শিয়াল ও মোরগ-এর গল্প

গল্পের মুল লেখক: আবু তাহের বর্ধমানী

অনুলিখন : মিজানুর রহমান

একদিন এক শিয়াল একটা মোরগকে দেখে ধরবার জন্য ছুটল। মোরগও শিয়ালকে দেখে প্রাণের ভয়ে ছুটতে লাগল। কিছুদূর যেয়ে মোরগ একটা গাছের ডালে পড়ল। শিয়াল গাছের তলায় দাঁড়িয়ে মোরগকে লক্ষ্য করে বলল- ‘আচ্ছালামু আলাইকুম’ ভাই মোরগ কেমন আছ ?

মোরগ বলল, ওয়া আলাইকুমুচ্ছালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহে ওয়া বারাকাতুহু।’ এইতো ভাই আল্লাহ্‌র রহমতে ছহি ছালামতেই আছি।

শিয়াল বলল, মোরগ ভাই তুমি কি আল্লাহ্‌র নবীর এ হাদীস জান না ?

মোরগ বলল, কোন হাদীস ? শিয়াল বলল, আল্লাহ্‌ রনবী যে বলেছেন, ছালামের পর মোছাফা করলে গোনাহ্‌ খাতা মাফ হয়ে যায়। আমরা ভাই আল্লাহ্‌র গোনাহ্‌গার বান্দা। পদে পদে আমরা কত ছাগিরা কাবিরা গোনাহ্‌ করছি। নেমে এসনা ভাই একটু হাতে হাত মিলাই। মেহেরবান আল্লাহ্‌ তোমারও গোনাহ্‌ মাফ করবেন আমারও গোনাহ্‌ মাফ করবেন। আর সেই সঙ্গে আমাদের উভয়ের মধ্যে মহব্বত পয়দা হবে।

মোরগ বলল, ভাই শিয়াল, আজ আমি এত পরিশ্রান্ত ও ক্লান্ত হয়ে পড়েছি যে, নেমে যেতে পারব না। আর বহু কষ্ট করে যদি নেমে যাই তাহলে উঠে  আসতে পারব না। অতএব এ যাত্রা আমাকে ক্ষমা কর। আল্লাহ্‌ যদি বাঁচিয়ে রাখেন আর আগামীতে যদি মোলাকত হয়ে যায়, তাহলে তোমার সাথে ডবল করে মুছাফা করে নিব। কেমন?

শিয়াল একথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল, মোরগ ভাই তুমি কি আল্লাহ্‌র নবীর এ হাদীস জান না ?

মোরগ বলল, কোন হাদীস? শিয়াল বলল, আল্লাহ্‌র নবী বলেছেন, মোরগ একটি ভাল পাখী, সে মুয়াজ্জেন লোকদের নামাজের জন্য জাগিয়ে দেয়। অতএব তুমি যখন মুয়াজ্জেন তখন আযানটা দিয়ে দিয়ে দাও না ভাই, দু’ভাইয়ে মিলে নামাজটা পড়ে নিই।

মোরগ বলল, শিয়াল ভাই তুমি কি কোরআন শরীফ পড়নি ? সূরা-বানি ইসরাইলে কি দেখনি যে, আল্লাহ্‌ রব্বুল আলামীন বলেছেন,

অর্থ :  সূর্য যখন পশ্চিম দিকে ঢলে পড়বে তখন জোহরের নামাযের সময় হবে; তখন তোমরা আজান দিয়ে নামাজ পড়। কিন্তু এখন পূর্ব দিকে সূর্য রয়েছে – অনুমান বেলা এগারোটা হবে। এখন তুমি আজান দিতে বলছ, তোমার মনের মতলবটা কি বলতো শুনি ?

শিয়াল হঠাৎ একটু বুদ্ধি খাটিয়ে বলল, যেদিকে সূর্য রয়েছে ওদিকটা কি পূর্ব দিক নাকি ? আমি তো ভাই মনে করছি ওটা পশ্চিম দিক। তা হলেতো দেখতে পাচ্ছি আমাকে ভুলো লেগেছে। আমি দিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি। যাক্‌ আমি তাহলে একটু অপেক্ষাই করি। সূর্য পশ্চিমে ঢলেই পড়ুক। তোমার সাথে জোহরের নামাজটা পড়েই যাব। এই বলে শিয়াল চুপচাপ বসে থাকল।

কিছুক্ষণ পর সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলে পড়ল তখন শিয়াল বলল, মোরগ ভাই আজানটা দিয়ে দাও, নামাযের সময় হয়ে গেছে। মোরগ তখন দরাজ কন্ঠে আজান দিয়ে দিল।

শিয়াল বলল, মোরগ ভাই তাড়াতাড়ি নেমে এসো। দু’ভাইয়ে নামাজটা পড়ে নিই। নামাজ পড়ে আমাকে আবার একটা জরুরি কাজে যেতে হবে।

মোরগ বলল, এত ব্যস্ত হও কেন ? জোহরের নামাযের সময় কি চলে গেল নাকি? অপেক্ষা কর, অপেক্ষা কর। তা’ছাড়া জামাতের ফজিলতের হাদীস কি তোমার জানা নেই ? আল্লাহর নবী বলেছেন কেউ যদি একা ফরজ নামায পড়ে সে একশত নেকী পাবে, দু’জন এক সাথে নামাজ পড়ে প্রত্যেকে দু’শত করে নেকী পাবে; এভাবে এক সঙ্গে তিনজন পড়লে প্রত্যেকে তিনশত করে, চারজন পড়লে প্রত্যেকে চারশত করে, পাঁচজন পড়লে প্রত্যেকে পাঁচশত করে, ছয়জন পড়লে প্রত্যেকে ছ’শত করে, সাতজন পড়লে প্রত্যেকে সাতশত করে, আটজন পড়লে প্রত্যেকে আটশত করে, নজন পড়লে প্রত্যেকে ন’শত করে দশজন পড়লে প্রত্যেকে দশশত করে নেকী পাবে। আর দশের বেশি হলে প্রত্যেকে অসংখ্য নেকী পাবে। জামাতের যেখানে এত ফজিলত সেখানে তোমার এই ব্যস্ততা সত্যই দুঃখজনক। তুমি ব্যস্ত হয়ো না, ব্যস্ত হয়োনা। অপেক্ষা কর। জামাতের ফজিলত নেওয়ার চেষ্টা কর।

শিয়াল বলল, আল্লাহ্‌র নবীর এ হাদীসটা কি তুমি জান না। মোরগ ভাই ? আল্লাহ্‌র নবী যে বলেছেন, দু’জন থাকলে একজন ইমাম আর অন্যজন মুক্তাদী হয়ে নামাজ পড়বে। অতএব দু’জনে জামাত হবে। তুমি নেমে এসো, তোমাকেই ইমাম বানিয়ে আমি তোমার অনুসরণ করব।

মোরগ বলল, শিয়াল ভাই ইংরেজি আর বাংলা ব্যাকরণে তোমার কিছুটা জ্ঞান থাকলেও আরবী ব্যাকরণে তোমার মোটেই জ্ঞান নেই বুঝতে পারছি। ইংরেজিতে এক হলে যেমন ‘সিঙ্গুলার নাম্বার আর একের বেশি হলে প্লুরাল নাম্ম্বার হয়, ঠিক তেমনি বাংলায় এক হলে একবচন আর একের বেশি হলে বহুবচন হয়। কিন্তু আরবী ব্যাকরণে তা হয় না। আরবীতে এক হলে ‘ওয়াহেদ’ দুই হলে তাছনিয়া আর দুয়ের বেশি হলে হয় জামা। এই জামা না হলে জামাত হতেই পারে না। অতএব তুমি আর আমি দু’জনে জামাত কেমন করে হবে ? জামাত কয়েম করতে হলে দু’য়ের অধিক মুছল্লীর দরকার। তুমি এখন চুপচাপ বসে থাক। আমি যখন গাছের ডালে রয়েছি অনেক দূর পর্যন্ত আমার নজর যাচ্ছে। যখনই কোন মুছল্লী ভাইকে দেখতে পাব ডেকে নিয়ে জামাত কায়েম করব।

শিয়াল মনে মনে ভাবতে লাগল- এখন কি করা যায়। এমন সময় মোরগ উচ্চস্বরে বলে উঠল ‘আলহামদুলিল্লাহ’।

শিয়াল একটু চমকে উঠে বলল – এত জোরে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললে কেন ভাই ?

মোরগ আমার বিশিষ্ট বন্ধু মিষ্টার ‘ডগ’ আসছেন। জামাত এবার ভালভাবেই হবে তাই ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়লাম। শিয়াল তখন দে ছুট।

মোরগ খুব চীৎকার করে বলতে লাগল, ওহে শিয়াল ভাই শোন, শোন পালাও কেন ? জামাতে নামায পড়বে না ?

শিয়াল তখন বলল, আমার ওজু টুটে গেছে রে ভাই – ওজুটা করে আসি।

মোরগ বলল, তুমি কি জাননা, কুরআন শরীফে আছে আল্লাহ্‌তায়ালা বলেছেন, ‘পাক মাটিতে তায়াম্মুম কর’ । অতএব তায়াম্মুম কর। অতএব তায়াম্মুম করেই নামাজ হবে, তুমি ফিরে এসো।

শিয়াল বলল মোরগ ভাই, তার আগে যে আছে, ‘যদি পানি না পাও তাহলে তায়াম্মুম কর।’ তাই বনের মাঝে পানির খোঁজে চললাম, এই বলে শিয়াল গভীর জঙ্গলে ঢুকে পড়ল। কুকুর আপন রাস্তা ধরে চলে গেল আর মোরগ গাছের ডাল থেকে নেমে নিজের বাসায় যেয়ে উঠল।

এই গল্পটি যদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্য তালিকায় রাখা হয় তাহলে গল্পটির মাধ্যমে ছোট ছোট ছেলে মেয়ে যাদের কুসুমের মত প্রাণ, ফুলের মত হৃদয়, সরল সবুজ মন, তাদেরকে কি শিক্ষা দেওয়া হবে বলুনতো ? যাদেরকে এই গল্প পড়ান হবে, তাদেরকে যদি জিজ্ঞেস করেন আচ্ছা বাবা বলত কারো সাথে দেখা হলে কি বলতে হয় ? সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিবে , আচ্ছালামু আলাইকুম।

যদি বলেন আচ্ছা বাবা বলত যাকে ছালাম দেওয়া হবে সে কি বলবে ? সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিবে – ওয়া আলাইকুম আচ্ছালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

যদি বলেন আচ্ছা বলত বাবা ছালামের পর কি করতে হয় এবং তাতে লাভ কি হয় ? সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিবে, ছালামের পর মুছাফা করতে হয় আর তাতে উভয়ের গোনাহ্‌ মাফ হয় এবং আপোষে মহব্বত পয়দা হয়।

যদি বলেন আচ্ছা জোহরের নামাজের সময় কখন হয় এবং নামাজের আগে কি কি করতে হয় ? সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিবে পশ্চিম দিকে সূর্য ঢলে পড়লে জোহরের নামাজের সময় হয়। নামাজের আগে আগে আজান দিতে হয়, ওজু করতে হয়, পানি না পাওয়া গেলে পাক মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নামাজ হয়।

যদি বলেন আচ্ছা বাবা বলত জামাতের ফজিলত কতটুকু ? সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিবে, একজন একশত, দু’জন দু’শত করে, তিনজন তিনশত করে, চারজন চারশত করে, পাঁচজন পাঁচশত করে, ছয়জন ছয়শত করে, সাতজন সাতশত করে, আটজন আটশত করে, নয়জন নয়শত করে, দশজন হলে এক হাজার ও দশের অধিক হলে এক একজন অসংখ্য নেকী পাবে।

যদি বলেন আচ্ছা বাবা শরীয়তের এতগুলো মছল্লা-মাছায়েল তুমি শিখলে কোথায় ? সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিবে, শিয়াল মোরগের গল্প পড়ে এসব শিখেছি।

বলা বাহুল্য, একটা গল্পের মাধ্যমে সরল মতি ছেলেদের মাথায় শরীয়তের অনেক দরকারী কথা ঢুকিয়ে দেওয়া হল। এক বলে লক্ষ্য ঠিক রেখে উপলক্ষ বদলান। গল্প, প্রবন্ধ, কাব্য, সাহিত্য, নভেল, নাটক, উপন্যাস প্রভৃতি লিখতেও দোষ নেই, পড়তেও দোষ নেই। তবে সেটা লক্ষ্য ঠিক রেখে রচিত হওয়া চাই। আমরা যখন মুসলমান তখন আমাদের ছেলে মেয়েদেরকে ইসলামী ভাবধারায় গড়ে তুলতে হবে। সেটাই হতে হবে আমাদের লক্ষ্য। এই লক্ষ্য ঠিক রেখে যদি আমাদের কবি সাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিকরা লেখনী ধারণ করেন তাহলে আমাদের ছেলে মেয়েদের নৈতিক চরিত্র নিশ্চয়ই সুন্দর হয়ে ফুটে উঠবে। এ ব্যাপারে শিয়াল মোরগের গল্পটি আশা করি আমাদের লেখদেরকে যথেষ্ট প্রেরণা যোগাবে।

আপনাদের মধ্যকার কেউ যদি এমন গল্প টাইপ করে দিতে পারেন তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন । আমরা গল্পের পিডিএফ সংস্করণ পাঠিয়ে দিবো।

মতামত দিন