বিদআত সাম্প্রতিক বিষয়

বড়দিন ও নববর্ষ পালন করার বিধান

বড়দিন ও নববর্ষ পালন করার বিধান

সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ ( রহ) এই বিষয়ে সূরা আল-ফুরকান এর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:

আয়াতটি হলো:

   
وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا [٢٥:٧٢]

অনুবাদ : এবং যারা মিথ্যা কাজে যোগদান করে না এবং যখন অসার ক্রিয়াকর্মের সম্মুখীন হয়, তখন মান রক্ষার্থে ভদ্রভাবে চলে যায়। ( সূরা আল ফুরক্বান, আয়াত নং- ৭২)।

মুশরিকদের উত্সব সম্পর্কে তিনি বলেন, যেহেতু তারা দ্বিধা, প্রবৃত্তির অনুসরণ এবং মিথ্যা একত্রিত করে, সেহেতু এসব বিষয়ে দ্বীনি কোন উপকারীতা নেই। তাদের এই সাময়িক বাসনাপূরণ শেষ হয়ে ব্যথা দিয়ে। যেহেতু তারা মিথ্যার উপর দাড়িয়ে রয়েছে, সেহেতু তাদের এসবে অংশগ্রহণ করা তাদের অন্তর্ভূক্তির শামিল।

 এই আয়াত তাদের প্রশংসা ও সুপারিশ করে (যারা এসব মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না), এর অর্থ হচ্ছে সেগুলো উত্সব এবং অন্যান্য মিথ্যা বিষয়গুলোতে অংশগ্রহণ না করতে উত্সাহিত করছে।

 আমরা বুঝতে পারি যে, এসব উত্সবে অংশগ্রহণ করা মন্দ কাজ যেহেতু তারা মিথ্যায় নিমজ্জিত।

 এটা আরো নির্দেশ করে যে, এগুলো আরো অনেক কারণে হারাম। কারণ আল্লাহ তাআলা এটিকে মিথ্যা বলেছেন। আল্লাহ তাদের দোষারোপ করেনে যারা মিথ্যা বলে এমনকি যদিও কেউ না ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাতে। অন্য আয়াতে যিহার ( স্ত্রীকে মাতা বলার বিধান ) কেও নিষেধ করেছেন।

الَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِنكُم مِّن نِّسَائِهِم مَّا هُنَّ أُمَّهَاتِهِمْ ۖ إِنْ أُمَّهَاتُهُمْ إِلَّا اللَّائِي وَلَدْنَهُمْ ۚ وَإِنَّهُمْ لَيَقُولُونَ مُنكَرًا مِّنَ الْقَوْلِ وَزُورًا ۚ وَإِنَّ اللَّهَ لَعَفُوٌّ غَفُورٌ [٥٨:٢]

তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীগণকে মাতা বলে ফেলে, তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা কেবল তারাই, যারা তাদেরকে জন্মদান করেছে। তারা তো অসমীচীন ও ভিত্তিহীন কথাই বলে। নিশ্চয় আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল। ( সূরাহ আল-মুজদালাহ, আয়াত নং-২)।

 এবং আল্লাহ তাআলা এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন,

ذَٰلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ حُرُمَاتِ اللَّهِ فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ عِندَ رَبِّهِ ۗ وَأُحِلَّتْ لَكُمُ الْأَنْعَامُ إِلَّا مَا يُتْلَىٰ عَلَيْكُمْ ۖ فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ [٢٢:٣٠]

এটা শ্রবণযোগ্য। আর কেউ আল্লাহর সম্মানযোগ্য বিধানাবলীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে পালনকর্তার নিকট তা তার জন্যে উত্তম। উল্লেখিত ব্যতিক্রমগুলো ছাড়া তোমাদের জন্যে চতুস্পদ জন্তু হালাল করা হয়েছে। সুতরাং তোমরা মূর্তিদের অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাক এবং মিথ্যা কথন থেকে দূরে সরে থাক । (সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত নং-৩০)।

তাই কেউ যদি মিথ্যা কাজে যোগদান করুক এটাকে নিন্দা করা হয়েছে।

হাদীস হতে দলীল :

আনাস বিন মালিক (রা) বলেন, আল্লাহর রাসূল (সা) মাদীনাহয় আসলে দেখেন তারা বছরের দুটি দিনে আনন্দ উত্সব ও খেলাধূলা করছে। তিনি বললেন, এই দুটি দিন কি ? তারা বললো, জাহিলিয়্যার যুগে আমরা এই দুই দিনে খেলাধূলা করতাম।

আল্লাহর রাসূল (সা) বললেন, “আল্লাহ তোমাদের এই পরিবর্তে আরো ভালো দুটি জিনিস দিয়েছেন :সেই দুটি হলো ঈদ উল আযহা এবং ঈদ উল ফিতর। ( সূনান আবূ দাউদ)।

এটা পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করে যে, রাসূল (সা) নির্দিষ্ট ভাবেই এই উম্মাহকে কাফিরদের উত্সব উদযাপন করতে নিষেধ করেছেন। তিনি সম্ভাব্য সব উপায়ে তাদের বিরোধিতা করার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রকৃত বিষয় হলো যে লোকদের ধর্ম এটাকে টিকিয়ে রেখেছে তার অর্থ এই নয় যে, এটা সংরক্ষণ করা উম্মাহর উচিত ছিলো। যেমনটা তাদের কুফর এবং পাপ ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রকৃতপক্ষে, নাবী (সা) কঠোরভাবে তাঁর উম্মাহকে অনেক বিষয়ে তাদের বিপরীত করার নির্দেশ দিয়েছেন যেগুলো মুবাহ। এবং এসব বিষয় অনুসরণ করার অর্থ তাদের সাদৃশ্য গ্রহণ করা। তাদের বিষয়ে আমাদের সকল বিষয়ে বাধা প্রদান করা উচিত। কারণ যতই আমরা জাহান্নামের অনুসরণকারীদের থেকে পার্থক্য সৃষ্টি করবো আর ততই তাদের কার্যক্রম এর সাদৃশ্য থেকে দূরে থাকবো ।

এসব বিষয়ে প্রথম হাদীস:

“ প্রত্যেক জাতিরই উত্সব রয়েছে এবং এটাই আমাদের উত্সব”। এই হাদীস নির্দিষ্ট করে নির্দেশ করে যে, প্রত্যেক জাতিরই নিজস্ব উত্সব রয়েছে।

যেমন আল্লাহ তাআলা এর ব্যাখ্যায় বলেন,

فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ ۚ لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا ۚ وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَجَعَلَكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَٰكِن لِّيَبْلُوَكُمْ فِي مَا آتَاكُمْ ۖ فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ ۚ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ [٥:٤٨]

অনুবাদ :আমি তোমাদের প্রত্যেককে একটি আইন ও পথ দিয়েছি। যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে তোমাদের সবাইকে এক উম্মত করে দিতেন, কিন্তু এরূপ করেননি-যাতে তোমাদেরকে যে ধর্ম দিয়েছেন, তাতে তোমাদের পরীক্ষা নেন। অতএব, দৌড়ে কল্যাণকর বিষয়াদি অর্জন কর। তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। অতঃপর তিনি অবহিত করবেন সে বিষয়, যাতে তোমরা মতবিরোধ করতে। (সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত নং-৪৮)।

এই আয়াত নির্দেশ করছে যে, প্রত্যেক জাতিরই একটি নির্দিষ্ট পথ রয়েছে। এই আয়াতে “লাম ইয়াকুল্লি” দ্বারা সবার জন্য ও প্রত্যেককে নির্দেশ করছে।  তাই যদি ইয়াহুদী দর নিজস্ব উত্সব থাকে এবং খ্রিষ্টানদেরও উত্সব রয়েছে। এটা শুধুই তাদের জন্য। এতে আমাদের কোন অংশ নেই। যেমনি আমরা তাদের কিবলাহ বা তাদের আইন কানুন-এ অংশগ্রহণ করি না।

দ্বিতীয়ত হলো:

উমার ইবন আল-খাত্তাব (রা) শর্ত দিয়েছেন এবং সাহাবা ও ফুকাহা কেরাম একমত হয়েছেন তাতে যে, আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা ইসলামী শাসনকে মেনে নিয়েছে (আহলে যিম্মাহ) তারা উন্মুক্তভাবে ইসলামী দেশে এসব উত্সব পালন করবে না। যদি মুসলিমরা তাদের উন্মুক্তভাবে উদযাপন নিষেধ করতে একমত হয়, তাহলে একজন মুসলিম কি কিভাবে তাদের উত্সব পালন করতে পারে ? এটা কি তার চেযে খারাপ নয় যদি কাফির উন্মুক্তভাবে না করতে পারে ?

তাদের উত্সব পালন করতে নিষেধ করার একটিই কারণ হলো তাদের অংশগ্রহণ হলো তাদের পাপ অথবা তাদের পাপাচারিতার প্রকাশ। অন্যক্ষেত্রে, মুসলিমগণকে পাপাচার হতে অথবা পাপাচারের নিদর্শন হতে নিষেধ করা হয়েছে। এমনকি যদি একজন কাফিরকে এসব উন্মুক্তভাবে অংশগ্রহণ করতে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। তাহলে কিভাবে একজন মুসলিম তা করতে পারে ? কাফিরদের পাপাচারিতা ( তাদের উত্সবে ) ইনশাআল্লাহ বর্ণনা করা হবে।

ইমাম বায়হাক্বী সহীহ সনদসহ “আহলে যিম্মাহ’র নতুন বছর উপলক্ষে বা অন্যান্য উত্সবে  চার্চে প্রবেশ করার নিষেধাজ্ঞা” নামে অধ্যায়ে  বর্ণনা করেন যে, সুফিয়ান সাওরী (রহ) হতে যাওর বিন ইয়াযিদ হতে আ’তা বিন দীনার বলেন, উমার (রা) বলেন, অনারবদের ভাষা শিক্ষাগ্রহণ করো না। মুশরিকদের প্রার্থনা কেন্দ্রে তাদের উত্সবের দিনে অংশগ্রহণ করো না।আল্লাহর ক্রোধ তাদের উপর বর্ষিত হয়।

উমার ইবন আল-খাত্তাব বলেন: আল্লাহর শত্রুদের উত্সবে তাদের উপেক্ষা করো ।

আবূ উসামাহ হতে সহীহ সনদে বর্ণিত রয়েছে যে, আওন (রহ) আবুল মুগীরাহ হতে আবদুল্লাহ ইবনে উমার হতে বর্ণনা করেন, যারা অনারবভূমিকে বসবাস করে এবং তাদের নববর্ষ এবং তাদের উত্সব উদযাপন করে, তাদেরকে বিচার দিবসে একত্রিত করা হবে।

উমার (রা) তাদের ভাষা শিক্ষা এবং এমনকি তাদের উত্সবের দিন তাদের গির্জায় প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন। তাহলে তারা যা করছে তা কিভাবে পালন করা বৈধ হয়? অথচ সেগুলো  তাদের ধর্মের একটি অংশ। তাদের ভাষা শেখার চেয়ে এগুলো কি আরো খারাপ হচ্ছে না ? তাদের প্রার্থনা কেন্দ্রে প্রবেশ করার চেয়ে তাদের উত্সব পালন করা আরো খারাপ হচ্ছেনা ?

আল্লাহর ক্রোধ যদি তাদের উপর তাদের উত্সব উদযাপন করার জন্য হয় তাহলে আমরা যদি তাতে অংশগ্রহণ করি তাহলে আমাদের অবস্থা কি হবে ?

অথচ আল্লাহ আমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন তাদের এড়িয়ে চলতে। “আল্লাহর শত্রুদের উত্সবে তাদের উপেক্ষা করো” এই নির্দেশ কি তাদের সাথে অংশগ্রহণ করতে বলছে ? তাহলে আসলেই যে পালন করছে তাদের অবস্থা কি হবে ?

 “যারা অনারবভূমিকে বসবাস করে এবং তাদের নববর্ষ এবং তাদের উত্সব উদযাপন করে, তাদেরকে বিচার দিবসে একত্রিত করা হবে”। এটা নির্দেশ করে যে, যারা তাদের সাথে সকল কাজে অংশগ্রহণ করে তারা কাফির অথবা তারা যা করছে তা কাবীরাহ গুনাহ যা তাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। আগের অর্থ তাই প্রকাশ করছে।

তিনি উল্লেখ করেন, আল্লাহই ভালো জানেন, যারা তাদের দেশে বসবাস করে ।কারণ আব্দুল্লাহ ইবন আমর (রা) এবং অন্যান্য সাহাবাগণ –এর সময়ে তারা মুসলিম দেশে  কাফিরদের উত্সব পালন করতে নিষেধ করতেন । মুসলিমদের কেউ তাদের জড়িত হতো না । এটা শুধুমাত্র কাফিরদের দেশেই সম্ভব ছিলো ।

‘আলী (রা) তাদের একান্ত উত্সবগুলোকে স্বীকার করতেই অস্বীকার করতেন তাহলে এসব উদযাপন কিভাবে করা যায় ?

ইমাম আহমাদ (রহ) এই বিষয়ে উমার (রা) ও আলী (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন এবং এই উত্সবগুলো সম্পর্কে তাঁর মতামতও বর্ণনা করেছেন।  ইমাম আবুল হাসান আল আ’মিদী বলেন, ইবন আল-বাগদাদী তার “উমদাতুল হাদীর ওয়া কিফায়াত আল-মুসাফির” গ্রন্থে বলেন, ‘খ্রিষ্টান ও ইয়াহুদীদের উত্সবে অংশগ্রহণ করা নিষিদ্ধ। এই ব্যাপারে তিনি দলীল হিসেবে সূরা আল-ফুরক্বান এর ৭২ নং আয়াতকে নির্দেশ করেন ।

তিনি বলেন, এটা তাদের সংস্কৃতি এবং তাদের উত্সব। তিনি আরো বলেন, তাদের সিনাগগ এবং চার্চে প্রবেশ করা নিষেধ।

ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রচিত “ ইকতি’দা আল-সিরাত আল-মুস্তাক্বিম মুখালিফাত আসহাব আল জাহিম” গ্রন্থ হতে সংকলিত।

লেখাটি ইংরেজী লেখা থেকে অনূদিত।

লেখাটি পিডিএফ আকারে ডাউনলোড করতে চাইলে ।বড়দিন ও নববর্ষ পালন করার বিধান

মতামত দিন