মাওলানা আকরম খাঁ এর জীবনী

ভূমিকা :

১৭৫৭ সালে পলাশী বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের কাঠামোগত বিপর্যয়ের সূচনা হয়। ধীরে ধীরে ক্ষমতা বলয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে চেপে বসে ব্রিটিশ বেনিয়ারা। ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে উপমহাদেশীয় মুসলিমদের সাথে ব্রিটিশদের যে তিক্ততা, তা আরো তীব্র রূপ নেয় সিপাহী বিদ্রোহ ও ওহাবী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। মুসলিমরা আশরাফ শ্রেণী থেকে রাতারাতি দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয়, আর সেই স্থান দখল করে হিন্দুরা। প্রশাসনিক কার্যক্রমে আরবী-ফারসীর ব্যবহার অপসারণের ফলে মুসলিমরা অশিক্ষিত এক শ্রেণী হিসাবে পরিগণিত হ’তে থাকে। ব্রিটিশ আমলে ইংরেজী শিক্ষিত হিন্দুদের নামের সাথে ‘বাবু’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া হতো। আর তৎকালীন কলকাতা কেন্দ্রীক হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের বলা হ’ত ‘বাবু বুদ্ধিজীবী’, এরা ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের উদরে পুষ্ট হওয়া একটি গোষ্ঠী।

ব্রিটিশদের আগ্রাসনের প্রধান শিকার ছিল মুসলিম বাংলা। তাদের অত্যাচার, নির্যাতন, ধর-পাকড় এবং অবহেলার ফলে বাঙালি মুসলিমরা শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি সবকিছুতেই কেবল পিছু হটতে থাকে। এ সময় হিন্দুরা মুসলিমদের ‘মুছলমানের ব্যাটা-ম্লেচ্ছ-যবন- ছোটলোক-চাষা’ ইত্যাদি বলে তাচ্ছিল্য করতো এবং বলে রাখা ভালো, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না।

শাসকগোষ্ঠী এবং রাতারাতি মুসলিমদের জমিদারি হাতে পাওয়া হিনদুদের হিংসা-প্রতিহিংসা, অবহেলা ও নিপীড়নে যখন মুসলিমরা কালাতিপাত করছিল এমনই এক ঐতিহাসিক কালপর্বে আগমন করেন শতাব্দীর সূর্য মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ। মুসলিমদের বিশেষত বাঙালি মুসলিমদের অধিকার আদায়ের পক্ষে, তাদের শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিক বিকাশের ক্ষেত্রে এবং তাদের স্বাধীনতার জন্য তিনি অবিরাম সংগ্রাম করেন। আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতিক সংকটে ভোগা মুসলিম সমাজকে তিনি চিনিয়ে দেন তাদের সত্যিকারের পরিচয়-সংস্কৃতি। এক শতাব্দী কাল ধরে তিনি মুসলিম সমাজের রাজনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তির সাথে জড়িয়ে যান অঙ্গাঙ্গিভাবে। অত্র প্রবন্ধে এই মহান কিংবদন্তীর দীর্ঘ ও সংগ্রামী জীবনের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত উল্লেখ করা হ’ল।

জন্ম ও বংশপরিচয় :

১৮৬৮ সালের ৭ই জুন (মতান্তরে ৮ই জুন), পশ্চিমবঙ্গের চবিবশপরগনা জেলার হাকিমপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত, আলিম ও মুজাহিদ পরিবারে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মাওলানা আব্দুল বারী খাঁ, মাতা রাবেতা খাতুন। পিতা মাওলানা আব্দুল বারী খাঁ ছিলেন শাইখুল কুল ফিল কুল মিয়াঁ নাযীর হুসাইন দেহলভীর এক কৃতি ছাত্র এবং তার নানা হাজী মুফিযুদ্দীন ছিলেন মাওলানা এনায়েত আলীর প্রতিষ্ঠিত হাকিমপুর কেন্দ্রের অন্যতম প্রধান সহযোগী’।[1]

১৮৩১ সালে বালাকোটের যুদ্ধে তার পূর্বপুরুষদের একজন শহীদের মর্যাদা লাভ করে।[2] তাঁর পিতাও বালাকোটের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ‘গাযী’ উপাধিতে ভূষিত হন’।[3] সাইয়্যেদ নিছার আলী তিতুমীরের বিখ্যাত বাঁশের কেল্লা ছিল আকরম খাঁর পাশের গ্রামে’।[4] আকরম খাঁর পিতামহ তোরাব আলী খাঁ ছিলেন শহীদ তিতুমীরের সহযোদ্ধা’।[5] আকরম খাঁর পূর্বপুরুষরা ছিলেন ব্রাহ্মণ। ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পনেরো শতকে তারা ইসলাম গ্রহণ করেন’।[6] জনশ্রুতি আছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোন এক পূর্বপুরুষ এবং আকরম খাঁর জনৈক পূর্বপুরুষ ছিলেন সহোদর ভাই’।[7]

শিক্ষা জীবন :

এগারো বছর বয়সে একই দিনে পিতা-মাতা উভয়কে হারিয়ে আকরম খাঁ নানার কাছে মানুষ হন’।[8] পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী বাড়িতেই তিনি আরবী-ফার্সী শিক্ষা গ্রহণ করেন’।[9] এছাড়া গ্রামের মক্তবেও তিনি লেখাপড়া করেছেন। ইসলামী শিক্ষার প্রতি অনুরাগ ও ইংরেজী শিক্ষার প্রতি বিরাগবশত ইংরেজী স্কুল ছেড়ে তিনি ১৮৯৬ সালে কলিকাতা মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং ১৯০১ সালে তিনি এফ. এম (ফাইনাল মাদ্রাসা) পাস করেন’।[10] এছাড়া আকরম খাঁ নিজ প্রচেষ্টায় বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন।

ইসলামী চিন্তা-ভাবনা :

মাওলানা আকরম খাঁ ছিলেন ওহাবী পরিবারের সন্তান। উনার বাপ-দাদা ও নানা জিহাদ আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রেই জিহাদী জোশ তাঁর রক্তে মিশে ছিল। মাওলানা আকরম খাঁ নির্দিষ্ট কোনো মাযহাবের অনুসরণ করতেন না। তিনি একজন আহলেহাদীছ আলেম হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তাকলীদের বিরুদ্ধে ছিলেন আপোসহীন’।[11] দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ বলেন, ‘কেবল অশিক্ষিত মানুষেরা ধর্মের শাসন-অনুশাসনের ক্ষেত্রে চার ইমামের মাযহাবকে শেষ ব্যাখ্যা মনে করে তাক্বলীদের দ্বার চিরতরে অবরুদ্ধ ভেবে এ ক্ষেত্রে টু শব্দটি করার স্বাধীনতা খুঁজে পাচ্ছে না। তাই প্রথমে গোড়ার দিকে সংস্কার করার বাসনায় তিনি হাদীছ শাস্ত্র ঘেঁটে মাল-মসলা সংগ্রহ করে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন, কুরআন ও হাদীছের সূত্রগুলোর ব্যাখ্যা করার স্বাধীনতা সকল মুসলমানের রয়েছে। এক্ষেত্রে তার সহযাত্রী ছিলেন মাওলানা আব্দুল্লাহেল বাকী। এদেরই চেষ্টায় এ অঞ্চলে আহলে হাদীছ আন্দোলন বিশেষভাবে ফলে ওঠে’।[12]

মাওলানা ছিলেন প্যান ইসলামী ধারণায় বিশ্বাসী’।[13] শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহঃ) ও মোহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহাব (রহঃ)-এর দ্বারা তিনি প্রভাবিত ছিলেন। তিনি শিরক-বিদ‘আত এবং পীর-ফকির ও ভ্রান্ত ছূফীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। তিনি আহলে হাদীছদের আদর্শে মুসলিম সমাজকে গড়তে চেয়েছিলেন। এজন্য বিভিন্ন জনের দ্বারা তিনি আক্রান্ত ও সমালোচিত হয়েছিলেন’।[14]

মাওলানা আকরম খাঁ ‘ইসলাম মিশন’, ‘খাদিমুল ইসলাম’ এর মতো ধর্মীয় সংগঠন প্রতিষ্ঠায়ও ভূমিকা রাখেন। এ অঞ্চলে তিনি হানাফী-আহলেহাদীছ দ্বন্দ্ব নিরসন করে উভয় জামা‘আত মিলে গঠনমূলক কাজ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ লক্ষ্যে মাওলানা আকরম খাঁ, মাওলানা আব্দুল্লাহেল বাকী, মাওলানা এছলামাবাদী ও ড. শহীদুল্লাহর মিলিত প্রচেষ্টায় ১৯১৩ সালে বগুড়ার বানিয়া গ্রামে ‘আঞ্জুমান-এ-উলামা-এ-বাংলা’ প্রতিষ্ঠা করেন। এর সভাপতি ছিলেন আব্দুল্লাহেল বাকী, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ও মাওলানা আকরম খাঁ ছিলেন যথাক্রমে এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জেনারেল সেক্রেটারী’।[15]

সে সময়ে বাংলার মুসলিম সমাজে ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামে এক নব্য ফিৎনা মাথাচাড়া দেয়। কাজী আব্দুল ওদুদ, নাসিরউদ্দীন প্রমুখরা তখন প্রগতির নামে, বুদ্ধির মুক্তির নামে ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টকেই (Enlightenment) মানব মুক্তির পথ ধরে নিয়ে ‘সওগাত’ এবং ‘শিখা গোষ্ঠী’ প্রতিষ্ঠা করে, মুসলিম সমাজকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চক্রান্ত করে। আকরম খাঁ তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ করেন, কলম ধরেন, বক্তৃতা দেন। প্রগতির নামে মুসলিম সমাজে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি প্রসারের কঠোর বিরোধিতায় তিনি আপোসহীনভাবে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন।

কেউ কেউ বলে থাকেন যে, তিনি পরবর্তীতে তার ধর্মীয় চিন্তা পরিবর্তন করেছিলেন। দু’একটি ক্ষেত্রে মূলধারার বিপরীতে তিনি ভিন্নমত পোষণ করতেন, এ কথা সত্য; কিন্তু সামগ্রিক ভাবে তাঁর ধর্মীয় চিন্তায় কোন পরিবর্তন আসে নি। যার সাক্ষ্য পাওয়া যায় তাঁর নিজেরই উক্তিতে। শেষ জীবনে তিনি নিজের ব্যাপারে বলেছিলেন, ‘আমাকে যদি কোন বিশেষ চিন্তাধারার লোক বলে চিহ্নিত করতে চাও, তাহলে আমাকে ওহাবী বলো’।[16] শেষ জীবনেও তিনি বিলম্ব না করে আহলেহাদীছগণের ন্যায় আছরের ছালাত দ্রুত আদায় করতেন’।[17]

মাওলানা আকরম খাঁ তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বেও অভিজ্ঞ ছিলেন। তিনি খৃষ্টান মিশনারীদের সঙ্গে বিতর্কে অবতীর্ণ হতেন। মিশনারীদের জবাবে তিনি ‘মূল বাইবেল কোথায়?’ ও ‘যীশু কি নিষ্পাপ’ শিরোনামে দু’টি প্রবন্ধও লিখেছিলেন’।[18] হিনদু শাস্ত্রের বেদ-পুরাণ-গীতা ইত্যাদি সম্পর্কে তিনি জ্ঞান রাখতেন। একবার সরস্বতী পূজার উপর লিখিত তাঁর একটি প্রবন্ধ নিয়ে ‘দৈনিক আজাদ’ বনাম ‘আনন্দবাজার’ তুমুল বিতর্ক চলেছিল। আকরম খাঁ আজাদে পূজার উপর একটি সম্পাদকীয় লিখলে তা আনন্দবাজারের শিরঃপীড়ার কারণ হয়। তখন ‘না মহাশয়’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় লিখে আনন্দবাজার পত্রিকা ক্ষোভ প্রকাশ করে। এর পাল্টা জবাবে আকরম খাঁ ‘হা মহাশয়’ শিরোনামে ফের একটি প্রবন্ধ লেখেন। মাওলানার এই জবাবে আনন্দবাজার আর কোনো উচ্চবাচ্য না করে একদম চুপ হয়ে যায়’।[19]

সাংবাদিকতা :

মাওলানা আকরম খাঁ খুব অল্প বয়সে (ছাত্র জীবনেই) সাংবাদিকতায় যোগদান করেন। তিনি সাপ্তাহিক ‘আহলে হাদিস’ পত্রিকায় প্রথম লেখালেখি শুরু করেন’।[20] এই সময় তিনি হাজী আব্দুল্লাহর নযরে পড়েন (যিনি ছিলেন ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকার মালিক), তিনি আকরম খাঁর লেখা পড়ে চমৎকৃত হলে আকরম খাঁকে ডেকে বলেন, ‘বাবা! আমি তোমাকে প্রেসসহ আনুষঙ্গিক সব ব্যবস্থা করে দেব। তুমি পত্রিকা বের করতে পারবে?’ এই সুবর্ণ সুযোগ হাতে পেয়ে আকরম খাঁ রাযী হয়ে যান’।[21] মাত্র ৫১ টাকা পকেটে নিয়ে ১৯০৩ সালে (মতান্তরে ১৯০৮/১৯১০ সালে) আকরম খাঁ সাপ্তাহিক মোহাম্মদী পত্রিকা বের করেন’।[22] পরবর্তীতে ১৯২২ সালে মোহাম্মদীর ‘দৈনিক’ ও ১৯২৭ সালে ‘মাসিক’ সংখ্যা প্রকাশ করেন। প্রকাশনা শুরুর পর পরই ‘মোহাম্মদী’ প্রথম সারির পত্রিকা হিসেবে উঠে আসে।

১৯২৫ সালে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক হানাফী’ নামক পত্রিকা সাপ্তাহিক মোহাম্মদীর সাথে প্রতিযোগীতায় অবতীর্ণ হয়। কিন্তু সাপ্তাহিক মোহাম্মদীর যুক্তিবাদী ও বিশ্লেষণধর্মী রচনার মোকাবেলায় ‘হানাফী’ তেমন জনপ্রিয় হ’তে পারেনি। মোহাম্মদী অনেক বেশী জনপ্রিয় ছিল। বাংলার মফস্বল অঞ্চলে এমন স্থান কমই ছিল, যেখানে সাপ্তাহিক মোহাম্মদীর অনুপ্রবেশ ঘটেনি’।[23] তবে মোহাম্মদী নিজে থেকে মাযহাবী কোনো কোন্দলে লিপ্ত হতো না বলেই প্রমাণ পাওয়া যায়। বরং আহলেহাদীছ সম্বন্ধে হানাফী সম্প্রদায়ের আলিমগণ দু-একখানি পত্রিকায় যে সব তীব্র সমালোচনা বের করত, প্রধানত সেগুলোর উত্তরে পাল্টা সমালোচনা বা জবাব দেয়া হতো মোহাম্মদীর মাধ্যমে’।[24]

সমাজে প্রচলিত শিরক, বিদ‘আত ও কুসংস্কার দূর করে বাঙালি মুসলিমদের ইসলামের সঠিক রূপরেখা দেখানোই ছিল মোহাম্মদীর আত্মপ্রকাশের মূল লক্ষ্য। যদিও আকরম খাঁ কর্তৃক মোহাম্মদীর দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম তিন বছর মোহাম্মদী সত্যিকার অর্থেই মোহাম্মদী জামাতের ও তাদের আদর্শের নকীব ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে মোহাম্মদী তার নামটুকু ছাড়া আদর্শিক স্বতন্ত্র বজায় রাখতে সক্ষম হয় নি’।[25] রাজনীতিতে জড়িত থাকার কারণে ও সর্বভারতীয় মুসলিমের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রেক্ষিতেই সম্ভবত মাওলানাকে মোহাম্মদী আদর্শের সাথে শিথিলতা প্রদর্শন করতে হয় এবং ইতিহাস থেকে এমনই প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত মেলে।

ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে বঙ্কিমের ‘বন্দেমাতরম্’-কে গ্রহণ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রামে শ্রীপদ্মকে কেন্দ্র করে হিনদু-মুসলমানের মধ্যে এক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন শুরু হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলমান ছাত্রদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং মুসলমান ছাত্রদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণের স্বরূপ উন্মোচনে ‘মাসিক মোহাম্মদী’ একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। তারপর ছাত্রদের আন্দোলন ও মাসিক মোহাম্মদীর যুগান্তকারী ভূমিকায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নতিস্বীকার করে মনোগ্রাম থেকে ‘শ্রী’ প্রতীক বাদ দিতে বাধ্য হয়’।[26]

হিনদুদের প্রধান পত্রিকা ‘আনন্দবাজার’, ‘বসুমতী’, ‘প্রবাসী’ সর্বদাই মুসলিম বিরোধী প্রচারণায় লিপ্ত থাকত। তবে কলকাতার ‘প্রবাসী’ এবং ঢাকার ‘শিখা গোষ্ঠী’ ছিল মাসিক মোহাম্মদীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। আর মাওলানা আকরম খাঁ মোহাম্মদীর মাধ্যমে এদের উপযুক্ত জবাব দিতেন বলে-ই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়’।[27]

১৯৩৬ সালের ৩১শে অক্টোবর অবিভক্ত ভারতের কলকাতা থেকে আকরম খাঁ প্রথম ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। এটি ছিল তৎকালীন মুসলিম বাংলার একমাত্র দৈনিক পত্রিকা। মাওলানা আকরম খাঁর সারা জীবনের সেরা কীর্তি ছিল ‘দৈনিক আজাদ’। আজাদ বাংলার মানুষের কাছে এতোটাই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল যে, আজাদে যা লেখা হতো, বাংলার রাজনীতি ও মুসলিম সমাজের চিন্তা সেদিকেই মোড় নিত। প্রকাশকাল থেকেই এটি প্রধানত মুসলিমদের (বা বলা যায় মুসলিম লীগের) মুখপাত্র হিসাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে দৈনিক আজাদের ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। যেহেতু আজাদ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার প্রচারণায় মূখ্য ভূমিকা পালন করেছিল, তাই স্বভাবতঃ হিনদুরা আজাদের উপর অত্যন্ত বিক্ষুব্ধ ছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৫ দিনের মাথায় রাতের বেলা আজাদ অফিস গুন্ডাদের দ্বারা আক্রান্ত হয়’।[28] ১৯৪৮ সালের অক্টোবর মাসের ১২ তারিখে স্বাধীন ভারতের কলকাতা থেকে আজাদের সর্বশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এরপর ১৩ই অক্টোবর থেকে ১৮ই অক্টোবর পর্যন্ত আজাদের প্রকাশনা বন্ধ থাকার পর ১৯শে অক্টোবর ‘দৈনিক আজাদ’ পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়’।[29]

অবিভক্ত ভারতে মুসলমিদের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় সংবাদপত্র ছিল দৈনিক আজাদ এবং ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’।[30] আর এই দু’টি পত্রিকারই প্রতিষ্ঠাতা-প্রকাশক-সম্পাদক ছিলেন মাওলানা আকরম খাঁ। সে সময় বঙ্গীয় মুসলিমদের অগ্রগতির জন্য অনেক পত্রিকাই আত্মপ্রকাশ করেছিল, তবে সেগুলো দীর্ঘ মেয়াদে টিকতে সক্ষম হয় নি বরং বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আকরম খাঁর ‘মোহাম্মদী’ কখনো বন্ধ হয় নি।‘মোহাম্মদী’ ও ‘আজাদ’ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে আকরম খাঁ ‘মাসিক আল-এসলাম’ (১৯১৪/১৯১৫ সাল থেকে আনজুমান-এ-উলামা-এ-বাংলার মুখপাত্র হিসাবে), ‘দৈনিক সেবক’ (১৯২১-২২), খেলাফত আন্দোলনকে জোরদার করার লক্ষ্যে উর্দু ‘দৈনিক যামানা’ (১৯২০-২৪), ইংরেজি ‘The Comrade’ (১৯৪৬) পত্রিকা প্রকাশ করেন। ‘দৈনিক সেবক’-এ সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কট্টর সমালোচনা লিখলে মাওলানাকে গ্রেফতার করে এক বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয় এবং পত্রিকাটি নিষিদ্ধ করা হয়, এ সময়ই পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়’।[31]

মাওলানা ছাহেবের সাংবাদিক জীবনের একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য ঘটনা আছে। উছমানী খেলাফতের (তথা তুরস্ক) বিরুদ্ধে তখন ব্রিটিশদের নীতি মারমুখো হয়ে উঠেছিল। তখন ব্রিটিশদের সমালোচনায় মাওলানা ছাহেব মোহাম্মদীতে খুব জোর কলম চালাতে শুরু করেন। তখন ইংরেজ লাট সাহেবের নির্দেশে দেশ শাসন করা এগজিকিউটিভ কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য নবাব উপাধিধারী এক বাঙালী মুসলিম আকরম খাঁকে আহলেহাদীছ হবার কারণে সুন্নাত জামা‘আতের (আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ) বহির্ভূত মনে করতেন। আর যেহেতু তুরস্কের সুলতান সুন্নাত জামা‘আতের নেতা তাই হয়তো আহলেহাদীছরা তাকে নাও মানতে পারেন এই ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি আকরম খাঁর তুরস্কের পক্ষে লেখালেখি করার অযৌক্তিকতা তুলে ধরতে চেষ্টা করেন। কিন্তু এতে কাজ না হলে তাকে লোভ দেখিয়ে বলেন যে, তুরস্কের সুলতানের পক্ষে লেখা ছেড়ে দিলে আপনার পত্রিকা প্রকাশের সব ব্যবস্থা সরকারী খরচে করা হবে। তখন আকরম খাঁ জবাবে বলেন, ‘দেখুন জনাব! খলীফার বিরুদ্ধে চিন্তা করার আগে যেন আমার মস্তিষ্ক বিকল হইয়া যায়, তাঁহার বিপক্ষে লেখনী ধারণ করার পূর্বেই যেন আমার হাত অবশ হইয়া পড়ে। তাঁহার অনিষ্ট সাধনের চেষ্টার আগেই যেন আমার নশ্বর দেহের অবসান ঘটে, খোদার দরবারে এই-ই আমার অন্তরের প্রার্থনা’। এতেও কাজ হ’ল না দেখে এবার তিনি আকরম খাঁকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার ভয় দেখান। কিন্তু মাওলানা দমলেন না, পাল্টা জবাবে মাওলানা বললেন, ‘দেখুন জনাব! আমি জীবনে বহুবার শিকার করিয়াছি। বনদুকের গুলিতে অনেক পাখি মারিয়াছি। আমার প্রতি গুলি নিক্ষিপ্ত হইলে মারা যাইতে পারি, এ ভালোভাবেই জানি। কিন্তু আপনি নিশ্চয় জানিবেন, আমাকে বন্দুকের গুলিতে নিহত করা হইলে আমার দেহ হইতে যত বিনদু রক্তপাত হইবে, বাংলার বুকে ঠিক ততজন আকরম খাঁ পুনর্বার জন্মিবে’।[32]

মাওলানা আকরম খাঁ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় লিখতেন এবং পত্রিকা প্রকাশে তিনিই প্রথম হিনদু সমাজের সাথে পাল্লা দিয়ে দক্ষতার পরিচয় দেন (বস্তুত মাওলানার সাথে লড়তে হিনদুদের পত্রিকাগুলোর লেজেগোবরে অবস্থা হয়ে যেত)। এই জন্য হিনদু সমর্থক পত্রিকাগুলো মাওলানা আকরম খাঁ কে ‘আক্রমণ খাঁ’ বলে অভিহিত করতো’।[33] মাওলানা নিজে বহু পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা করেন এবং অসংখ্য সাংবাদিকের জন্ম দিয়ে ও তাদের আশ্রয়স্থল হয়ে যে বিরল নযীর পেশ করেন, তারই যথার্থ প্রতিদান স্বরূপ তিনি ‘বাংলার মুসলিম সাংবাদিকতা জনক’ হিসাবে ভূষিত হন।

রাজনীতি :

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে যোগ দেবার মধ্য দিয়ে মাওলানা আকরম খাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। এরপর ১৯০৬ সালের ৩০শে ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকায় অনুষ্ঠিত মুসলিম নেতৃবৃন্দের এক রাজনৈতিক অধিবেশনে ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’ (All India Muslim League) গঠিত হলে মাওলানা আকরম খাঁ তাতে অন্যতম একজন প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে যোগদান করেন’।[34] আকরম খাঁ ১৯২৪ সাল পর্যন্ত অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯২০ সালে ঢাকার আহসান মনযিলে এক সম্মেলনে তিনি ‘নিখিল ভারত খিলাফত আন্দোলন কমিটি’র সভাপতি নিযুক্ত হন। খেলাফত আন্দোলনে যুক্ত থাকবার সুবাদে আন্দোলনকে জোরদার করার লক্ষ্যে আলী ভ্রাতৃদ্বয়ের (মাওলানা মোহাম্মদ আলী ও মাওলানা শওকত আলী) সাথে সারা ভারত সফর করেন’।[35] ১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের উদ্যোগে হিনদু-মুসলিম সম্প্রীতিমূলক ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ চুক্তিতে আকরম খাঁ বিশেষ ভূমিকা পালন করেন, যদিও পরবর্তীতে কংগ্রেসের অসহযোগিতার কারণে তা অকার্যকর হয়ে যায়’।[36]

১৯২৬-২৭ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন এবং ঐ বছরই (১৯২৭ সালে) কংগ্রেস ত্যাগ করেন। এরপর ১৯২৯ সালে ‘নেহরু রিপোর্ট’ বিরোধী আন্দোলনে তিনি অংশগ্রহণ করেন’।[37] একই বছর (১৯২৯ সাল) ‘নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি’ গঠন হলে মাওলানা আকরম খাঁ এর সেক্রেটারী নির্বাচিত হন। ১৯৩৫ সাথে এ. কে. ফজলুল হক সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৩৬ সালে এটি ‘কৃষক-প্রজা সমিতি’ নাম ধারণ করে। কিন্তু ফজলুল হককে তিনি সভাপতি হিসাবে অপসন্দ করার কারণে তিনি সমিতির প্রতি বিরাগভাজন হয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে তিনি কৃষক-প্রজা সমিতি ত্যাগ করেন’[38] এবং মুসলিম লীগে সক্রিয় হন। ১৯৪০ সালে ‘লাহোর প্রস্তাব’ উত্থাপিত হলে তিনি এর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন এবং পাকিস্তান আন্দোলনে মনোনিবেশ করেন’।[39] দৈনিক আজাদে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে শুরু করেন। কিন্তু ‘জমিয়ত-এ-উলামা-এ-হিন্দ’ মুসলিম লীগের বিরোধিতা ও কংগ্রেস নীতি অবলম্বন করে অখন্ড ভারতের দাবী তুললে এর বিকল্প স্বরূপ ১৯৪৫ সালের ১১ই জুলাই কলকাতায় ‘জমিয়ত-এ-উলামা-এ-ইসলাম’ নামে একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। মাওলানা আকরম খাঁ এর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন এবং ‘জমিয়ত-এ-উলামা-এ-ইসলাম’-এর প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে ২৪শে অক্টোবর ইংরেজীতে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন’।[40]

দেশ ভাগের পর ১৯৪৮ সালে তিনি ‘আজাদ’ ও ‘মোহাম্মদী’ নিয়ে ঢাকায় স্থানান্তিত হন। ১৯৫১ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক মুসলিম লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ইস্তফা দেন কিন্তু তবুও আরো কিছু কাল তিনি নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে বহাল থাকেন। পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের সাথেও তিনি জড়িত ছিলেন। তিনি রাজনীতি ছেড়ে দিলেও রাজনীতি তাকে ছাড়ে নি। ১৯৫৮ সাথে পাকিস্তানে সামরিক আইন প্রবর্তন হয়। এতে মুসলিম লীগ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়লে আবারো রাজনীতিতে আকরম খাঁর ডাক পড়ে’।[41]

১৯৬২ সালে ২৯শে অক্টোবর তাঁর সভাপতিত্বে ঢাকায় আহূত পাকিস্তান মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে জীবনের শেষ কোন সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং খাজা নাজিমুদ্দীনকে সভাপতির দায়িত্ব দিয়ে মাওলানা আকরম খাঁ ৯৪ বছর বয়সে আনুষ্ঠানিকভাবে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন’।[42] পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সংগ্রামী ভূমিকার কারণে তিনি জিন্নাহর প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

ভাষা ও শিক্ষা ভাবনা :

মাতৃভাষার বাংলার প্রতি মাওলানার বিশেষ টান ছিল। ১৯২০ সালে আহসান মনযিলে খেলাফত কনফারেন্সে সব নেতারা উর্দূতে বক্তৃতা করলেও শুধুমাত্র যে দু’জন ব্যক্তি বাংলায় বক্তব্য দেন, তার মধ্যে মাওলানা আকরম খাঁ একজন’।[43]

১৯৫২ সালে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার পক্ষে আন্দোলনকারীদের উপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যপদ থেকে তিনি পদত্যাগ করেন। মুসলিম লীগের নেতা হবার পরেও তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে ছিলেন। বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকায় তিনি লেখেন, ‘দুনিয়ায় অনেক রকম অদ্ভুত প্রশ্ন আছে, বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা কি? উর্দু না বাংলা? এই প্রশ্নটা তার মধ্যে সর্বাপেক্ষা অদ্ভুত। নারিকেল গাছে নারিকেল ফলবে, না বেল? বঙ্গে মুসলিম ইতিহাসের সূচনা হইতে আজ পর্যন্ত বাংলা ভাষাই তাদের লেখ্য, কথ্য ও মাতৃভাষারূপে ব্যবহৃত হইয়া আসিতেছে এবং ভবিষ্যতেও মাতৃভাষারূপে ব্যবহৃত হইবে’।[44]

মাওলানা আকরম খাঁ মাতৃভাষা নিয়ে যেমন চিন্তা করতেন, তেমন মাতৃভূমির শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও তিনি মাথা ঘামাতেন। ১৯৩২ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর কলিকাতা আলবার্ট হলে তিনি বৃটিশ প্রণীত আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় বক্তব্য দেন’।[45] বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অপসংস্কৃতি চর্চার ব্যাপকতা দেখে তিনি বলেছিলেন, ‘আজ এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী পালনের যে তোড়জোড় দেখতে পাচ্ছি, এসবের মধ্যে আমাদের বিগত তিন পুরুষের চেষ্টা-সাধনার শোচনীয় ব্যর্থতাই আমি প্রত্যক্ষ করছি’।[46] আকরম খাঁ পূর্ব পাকিস্তানের শেষ গভর্ণরকে বহু বার তাগাদাও দিয়েছিলেন একটি আরবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য’।[47]

গ্রন্থরচনা :

সাংবাদিকতা ও রাজনীতির ময়দানে দৌড়ঝাঁপের মধ্যেও মাওলানা আকরম খাঁ মূল্যবান কিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন। পাঠকের সমীপে তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহের একটা তালিকা দেওয়া হ’ল :

(১) তাফসীরুল কোরআন। এটি সম্পন্ন করতে ১২ বছর সময় লাগে (২) মোস্তফা চরিত। (৩) মোস্তফা চরিতের বৈশিষ্ট্য। (৪) উম্মুল কোরআন। (৫) আমপারার তাফসীর (কাব্যে)। [এটি তিনি কারাগারে বসে লিখেন] (৬) সমস্যা ও সমাধান। (৭) মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস। মাওলানা আকরম খাঁ যখন এই বইটি লেখা শুরু করেন, তখন তিনি ৯৪ বছর বয়সের শেষে এসে উপনীত হয়েছেন। এটি মোহাম্মদীতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। এছাড়াও ‘কোরআনের হজরত ঈছা ও বাইবেলের যিশুখ্রিস্ট’ নামক একটি পুস্তিকা রচনার করবেন বলে তিনি মনস্থির করেন এবং এর ভূমিকাও লিখেন’।[48] কিন্তু সম্ভবত পরে তিনি আর এগোতে পারেন নি। আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, আবুল কালাম শামসুদ্দীন ও মুজিবর রহমান খাঁ প্রমুখ আকরম খাঁকে বার বার অনুরোধ করেন তাঁর নিজের একটি ‘আত্মজীবনী’ লিখতে। কিন্তু তিনি এতে অনীহা প্রকাশ করেন’।[49]

মাওলানা আকরম খাঁর রচিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ হ’ল, (১) মুছলমানের জাতিত্ব ও সংস্কৃতি (২) ব্যাক টু দি কুরআন (৩) রমজানের সাধনা (৪) এছলামের আদর্শ (৫) হজরতের প্রাক-নবুয়ত সমাজসেবা (৬) আমাদের ইতিহাস (৭) বায়তুল্ মাল তহবীল (৮) এছলামের রাজ্যশাসন বিধান (৯) সঙ্গীত সমস্যা ইত্যাদি।

সাহিত্যচর্চা :

সাহিত্যচর্চা মাওলানা আকরম খাঁর এক বিশেষ প্রতিভা। তাঁর লিখিত মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস, মোস্তফা চরিত, কাব্যে আমপারার তাফসীর এবং কোরাআনের তরজমা বাংলা সাহিত্যে এক বিশাল দান।

মাওলানা কর্তৃক সূরা ফাতিহার বঙ্গানুবাদ পাঠকের সমীপে পেশ করা হ’ল : ‘যাবতীয় কৃতজ্ঞতা আল্লাহরই প্রাপ্য, যিনি সকল জাহানের প্রভু পরওয়ারদেগার, যিনি করুণাময়, কৃপানিধান, যিনি বিচার দিবসের মালিক, (হে আমাদের পরওয়ারদেগার) আমরা ইবাদত করি একমাত্র তোমারই- আর সাহায্য প্রার্থনা করি একমাত্র তোমারই নিকটে, আমাদিগকে পরিচালিত করিও সরল সুপ্রতিষ্ঠিত পথে- যাহাদের উপর কৃপা করিয়াছ তাদের (অবলম্বিত) পথে, কিন্তু দন্ডভাজন করা হইয়াছে যাহাদিগকে এবং সুপথহারা হইয়াছে যাহারা তাহাদের পথে নহে’।[50]

১৯৩৭ সালের ২৩শে মে দৈনিক আজাদে প্রকাশিত মাওলানার ‘য়্যা মোহাম্মদ আন্তা রাসূলুল্লাহ’ কবিতা তাঁর সাহিত্য প্রতিভার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সুফিয়া কামাল, কাজী নজরুল ইসলাম সহ অনেক কবি সাহিত্যিকের প্রবন্ধ ও কবিতা মাওলানা ছাহেব মোহাম্মদীতে নিয়মিত প্রকাশ করতেন। বাংলার মুসলিমরা হামেশা তাদের কথায় যে সব আরবী-ফারসী শব্দের ব্যবহার করে থাকে, সে সব শব্দকে সাহিত্যে স্থান দেবার জন্যও মাওলানা প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। ১৯১৮ সালে চট্টগ্রামে এক সাহিত্য সমিতির সম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ব করেন এবং এক স্মরণীয় ভাষণ দেন’।[51]

মাওলানার অনেক কবিতা মুখস্থ ছিল, আলাপ-আলোচনায় সুযোগ আসলে তিনি সেগুলো আবৃতি করতেন। তবে আকরম খাঁ পুঁথি সাহিত্যের বিরুদ্ধে ছিলেন। বেশ কয়েক রিকশা বোঝাই পুঁথি সাহিত্যের বই মাওলানা সাহেব আনিয়ে ছিলেন অধ্যায়নের জন্য, কিন্তু এসব পুঁথিতে ইসলামকে বিকৃতভাবে তুলে ধরার কারণে তিনি হতাশ হোন এবং এরপর আর কখনো পুঁথি সাহিত্যের ব্যাপারে তিনি উৎসাহ দেখান নি’।[52]

মাওলানা আকরম খাঁ প্রচুর পরিমাণে অধ্যায়ন করতেন। তাঁর সংগ্রহে ছিল অজস্র কিতাবপত্র। মাওলানা মুহিউদ্দিন খান লিখেছেন, ‘এখন এই বিরাট ঢাকা শহরে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ বা আব্দুল্লাহিল কাফীর ব্যক্তিগত লাইব্রেরীর ন্যায় একটা লাইব্রেরী কেউ গড়ে তুলতে পারেন নি। পারেন নি মানে সেই রুচি ও মত গরজবোধই যেন বিলুপ্ত হয়ে গেছে’।[53]

কিছু অসঙ্গতি :

মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর মু‘জেযাকে মূলধারার আলিমগণ যেভাবে মানতেন, আকরম খাঁ সেগুলোকে সেভাবে মানতেন না। ইসলামের অলৌকিক বিষয়সমূহের ব্যাপারে তিনি মানবীয় জ্ঞান ও যুক্তির ব্যবহার করে ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিলেন’।[54] সঙ্গীত সমস্যা বইয়ে তিনি সঙ্গীতকে নিষিদ্ধ নয় বলে মত প্রকাশ করেছেন। তিনি সম্ভবত এ ব্যাপারে যাহেরীদের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। এছাড়া মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর মহানুভবতার প্রমাণে মোস্তফা চরিতে তিনি খৃষ্টান মিশনারী ও প্রাচ্যবিদদের (Orientalist) অনেক মন্তব্য হাযির করেছেন, অনেকেই তা ভালোভাবে গ্রহণ করেন নি। তবে পরে এ সম্পর্কে মাওলানার কাছে অভিযোগ করা হলে তিনিও তা স্বীকার করে নেন’।[55]

মৃত্যু :

১৩৭৫ সালের ২রা ভাদ্র মোতাবেক ১৯৬৮ সালের ১৮ই আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিটে ঢাকাস্থ বাসভবনে শত বৎসর বয়সে মাওলানা আকরম খাঁ নশ্বর এই দুনিয়া ত্যাগ করে রবের সান্নিধ্যে যাত্রা করেন। তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সকল অনুরোধ উপেক্ষা করে সরকারী জাতীয় কবরস্থান বাদ দিয়ে তাঁর অছিয়ত অনুযায়ী বংশাল মালিবাগ আহলেহাদীছ কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়’।[56]

মাওলানা আকরম খাঁর মৃত্যুতে তৎকালীন পাকিস্তানের বিখ্যাত সব পত্রিকায় বিশেষ বিশেষ সম্পাদকীয়-নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়।

১৯শে আগষ্ট দৈনিক আজাদে লেখা হয়, ‘শতাব্দীর সূর্য চিরঅস্তমিত হইয়াছে। এক শতাব্দীর এক সংগ্রামী ও সৃষ্টিমুখর ইতিহাসের প্রাণস্পন্দন চিরদিনের মত নিরব হইয়াছে’।

‘দৈনিক পয়গামে’ লেখা হয়, ‘একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র খসিয়া পড়িল। মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ আর ইহলকে নাই’। ২০শে আগষ্ট ‘ইমরোজে’ লেখা হয়, ‘মওলানা আকরম খাঁর মৃত্যুতে পাকিস্তান তাহার এক মহান সন্তান হইতে বঞ্চিত হইয়া গেল’।

এছাড়াও ‘দৈনিক পাকিস্তান’, The Pakistan Observer, The Morning News, ‘দৈনিক আগাজ’, দৈনিক কোহিস্তান’, ‘হুররিয়াত’ এবং ‘পাসবান’ পত্রিকাও শোকবার্তা প্রকাশ করে।

শেষ কথা :

মাওলানা আকরম খাঁ ছিলেন একাধারে আলিম, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, সমাজ সংস্কারক ও সাহিত্যিক। শত বর্ষের এক জীবন্ত ইতিহাস। উনিশ ও বিশ শতকের পিছিয়ে পড়া মুসলিমদের জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন, সংগ্রাম করেছেন সাম্রাজ্যবাদী শাসন থেকে মুক্তির জন্য। ঔপনিবেশিক শাসন ও হিনদুদের প্রভাবে আত্মপরিচয়ের সংকটে ভোগা মুসলিমদের তিনি আত্মপরিচয়ের সন্ধান দিয়েছেন। লড়েছেন মুসলিম সমাজের নৈতিক, আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র রক্ষার তাগিদে। কিন্তু তাঁর চর্চা আজ আমাদের ধর্ম চিন্তা এবং জাতীয় জীবনে অনুপস্থিত। এদেশে তার নামে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা ইন্সটিটিউট নেই; পাঠ্য পুস্তকে নেই তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের ছিটেফোঁটাও। বিচ্ছিন্ন কিছু ছিন্নপত্র ছাড়া নেই তাঁর কোনো পূর্ণাঙ্গ জীবন ভাষ্য। তিনি আমাদের থেকে, আমাদের দেশ থেকে আলাদা বিচ্ছিন্ন এক সত্তা হিসাবে রয়েছেন। অথচ এই আমরা, এই আমাদের দেশ এবং যা কিছু আমরা অর্জন করেছি তার মূলের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন এই মহান মানুষটি।

মুহাম্মাদ আবু হুরায়রা ছিফাত

লেখক : ছাত্র (অনার্স ১ম বর্ষ), রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী।

[1]. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, আহলেহাদীছ আন্দোলন (হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, দ্বিতীয় প্রকাশ : জানুয়ারী ২০১১), পৃ. ৪৬৭।

[2]. ড. আবুল কালাম মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ, মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর অবদান (বাংলা একাডেমী, প্রথম প্রকাশ : জুন ২০০৯) পৃ. ০৪-০৫

[3]. ফাহমিদ-উর-রহমান, উত্তর আধুনিক মুসলিম মন (বাংলা সাহিত্য পরিষদ, প্রথম প্রকাশ : এপ্রিল ২০১০), পৃ. ২৬

[4]. মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর অবদান, পৃ. ০৪-০৫।

[5]. ইমরান মাহফুজ, কালান্তরের অভিযাত্রী (ঐতিহ্য, প্রকাশকাল : জুন ২০২১), পৃ. ১২৬; উত্তর আধুনিক মুসলিম মন, পৃ. ২৬।

[6]. কালান্তরের অভিযাত্রী, পৃ. ১২৭।

[7]. উত্তর আধুনিক মুসলিম মন, পৃ. ২৬

[8]. আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃ. ৪৬৭।

[9]. মাসিক আত-তাহরীক, সেপ্টেম্বর ২০২০, ‘মুসলিম সমাজ ও মাওলানা আকরম খাঁ’, পৃ. ০৩।

[10]. ড. মুহাম্মদ আবদুল্লাহ, রাজনীতিতে বঙ্গীয় উলামার ভূমিকা (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় সংস্করণ: ফেব্রুয়ারী ২০০৯), পৃ. ২৫২।

[11]. আবু জাফর সম্পাদিত, মওলানা আকরম খাঁ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, দ্বিতীয় সংস্করণ : মে ২০০৭), পৃ. ৬৭।

[12]. মওলানা আকরম খাঁ, পৃ. ৯০-৯১।

[13]. রাজনীতিতে বঙ্গীয় উলামার ভূমিকা, পৃ. ২৫৩।

[14]. মওলানা আকরম খাঁ, পৃ. ৯৭, ১০০, ২৭৬।

[15]. রাজনীতিতে বঙ্গীয় উলামার ভূমিকা, পৃ. ১৩৮-১৩৯।

[16]. মওলানা আকরম খাঁ, পৃ. ১৪৭।

[17]. মুহিউদ্দীন খান, জীবনের খেলাঘরে (মাসিক মদীনা পাবলিকেশান্স, প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারী, ২০১৯), পৃ. ২৬৭।

[18]. মওলানা আকরম খাঁ, পৃ. ১৮৭।

[19]. মওলানা আকরম খাঁ, পৃ. ১০৭-১০৮।

[20]. ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী সম্পাদিত, আজাদ ও সমকালীন সমাজ (বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট, প্রথম প্রকাশ : জুলাই ২০০৪), পৃ. ০৯।

[21]. মাসিক আত-তাহরীক, সেপ্টেম্বর ২০২০, পৃ. ০৬।

[22]. উত্তর আধুনিক মুসলিম মন, পৃ. ২৭।

[23]. মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর অবদান, পৃ. ২১।

[24]. রাজনীতিতে বঙ্গীয় উলামার ভূমিকা, পৃ. ২৫৩।

[25]. আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃ. ৪৬৭।

[26]. মওলানা আকরম খাঁ, পৃ. ১১৩।

[27]. কালান্তরের অভিযাত্রী, পৃ. ১২৭-১২৮।

[28]. আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর (খোশরোজ কিতাব মহল, প্রকাশকাল : জানুয়ারী ২০১৬), পৃ. ২০৮।

[29]. আজাদ ও সমকালীন সমাজ, পৃ. ১৩।

[30]. জীবনের খেলাঘরে, পৃ. ৮৫।

[31]. আহমাদ হা/২৭৫৫১; তিরমিযী হা/১৯০০; ইবনু মাজাহ হা/২০৮৯; মিশকাত হা/৪৯২৮; ছহীহাহ হা/৯১ মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর অবদান, পৃ. ২৫।

[32]. মওলানা আকরম খাঁ, পৃ. ১৩৬-১৩৭।

[33]. মওলানা আকরম খাঁ, পৃ. ২১।

[34]. রাজনীতিতে বঙ্গীয় উলামার ভূমিকা, পৃ. ২৫২।

[35]. রাজনীতিতে বঙ্গীয় উলামার ভূমিকা, পৃ. ২৫৪।

[36]. উত্তর আধুনিক মুসলিম মন, পৃ. ২৯।

[37]. মওলানা আকরম খাঁ, পৃ. ৫৮০।

[38]. রাজনীতিতে বঙ্গীয় উলামার ভূমিকা, পৃ. ২৫৫।

[39]. মাসিক আত-তাহরীক, সেপ্টেম্বর ২০২০, পৃ. ০৭।

[40]. রাজনীতিতে বঙ্গীয় উলামার ভূমিকা, পৃ. ১১৫-১১৬।

[41]. রাজনীতিতে বঙ্গীয় উলামার ভূমিকা, পৃ. ২৫৬।

[42]. মাসিক আত-তাহরীক, সেপ্টেম্বর ২০২০, পৃ. ০৭।

[43]. আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃ. ২১।

[44]. কালান্তরের অভিযাত্রী, পৃ. ১২৫-১২৬।

[45]. মাসিক আত-তাহরীক, সেপ্টেম্বর ২০২০, পৃ. ০৩।

[46]. জীবনের খেলাঘরে, পৃ. ২৬৯।

[47]. জীবনের খেলাঘরে, পৃ. ২৩৩।

[48]. মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস (ঐতিহ্য, প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারী ২০০২), পৃ. ০৯।

[49]. মওলানা আকরম খাঁ, পৃ. ১৫২-১৫৩।

[50]. মওলানা আকরম খাঁ, পৃ. ১২১-১২২।

[51]. মওলানা আকরম খাঁ, পৃ. ২৭১।

[52]. মওলানা আকরম খাঁ, পৃ. ১৫৬-১৫৭।

[53]. জীবনের খেলাঘরে, পৃ. ১৭৮।

[54]. উত্তর আধুনিক মুসলিম মন, পৃ. ৩৪; মওলানা আকরম খাঁ, পৃ. ১০০, ১৬৩।

[55]. মওলানা আকরম খাঁ, পৃ. ১২০।

[56]. আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃ. ৪৬৯।

সূত্র

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
skybet88 skybet88 skybet88 skybet88 mix parlay skybet88 slot bonus new member skybet88 skybet88 slot gacor skybet88 skybet88