ইসলামী শিক্ষা

ছলনাময় দুনিয়া থেকে সাবধান!

#বিষয়: ছলনাময় দুনিয়া থেকে সাবধান!
#খতীব: শাইখ ড. সালাহ আল বুদাইর হাফিঃ
।।।প্রথম খুতবা।।।
الحمد لله الذي أنزلَنا ربيع فضله الخصيب، وأحلَّنا في ربوة كرمه الرحيب، وأكرمنا بالعيش المغدق الناعم الرطيب، وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأشهد أن نبينا وسيدنا محمدا عبده ورسوله، صلى الله عليه وعلى آله وأصحابه، أما بعد:
হে মুসলমান!
আমাদের থেকে কত সকাল ও সন্ধ্যা অতিক্রম করছে, হঠাৎ মরণ এসে সব কেড়ে নিচ্ছে এবং বালা-মসিবত এসে আমাদের জীবনকে মলিন করছে। অতএব আপনারা দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে তার উপর নির্ভরশীল হবেন না; কেননা দুনিয়ার প্রাপ্তি ক্ষণস্থায়ী, এর স্থায়িত্ব অসম্ভব, আর চূড়ান্ত পরিণাম বিলুপ্তি ও প্রস্থান। কতজনকে সে আনন্দ দিয়েছে, পরে নিশিতে প্রস্থানও করেছে। কতককে সমৃদ্ধি দিয়েছে, অতঃপর নিঃশেষ করেছে। আবার অনেককে অঢেল ও পর্যাপ্ত প্রাচুর্যতা দিয়েছে, আবার তা কর্তনও করেছে!

এমন অসংখ্য ধনী ও সম্পদশালী রয়েছে যারা উষ্ণ ও মোলায়েম দামী পোষাক পরিধান করত, তাজা ও সুস্বাদু খাবার খেত, আরামদায়ক বিলাসবহুল বাহনে আরোহন করত; কিন্তু কালের ব্যবধানে সময়ের বোঝা ও সকল পরীক্ষা তার উপর চেপে বসেছে!
কবি বলেন:
“কতক সম্মানের অধিকারী লাঞ্চনার স্বীকার হয়েছে …
অতঃপর করুণার পাত্র হয়েছে, অথচ একসময় তাকে হিংসে করা হত।”
অতএব যারা দুনিয়ার খড়কুটা কুড়াচ্ছেন ও পঙ্কিলতা অর্জন করছেন, সুযোগ যেন আপনাদেরকে ধোঁকা না দেয় এবং অবকাশ সময় যেন আপনাদেরকে ভুলিয়ে না রাখে। আপনারা এটা মনে করবেন না যে, দুনিয়ার অবসান হবে না এবং দান ও সুযোগ সুবিধাদি শেষ হবে না। বরং আপনারা সেসব লোকদের পরিণতি থেকে শিক্ষা গ্রহন করুন যারা অবাধ্যতায় নিমজ্জিত ছিল এবং উপদেশ এড়িয়ে অহংকার ও দাম্ভিকতা করে চলত। এরা শুকরিয়া আদায় করেনি এবং সৎপথে ফিরে আসার চিন্তাও করেনি। অথচ আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য পার্থিব সুখ- সাচ্ছন্দ্য ও আনন্দ ফুর্তির দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন; ফলে এরা মনে করেছে যে, এসব নেয়ামত নিঃশেষ হবার নয়। তাই তারা উল্লাস করেছে ও অবাধ্যতা করে দাম্ভিকতা প্রদর্শন করেছে। পরিণামে আল্লাহ তায়ালা তাদের মুলোৎপাটন করেছেন ও তাদের চিহৃ মুছে দিয়েছেন। এ মর্মে আল্লাহ তায়ালা বলেন: [ অতঃপর তাদেরকে যে উপদেশ করা হয়েছিল তারা যখন তা ভুলে গেল, তখন আমরা তাদের জন্য সব কিছুর দরজা খুলে দিলাম। অবশেষে তাদেরকে যা দেয়া হল তাতে তারা যখন উল্লাসিত হল, তখন হঠাৎ তাদেরকে পাকড়ও করলাম; ফলে তখনি তারা নিরাশ হল। ] সূরা আনয়াম: ৪৪।
আয়াতটির ব্যাখ্যায় কাতাদাহ রহঃ বলেন: ( তাদের উপর আচমকা আল্লাহর ফয়সালা -আযাব- নেমে এসেছে। আর আল্লাহ তায়ালা কোন জাতিকে পাকড়াও করেন না যতক্ষণ না তারা বিভোর থাকে, ধোঁকা ও উদাসীনতায় নিমজ্জিত থাকে এবং নানাবিধ নেয়ামত পেয়ে থাকে! অতএব তোমরা আল্লাহর এই কৌশলে ধোঁকায় পড়িও না। ফাসেক ও দুষ্কৃতিকারীরা ছাড়া আর কেউ এমন কৌশলে ধোঁকায় পড়ে না। )
জনৈক আলেম বলেছেন: ( আল্লাহ তায়ালা ঐ ব্যক্তির উপর রহম করুন যে এই আয়াতটি গভীরভাবে অনুধাবন করেছে: “حتى إذا فرحوا بما أوتوا أخذناهم بغتة”/ অর্থ: অবশেষে তাদেরকে যা দেয়া হল তাতে তারা যখন উল্লাসিত হল, তখন হঠাৎ তাদেরকে পাকড়ও করলাম। ) আর মুহাম্মাদ বিন নযর হারেসী রহঃ বলেন: (তাদেরকে বিশ বছর অবকাশ দেয়া হয়েছিল।)
উকবা বিন আমের রাঃ হতে বর্ণিত, “নবী সাঃ বলেছেন: ( যখন দেখবে বিভিন্ন অপরাধ করা সত্ত্বেও আল্লাহ তায়ালা তাঁর কোন বান্দাকে তার পছন্দের পার্থিব বস্তু দিচ্ছেন, তখন জেনে রাখ, এটা তাকে ধীরে ধীরে পাকড়াও করার জন্য। ) তারপর তিনি উক্ত আয়াতটি পাঠ করলেন।”
হাসান বসরী রহঃ বলেন: ( আল্লাহর কসম! মানুষদের মধ্যে যাকে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ায় সমৃদ্ধি দিলেন, আর সে ভয় করল না যে এতে হয়ত তাকে পাকড়াও করার কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে, তাহলে -বুঝা যাবে- তার আমলে ঘাটতি এসেছে এবং চিন্তাশক্তি দুর্বল হয়েছে। )
আল্লাহর বাণী:(سنستدرجهم من حيث لا يعلمون) অর্থ: [ অচিরেই আমি তাদেরকে এমনভাবে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাব যে, তারা জানতেও পারবে না। উক্ত আয়াতের অর্থ বর্ণনা করতে গিয়ে সুফিয়ান সাওরী রহঃ বলেন: ( অর্থাৎ আমি তাদের উপর নেয়ামতরাজি ঢেলে দিব এবং শুকরিয়া আদায়ের বিষয়টিকে ভুলিয়ে দিব। ) আর হাসান বসরী রহঃ বলেছেন: ( অনেক ব্যক্তি ইহসান পেয়ে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে, অনেকেই প্রশংসায় ভূষিত হয়ে পরীক্ষিত হচ্ছে, আর বহু মানুষই নিজ নিজ দোষ-ত্রুটি গোপন থাকায় প্রবঞ্চিত হচ্ছে! )
দুর্ভাগ্য ও দুর্দশা তাদের জন্য যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা অগণিত নতুন নতুন নেয়ামত দিয়েছেন, কিন্তু তারা সে নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে ও ইস্তিগফার করতে ভুলে গেছে। ফলে তাদের উপর শাস্তি আপতিত হয়েছে ও নেয়ামতগুলো কেড়ে নেয়া হয়েছে!
আফসোস সেই গাফেল ব্যক্তির জন্য যার হুঁশ ফিরে সুযোগ ও সময় ফুরাবার পরে!
অতএব আপনারা স্মরণ করুন সেই ইন্তিকালের মুহুর্তকে, রবের সাথে সাক্ষাত ও মহাসমাবেশের সময়কে এবং কেয়ামত বা হিসাবের দিনকে! সেই সাথে স্মরণ করুন সেদিনের আমলনামা প্রকাশ হওয়াকে যাতে অণু ও সরিষা দানার পরিমাণ আমলেরও হিসাব থাকবে! স্মরণ করুন সে দিনের কথা যেদিন ¯স্নেহশীল বাবা বা আপন ভাই অথবা অন্তরঙ্গ বন্ধু কেউই কোন উপকারে আসবে না। আপনারা সেদিনের কথা স্মরণ করুন: [ যেদিন মানুষ পালিয়ে যাবে তার ভাইয়ের কাছ থেকে,* এবং তার মাতা ও পিতার কাছ থেকে,* তার স্ত্রী ও তার সন্তান থেকে।* সেদিন তাদের প্রত্যেকের হবে এমন গুরুতর অবস্থা যা তাকে সম্পূর্ণরূপে ব্যস্ত রাখবে। ] হায়! সেদিন কতই না ব্যস্ততা ও ভয়ানক অবস্থা হবে; কেউ তার আত্মীয় বা সঙ্গীদের দিকে ফিরেও তাকাবে না! সেদিনের অবস্থার পরিবর্তন ও বিরাট দুশ্চিন্তার কারণে সবাই পলায়নপর থাকবে ও ওযর পেশ করতে মহাব্যস্ত থাকবে!
ইকরিমা রহঃ বলেন: ( সেদিন ব্যক্তি তার স্ত্রীর কাছে গিয়ে বলবে: ‘হে অমুক! আমি তোমার কেমন স্বামী ছিলাম?’ তখন স্ত্রী বলবে: ‘তুমি সেরা স্বামী ছিলে’, এভাবে স্বামীর প্রশংসা করবে। অতঃপর স্বামী বলবে: আজকে আমি তোমার কাছে মাত্র একটি নেকী ভিক্ষা চাচ্ছি যেন আমি এ দূরাবস্থা থেকে নাজাত পেতে পারি যা তুমি দেখছ! তখন স্ত্রী বলবে: এটা তো সামন্যই চেয়েছে, কিন্তু আমি তোমাকে কিছুই দিতে পারব না। কেননা আমিও সেটাই ভয় করছি যা তুমি করছ! পিতা তার সন্তানের কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বলবে: আমি তোমার পিতা হিসেবে কেমন ছিলাম? জবাবে ছেলে তার প্রশংসা করবে। তখন সে বলবে: হে আমার প্রিয় ছেলে! তোমার নেকী থেকে আমার একটি অণু পরিমাণ নেকীর প্রয়োজন যেন তা দ্বারা আমি এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে পারি যা তুমি দেখছ। তখন তার ছেলে তাকে বলবে: হে আমার বাবা! যা চেয়েছেন তা কতই না নগন্য, কিন্তু আমিও সেটার ভয় করছি যেটা আপনি করছেন; অতএব আমি আপনাকে কিছুই দিতে পারব না। )
অতএব হে মুসলমান!
আপনারা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করুন। কেননা যে ব্যক্তি অলসতা ও অজ্ঞতায় সময় নষ্ট করবে এবং তার আমলনামায় পঙ্কিলতা ও গোনাহ বৃদ্ধি পাবে; আগামীকাল কবর হবে তার আফসোস ও পরিতাপের জায়গা! তবে যদি পরম দয়াময় তাকে দয়া করেন!
কত মানুষ মৃত্যু বরণ করে গত হয়েছে, অথচ তাদের পাপকর্ম এখনও জারি রয়েছে! আবার অনেকেই মারা গেছে, কিন্তু তাদের উপর সৎকাজের নেকী জারি রয়েছে! কাজেই ব্যক্তির নিঃশ্বাস যে মন্দাবস্থায় বিচ্ছিন্ন হয়, তার বোঝা তার উপর চলমান থাকে। আর ব্যক্তির হায়াত যে ভাল কর্মের উপর শেষ হয়, তার সওয়াবও তার উপর জারি থাকে। অতএব আপনারা পতনশীলদের যাত্রায় চলবেন না। বরং আপনারা আল্লাহর কাছে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করুন ও তাঁর কাছেই আশ্রয় নিন। কেননা আল্লাহকে আঁকড়ে ধরা ও তাঁর কাছে আশ্রয় গ্রহণই হেদায়াতের মূলস্তম্ভ এবং ভ্রষ্টতা থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যম।
أقول ما تسمعون، وأستغفر الله فاستغفروه ويا فوز المستغفرين.
।।।দ্বিতীয় খুতবা।।।
الحمد لله الذي زيَّنَتْ بشكره الأفواه ، وخضعتْ لعظمته الجباه، وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأشهد أن نبينا وسيدنا محمدا عبده ورسوله، صلى الله عليه وعلى آله وأصحابه، أما بعد:
হে মুসলমান:
আপনাদের মাঝে বরকতময় আলোকিত দশ রাতের উদয় হতে চলেছে যা বরকত ও উপহারের ভান্ডার, বছরের সেরা দিনসমূহ এবং সংখ্যায় এমন দশটি দিন যা ফজিলতপূর্ণ, গাম্ভির্যময় ও উজ্জ্বল। অন্যান্য দিনের চেয়ে সে দিনগুলোর অত্যাধিক ফজিলতের কারণে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা সেগুলোর শপথ করে বলেছেন: [ শপথ দশ রাতের। ] সূরা আল ফাজর: ২। আর সেগুলো হল যিলহাজ্ব মাসের প্রথম দশ দিন। অন্যান্য সময়ের আমলের চেয়ে এ দশকের সৎ আমলের অধিক ফজিলতের বিষয়টি প্রমাণিত। একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীসে এসেছে যে, ইবনে আব্বাস রাঃ হতে বর্ণিত, নবী সাঃ বলেছেন: ( এই দশ দিনের তুলনায় এমন কোন দিন নেই যাতে কোন সৎ আমল আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। লোকেরা বলল: আল্লাহর পথে জিহাদও নয় কি? তিনি বললেন: আল্লাহর পথে জিহাদও নয়, তবে কোন ব্যক্তি যদি তার জান মালসহ -জেহাদ করতে- বের হয়ে যায় এবং এর কোন কিছুই নিয়ে আর ফিরে না আসে। ) সহীহ বুখারী।
যিলহজ্বের এই দশ দিন ফজিলত ও সময় উভয় দিক থেকেই সেরা এবং বিশাল মর্যাদাপূর্ণ। অতএব আপনারা এ সময়ে বেশি বেশি তাকবীর (আল্লাহু আকবার), তাহমীদ (আলহামদুলিল্লাহ) ও তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) পাঠ করুন। এ সময়ে সব ধরনের সৎ ও ভাল কাজের প্রতিযোগিতা করুন। এ দশককে মুল্যায়ন করুন সময় ও সুযোগ ফুরিয়ে যাবার আগেই এবং অলসতা পরিহার করে আগ্রহচিত্তে ইবাদত ও আনুগত্যমূলক কাজে পরিশ্রম ও প্রচেষ্টা করুন।
পরিশেষে আপনারা শ্রেষ্ঠ নবীর উপর দরুদ ও সালাম পাঠ করুন।
সমাপ্ত
————————————————————————–
অনুবাদ: হারুনুর রশীদ ত্রিশালী
পিএইচডি গবেষক, মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়; এবং
বাংলা আলোচক ও জুমার খুৎবার লাইভ অনুবাদক (এফ এম ১০৭.৯ রেডিও চ্যানেল), মসজিদে নববী।
পরিমার্জন ও প্রকাশ: আব্দুল মতিন
বিএ(অনার্স) ও এমএ (থিসিস) ইন এ্যারাবিক।
শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক
জমঈয়ত শুব্বানে আহলে হাদীস বাংলাদেশ
ও যুগ্ম-পরিচালক, শুব্বান রিসার্চ সেন্টার।

মতামত দিন