জীবনী

সৌদী ‘আরাবের প্রধান মুফতি ‘আল্লামা আশ্‌ শাইখ বিন বায (رحمه الله)

‘আল্লামা আশ্‌শাইখ ‘আব্দুল ‘আযীয ইবনু ‘আব্দিল্লাহ ইবনু বায (রহ.) ছিলেন সারা বিশ্বে সুপরিচিত এক ইছলামী ব্যক্তিত্ব। অসাধারণ জ্ঞান, অনন্য প্রজ্ঞা, পরিপূর্ণ ইখলাস ও আল্লাহ ভীতি, ছুন্নাতে রাছূলের অকৃত্রিম অনুসরণ, চমৎকার আচার-ব্যবহার, উন্নত মানবীয় গুণাবলী ও চরিত্রের অধিকারী, শির্‌ক, কুফ্‌র ও বিদ‘আতের বিরুদ্ধে আপোষহীন, তাওহীদ ও ছুন্নাহ্‌র অতন্দ্র প্রহরী এক অকুতোভয় দা‘য়ী, মুবাল্লিগ ও অসাধারণ মু‘আল্লিম হিসেবে সমগ্র বিশ্বে বিশেষ করে মুছলিম বিশ্বে তিনি ছিলেন খুবই সমাদৃত অতি উজ্জ্বল এক নক্ষত্র। ইছলাম বিরোধী নানা ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত ও কুট-কৌশল মোক্বাবিলায় তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা, সংগ্রাম ও সঠিক দিক-নির্দেশনার কাছে সমগ্র মুছলিম বিশ্ব যুগ যুগ ধরে ঋণী হয়ে থাকবে। ইছলামের প্রকৃত রূপ তুলে ধরার নিমিত্ত ক্বোরআন ও ছুন্নাহ্‌তে বর্ণিত খাঁটি ইছলামী “আক্বীদাহ্‌র প্রচার ও প্রসারে তিনি আমৃত্য কাজ করে গেছেন।

‘আল্লামা আশ্‌ শাইখ ‘আব্দুল ‘আযীয ইবনু ‘আব্দিল্লাহ ইবনু বায ১৩৩০ হিজরীর যিলহাজ্জ মাসে সৌদী ‘আরাবের রাজধানী রিয়াদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্র জীবনের প্রথম দিকে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ভালো ছিলো। কিন্তু (قدر الله وما شاء فعل) ১৩৪৬ হিজরীতে ১৬ বৎসর বয়সে তাঁর চোখে রোগ দেখা দেয় এবং তাঁর দৃষ্টিশক্তি ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে। ১৩৫০ হিজরীর মুহার্‌রাম মাসে অর্থাৎ বিশ বছর বয়সে (قدر الله وما شاء فعل) তাঁর দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ লোপ পায়।

এ সম্পর্কে তিনি বলেছেন:- “আমার দৃষ্টিশক্তি হারানোর উপরও আমি আল্লাহ্‌র সর্ববিধ প্রশংসা জ্ঞাপন করছি। আল্লাহ্‌র কাছে দো‘আ করছি, তিনি যেন দুন্‌ইয়া ও আখিরাতে আমাকে উত্তম প্রতিদান প্রদান করেন।”

অতি অল্প বয়সেই তিনি (রহ.) লেখাপড়া শুরু করেন। প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পূর্বেই তিনি ক্বোরআনে কারীমের হিফ্‌য সম্পন্ন করেন। মক্কার খ্যাতনামা ক্বারী শাইখ সা‘দ ওয়াক্কাস আল-বুখারীর নিকট ‘ইলমে তাজওয়ীদ তথা সঠিক-শুদ্ধভাবে ক্বোরআনে কারীম পাঠের নিয়মাবলী শিক্ষা লাভ করেন। অতঃপর তিনি সৌদি ‘আরাবের তৎকালীন গ্র্যান্ড মুফতী আশ্‌শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহীম ইবনু ‘আব্দিল লাত্বীফ আল আশ্‌ শাইখ সহ দেশের প্রখ্যাত ‘উলামায়ে কিরামের নিকট ‘আরবী ভাষায় এবং শারী‘য়াতের বিভিন্ন বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। বিশেষ করে তৎকালীন গ্র্যান্ড মুফতী আশ্‌শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহীমের নিকট তিনি একাধারে দশ বছর ইছলামের বিভিন্ন বিষয়ে হাতে-ক্বলমে শিক্ষা গ্রহণ করেন।

১৩৫৭ সনে গ্র্যান্ড মুফতী শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহীমের পরামর্শক্রমে তিনি রিয়াদের অদূরে আল-খারজ এলাকার বিচারপতি নিযুক্ত হন। দীর্ঘ চৌদ্দ বছর বিচারপতির দায়িত্ব পালনের পর ১৩৭২ সনে রিয়াদ প্রত্যাবর্তন করেন এবং রিয়াদ মা‘হাদে ‘ইলমীতে শিক্ষকতার কাজে নিয়োজিত হন। এর এক বছর পর তিনি রিয়াদের শারী‘আহ কলেজে অধ্যাপনার কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ নয় বছর এই কলেজে তিনি ‘ইলমুল ফিক্ব্‌হ, ‘ইলমূত তাওহীদ ও ‘ইলমুল হাদীছ শিক্ষা দান করেন।

১৩৮১ হিজরীতে যখন মাদীনা ইছলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন শাইখ ইবনু বায উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস-চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে ১৩৯০ হিজরী সালে তিনি চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন। ১৩৯৫ হিজরী সাল পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল থাকেন।

ঐ বৎসরই রাজকীয় এক ফরমানের অধীনে তাঁকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় “ইছলামী গবেষণা, ফাতওয়া, দা‘ওয়াত ও ইরশাদ” (দারুল ইফতা) নামক সৌদী ‘আরাবের সর্বোচ্চ দ্বীনী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগ করা হয়। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি পূর্ণ নিষ্ঠা, আমানাতদারী ও সাফল্যের সাথে এই মহান দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

উক্ত দায়িত্বের পাশাপাশি শাইখ ইবনু বায আরো অনেক দ্বীনী সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে এবং দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। যেমন:-

১। প্রধান: সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদ, সৌদী ‘আরাব।

২। প্রধান: স্থায়ী ইছলামী গবেষণা ও ফাতওয়া কমিটি।

৩। প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট ও সদস্য: রাবেতায়ে ‘আলম আল ইছলামী।

৪। প্রেসিডেন্ট: আন্তর্জাতিক মাছজিদ বিষয়ক উচ্চ পরিষদ।

৫। উচ্চ পরিষদ সদস্য: মাদীনা ইছলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

৬। প্রেসিডেন্ট: ইছলামী ফিক্ব্‌হ পরিষদ, মাক্কাহ ।

৭। উচ্চ কমিটি সদস্য: দা‘ওয়াতে ইছলামিয়্যাহ, সৌদী ‘আরাব।

উল্লেখ্য যে, ১৯৯৩ ইং সনে সৌদী রাজকীয় এক ফরমানের মাধ্যমে ‘আল্লামা শাইখ ইবনু বাযকে সৌদী ‘আরাবের প্রধান মুফতী পদে নিয়োগ দেয়া হয়।

‘আল্লামা শাইখ ইবনু বায ছোট-বড় অনেক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা ও সংকলন করে গেছেন। তন্মধ্যে “العقيدة الصحيحة وما يضادها” (সঠিক ধর্ম বিশ্বাস ও তার পরিপন্থী বিষয়), “فضل الدعوة إلى الله وحكمها وأخلاق القائمين بها” (আল্লাহর দিকে আহবানের ফাযীলাত, হুক্‌ম এবং দা‘য়ীর চরিত্র), “وجوب لزوم السنة والحذر من البدعة” (ছুন্নাতে রাছুল 1 আঁকড়ে ধরা এবং বিদ‘আত থেকে সতর্ক থাকা অপরিহার্য), “হাজ্জ, ‘উমরাহ ও যিয়ারাত সম্পর্কিত বিষয়াদির বিশ্লেষণ”, “ইছলামের দৃষ্টিতে‘আরাব জাতীয়তাবাদ”, “আল্লাহ্‌র পথে জিহাদ” ইত্যাদি পুস্তক-পুস্তিকা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া ”শারহুল ‘আক্বীদাতিত ত্বাহাওয়িয়াহ” ও ‘‘ফাতহুল বারী শারহিল বুখারী’’ সহ কয়েকটি গ্রন্থের উপর তাঁর গুরুত্বপূর্ণ টীকাও রয়েছে।

আলহামদুলিল্লাহ,শাইখ ইবনু বাযের বিভিন্ন বক্তৃতা, রচনা, প্রশ্নোত্তর ও পত্রাবলী একত্রে সংকলন করা হয়েছে। ”মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাত মুতানাওয়ী‘আহ” (مجموع فتاوى ومقالات متنوعة) নামে এই সংকলন সমগ্রটি প্রকাশিত হয়েছে। ‘আল্লামা শাইখ ইবনু বায রাষ্ট্রীয় ও অন্যান্য বিভিন্ন রকমের গুরুদায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও দা‘ওয়াত, দার্‌ছ, ওয়া‘য-নাসীহাত ও সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজে নিষেধ প্রদানের কর্তব্য থেকে কখনও বিচ্যুত হননি। আল-খার্‌জ এলাকায় বিচারপতি থাকাকালে সেখানে তিনি দার্‌ছ ও ওয়া‘য নাসীহাতের হালাক্বা (চক্র) চালু করেন। রিয়াদ প্রত্যাবর্তনের পর রিয়াদস্থ প্রধান জামে‘ মাছজিদে দার্‌ছ প্রদানের যে কার্যক্রম চালু করেছিলেন তা মৃত্যুর কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত যথানিয়মে চালিয়ে গেছেন। মাদীনায় অবস্থানকালীন সেখানেও তিনি হালাক্বায়ে দার্‌ছ চালু করেছিলেন। সাময়িকভাবে কোন শহরে স্থানান্তরিত হলে সেখানেও তিনি হালাক্বায়ে দার্‌ছ চালু করতেন। তাঁর যাবতীয় দ্বীনী খিদমাতকে আল্লাহ 8 ক্বিয়ামতের দিন তাঁর মীযানে হাছানাহ্‌তে রাখুন, আর এ সবের দ্বারা উম্মতে মুছলিমাহ্‌কে উপকৃত হওয়ার তাওফীক্ব দান করুন।

আল্লাহ পরকালে তাঁকে পরম সুখ-শান্তি ও উত্তম প্রতিদান প্রদান করুন। আল্লাহুম্মা আ-মী-ন।

মতামত দিন