সলাত

স্বলাতে মুবাশ্‌শির (পর্ব ১৪)

রচনায় : আব্দুল হামীদ ফাইযী

মসজিদ ও নামায পড়ার জায়গা সম্পর্কিত

মহানবী (সাঃ) বলেন, “—আর সারা পৃথিবীকে আমার জন্য মসজিদ (নামাযের জায়গা) এবং পবিত্রতার উপকরণ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং আমার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তির নিকট যে কোন স্থানে নামাযের সময় এসে উপস্থিত হবে , সে যেন সেখানেই নামায পড়ে নেয়।” (বুখারী ৪৩৮নং, মুসলিম প্রমুখ)

কবরস্থান ও গোসলখানা ছাড়া সারা পৃথিবীর (সমস্ত জায়গাই) মসজিদ (নামায ও সিজদার স্থান)। (আবূদাঊদ, সুনান, তিরমিযী, সুনান, দারেমী, সুনান, মিশকাত ৭৩৭নং)

একদা আবূ যার (রাঃ) মহানবী (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন, পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কোন্‌ মসজিদ স্থাপিত হয়? উত্তরে তিনি বললেন, “হারাম (কা’বার) মসজিদ।” আবূ যার বললেন, তারপর কোন্‌টি? তিনি বললেন, “তারপর মসজিদুল আকসা।” আবূ যার বললেন, দুই মসজিদ স্থাপনের মাঝে ব্যবধান কত ছিল? তিনি বললেন, “চল্লিশ বছর। আর শোন, সারা পৃথিবী তোমার জন্য মসজিদ। সুতরাং যেখানেই নামাযের সময় এসে উপস্থিত হবে, সেখানেই নামায পড়ে নেবে।” (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ৭৫৩নং)

নির্মিত গৃহ্‌ মসজিদ ছাড়া অন্য স্থানেও নামায পড়ার বৈধতা উম্মতে মুহাম্মাদিয়ার জন্য এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

মসজিদের মাহাত্ম

মহান আল্লাহ বলেন, وأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلّه অর্থাৎ, আর মসজিদসমূহ আল্লাহর। (সূরা আল-জিন আয়াত নং-১৮)

মহানবী (সাঃ) বলেন, “আল্লাহর নিকট পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠতম স্থান হল মসজিদ এবং সবচেয়ে নিকৃষ্টতম স্থান হল বাজার।” (মুসলিম,  মিশকাত ৬৯৬নং)

মাহাত্মপূর্ণ চারটি মসজিদ

মহানবী (সাঃ) বলেন, “তিনটি মসজিদ ছাড়া আর কোন স্থান যিয়ারতের জন্য সফর করা যাবে না; মসজিদুল হারাম, মসজিদুল আকসা ও আমার এই মসজিদ (নববী)।” (বুখারী,মুসলিম, সহীহ মিশকাত ৬৯৩)

তিনি বলেন, “মসজিদুল হারাম ছাড়া অন্যান্য মসজিদের তুলনায় আমার এই মসজিদে (নববীতে) একটি নামায হাজার নামায অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।” (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ৬৯২নং)

“আর অন্যান্য মসজিদের তুলনায় মসজিদুল হারামের একটি নামায এক লক্ষ নামায অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।” (আহমাদ, মুসনাদ, বায়হাকী, জামে ৩৮৩৮, ৩৮৪১ নং)

প্রকাশ যে, এই ফযীলত মহিলাদের জন্য নয়। কারণ, তাদের জন্য স্বগৃহে নামায পড়াই উত্তম। যেমন নফল বা সুন্নত নামাযেও উক্ত সওয়াব নেই, কেননা, সুন্নত বা নফল নামায ঘরে পড়াই আফযল। অথবা মক্কা ও মদীনার মহিলাদের জন্য তাদের স্বগৃহে এবং ঐ স্থানদ্বয়ে সুন্নত ও নফল নামায ঘরে পড়ার ফযীলত আরো অধিক। অল্লাহু আ’লাম।

মসজিদে নববীর একটি বিশেষ জায়গার কথা উল্লেখ করে মহানবী বলেন, “আমার গৃহ্‌ ও (আমার মসজিদের) মিম্বরের মাঝে বেহেশ্তের এক বাগান রয়েছে। আর আমার মিম্বর রয়েছে আমার হওযের উপর।” (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ৬৯৪নং)

কুবার মসজিদ সম্বন্ধে মহানবী (সাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি স্বগৃহে ওযু বানিয়ে কুবার মসজিদে এসে কোন নামায পড়ে, তার একটি উমরাহ্‌ করার সমান সওয়াব লাভ হয়।” (আহমাদ, মুসনাদ, নাসাঈ, সুনান,হাকেম, মুস্তাদরাক, বায়হাকী, জামে ৬১৫৪ নং)

প্রথম কিবলা মসজিদুল আকসায় নামায পড়লে ৫০০ বা ১০০০ নামাযের সওয়াবের কথা কোন সহীহ হাদীসে আসে নি। (তামামুল মিন্নাহ্‌, আলবানী ২৯৩-২৯৪পৃ:) অবশ্য এক বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, হযরত সুলাইমান (আঃ) যখন ঐ মসজিদ নির্মাণ শেষ করেছিলেন, তখন আল্লাহর নিকট দুআ করেছিলেন যে, যে ব্যক্তি কেবলমাত্র নামাযের উদ্দেশ্যেই ঐ মসজিদে উপস্থিত হবে, সে ব্যক্তি যেন ঐ দিনকার মত নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে, যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছিল। (নাসাঈ, সুনান ৬৬৯, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান ১৪০৮ নং)

আর এক বর্ণনা মতে তাতে ২৫০ নামাযের সওয়াব আছে। মহানবী (সাঃ) বলেন, “বায়তুল মাকদিস অপেক্ষা আমার এই মসজিদে নামায চারগুণ উত্তম। আর তা হল শ্রেষ্ঠ নামাযের স্থান।” (হাকেম, মুস্তাদরাক ৪/৫০৯, বায়হাকী শুআবুল ঈমান, ত্বা, সিলসিলাহ সহীহাহ, আলবানী ৬/২/৯৫৪)

মসজিদ নির্মাণের ফযীলত

আল্লাহর নবী (সাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর (সন্তুষ্টি লাভের) উদ্দেশ্যে একটি মসজিদ নির্মাণ করে দেয়, আল্লাহ তার জন্য বেহেশ্তে একটি ঘর বানিয়ে দেন।” (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ৬৯৭নং)

“যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পাখির বাসার মত অথবা তার চেয়েও ছোট আকারের একটি মসজিদ বানিয়ে দেয়, আল্লাহ তার জন্য বেহেশ্তে একটি গৃহ্‌ নির্মাণ করে দেন।” (ইবনে মাজাহ্‌, সুনান, জামে ৬১২৮ নং)

“যে ব্যক্তি তিতির পাখীর (পোকামাকড় খোঁজার উদ্দেশ্যে) আঁচড়ানো স্থান পরিমাণ আয়তনের অথবা তদপেক্ষা ছোট আকারের মসজিদ নির্মাণ করবে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি গৃহ্‌ নির্মাণ করবেন।” (ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ, সহিহ তারগিব ২৬৫নং)

আর মহান আল্লাহ বলেন,

في بُيُوْتٍ أَذِنَ اللهُ أَنْ تُرْفَعَ وَيُذْكَرَ فِيْهَا اسْمُهُ يُسَبِّحُ لَهُ فِيْهَا بِالْغُدُوِّ وَالآصَال رِجَالٌ لاَّ تُلْهِيْهُمْ تِجَارَةً وَّلاَ بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللهِ وَإِقَامِ الصَّلاَةِ وَإِيْتَاءِ الزَّكَاةِ يَخَافُوْنَ يَوْماً تَتَقَلَّبُ فِيْهِ الْقُلُوْبُ وَالأَبْصَار

অর্থাৎ, আল্লাহ যে সব গৃহ্‌কে (মর্যাদায়) উন্নীত করার এবং সেগুলোতে তাঁর নাম স্মরণ করার আদেশ দিয়েছেন, সেখানে সকাল-সন্ধায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এমন লোকেরা; যাদেরকে ব্যবসা-বানিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ, নামায কায়েম এবং যাকাত প্রদান করা হতে বিরত রাখে না। তারা ভয় করে সেই দিনকে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ ভীতি-বিহ্বল হয়ে পড়বে। (কুরআন মাজীদ ২৪/৩৬-৩৭)

মসজিদে যাওয়ার মাহাত্ম

প্রিয় নবী (সাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি সকাল অথবা সন্ধ্যায় মসজিদে যায়, তার জন্য আল্লাহ মেহ্‌মানীর উপকরণ প্রস্তুত করেন। যখনই সে সেখানে যায়, তখনই তার জন্য ঐ মেহ্‌মানীর উপকরণ প্রস্তুত করা হয়।” (বুখারী ৬৬২, মুসলিম, সহীহ ৬৬৯নং)

আল্লাহর রসূল (সাঃ) বলেন, “পুরুষের স্বগৃহে বা তার ব্যবসাক্ষেত্রে নামায পড়ার চেয়ে (মসজিদে) জামাআতে শামিল হয়ে  নামায পড়ার সওয়াব পঁচিশ গুণ বেশি। কেননা, সে যখন সুন্দরভাবে ওযু করে কেবল মাত্র নামায পড়ার উদ্দেশ্যেই মসজিদের পথে বের হয় তখন চলামাত্র প্রত্যেক পদক্ষেপের বিনিময়ে তাকে এক-একটি মর্যাদায় উন্নীত করা হয় এবং তার এক-একটি গুনাহ মোচন করা হয়। অতঃপর নামায আদায় সম্পন্ন করে যতক্ষণ সে নামাযের স্থানে বসে থাকে ততক্ষণ ফিরিশতাবর্গ তার জন্য দুআ করতে থাকে; ‘হে আল্লাহ  ওর প্রতি করুণা বর্ষণ কর। হে আল্লাহ! ওকে ক্ষমা কর। আর সে ব্যক্তি যতক্ষণ নামাযের অপেক্ষা করে ততক্ষণ যেন নামাযের অবস্থাতেই থাকে।” (বুখারী ৬৪৭নং, মুসলিম, সহীহ ৬৪৯নং, আবূদাঊদ, সুনান, তিরমিযী, সুনান, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান)

তিনি বলেন, “অন্ধকারে অধিকাধিক মসজিদের পথে যাতায়াতকারীদেরকে কিয়ামত দিবসের পরিপূর্ণ জ্যোতির সুসংবাদ দাও।” (আবূদাঊদ, সুনান, তিরমিযী, সুনান, সহিহ তারগিব ৩১০নং)

তিনি আরো বলেন “যে ব্যক্তি কোন ফরয নামায আদায়ের উদ্দেশ্যে স্বগৃহে থেকে ওযু করে (মসজিদের দিকে) বের হয় সেই ব্যক্তির সওয়াব হয় ইহ্‌রাম বাঁধাহাজীর ন্যায়। আর যে ব্যক্তি কেবলমা­ত্র চাশতের নামায পড়ার উদ্দেশ্যেই বের হয়, তার সওয়াব হয় উমরাকারীর সমান। এক নামাযের পর অপর নামায; যে দুয়ের মাঝে কোন অসার (পার্থিব) ক্রিয়াকলাপ না থাকে তা এমন আমল যা  ইল্লিয়্যীনে (সৎলোকের সৎকর্মাদি লিপিবদ্ধ করার নিবন্ধ গ্রন্থে) লিপিবদ্ধ করা হয়।” (আবূদাঊদ, সুনান, সহিহ তারগিব ৩১৫নং)

“তিন ব্যক্তি আল্লাহর যামানতে; এদের মধ্যে একজন হল সেই ব্যক্তি যে মসজিদে যায়। মরণ পর্যন্ত সে আল্লাহর যামানতে থাকে। অতঃপর তিনি তাকে বেহেশ্তে প্রবেশ করান। অথবা তাকে তার প্রাপ্ত সওয়াব ও নেকীর সাথে (তার বাড়ি) ফিরিয়ে দেন।” (আবূদাঊদ, সুনান, মিশকাত ৭২৭নং)

“নামাযে সওয়াবের দিক থেকে সবচেয়ে বড় সেই ব্যক্তি, যার (বাড়ি থেকে মসজিদের দিকে) চলার পথ সবচেয়ে দূরের।” (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ৬৯৯নং)

মসজিদে নববীর আশেপাশে কিছু জায়গা খালি পড়েছিল। বনী সালেমাহ্‌ মসজিদের পাশে (ঐ খালি জায়গায়) ঘর বানাবার ইচ্ছা করল। এ খবর আল্লাহর রসূল (সাঃ) এর নিকট পৌঁছলে তিনি তাদেরকে বললেন, “আমি শুনলাম যে, তোমরা তোমাদের পূর্বের ঘর-বাড়ি ছেড়ে মসজিদের পাশে এসে বসবাস করতে চাচ্ছ।” তারা বলল, ‘হ্যাঁ, হে আল্লাহর রসূল! এ রকমই ইচ্ছা আমরা করেছি।’ তিনি বললেন, “হে বনী সালেমাহ্‌! তোমরা তোমাদের ঐ বাড়িতেই থাক। (দূর হলেও, মসজিদ আসার ফলে) তোমাদের পায়ের চিহ্ন (তোমাদের নেকীর খাতায়) লিপিবদ্ধ করা হবে।” এরুপ তিনি দু’বার বললেন। (মুসলিম,  মিশকাত ৭০০নং)

মতামত দিন