আক্বীদা

ঈমানের মাধুর্য

ঈমানের মাধুর্য

অনুবাদ : সিরাজুল ইসলাম আলী আকবর

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ – رَضِيَ اللهُ عَنْهُ- قَالَ : قَالَ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، ثَلَاثٌ مَنْ كُنَّ فِيْهِ وَجَدَ حَلَاوَةَ الإِيْمانِ : أَنْ يَّكُوْنَ اللهُ وَرَسُوْلُهُ أحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَاও وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءُ لَا يُحِبُّهُ إلَّا ِللهِ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَّعُوْدَ فِيْ الْكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُّقْذَفَ فِيْ النَّارِ.

আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন : যে ব্যক্তি তিনটি সৎ স্বভাব (গুণ)-এর অধিকারী হবে সে ঈমানের স্বাদ উপভোগ করবে—(এক) তার নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসূল স. সব চাইতে প্রিয় হবে। (দুই) কোনো ব্যক্তিকে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ভালোবাসবে। (তিন) আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে যেরূপ অপছন্দ করে, কুফরিতে ফিরে যাওয়াকেও ঠিক সে-রূপ অপছন্দ করবে।[1]

হাদিস বর্ণনাকারী : মহান সাহাবি আবু হামজা আনাস ইবনে মালেক ইবনে নছর নাজ্জারী খাযরাজী ; যিনি ইমাম, কারী, মুফতি ও মুহাদ্দিস এবং ইসলামের অন্যতম মহান রাবী ও রাসূলুল্লাহ স.-এর বিশিষ্ট খাদেম। আল্লামা যাহাবী রহ. বলেন :—

صحب النبي صلى الله عليه وسلم أةم الصحبة، ولازمه أكمل الملازمة، منذ أن هاجر إلى أن ماة، وغزا معه غير مرة، وبايع ةحة الشجرة.

তিনি রাসূল সা.-এর পরিপূর্ণ সাহচর্য-লাভে ধন্য হয়েছেন। মহানবীর হিজরতের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি তাঁর সেবা যত্নে অব্যাহতভাবে নিরত ছিলেন। একাধিক ‘গাযওয়ায়’ (ইসলাম প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে) তিনি ছিলেন রাসূলের একান্ত সহযোগী। (বাবলা) বৃক্ষের নীচে বায়আত গ্রহণকারী ভাগ্যবানদের তিনি ছিলেন অন্যতম।[2]

তিনি স্বয়ং বলেন :—

خدمت النبي صلى الله عليه وسلم عشر سنين، فما ضربني، ولا سبني، ولا عبس في وجهي.

আমি এক নাগাড়ে দশ বছর রাসূলের খেদমতে নিয়োজিত ছিলাম। এ দীর্ঘ সময়ে তিনি কখনো আমাকে (ত্রুটি সত্ত্বেও) প্রহার করেননি, কটু কথা বলেননি কখনো, কিংবা কোন কারণে তার ভ্রূ কুঞ্চিত হতে দেখিনি।[3]

রাসূল সা. তার জন্য দোয়া করেছিলেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির প্রাচুর্যের জন্য। তার দোয়া কবুল হয়, এবং মৃত্যুর পূর্বে তার সন্তান-সন্ততির সংখ্যা দাঁড়ায় শতাধিকে। ৯১ হিজরিতে, কিংবা বলা হয় আরো পরে, তিনি মৃত্যু বরণ করেন। তিনি ছিলেন বসরায় মৃত্যুবরণকারী সর্বশেষ সাহাবি। তার মৃত্যুতে মানুষের মাঝে এক অভূতপূর্ব শোকের ছায়া নেমে আসে। এমনকি, তখন মানুষের মাঝে বলাবলি হচ্ছিল যে—

قد ذهب نصف العلم.

‘জ্ঞানের অর্ধেক বিদায় নিয়েছে।’

শাব্দিক আলোচনা :—

ثَلَاثٌ অর্থাৎ তিনটি স্বভাব বা গুণ।

مَنْ كُنَّ فِيْهِ وَجَدَ حَلَاوَةَ الإِيْمانِ —كن দ্বারা উদ্দেশ্য ‘অর্জিত হল’। সুতরাং এ كان টি হল পূর্ণাঙ্গ ক্রিয়া। বাক্যটির অর্থ এই যে, এ গুণত্রয় যার অর্জিত হবে, সে ঈমানের মাধুর্যপ্রাপ্ত হবে। ঈমানের মাধুর্য হল : আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের মাধ্যমে অতুলনীয় আস্বাদ লাভ, অন্তরের প্রশান্তি ও উন্মোচন।

ঈমানের হালাওয়াত (মাধুর্য) কি ?

এবাদতগুজার ব্যক্তি বন্দেগি-গুজরানকালে যে আত্মতৃপ্তি ও আন্তরিক প্রশান্তি উপভোগ করে, তাকেই ঈমানের হালাওয়াত বা ঈমানের মধুরতা-মাধুর্য বলে।

আল্লামা ইবনে হাজার রহ. শায়খ আবু মুহাম্মদ ইবনে আবু জামরার বরাত দিয়ে বলেন :—

إنما عبر بالحلاوة لأن الله شبه الإيمان بالشجرة في قوله تعالى: ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا كَلِمَةً طَيِّبَةً كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ (إبراهيم: ২৪) فالكلمة هي كلمة الإخلاص، والشجرة أصل الإيمان، وأغصانها اتباع الأمر واجتناب النهي، وورقها ما يهتم به المؤمن من الخير، وثمرها عمل الطاعات، وحلاوة الثمر جني الثمرة، وغاية كماله تناهي نضج الثمرة، وبه تظهر حلاوتها.

মানুষের আত্মার এই আস্বাদ ও প্রশান্তির মধুর অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে ‘হালাওয়াত’ শব্দের অবতারণার কারণ এই যে, আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ঈমানকে বৃক্ষের সাথে তুলনা করেছেন ; কোরআনে এসেছে—

‘আল্লাহ তাআলা উপমা বর্ণনা করেছেন : পবিত্র বাক্য হল পবিত্র বৃক্ষের মতো।[4] [5]

উল্লেখিত আয়াতে ‘কালেমা’ দ্বারা উদ্দেশ্য কালেমায়ে এখলাস (কালেমায়ে তায়্যিবা)। বৃক্ষ হল ঈমানের মূল কান্ড, আদেশের অনুবর্তন ও নিষেধের পরিহার, তার শাখা-প্রশাখা ; মোমিনগণ ব্রতী হন যে কল্যাণ-কর্মে, তা তার পত্র-পল্লব। মোমিনের অনুগত কর্মতৎপরতা হল এ বৃক্ষের ফল, ফলের আহরণ ফলের সুমিষ্ট স্বাদ। ফল পরিপূর্ণ পরিপক্ব হওয়া এ দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সুখময়-সফল পরিণতি—এভাবেই, সার্বিক পরম্পরায় প্রকাশ পায় এর ‘হালাওয়াত’ বা মাধুর্য।

وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءُ لَا يُحِبُّهُ إلَّا للهِ এর মর্মার্থ এই যে, মুসলমানদের মাঝে পারস্পরিক সম্পর্কের একক ভিত্তি হবে আল্লাহর প্রতি সর্বান্ত বিশ্বাস, সৎকর্ম—ইত্যাদি। আল্লাহর জন্য অপরকে ভালোবাসা তখনই প্রমাণিত হবে, যখন তাৎক্ষণিক পারস্পরিক সম্প্রীতি বা মনোমালিন্যের দরুন দু’জন মুসলিমের মাঝে আল্লাহ ও তার প্রতি বিশ্বাস কেন্দ্রিক সম্পর্কের অবনতি ঘটবে না।

وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَّعُوْدَ فِيْ الْكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُّقْذَفَ فِيْ النَّارِ অর্থ হল : কুফরে প্রত্যাবর্তনে ততখানি ঘৃণা ও আতঙ্ক বোধ করবে, যতটা আতঙ্ক ও অনীহা বোধ করে মানুষ আগুনে নিক্ষিপ্ত হতে। ভিন্ন বর্ণনায় রয়েছে:—

وحتى أن يقذف في النار أحب إليه أن يرجع إلي الكفر بعد إذ أنقذه الله منه

অর্থাৎ—যতক্ষণ যে কুফর থেকে আল্লাহ তাআলা মানুষকে রক্ষা করেছেন, সে কুফরে প্রত্যাবর্তনের তুলনায় অধিক প্রিয় জ্ঞান করবে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে।[6] উপরোক্ত বর্ণনার তুলনায় এ বর্ণনাটি অধিক অলংকারপূর্ণ। কারণ, প্রথমোক্ত রেওয়াতে কুফরে প্রত্যাবর্তন ও আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে একই পর্যায়ভুক্ত করা হয়েছে। পক্ষান্তরে এ রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে যে, কুফরে প্রত্যাবর্তনের তুলনায় আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া অধিক শ্রেয়।

 বিধি-বিধান ও উপকারিতা :

১। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের রয়েছে এক অভূতপূর্ব, অপরিমেয় ও তৃপ্তিকর আস্বাদ, যা গ্রহণ করতে সক্ষম কেবল সত্যবাদী মোমিনগণ, যাদের ক্রমাগত অধ্যবসায় সৃষ্টি করে এ আস্বাদ লাভের উপযোগী গুণাবলী—তাদের আত্মায়, কর্মে ও নিত্য তৎপরতায়। ঈমানের দাবিদার মাত্রই এ আস্বাদ গ্রহণে সক্ষম—এমন নয়।

২। আল্লাহ তাআলাকে মহববত করা এবং তারই ফলশ্রুতিতে তার রাসূলকেও ভালোবাসা। এ এমন এক গুণ যা সেসব সৌভাগ্যশালী সুমহান ব্যক্তি-বর্গের গুণাগুণের মাঝে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, যারা ঈমানের তৃপ্তি-স্বাদ গ্রহণে সফল হতে পেরেছেন। বস্ত্তত: কোন মহববতই আল্লাহ তাআলা ও তার রাসূলের মহববতের চেয়ে অগ্রণী হতে পারে না। বরং মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসাই মাতা-পিতা, সন্তান-সন্ততি, সমগ্র মানুষ, এমনকি নিজের সত্তাসহ সকল কিছুর চেয়ে অগ্রগণ্য হতে হবে। এটাই ঈমানের দাবি। উল্লেখ্য, উমর রা. মহানবীকে বলেছিলেন:—

يا رسول الله لأنت أحب إلي من كل شيء إلا من نفسي، فقال النبي صلى الله عليه وسلم: لا والذي نفسي بيده حتى أكون أحب إليك من نفسك، فقال عمر: فإنه الآن والله لأنت أحب إلي من نفسي، فقال النبي صلى الله عليه وسلم: الآن يا عمر، (أى كمل إيمانك).

হে আল্লাহর রাসূল স.! আপনি আমার নিকট আমি ছাড়া অপরাপর সবকিছুর চেয়ে অধিকতর প্রিয়। তখন তিনি স. বললেন : না, (এরূপ হতে পারে না) যতক্ষণ না আমি তোমার কাছে তোমার সত্তার চাইতেও প্রিয়তর হই। (এবার) উমর রা. বললেন : আল্লাহর শপথ ! এ মুহূর্ত থেকে অবশ্যই আপনি আমার কাছে আমার আপন সত্তার চেয়েও প্রিয়। মহানবী (এবার) বললেন : হে উমর ! এক্ষণে (তোমার ঈমান পূর্ণতা পেল)।[7]

আনাস রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন :—

لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحب إليه من والده وولده والناس أجمعين.

তোমাদের মাঝে কেউ পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা-মাতা, সন্তান, এবং সকল মানব-মানবীর চেয়ে প্রিয়তর হব[8]

মহান আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ভালোবাসার যে চিত্র উক্ত পরিসরে তুলে ধরা হল তার একটি অনিবার্য প্রভাব তথা অলৌকিক প্রতিক্রিয়া ও ফলশ্রুতি রয়েছে। তা হচ্ছে এই যে, আল্লাহ ও তার রাসূল স.-এর সে-রূপ মহববত পোষণকারী বান্দারা ঐশী আদেশ-নিষেধের প্রতি যথাযোগ্য আত্মতুষ্টি আর আত্মস্বীকৃতির বিকাশ ঘটিয়ে সেসব বিধি-নিষেধ বা আদেশ-নিষেধের অকপট অনুকরণে দৃঢ়তার স্বাক্ষর রাখতে সদাই সক্রিয় হন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন :—

قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ(آل عمران: ৩১)

বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস তাহলে তোমরা আমাকে অনুসরণ কর, তবে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসবেন।[9]

৩। ফরজ কর্মের পর যে সমস্ত বিষয় আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা মানুষের অন্তরে জাগ্রত করে,—ইবনে কায়্যিম (রহ.)-এর মতে—তা নিম্নরূপ :—

(ক) আত্ম-সমাহিতি, নিমগ্নতা ও সক্রিয় চিন্তাবৃত্তির মাধ্যমে কোরআন তেলাওয়াতে ব্রতী হওয়া।

(খ) নফল এবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য হাসিলে প্রয়াসী হওয়া।

(গ) রসনা, আত্মা ও নেক আমলের মাধ্যমে সর্বাবস্থায় আল্লাহর স্মরণে সক্রিয় থাকা।

(ঘ) আল্লাহ তাআলার পছন্দনীয় বিষয়াদিকে প্রবৃত্তির শোভনীয় বস্ত্তসমূহের উপর প্রাধান্য দেয়া।

(ঙ) আল্লাহর প্রতি মহববত পোষণকারী সত্যবাদী নেককারদের সংস্রবে আত্মনিয়োগ করা।

(চ) মহান আল্লাহ ও অন্তরাত্মার মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়—এমন সব উপায়-উপকরণের সাথে যথা-সম্ভব দূর সম্পর্কও না রাখা।

৪। আল্লাহ তাআলাকে ভালোবাসার ফলশ্রুতিতে তাঁর রাসূলকেও ভালোবাসা এবং উক্ত পবিত্রতম মহববতকে সৃষ্টিকুলের মহববতের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া। আল্লাহ তাআলাকে ভালোবাসার অনিবার্য ফলশ্রুতি হিসেবে মহানবীকে ভালোবাসার কতিপয় লক্ষণ নিম্নরূপ :—

(ক) এ কথার প্রতি সুদৃঢ় ঈমান ও বিশ্বাস পোষণ করা যে, তিনি স. হচ্ছেন আল্লাহ তাআলা কর্তৃক প্রেরিত সর্বশেষ রাসূল। আল্লাহ তাআলা তাকে সকল মানুষের জন্য সু-সংবাদ দানকারী, সতর্ককারী এবং তার আনীত একমাত্র সত্য-ধর্ম ইসলামের প্রতি আহবানকারী এবং তিমিরনাশী মশাল ও আলোকিত দিশারি রূপে প্রেরণ করেছেন।

(খ) তার দর্শন-সাক্ষাতের প্রবল আকাঙ্ক্ষার লালন এবং এ আকাঙ্ক্ষা মনে জাগ্রত না হলে মনঃকষ্টের উদ্রেক হওয়া।

(গ) তার যাবতীয় আদেশের অনুবর্তন এবং নিষেধের পরিহার ও বর্জন। কারণ, প্রকৃত মহববত পোষণকারী মাহবুবের অনুসারী হয়। এটা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয় যে, তুমি এক দিকে তার ভালোবাসার দাবি করবে এবং অন্যদিকে তার নির্দেশাবলীর বিরোধিতা এবং নিষিদ্ধ বিষয়াদির সীমা লঙ্ঘন করবে।

(ঘ) সুন্নতের অতুলনীয়তা ও অনুপম আদর্শের আলোয় জীবন সমুজ্জ্বল করা। তার অনুকুল ও পক্ষ মতের অনুসারী যারা, তাদের সাহায্য করা, এবং যারা তার ঘোরতর বিরোধিতায় লিপ্ত, মনে-প্রাণে তাদের বিরুদ্ধাচরণ করা। তার মতামত ও আদর্শ প্রচারে অবদান রাখা। সর্বোপরি, এসব পথে নিরলস চেষ্টা সাধনায় কোনরূপ কার্পণ্য না করা।

(ঙ) তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ।

(চ) তাঁর নৈতিকতা ও চরিত্রে চরিত্রবান এবং শিষ্টাচারে পরিমার্জিত হওয়া।

(ছ) তাঁর সাহাবিদের ভালোবাসা এবং তাদের পক্ষ হয়ে প্রতিরোধ করা।

(জ) তাঁর জীবন বৃত্তান্ত ও সমুদয় সংবাদ সম্বন্ধে জ্ঞান আহরণ করা।

৫। মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্প্রীতির ভিত্তি হবে আল্লাহ তাআলার জন্য ও তার সন্তুষ্টির উপর ভিত্তি করে। এ সৌহার্দ্যের রয়েছে অতুলনীয় ফজিলত ও সওয়াব। এ ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে বিভিন্ন হাদিস। আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা. বলেছেন :—

سبعة يظلهم الله في ظله يوم لا ظل إلا ظله… وذكرمنهم ورجلان تحابا في الله، اجتمعا عليه وافترقا عليه.

‘যেদিন আল্লাহ তাআলার ছায়া ব্যতীত কোন ছায়া থাকবে না, সেদিন আল্লাহ তাআলা সাত ব্যক্তিকে তার ছায়ায় আশ্রয় দান করবেন…(তাদের মাঝে তিনি উল্লেখ করেন)…এমন দুই ব্যক্তি, যারা একে-অপরকে ভালোবেসেছে একমাত্র আল্লাহর জন্য—তারা একত্রিত বা পৃথক হয়েছে তারই উদ্দেশ্যে, তারই নিমিত্তে।[10]

৬। আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্যে ভালোবাসার কতিপয় অধিকারসমূহ :—

(ক) প্রয়োজনের সময় সহায়তার জন্য পাশে দাঁড়ানো। যেমন হাদিসে এসেছে:

خير الناس أنفعهم للناس.

যে মানুষের সর্বাধিক উপকারে আসে, সে-ই তাদের মাঝে সর্বোত্তম।[11]

(খ) স্বীয় মুসলিম ভাই-এর দোষচর্চা থেকে নীরব থাকা। তার ভুল-ত্রুটিকে কোন না কোন অজুহাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা। তুমি যেরূপ তোমার দোষ-ত্রুটিকে ঢেকে রাখা পছন্দ কর, তার জন্যেও তা পছন্দ করবে।

(গ) তোমার দ্বীনি ভাই আল্লাহ কর্তৃক কোন নেয়ামত প্রাপ্ত হলে তুমি তার প্রতি কিছুতেই হিংসা-বিদ্বেষ ও পরশ্রীকাতরতায় আক্রান্ত হবে না।

(ঘ) তোমার সে ভাই জীবিত হোক কিংবা মৃত, তার জন্য তার অনুপস্থিতিতে দোয়া করা। কারণ, এরূপ দোয়া আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় এবং প্রার্থনাকারীও তার অনুরূপ দয়াপ্রাপ্ত হয়।

(ঙ) মুসলিম ভাইকে অভিবাদন ও সালাম দানে অগ্রণী থাকা। তার অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেওয়া, বা জিজ্ঞাসাবাদ করা এবং তার প্রতি অহংকার ও প্রতারণামূলক আচার-আচরণ মোটেও না করা।

(চ) যে কোন মুসলিম ভাইয়ের শুভাকাঙ্ক্ষী হওয়া।

কুফরি আল্লাহর নিকট একটি জঘন্য বিষয়। কাজেই মোমিনের নিকট জ্বলন্ত অগ্নিতে নিপতিত হওয়া যত অপছন্দনীয়, তার কাছে কুফরি শুধু ততটা অপছন্দনীয়—তাই নয়, বরং তার চেয়েও তীব্রতর ও অশুভ হওয়া একান্ত কাম্য। অনুরূপভাবে, কাফের আল্লাহর নিকট ঘৃণিত, তাই ঈমানদার ব্যক্তিকেও তাকে সেই কুফরির জন্য—যা জাহান্নামের দিকে ধাবিত করে নিক্ষিপ্ত করে তাতে—ঘৃণা করা একান্তভাবে জরুরি।

বস্ত্তত: কাফেরদের সঙ্গ অবলম্বন ও মৈত্রী আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টির কারণ। কাফেরদের সঙ্গে আন্তরিকতাপূর্ণ মৈত্রীর নানাবিধ ধরন বা বিবিধ পদ্ধতি রয়েছে। যথা : তাদের ভালোবাসা, মোমিনদের বিরুদ্ধে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা। তাদের খোশামোদ-তোষামোদপূর্ণ সঙ্গ ও বন্ধুত্ব অবলম্বনে আষ্ঠে-পৃষ্ঠে জড়িত হওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন—

لَا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً .

ঈমানদারগণ মোমিন ব্যতীত কোন কাফেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে না। যারা এরূপ করে আল্লাহর সাথে তাদের কোন সম্পর্ক থাকবে না। তবে তোমরা যদি তাদের পক্ষ থেকে কোন অনিষ্টের আশঙ্কা কর (তবে তাদের সঙ্গে সাবধানতার সাথে থাকবে)।[12]

তথ্যসূত্র:

[1] বোখারি- ১৬, মুসলিম-৪৩।

[2] আল-ইসাবা ফি তামঈযিস সাহাবা

[3] যাদুদ দায়িয়াহ : ৮

[4] ইবরাহীম : ২৪

[5] যাদুদ দায়িয়াহ :

[6] বোখারি : ৫৫৮১

[7] বোখারি- ৬৬৩২

[8] বোখারি-১৫, মুসলিম-৪৫

[9] আল- ইমরান: ৩১

[10] বোখারি ও মুসলিম

[11] তাবারানী, হাদিসটি হাসান

[12] আলে-ইমরান, ২৮

মতামত দিন