বিজ্ঞান ও ইসলাম

আলোকবিজ্ঞানে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান

আলোকবিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান

পদার্থবিজ্ঞান (Physics) হচ্ছে পদার্থ ও তার গতির বিজ্ঞান। অত্যন্ত বিমূর্তভাবে বলতে গেলে, পদার্থবিজ্ঞান হল সেই বিজ্ঞান যার লক্ষ্য আমাদের চারপাশের বিশ্বকে বোঝার চেষ্টা করা। প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা মানুষের আদিমতম কাজের একটি, তবে তার আগে প্রকৃতি নিয়ে গবেষণার সাধারণ নাম ছিল প্রাকৃতিক দর্শন
(Natural Philosophy), যাকে ঠিক বিজ্ঞান বলা যায় না। মুসলমানরা পদার্থবিজ্ঞানের দুইটি শাখায় সবিশেষ আবিষ্কার রাখেন যার একটি সেই প্রাচীনকাল হতে চলে আসা জ্যোতির্বিজ্ঞান (Astronomy), আর অন্যটি একরকম মুসলমানদের হাতেই প্রথম শুরু হওয়া আলোকবিজ্ঞান (Optics)।

প্রথমেই আলোকবিজ্ঞান দিয়েই শুরু করা যাক আর সেক্ষেত্রে অবধারিতভাবে যাঁর নাম এসে যায় তিনি হলেন ইব্‌নুল হাইছাম (Ibn Al-Haytham)। তবে, উনারও দেড় শতক আগে এক্ষেত্রে পথ চলা শুরু করেন আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবন্‌ ইস্‌হাক আল-কিন্দি (أبو يوسف يعقوب إبن إسحاق الكندي; ৮০১-৮৭৩)। দর্শনে বিশ্বজোড়া অবদান রাখা এই দার্শনিকের চিকিৎসাবিজ্ঞানে অবদানের কথা আমরা আগেই জেনেছি। তিনিই সম্ভবতঃ আলো এবং এর পেছনের বিজ্ঞান সম্পর্কে মুসলমানদের আগ্রহী করে তোলেন। আলো সম্পর্কে অ্যারিস্টটল এবং ইউক্লিডের আপাত বিপরীতধর্মী ভূল মতবাদের মাঝে তিনি সামঞ্জস্য করেন। অ্যারিস্টটল বিশ্বাস করতো, দেখার জন্য চোখ আর বস্তুর মধ্যবর্তী স্বচ্ছ মাধ্যমটি আলোয় পরিপূর্ণ থাকতে হবে। অন্যদিকে, ইউক্লিড মনে করতো, চোখ হতে আলো গিয়ে কোন বস্তুর উপর পড়লেই দর্শন(View) সম্ভব। কিন্দী উনার ‘কিতাবুল সুয়াআত’(Book of the Rays) গ্রন্থে এর সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেন। এছাড়া, তিনি এসব ক্ষেত্রে পরীক্ষালব্ধ প্রমান ছাড়াই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীদের সমালোচনাও করেন। অ্যারিস্টটল এবং ইউক্লিডের মতবাদ যে বোকা বুঝানোর মতবাদ ছিলো তা তিনি প্রমান করেন।
কিন্দির পরে অন্যেরাও এ বিষয়ে কিছু কিছু কাজ করেন, যদিও সে সবের হদিস পাওয়া যায় না। এজন্য, সে সব কাজে মৌলিকতার অভাব এবং ইব্‌নুল হাইছামের আবির্ভাব- এ দু’টোকেই দায়ী করা যায়। এদের মাঝেও আলী ইবন্‌ সাহল রাব্‌বান আল-তাবারী (أبو سعد العلاء ابن سهل; ৯৪০-১০০০) উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। গোলীয় দর্পণ (Spherical Mirror) এবং লেন্সে (Lens) আলোর গতিপথের ব্যাপারে তাঁর কাজ রয়েছে। কিন্তু, তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হচ্ছে আলোর প্রতিসরণের দ্বিতীয় সূত্রের (Second Law of Refraction) আবিষ্কার। ৯৮৪ খৃষ্টাব্দে তিনি সূত্রটি প্রকাশ করেন। কিন্তু ৬০০বছর পর ১৬২১ খৃষ্টাব্দে ডাচ্‌ বিজ্ঞানী উইলব্রোর্ড স্নেলীয়াস্‌ (Willebrord Snellius; ১৫৮০-১৬২৬) এবং ১৬৩৭ খৃষ্টাব্দে ফরাসী বিজ্ঞানী রেনে দেকার্তে (René Descartes; ১৫৯৬-১৬৫০) কর্তৃক চুরি করা হয় এবং বর্তমানে বিজ্ঞানের জগতে মুসলমানদের আবিষ্কৃত সেই সূত্রকেই চুরি করে স্নেলের সূত্র (Snell’s Law) নামে পরিচিত ঘটানো হয়েছে!

আবু আলী আল্‌ হাসান ইবন্‌ আল হাসান ইবন্‌ আল হাইছাম (ابو علي، الحسن بن الحسن بن الهيثم; ৯৬৫-১০৩৯) ছিলেন দশম শতকের বিজ্ঞানের জগতের বড় বড় মহারথীদের একজন। তাঁরআবিষ্কার একাধারে চিকিৎসা, শারীরবিদ্যা, গণিত, প্রকৌশল, দর্শন ও মনস্তত্ত্বের মত বিষয়গুলোতে বিস্তৃত ছিল। কিন্তু, সব কিছু ছাড়িয়ে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে, আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে আলোকবিজ্ঞানে তাঁর অপরিসীম অবদানের জন্য অমর হয়ে আছেন।
মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানে যেমন ইবন সীনা, রসায়নে আল-রাজী, তেমনি এক্ষেত্রে ইবনুল হাইছাম।চোখের গঠন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আলোকবিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন নাকি আলোকবিজ্ঞানে কাজ করতে গিয়ে ইবনুল হাইছাম চোখের গঠন অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন, তা জনা যায় না। যতটুকু জানা যায় তা হচ্ছে, উনার এই অনুসন্ধিৎসায় চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং পদার্থবিজ্ঞান উভয়ই সমৃদ্ধ হয়েছে।
চোখের লেন্সের গঠনকে তিনি মসুরের ডালের সাথে তুলনা দেন, যার আরবী পরিভাষা ‘আদাসা’(عدسة)। ল্যাটিন অনুবাদে তা ‘Lenticulam’ হয়ে বর্তমানে ইংরেজীতে ‘Lens’ শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। আলো (Light) নিয়ে উনার অন্ততঃ ১১টি গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। উনার এসব গ্রন্থে আলো নিয়ে প্রকাশিত মৌলিক ধারনাগুলো আধুনিক আলোকবিজ্ঞানের মূল।


তিনিই আলোর সরলপথে গমনের (Straight Line Travelling) ব্যাপারে প্রথম ধারনা দেন। আলোর প্রতিফলন (Reflection) এবং প্রতিসরনের (Refraction) সূত্রসমূহ তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন। ‘রিসাতুল ফিশ্‌শফক’(Courses on Twilight) গ্রন্থে তিনি বায়ুমন্ডলের উর্ধ্বসীমা নির্ণয় করেন। ‘মালাকাতে ফি কাউস ফাজ্‌হিন ওয়াল হালাত’(Memior on the Rainbow and the Halo) গ্রন্থে আলোচিত হয়েছে রঙধনু, বস্তুর ছায়াপাত এবং ‘মাকালাতু ফিল মারাইয়াল মুহ্‌রিকা বিল কুতুওয়া’(Memoir on the Conical Burning Mirrors) গ্রন্থে তিনি আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরণ ও প্রতিবিম্বের স্বরূপ এবং এদের সমস্যাসমূহ আলোচনা করেছেন। কিন্তু, এতগুলো কাজের কোনটাই উনার মূল অবদান নয়! আলোকবিজ্ঞানে উনার অমরত্বের পেছনের দুইটি কারনের একটি হচ্ছে, চোখের দৃষ্টি সম্পর্কে তাঁর প্রস্তাবিত তাত্ত্বিক মতবাদ। এর আগের হাজার বছর ধরে বিজ্ঞানীদের মাঝে প্রচলিত ধারনার(এদের মাঝে অ্যারিস্টটল, টলেমী, ইউক্লিডের মত বিজ্ঞানীরাও ছিলেন) বিপরীতে এসে তিনিই প্রথম বলেন ‘বস্তু হতে আলো এসে আমাদের চোখে পড়লে, তবেই আমরা দেখতে পাই, অন্যথায় নয়।‘ এই মতবাদ আলো সম্পর্কে বিজ্ঞানের ধারাকেই উলটে দেয় এবং এটি আজও প্রতিষ্ঠিত সত্য। অথচ, ষোড়শ’ শতকের আগ্‌পর্যন্ত ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা হিংসাবশত একে গ্রহন করতে রাজিই ছিলো না!
ইবনুল হাইছামের দ্বিতীয় অমর আবিষ্কার উনার ৭ খন্ডে সমাপ্ত সুবিশাল গ্রন্থ কিতাবুল মানাযির (Kitāb al-Manāẓir;كتاب المناظر) যা পরবর্তীতে দ্বাদশ শতকের শেষে কিংবা ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে Opticae Thesaurus: Alhazeni Arabis নামে ল্যাটিনে অনূদিত হয়। এ গ্রন্থে তিনি উনার প্রস্তাবিত আলোর তত্ত্ব ছাড়াও অন্যান্য আলোকীয় ঘটনার (প্রতিসরণ, প্রতিফলন ইত্যাদি) পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছেন এবং গণিত ও জ্যামিতির সাহায্যে সে সব প্রমানের চেষ্টা করেছেন। এখানেই থেমে যান নি তিনি।
প্রতিটি আলোকীয় ঘটনা (Optical Phenomenon) প্রমানের জন্য তিনি যেসব পরীক্ষা চালিয়েছিলেন সেসবের বর্ণনাও তিনি এতে সংযোজিত করে দিয়েছেন। এর সাহায্যে তিনি যেন সকলকে বলতে চাইছেন, ‘আমার কথা বিশ্বাস না হলে নিজেই পরীক্ষা করে দেখ’। বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রমানে পরীক্ষামূলক প্রমান উপস্থাপনের এটাই সর্বপ্রথম উদাহরণ। এ কারনেই, এই গ্রন্থকে আইজাক নিউটনের (Isaac Newton) চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া গ্রন্থ ‘ফিলোসোফিয়া ন্যাচারালিস্‌ প্রিন্সিপিয়া ম্যাথ্‌মেটিকার’(Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica) সাথে একই সারিতে তুলনা করা হয় এবং ত্রয়োদশ শতক হতে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত ইউরোপের প্রায় সকল পদার্থবিজ্ঞানী (ফ্রান্সিস বেকন, রজার বেকন থেকে শুরু করে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, কেপ্‌লার, দেকার্তে পর্যন্ত) এই গ্রন্থের নিকট ঋনী বলে বলা হয়ে থাকে। এককথায় সবাই উনার থিউরী গুলোকেই বিনাদ্বিধায় মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে এবং উনার থিউরী থেকেই তারা তথা ফ্রান্সিস বেকন, রজার বেকন থেকে শুরু করে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, কেপ্‌লার, দেকার্তে পর্যন্ত সবাই চুরি করে এখন পদার্থবিজ্ঞানের মূল দাবি করে বসেছে।

সুত্র

মতামত দিন