সলাত

সলাতে মুবাশ্‌শির (পর্ব ৪২)

রচনায় : আব্দুল হামীদ ফাইযী

তাশাহহুদের পর

নামায ২ রাকআত বিশিষ্ট (যেমন ফজর, জুমুআহ, ঈদ প্রভৃতি) হলে দুআ মাসূরার পর সালাম ফিরলে নামায শেষ হয়ে যায়। কিন্তু ৩ বা ৪ রাকআত বিশিষ্ট (মাগরিব, এশা, যোহ্‌র, আসর, ইত্যাদি) হলে তাশাহহুদ পড়ে তৃতীয় রাকআতের জন্য উঠে যেতে হবে। ইবনে মাসঊদ (রাঃ) বলেন, ‘—অতঃপর নামাযের মাঝে হলে নবী (সাঃ) তাশাহহুদ পাঠ করে উঠে যেতেন। নচেৎ নামাযের শেষে হলে তাশাহহুদের পর যতক্ষণ ইচ্ছা (মাশাআল্লাহ) দুআ পড়তেন, তারপর সালাম ফিরতেন।’ (আহমাদ, মুসনাদ ১/৪৫৯, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ ৭০৮নং, মাজমাউয যাওয়াইদ,হাইষামী ২/১৪২)

প্রশ্ন ওঠে, দরুদও কি তাশাহহুদের শামিল?

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) এর মতে তাশাহহুদ ও দরুদ একই জিনিস। অর্থাৎ, সব তাশাহ্‌হুদেই দরুদ পড়তে হবে। (কিতাবুল উম্ম ১/১০২, সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ১৭০পৃ:) তাছাড়া উপরোক্তহাদীসে তাশাহহুদ ও দুআর কথা আছে, দরুদের কথা নেই। আর তার মানেই তাশাহ্‌হুদে দরুদ অবশ্যই শামিল আছে।

পরন্তু সাহাবাগণ তাশাহ্‌হুদে সালাম শিখার পর মহানবী (সাঃ) কে বললেন, (তাশাহ্‌হুদে) কেমন করে আমরা আপনার প্রতি সালাম পেশ করব তা (তাহিয়্যাত) তো শিখলাম। কিন্তু আপনার উপর দরুদ কিভাবে পাঠ করব (তা শিখিয়ে দিন)। তখন তিনি বললেন, “তোমরা বল, আল্লা-হুম্মা স্বাল্লি আলা মুহাম্মাদিঁউ—।” সুতরাং এখানেও স্পষ্টত: দরুদ তাশাহহুদেরই শামিল। তাছাড়া এখানে প্রথম না শেষ তাশাহহুদ তা নির্দিষ্ট নয়। অতএব বলা যায় যে, প্রথম তাশাহ্‌হুদেও দরুদ পড়তে হবে। (সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ১৬৪পৃ:)

অবশ্য মা আয়েশা رضي الله عنها এর একটিহাদীসে প্রথম তাশাহ্‌হুদে স্পষ্ট দরুদ পড়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর রসূল (সাঃ) এর জন্য তাঁর মিসওয়াক ও ওযুর পানি প্রস্তুত রাখতাম। অতঃপর আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি রাত্রের কোন অংশে জেগে উঠতেন। তারপর মিসওয়াক করে ওযু করতেন। অতঃপর ৯ রাকআত নামায পড়তেন। এতে তিনি অষ্টম রাকআত ছাড়া পূর্বে আর কোথাও (তাশাহহুদের জন্য) বসতেন না। সুতরাং (অষ্টম রাকআতে বসে) আল্লাহর নিকট দুআ করতেন এবং তাঁর নবীর উপর দরুদ পাঠ করতেন। অতঃপর সালাম না ফিরে তিনি উঠে যেতেন। তারপর নবম রাকআত পড়ে বসতেন। অতঃপর তাঁর প্রতিপালকের প্রশংসা বর্ণনা করে তাঁর নবীর উপর দরুদ পাঠ করতেন এবং দুআ করতেন। অতঃপর আমাদেরকে শুনিয়ে সালাম ফিরতেন। (আহমাদ, মুসনাদ ২/৩২৪, ভিন্ন শব্দে ঘটনাটি রয়েছে মুসলিমে ৭৪৬ নং)

উক্ত ব্যাপারটি তাহাজ্জুদ বা বিত্‌র নামাযের হলেও এর আমল ফরয নামাযেও চলবে। (তামামুল মিন্নাহ্‌, আলবানী ২২৪-২২৫পৃ:) এ জন্যই ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ্‌)ও বলেন, নামাযী প্রথম তাশাহ্‌হুদে দরুদ পড়বে। (মাজমূআতু রাসাইল ফিস স্বালাহ্‌ ১২৯পৃ:)

আবার প্রথম তাশাহ্‌হুদে দুআ করার কথাও একাধিকহাদীসে উল্লেখ হয়েছে। যেমন উপরোক্ত হযরত আয়েশা رضي الله عنها এরহাদীসেও দুআর কথা স্পষ্টভাবে রয়েছে। একহাদীসে মহানবী (সাঃ) বলেন, “যখন তোমরা প্রত্যেক দু’ রাকআতে বসবে, তখন ‘আত্‌-তাহিয়্যাতু—’ বল। অতঃপর তোমাদের প্রত্যেকের পছন্দমত দুআ বেছে নিয়ে আল্লাহর নিকট দুআ কর।” (সহিহ,নাসাঈ, সুনান ১১১৪ নং, আহমাদ, মুসনাদ, ত্বাবারানীরানী, মু’জাম)

সুতরাং প্রথম তাশাহ্‌হুদেও দুআ করা বিধেয়। (সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ১৬০পৃ:)

পরন্তু গরম পাথরের উপর বসে এত কিছু পড়া কি সম্ভব? কারণ নবী (সাঃ) প্রথম বৈঠক থেকে এত তাড়াতাড়ি উঠতেন যে, মনে হত তিনি যেন গরম পাথরের উপর বসেছিলেন। কিন্তু এ হাদীসটি যয়ীফ। (যইফ আবূদাঊদ, সুনান ১৭৭, যতিরমিযী, সুনান ৫৭, যনাসাঈ, সুনান ৫৫নং, তামামুল মিন্নাহ্‌, আলবানী ২২৪পৃ:)

তৃতীয় রাকআত

তাশাহহুদ শেষ করে তিন বা চার রাকআত বিশিষ্ট নামাযের জন্য যখন মহানবী (সাঃ) উঠতেন, তখন ‘তকবীর’ (আল্লাহু আকবার) বলতেন। (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ৭৯৯নং) তিনি ওঠার পূর্বেই তকবীর দিতেন। (আবূ য়্যা’লা, সিলসিলাহ সহীহাহ, আলবানী ৬০৪নং) ওঠার পর নয়।

দুই হাত দ্বারা মাটির উপর ভর করে (খমীর সানার মত উভয় হাতকে মাটিতে রেখে) উঠে খাড়া হতেন। (আবূ ইসহাকহারবী, বায়হাকী, তামামুল মিন্নাহ্‌, আলবানী ১৯৬পৃ:)

আযরাক বিন কাইস বলেন, আমি ইবনে উমার (রাঃ) কে দেখেছি, তিনি যখন দ্বিতীয় রাকআত থেকে (তৃতীয় রাকআতের জন্য) উঠতেন, তখন তাঁর উভয়হাত দ্বারা মাটির উপর ভর করতেন। পরে আমি তাঁর ছেলে ও তাঁর সঙ্গীদেরকে বললাম, ‘সম্ভবত: এরুপ তিনি তাঁর বাধ্যকের কারণে করে থাকেন।’ কিন্তু তাঁরা বললেন, ‘না, বরং এইরুপই হবে।’ (অর্থাৎ, এইরুপ ওঠাই সুন্নত।) (বায়হাকী ২/১৩৫, তামামুল মিন্নাহ্‌, আলবানী ২০০পৃ:)

এই সময় তিনি ‘রফয়ে য়্যাদাইন’ করতেন। (বুখারী, আবূদাঊদ, সুনান, মিশকাত ৭৯৪নং) খাড়া হওয়ার পর তিনি দ্বিতীয় রাকআতের মত সূরা ফাতিহা পাঠ করতেন। কিন্তু এই রাকআতে অন্য সূরা পাঠ করতেন না। (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ৮২৮নং)

অবশ্য কখনো কখনো যোহরের নামাযে (প্রায় ১৫) আয়াত মত অন্য সূরা পাঠ করতেন। (মুসলিম,  আহমাদ, মুসনাদ, মিশকাত ৮২৯, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ ৫০৯, সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ১১৩, ১৭৮পৃ:)

সুতরাং শেষ (তৃতীয় ও চতুর্থ) রাকআতে সূরা ফাতিহার পর অন্য সূরা পাঠ করা ও না করা উভয়ই বৈধ। যোহরের নামাযের উপর কিয়াস করে অন্যান্য নামাযেও পড়া বৈধ। (ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ ১/২৫৬, সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ১১৩পৃ:)

তাছাড়া উক্ত হাদীসে সাহাবাগণ তাঁর যোহরের প্রথম দু’ রাকআতে প্রায় ৩০ আয়াত মত, শেষ দু’ রাকআতে তার অর্ধেক প্রায় ১৫ আয়াত মত, আসরের প্রথম দু’ রাকআতে তার অর্ধেক প্রায় ৭/৮ আয়াত মত এবং শেষ দু’ রাকআতে তার অর্ধেক অর্থাৎ প্রায় ৩/৪ আয়াত মত পড়া আন্দাজ করতেন। এতে বুঝা যায় যে, আসরের শেষ দু’ রাকআতেও অন্য সূরা (অপেক্ষাকৃত ছোট ধরনের) পড়া চলবে।

এ ছাড়া আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন, ‘প্রত্যেক নামাযে ক্বিরাআত আছে —-। কিন্তু যে ব্যক্তি কেবল সূরা ফাতিহা পড়বে, তা তার জন্য যথেষ্ট হবে। আর যে ব্যক্তি এর বেশী পড়বে, তা তার জন্য উত্তম হবে।’ (বুখারী ৭৭২, মুসলিম, সহীহ ৩৯৬ নং) অন্য এক বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘পুরো নামাযেই ক্বিরাআত পড়া হয়—।’ (মুসলিম, সহীহ ৩৯৬ নং) অর্থাৎ প্রত্যেক রাকআতেই। হাফেয ইবনে হাজার (রহঃ) বলেন, কেউ কেউ বলেছেন, ‘নামাযের সমস্ত রাকআতেই ক্বিরাআত মুস্তাহাব।’ অবশ্য আবূ হুরাইরার এইহাদীসের প্রকাশ্য অর্থ তাই ইঙ্গিত করে। (ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার ২/২৯৫) সুতরাং সূরা ফাতিহার পর মহানবী (সাঃ) এর অন্য এক সূরা পড়া ও না পড়ার ব্যাপারে উভয় প্রকার বর্ণনা থাকায় এ কথা বলা যায় যে, তিনি শেষ দু’ রাকআতে কখনো কখনো সূরা পড়তেন, আবার কখনো পড়তেন না।

মোট কথা, তিন বা চার রাকআত নামাযে সূরা ফাতিহার পর প্রত্যেক রাকআতেই সূরা লাগানো যায়। কোন রাকআতেই না লাগালেও চলে। আবার কেবল প্রথম দু’ রাকআতে লাগিয়ে শেষ রাকআতগুলিতে না পড়লেও চলে। সব রকমই জায়েয।

ক্বিরাআতের পর মহানবী (সাঃ) বাকী রুকূ, কওমাহ্‌, সিজদাহ ও বৈঠক প্রভৃতি পূর্বের রাকআতের মত করে মাটির উপর উভয়হাত দ্বারা ভর করে তকবীর বলে চতুর্থ রাকআতের জন্য উঠে খাড়া হতেন। আর এই সময় তিনি কখনো কখনো ‘রফ্‌য়ে ইয়াদাইন’ করতেন। (আহমাদ, মুসনাদ, নাসাঈ, সুনান)

(চলবে)

মতামত দিন