সিয়াম

ই’তিকাফের উদ্দেশ্য ও উপকারিতা

ই’তিকাফের উদ্দেশ্য ও উপকারিতা

মুহাম্মদ শাহিদুল ইসলাম

সহকারী অধ্যাপক

ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ

উত্তরা ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।

বিশেষ নিয়তে বিশেষ অবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্যের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করাকে ই‘তিকাফ বলে।ই‘তিকাফ একটি মহান ইবাদত, মদিনায় অবস্থানকালীন সময়ে রাসূলুল্লাহ সা.  প্রতি বছরই ই‘তিকাফ পালন করেছেন। দাওয়াত, তরবিয়ত, শিক্ষা এবং জিহাদে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও রমজানে তিনি ই‘তিকাফ ছাড়েননি। ই‘তিকাফ ঈমানী তরবিয়তের একটি পাঠশালা, এবং রাসূলুল্লাহ সা.  এর হিদায়াতি আলোর একটি প্রতীক। ই‘তিকাফরত অবস্থায় বান্দা নিজেকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য দুনিয়ার অন্যান্য সকল বিষয় থেকে আলাদা করে নেয়। ঐকান্তিকভাবে মশগুল হয়ে পড়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের নিরন্তর সাধনায়। ই‘তিকাফ ঈমান বৃদ্ধির একটি মূখ্য সুযোগ। সকলের উচিত এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজের ঈমানী চেতনাকে প্রাণিত করে তোলা ও উন্নততর পর্যায়ে পৌছেঁ দেয়ার চেষ্টা করা। নিম্নে ই‘তিকাফের উদ্দেশ্য ও উপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :

ক. আল্লাহর সাথে ভালোবাসা বৃদ্ধি ও সুদৃঢ় করা : আল্লাহর দিকে আকৃষ্ট হওয়া ও আল্লাহকেন্দ্রিক ব্যতিব্যস্ততা যখন অন্তর সংশোধিত ও ঈমানী দৃঢ়তা অর্জনের পথ, কেয়ামতের দিন তার মুক্তিও বরং এ পথেই। তাহলে ই‘তিকাফ হল এমন একটি ইবাদত, যার মাধ্যমে বান্দা সমস্ত সৃষ্টি-জীব থেকে আলাদা হয়ে যথাসম্ভব প্রভুর সান্নিধ্যে চলে আসে। বান্দার কাজ হল তাঁকে স্মরণ করা, তাঁকে ভালোবাসা ও তাঁর ইবাদত করা। সর্বদা তার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা, এরই মাধ্যমে আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক দৃঢ় ও মজবুত হয়।

খ. পাশবিক প্রবণতা এবং অহেতুক কাজ থেকে দুরে থাকা : রোযার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদেরকে বাঁচিয়ে রাখেন অতিরিক্ত পানাহার ও যৌনাচারসহ পশু প্রবৃত্তির বিবিধ প্রয়োগ থেকে, অনুরূপভাবে তিনি  ই‘তিকাফের বিধানের মাধ্যমে তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখেন অহেতুক কথা-বার্তা, মন্দ সংস্পর্শ, ও অধিক ঘুম হতে। ই‘তিকাফের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সম্পূর্ণ অর্থে আল্লাহর জন্য নিবেদিত হয়ে যায়। নামায, কুর’আন তিলাওয়াত, যিকির ও দোয়া ইত্যাদির নির্বাধ চর্চার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের অফুরান সুযোগের আবহে সে নিজেকে পেয়ে যায়।

গ. শবে কদর তালাশ করা : ই‘তিকাফের মাধ্যমে শবে কদর খোঁজ করা রাসূলুল্লাহ সা.  এর মূল উদ্দেশ্য ছিল। আবু সায়ীদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত হাদীস সে কথারই প্রমাণ বহন করে, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সা.  বলেছেন:

إني اعتكفت العشر الأول ألتمس هذه الليلة ثم اعتكفت العشر الأوسط ثم أتيت فقيل لي إنها في العشر الأواخر فمن أحب منكم أن يعتكف فليعتكف فاعتكف الناس معه.

‘আমি প্রথম দশকে ই‘তিকাফ করেছি এই (কদর) রজনী খোঁজ করার উদ্দেশে। অতঃপর ই‘তিকাফ করেছি মাঝের দশকে। AZ:ci মাঝ-দশক পেরিয়ে এলাম। তারপর আমাকে বলা হল, (কদর) তো শেষ দশকে। তোমাদের মধ্যে যদি কেউ ই‘তিকাফ করতে চায় সে যেন ই‘তিকাফ করে।’ অত:পর লোকেরা তাঁর সাথে ই‘তিকাফ করল।[1]

ঘ. মসজিদে অবস্থানের অভ্যাস গড়ে তোলা : ই‘তিকাফের মাধ্যমে বান্দার অন্তর মসজিদের সাথে জুড়ে যায়, মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠে। হাদীস অনুযায়ী যে সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিজের ছায়ার নীচে ছায়া দান করবেন তাদের মধ্যে একজন হলেন ওই ব্যক্তি মসজিদের সাথে যার হৃদয় ছিল বাঁধা :

ورجل قلبه معلق بالمساجد.

‘ এবং ঐ ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের সঙ্গে বাঁধা।’[2]

ঙ. দুনিয়া ত্যাগ ও বিলাসিতা থেকে দুরে থাকা : ই‘তিকাফকারী যেসব বিষয়ের সাথে জীবন যাপন করত, সেসব থেকে সরে এসে নিজেকে মসজিদে আবদ্ধ করে ফেলে। ই‘তিকাফ অবস্থায় দুনিয়া ও দুনিয়ার ¯^v` থেকে সে বিচ্ছিন্ন  হয়ে পড়ে, ঠিক ঐ আরোহীর ন্যায় যে কোন গাছের ছায়ার নীচে বসল, অতঃপর সেখান থেকে উঠে চলে গেল।

চ. ইচ্ছাশক্তি প্রবল করা এবং প্রবৃত্তিকে খারাপ অভ্যাস ও কামনা-বাসনা থেকে বিরত রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা : কেননা ই‘তিকাফ দ্বারা খারাপ অভ্যাস থেকে বিরত থাকার ট্রেন্ড গড়ে উঠে। ই‘তিকাফ তার জন্য সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় নিজেকে ধৈর্যের গুণে ¸Yvwš^Z করতে ও নিজের ইচ্ছাশক্তিকে শানিত করতে। ই‘তিকাফ থেকে একজন মানুষ সম্পূর্ণ নতুন মানুষ হয়ে বের হয়ে আসার সুযোগ পায়। যা পরকালে উপকারে আসবে না তা থেকে বিরত থাকার ফুরসত মেলে।

তিকাফের সময়সীমা : সবচেয়ে কম সময়ের ই‘তিকাফ হল, শুদ্ধ মত অনুযায়ী, একদিন এক রাত। কেননা সাহাবায়ে কেরাম রাদি-আল্লাহু আনহুম নামায অথবা উপদেশ শ্রবণ করার অপেক্ষায় বা জ্ঞান অর্জন ইত্যাদির জন্য মসজিদে বসতেন, তবে তারা এ সবের জন্য ই‘তিকাফের নিয়ত করেছেন বলে শোনা যায়নি। সর্বোচ্চ কতদিনের জন্য ই‘তিকাফ করা যায় এ ব্যাপারে ওলামাদের মতামত হল, এ ব্যাপারে নির্ধারিত কোন সীমা-রেখা নেই।

তিকাফের শর্তাবলী : ই‘তিকাফের অনেকগুলো শর্ত রয়েছে । শর্ত গুলো নিম্নরূপ:

১. রোযা রাখা : ই‘তিকাফের জন্য কেউ কেউ রোযার শর্ত করেছেন, কিন্তু বিশুদ্ধ মত হল রোযা শর্ত নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ সা.  থেকে প্রমাণিত আছে যে তিনি কোন এক বছর শাওয়ালের প্রথম দশকে ই‘তিকাফ করেছিলেন, আর এ দশকে ঈদের দিনও আছে। আর ঈদের দিনে তো রোযা রাখা নিষিদ্ধ।

২. মুসলমান হওয়া : ই‘তিকাফের জন্য মুসলমান হওয়া শর্ত। কেননা কাফেরের ইবাদত গ্রহণযোগ্য হয় না।

৩. বোধশক্তি সম্পন্ন হওয়া : ই‘তিকাফকারীকে বোধশক্তিসম্পন্ন হতে হবে, কেননা নির্বোধ ব্যক্তির কাজের কোনো উদ্দেশ্য থাকে না, আর উদ্দেশ্য ব্যতীত কাজ শুদ্ধ হতে পারে না।

৪. ভাল-মন্দের পার্থক্য জানতে হবে : ভালো-মন্দ পার্থক্য করার জ্ঞান থাকতে হবে, কেননা কম বয়সী, যে ভাল-মন্দের পার্থক্য করতে পারে না, তার নিয়তও শুদ্ধ হয় না।

৫. নিয়ত করা : ই‘তিকাফের নিয়ত করতে হবে, কেননা মসজিদে অবস্থান হয়তো ই‘তিকাফের নিয়তে হবে অথবা অন্য কোনো নিয়তে। আর এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য করার জন্য নিয়তের প্রয়োজন। রাসূল সা.  তো বলেছেন :

إنما الأعمال بالنيات ، وإنما لكل إمري ما نوى .

‘প্রত্যেক কাজের নির্ভরতা নিয়তের উপর, যে যা নিয়ত করবে সে কেবল তাই পাবে।’[3]

৬. পবিত্র অবস্থায় থাকা : ই‘তিকাফ অবস্থায় মহিলাদের হায়েজ-নিফাস থেকে পবিত্র থাকা জরুরী, কেননা এ অবস্থায় মসজিদে অবস্থান করা হারাম, অবশ্য এস্তেহাজা অবস্থায় ই‘তিকাফ করা বৈধ। আয়েশা রা. আনহা বলেন :

اعتكفت مع رسول الله صلي الله عليه وسلم امرأة من أزواجه مستحاضة فكانت ترى الحمرة والصفرة فربما وضعنا الطست تحتها وهي تصلي.

‘রসুলুল্লাহ সা.  এর সাথে তাঁর স্ত্রী-গণের মধ্য হতে কেউ একজন ই‘তিকাফ করেছিলেন এস্তেহাজা অবস্থায়। তিনি লাল ও হলুদ রঙ্গের স্রাব দেখতে পাচ্ছিলেন, আমরা কখনো তার নীচে পাত্র রেখে দিয়েছি নামাযের সময়।’[4]

ই‘তিকাফকারী যদি রমজানের শেষ দশকে ই‘তিকাফের নিয়ত করে তা হলে একুশতম রাত্রির সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বে মসজিদে প্রবেশ করবে, কেননা তার উদ্দেশ্য কদরের রাত তালাশ করা, যা আশা করা হয়ে থাকে বেজোড় রাত্রগুলোতে, যার মধ্যে একুশের রাতও রয়েছে। ঈদের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর সে ই‘তিকাফ থেকে বের হতে পারবে।



তথ্যসূত্র:

[1]. মুসলিম, হাদীস নং-১১৬৭।

[2]. বুখারী, হাদীস নং-৬২০।

[3]. বুখারী, হাদীস নং-১

[4]. বুখারী, হাদীস নং-১০৩৭

মতামত দিন