বিজ্ঞান ও ইসলাম

রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে ইবনে সীনার অবদান

রসায়ন ও পদার্থ শাস্ত্রে ইবনে সীনা’র অবদান

মূল লিখা : Muslim’s Contribution to Science and Technology, Islamic Foundation, Bangladesh

অনুবাদ : নাহিদ হাসানআনোয়ার সাদাত

অনুলিখন : শাহাদাত হুসাইন

সম্পাদনা : সম্পাদনা পরিষদ

ইসলামের শ্রেষ্ঠ চার বিজ্ঞানীদের মধ্যে ইবনে সীনা একজন। ল্যাটিন ইউরোপে তিনি ‘অ্যাভিসেনা’ (Avicenna) পরিচিত। তাঁর পুরো নাম হলো আল শাইখ আল বাইম আবূ আলী আল হোসেইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবন সিনা আল বুখারী। তিনি ৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে বুখারার নিক আফশানাতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১০৩৭ খ্রিষ্টাব্দে ইসফাহানে মৃত্যুবরণ করেন। ইবনে সীনা ছিলে সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানীদের একজন। তাঁর চিকিত্সাশাস্ত্রে অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, প্রায় আঠারো শতকের শেষ পর্যন্ত প্রায় ৭০০ বছর ধরে তাঁর লিখিত বইগুলো অক্সফোর্ড, কেমব্রিজসহ ইউরোপের নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে  গুরুত্বসহকারে পড়ানো হত। তিনি তখন ছোট তার বাবা মা বুখারায় চলে আসেন, বলাবাহুল্য তখন বুখারা ছিল শিফা এবং সংস্কৃতির মূলকেন্দ্র।

ইবনে সীনার মেধা ছোটকাল থেকেই সবার নজরে আসে এবং তাঁকে তখনকার সময়ের বিস্ময় হিসেবে ধরা হয়। তিনি মূলত চিকিত্সাবিজ্ঞানে আগ্রহী ছিলেন। তিনি চিকিত্সাশাস্ত্রের উপরে প্রচুর লেখালেখি করেছেন। তবে শুধুমাত্রই চিকিত্সাশাস্ত্রেই নয় বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায়ও তার পদচারণা ছিল উল্লেখযোগ্য। “Canon of Medicine” ( Al Qanun Fi Al Tibb ) এবং “The book of cure” ( Kitab al Shifa ) এই দুইটি অবিস্মরণীয় বইয়ের লেখক তিনি।

ইবনে সীনা আলকেমীর বিরোধী ছিলেন। বলে রাখা ভাল যে, আলকেমী ছিল সমকালীন এক শাস্ত্র যে শাস্ত্রে বিভিন্ন ধাতুকে সোনায় রুপান্তরিত করার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। ইবনে সীনা বিশ্বাস করতেন যে বিভিন্ন ধাতুর বিভিন্ন বাহ্যিক রূপের কারণ হল তাদের অভ্যন্তরীণগঠন। ভারতের প্রাক্তন নবাব লাইব্রেরীতে ( রামপুরে অবস্থিত) আলকেমীর উপর  তাঁর একটি পান্ডুলিপি আছে। কিন্তু দু:খজনকভাবে তের শতকের ইবনে আবি উসাইবিয়া এই পান্ডুলিপির কথা উল্লেখ করেন নি। ইবনে সীনা ছিলেন আবু বকর আল বারিকির ছাত্র, ১০০৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি একটি বই তাঁর শিক্ষককে উত্সর্গ করেন। বইটিতে মোট ১৩টি অধ্যায় আছে এই বইয়ে। রসায়নশাস্ত্র ( আলকেমী ) সম্পর্কিত তার ধারণা গুলো এই বইয়ে স্থান পেয়েছে। ইবনে সীনার মতে, ধাতুসমূহের পরস্পর রুপান্তরকরণ সম্ভব নয়, কেননা এরা মূলত বিভিন্ন। মনে হয়, তিনি যেন ধাতুর রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী ছিলেন না। তার প্রবন্ধ “মা দুনিয়াত” ( খনিজ পদার্থসমূহ) ১৩শ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপে ভূতত্ত্ব বিষয়ে ধ্যান-ধারণার একমাত্র উত্স ছিলো । তার “Treaties of Minerals” আরেকটি উল্লেখযোগ্য অবদান।

ইবনে সীনা তাঁর বইগুলোতে বিভিন্ন ঔষধ প্রস্তুতির বর্ণনা করেছেন। যেমন সালফার ঔষধ, সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড দ্রবণ, ক্যালসিয়াম পলিসালফাইড, কপার ও সোনার ভস্মীকরণ, সালফারের তলকীকরণ, সাদা সালফারের প্রস্তুতি প্রভৃতি।

ইংরেজীতে এই প্রস্তুতি সম্পর্কে বলা হয়েছে:

The preparation of “Elixir” from Sulfar most probably refers to the formation of acid of sulphur since it has mentioned that with careful concentration of the product, its activity of highly increased.

ইবনে সীনা তাঁর সময়ে “ব্যবহারিক রসায়ন” নামে একটি বইও রচনা করেন। বিজ্ঞানে তাঁর পূর্নাঙ্গ অবদান চিকিত্সাশাস্ত্রে ।  চিকিত্সাশাস্ত্রে অবদান বিষয়ক প্রবন্ধে উল্লেখ করা হবে ইনশাআল্লাহ।

 

পদার্থ বিজ্ঞানে ইবনে সীনার অবদান 

ইবনে সীনাকে চিকিত্সা শাস্ত্রে অবদানের জন্য পরিচিত হলেও তার বিভিন্ন বিষয়ে প্রবল আগ্রহ ছিলো এবং এটা আশ্চর্যজনক যে, খুব কম সংখ্যক লোকই জানে যে ইবনে সীনা জড়তা সম্পর্কে যে ধারণা দিয়েছিলেন তা নিউটেনের জড়তার ধারণা থেকে কম নয়। ইবনে সীনা তার বই “আল-কিতাব আল নাজাতে” লিখেছিলেন, “কেউ নিজে নিজে নড়াচড়া বা নিজে নিজে স্থির হতে পারেনা” যা জড়তার মূলনীতির একটি পরিষ্কার ব্যাখ্যা। তিনি আরো লিখেছিলেন যে, বলকে কেবলমাত্র তার ফলাফল দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায়।

এই উক্তিরই ব্যাখ্যা হলো নিউটনের F=ma যা নিউটনের গতির সূত্র নামে পরিচিত। এটা জানা যায় যে, কোন বস্তুর ভর এর জড়তার পরিমাপক এবং বল এর সাপেক্ষ ছাড়া বস্তুর ভর অর্থহীন।

এই বলই যার উপর কাজ করে তাতে ত্বরণ সৃষ্টি করে। সুতরাং কোন বস্তুর ভর কেবলমাত্র তার উপর প্রযুক্ত বলের মাধ্যমে নির্ণয় করা যায়।

সর্বোপরি যদি ইবনে সীনার বক্তব্যগুলো এক সাথে দেখা যায় তাহলে বুঝা যায় যে তিনিই ছিলেন গতিসূত্রের ধারণাদাতা যা পরবর্তীতে নিউটনের গতিসূত্রের স্বীকার্যনামে পরিচিতি লাভ করে। ইবনে সীনা আরো বলেন যে, কোন একটি সরল যন্ত্রে ক্ষমতা হিসেবে যা পাওয়া যায় তা হলো হারানো গতির সমান যা বর্তমানে শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি হিসেবে পরিচিত।

J.J. Winter পরে “On Physical and Chemical Questions”-এ বলেন, ইবনে সীনার দৃষ্টিভঙ্গিতে তার সময়ের অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। উদাহরণস্বরুপ, তিনি আলোকে উজ্জ্বল কণার উতসের নি:সরণ হিসেবে বিবেচনা করেন যা একটি নির্দিষ্ট বেগে ভ্রমণ করে। তিনি Specific Gravity এর উপর অনুসন্ধান করেন। তিনি বলেন, আলোক অনুভূতির কারণ যদি আলোক কেন্দ্র হতে আলোক কণা বিচ্ছুরণ হেতু হয় আলোকের গতি সসীম থাকবে। তিনি নির্দিষ্ট ওজনেরও আলোচনা করেছেন।

“তিসআ রিসালা ফি হিকমাতি ওয়াত তারয়িয়াহ” নামক গ্রন্থে তিনি পদার্থবদ্যিা বিষয়ক বিভিন্ন সমস্যার পৃথক পৃথক আলোচনা করেছেন।

ইবনে সীনার নিকট পদার্থবিদ্যা একটি চিন্তামূলক শিল্প। যার দ্বিবিধ বিষয়বস্তু আছে।

1. বাস্তবে স্থিত বস্তুসমূহ

2. এবং ধারণাগত বস্তুসমূহ

পদার্থবিদ্যায় তিনি গতি, মিলন, শক্তি, শূণ্যতা, অসীমতা, আলোক ও উত্তাপ সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন। তিনি গবেষণা করে গেছেন : আপেক্ষিক গুরুত্ব নিয়ে। তিনি ব্যবহার করেছিলেন একটি ‘এয়ার থার্মোমিটার” বা “বায়ু থার্মোমিটার” । ইবনে সীনা ভার্ণিয়ার স্কেলের মত একটি স্কেল উদ্ভাবন করেন যা দিয়ে ক্ষুদ্রাক্ষুদ্র অংশ পরিমাপ করা যেত।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে ইবনে সীনার অবদান

পর্যবেক্ষণ বিশুদ্ধ করতে হলে বিশুদ্ধভাবে গণনা উপযোগী যন্ত্রপাতির প্রয়োজন। জ্যোতির্বিজ্ঞান আলোচনা করতে গিয়ে বিশুদ্ধতর গণনা করার উপযোগী যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের চিন্তাই ইবনে সীনাকে প্রথমে পেযে বসে। এই বিদ্যার প্রতি তার এতই অনুরাগ ছিলো যে, শেষ বয়সে তিনি গতিশীল পরিমাপ যন্ত্রেরও ন্যায় ( Vernier) সূক্ষ্ণ গণনা করার উপযোগী একটি যন্ত্রও আবিষ্কার করেন। এর মাধ্যমে যেন যান্ত্রিক সংযোজন নিখুঁতভাবে হয়ে থাকে। এ শাস্ত্রে ইবনে সীনার প্রর্ভতি জ্ঞান ছিলো। তিনি কয়েকটি জ্যোতিষ্ক-বিক্ষণাগার স্থাপন ছাড়াও হামাদানে কয়েকটি মানমন্দির নির্মান করেছিলেন।

গণিতশাস্ত্রেও তাঁর অবদান ছিলো। “Casting out of nines”-এর ব্যাখ্যা দেন তিনি।

 

* বইটির অনেক লেখা ” বিশ্বসেরা মুসলিম বিজ্ঞানী” বই থেকে নিয়ে সম্পাদনা করা হয়েছে *

ইবনে সীনা সম্পর্কে ঈষত ধারণা পেতে এই দুইটি জীবনী ডাউনলোড করুন।

ইবনে সীনার জীবনী

ইবনে সীনা

ইবনে সীনা চিকিত্সাশাস্ত্রের জনক

 

আপনাদের মধ্যে যারা ইংরেজী থেকে ছোট ছোট আর্টিকেল অনুবাদ করতে চান তারা আমাদের ফেসবুক পেজে জানাতে পারেন।

টাইপ করে না দিলেও হবে। হাতে লিখে দিলেই চলবে।

 

আমাদের ফেসবুক পেজ

 

মতামত দিন