবীর নামে নাম হয়ে যাবে। মনের ভেতর দলা পাকানো কষ্ট আর প্রেমের গুনাহ্ থেকে বের হয়ে আসার স্বস্তি থেকে মিথিলা জোরে বলে ফেলল, “আলহামদু লিল্লাহ্‌ ‘আলা কুল্লি হাল!”

৫.

মা বাবা বিয়ের জন্যে পাত্র দেখছে। রিনাকে যাঈদের ব্যাপারটা খুলে বলে মিথিলা। রিনা যদি একবার ফোন দিয়ে যাঈদকে জিজ্ঞেস করতো বিয়ে করতে রাজি কিনা! রিনা বিশ্বস্ত বান্ধবীর মত যাঈদকে ফোন দেয়। যাঈদ একবাক্যে না করে দিয়েছে। মিথিলাও এখন অনেকটা শক্ত। তাই সহজে মেনে নিয়েছে এই সিদ্ধান্ত। কারো কাছে পাপের ফিরিস্তি দেয়া উচিত না জেনেও পেটে রাখতে পারে না যাঈদের কথাটা, তাই রিনাকে বলা। বারবার করে না করে যাঈদের কথা কাউকে না বলতে। রিনাও কথা দিয়েছে।

“কিরে , তলে তলে টেম্পু চলে, আমরা গেলে হরতাল?”

রাতে ঘুমের আগে ফেইসবুক খুলতেই রাজীবের টেক্সট। একটু ঘাঁটাতেই বুঝতে পারলো আসল ঘটনা। রিনা সব বলে দিয়েছে।

“আমি তো তোর ফেইসবুক এক্টিভিটি দেখে ভাবতাম যে ওহী বন্ধ না হলে তুই এতদিনে দাবি করে বসতি তোর কাছে ওহী এসেছে, তাই তুই ভোল পালটে ফেলেছিস”।

“রাজীব, আমি তোর সাথে কথা বলতে চাচ্ছি না”।

“নারে দোস্ত যেভাবে, আমাদের সবাইকে নসীহা করতি নারী পুরুষ মেলামেশা হারাম বলে। আমি তো ভাবতাম প্রতি সকালে বুঝি মান্না সালওয়া দিয়ে নাস্তা করে ক্লাসে আসিস”।

চোখের পানিতে টেক্সটগুলো সব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। আর কথা বাড়ায় না মিথিলা। রুমের দরজা লাগিয়ে দিয়ে ওযু করে সলাতে দাঁড়ায় ও। অপরাধ যার কাছে করেছে ক্ষমা তো তাঁর কাছেই চাইতে হবে। অপবিত্র মনটাকে আবার পবিত্র করে দিতে পারেন একমাত্র তিনিই। সিজদাহতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে মিথিলা। আর হোঁচট খেতে চায় না, শক্তভাবে দ্বীনের পথে হাঁটতে চায় ও।

সূত্র : 

মতামত দিন