বিজ্ঞান ও ইসলাম

হ্যালীর ধূমকেতু

নাম হ্যালীর ধূমকেতু হলেও ব্রিটিশ বিজ্ঞানী এডমণ্ড হ্যালী সর্বপ্রথম এটা আবিষ্কার করেননি। তাহলে এটাকে হ্যালীর ধূমকেতু কেন বলা হয়? জানতে হলে একটু পিছে ফিরতে হবে।

১৬৮৭ সালে স্যার আইজাক নিউটন একটি বই লিখেন। নাম ‘Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica’। এই বইটিতে নিউটন গ্রহ-নক্ষত্রের গতিপথের ব্যাখ্যা দেন। তার আগে কেপলার কিছুটা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তবে কেপলার ‘Empirical Formula’ ব্যবহার করেছিলেন। সহজ ভাষায় ‘Empirical Formula’ বলতে থিওরীটিকাল বেসিস ছাড়াই শুধু ডাটা এনালাইসিস করে কোন কিছুর ফর্মূলা দেয়াকে বোঝায়। আমরা যারা ইঞ্জিনিয়ারিং লাইনে পড়ি, তারা অবশ্য Empirical Formula বলতে এমন কিছুকে বুঝি যেটা বইতে লেখা দেখলেই ঠাডা মুখস্থ করে যেতে হবে। বোঝার চেষ্টা করে লাভ নেই।

নিউটন Empirical Formula এর গোলকধাঁধা থেকে আমাদের বের করে আনেন। সর্বজনীন মহাকর্ষীয় সূত্র দেন। যদিও তিনি ধূমকেতুর গতিপথ নিয়ে খুব বেশী লিখতে পারেননি। পরবর্তীতে তার বন্ধু এডমণ্ড হ্যালী নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র ব্যবহার করেই ধূমকেতু নিয়ে সকল রহস্য ভেদ করেন। তার ‘Synopsis of the Astronomy of Comets’- এ তিনি বলেন যে, ১৫৩১ সালে পেট্রাস এপিয়ানাস আর ১৬০৭ সালে জোহানস ক্যাপলার যে ধূমকেতুর কথা বলে গিয়েছিলেন দুটি আসলে একই ধূমকেতু। ইতিহাস আরেকটু ঘেঁটে দেখা গেল, খ্রিষ্টপূর্ব ২৪০ সাল থেকেই এই ধূমকেতুটি প্রতি ৭৪-৭৯ বছরের ব্যবধানে একবার করে পৃথিবীতে দেখা যাচ্ছে। হ্যালী সেখান থেকে নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র ব্যবহার করে ভবিষ্যৎবাণী করেন যে, ১৫৩১, ১৬০৭ এবং ১৬৮২ সালের পর আবার ৭৬ বছর পর অর্থাৎ ১৭৫৮ সালে ধূমকেতুটি দেখা যাবে।

হ্যালীর প্রফেসী অনেকেই বিশ্বাস করেনি। তাদের কাছে ধূমকেতু মানেই অতিপ্রাকৃত কিছু ছিল। তারা বিশ্বাস করতো, এই ধূমকেতুর কাছে আমাদের কল্যাণ-অকল্যাণের ক্ষমতা রয়েছে। শেক্সপীয়ার ১৬০০ সালের দিকে লিখেন খুব জনপ্রিয় একটি নাটক ‘Julius Caesar’। সেখানে খুব বিখ্যাত একটি ডায়লগ রয়েছেঃ “When beggars die there are no comets seen; The heavens themselves blaze forth the death of princes.” অর্থাৎ,

“ফকিরের মৃত্যুতে কভু ধূমকেতু নাহি দেখা যায়,

রাজপুত্রের মৃত্যুতে আকাশ নিজ হইতে বিজলী ছড়ায়।”

সাহিত্যিকদের বলা হয় সমাজের দর্পণ। আমরা যেমন শরৎচন্দ্রের “বিলাসী” পড়ে সেসময়কার হিন্দুদের শ্রেণীবৈষম্য দেখতে পাই আবার ‘The Diary of Anne Frank ” কিংবা Jhon Byne এর লেখা ‘The Boy in the Striped Pyjamas’ পড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকার কিছুটা আঁচ আমাদের শরীরেও লাগে। একইভাবে শেক্সপীয়ারের সেই নাটক আমাদের জানিয়ে দেয় মাত্র ৪০০ বছর আগেও যাদেরকে আধুনিক পৃথিবীর রূপকার বলা হয় তারা কতোটা কুসংস্কারের মধ্যে ছিল। ১৪০০ বছর আগের একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে। রাসূল (সা) এর একমাত্র যে ছেলেটা জীবিত ছিল সেই ইব্রাহীমও (রা) মারা গেল। মদিনাবাসী প্রচণ্ড বিষন্ন। হঠাৎ সূর্যগ্রহণ হলো। সবাই বলাবলি করা শুরু করল, “ইব্রাহীমের মৃত্যুর কারণে সূর্যগ্রহণ হয়েছে।” রাসূল (সা) যদি সত্যিই ভণ্ড নবী হতেন তবে তার জন্য এটা খুব সুবর্ণ সুযোগ ছিল। উনি বলতে পারতেন, “আমি আল্লাহ্‌র নবী! আমার ছেলের মৃত্যুতে যদি সূর্যগ্রহণ না হয়, তবে কার মৃত্যুতে হবে?” কিন্তু তিনি এই কুসংস্কারকে চিরতরে বিনষ্ট করে বললেন, “সূর্য ও চন্দ্র মহান আল্লাহ্‌র দু‘টি নিদর্শন। কারো মৃত্যুর কারণে এগুলোর গ্রহণ হয় না।” [সহীহ মুসলিম, হাদিস নংঃ৯১৪]

ছিলাম চারশো বছর পিছনে, চলে গিয়েছি চৌদ্দশ বছর পিছনে! অনেকেই বলবে-“সব মোল্লারাই খারাপ, সবাইকে চৌদ্দশ বছর পিছনে নিয়ে যেতে চায়, সবখানে ধর্ম ঢুকায়। পাকিস্তান চলে যান!”

পাকিস্তান না যেয়ে হ্যালীর ধূমকেতুতেই ফিরে যাই। হ্যালীর ভবিষ্যৎবাণী অনুযায়ী এটাকে ঠিকই ৭৬ বছর পর ১৭৫৮ সালে আবার পৃথিবীর আকাশে দেখা যায়। যদিও হ্যালী তার প্রফেসীর সত্যতা নিজ চোখে দেখে যেতে পারেননি। তিনি ১৭৪২ সালে মারা যান। একজন মানুষের পক্ষে বর্তমান সময়ে দুইবার হ্যালীর ধূমকেতুকে দেখতে পারা বিরাট সৌভাগ্যের ব্যাপার। সাহিত্যিক মার্ক টোয়েন এমন আশা করেছিলেন। তিনি ১৮৩৫ সালে একবার হ্যালীর ধূমকেতুকে দেখেছিলেন। তারা খুব ইচ্ছা ছিল ১৯১০ সালে আবার একে দেখবেন। কিন্তু দেখে যেতে পারেননি। তিনি মারা যান ২১ শে এপ্রিল, ১৯১০ সালে। তার মৃত্যুর ঠিক একদিন পর আবার পৃথিবীর আকাশকে আলো করে দেখা দেয় হ্যালীর ধূমকেতু।

শেষবার হ্যালীর ধূমকেতু দেখা গিয়েছিল ১৯৮৬ সালে। আমার জন্মের প্রায় ৮ বছর আগে। এরপর দেখা যাবে আবার ২০৬১ সালে। হয়তো তখন এই পৃথিবীতে থাকব না। আল্লাহ্‌ চাইলে যদি বেঁচেও থাকি, ৬৭ বছরের এক থুড়থুড়ে বুড়ো হয়ে যাব। হ্যালীর ধূমকেতু কি আমায় তখন খুব বেশী টানবে যতোটা এখন টানছে?

হ্যালীর ধূমকেতুর ইতিহাস পড়ে মন কিছুটা বিষন্ন হয়ে গিয়েছে। হাজার হাজার বছর হয়ে গিয়েছে যখন আমি ছিলাম না। ঘটে গিয়েছে অনেক কিছুই। আবার হাজার হাজার বছর হয়ে যাবে কিন্তু আমি থাকব না। আমার আগে ছিল অসীম সময়, পরেও থাকবে অসীম সময়। মাঝখানে ছোট্ট একটি বিন্দুর মতো রয়েছি আমি। গণিতের ভাষায় যাকে “অতি ক্ষুদ্র” বলে অগ্রাহ্য করা যায়।

সেই অগ্রাহ্যযোগ্য জীবনটাকে নিয়ে এতো মাতামাতি কিংবা অহংকারের কিছু আছে?

“সবকিছুই ধ্বংসশীল। একমাত্র আপনার মহিমাময় ও মহানুভব পালনকর্তার সত্তা ছাড়া। অতএব, তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?” (সূরা আর রাহমান(৫৫): ২৬-২৮)

লেখকঃ শিহাব আহমেদ তুহিন

#সত্যকথন

Original Source

মতামত দিন