ইসলামী শিক্ষা

‘দুনিয়াবী পড়াশোনা’কে ইবাদাতে পরিণত করা-শেষ পর্ব

(পূর্বের পর্বগুলি ১ম পর্ব     ২য় পর্ব     ৩য় পর্ব   ৪র্থ পর্ব     ৫ম পর্ব   ৬ষ্ঠ পর্ব   শেষ পর্ব )

ইয়াসির ক্বাদী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের উপর একটা সিরিজ শুরু করেছেন। আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে দিয়ে শুরু।সেখানে ঊনি বলছিলেন যে আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তৎকালীন আরবদের মাঝে সবচেয়ে বড় genealogist ছিলেন। Genealogy is the study of lineage. বংশ নিয়ে, সোজা বাংলায় চৌদ্দ গুষ্টি নিয়ে পড়াশোনা। তখন ঊনি বলছিলেন যে এই সাব্জেক্টটা সেক্যুলার এবং ইসলামিক দুই ক্ষেত্রেই একটা মিসিং ব্রাঞ্চ এখন।

শুনে আমি একটু অবাক হইসিলাম। ইসলামিক এত শাখা থাকতে Genealogy নিয়ে পড়ার কি দরকার? আমাদেরতো এখন আরবদের মত এত গোত্রীয় সমাজ ব্যবস্থা না যে গোত্রে ইতিহাস দাওয়াতী কাজে লাগবে। ২দিনের মাঝেই উত্তর পেলাম ইয়াসীর ক্বাদীর আরেকটা পোস্ট থেকে। ঊনি মুহাম্মাদ আসাদ ( বিখ্যাত Road to Mecca বইটার লেখক) এর সাথে Dr Chaim Weizmann এর একটা কথোপকথন তুলে ধরেছেন যেখানে প্যালেস্টাইনের উপর ইহুদীদের অধিকারের হাস্যকর যুক্তি ঊনি খণ্ডন করেছেন ইহুদীদের বংশ লতিকার উপর জ্ঞান দিয়ে (পোস্টের লিংক কমেন্টে)।

চিন্তা করুন, Genealogy র মত একটা বিষয়কে আজকের সময়ে ইসলামের খেদমতে কাজে লাগানো সম্ভব। তাহলে সাইক্যোলজি, ইকোনমিক্স, ল, এডুকেশন, মার্কেটিং এগুলোকে কত দারুণ ভাবে সম্ভব!আমার বুকে এক ধরণের ব্যথা শুরু হয়ে যায় যখন আমি মানুষকে বলতে শুনি যে তারা ‘দুনিয়াবী শিক্ষায়’ আগ্রহী নয় ।

দুনিয়াবী শিক্ষার সংজ্ঞাই আমার কাছে ক্লিয়ার না। আমার এই সিরিজে আমি এই ব্যাপারটাই বুঝানোর চেষ্টা করেছি যে দ্বীন শিক্ষা আর দুনিয়াবী শিক্ষা Mutually exclusive না। কিন্তু আপাতত এই সিরিজ নিয়ে এটাই আমার শেষ লেখা। সামনের মাসে আমার পিএইচডি কোয়ালিফাইং পরীক্ষা। If I can’t make it, I will be kicked out from the department. এখন ফেসবুকে নোট লেখার জন্য খুবই বাজে একটা সময়। অলরেডি প্রচুর সময় দিয়ে ফেলেছি। আল্লাহ বাঁচায় রাখলে একসময় এভাবে অন্য ডিসিপ্লিন গুলা নিয়েও লিখবো ইনশাল্লাহ।

এই Critical টাইমে এই নোটের পেছনে এত সময় কেন দিলাম? এই টপিকটা আমার হৃদয়ের খুব কাছের একটা টপিক। একটা সময়ে আমি বিতর্ক করেছি অনেক এটা নিয়ে। কিছু বোনদের চিন্তার প্যাটার্ণ আমাকে আহত করেছে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে এটা নিয়ে কথাই বলবো না কারণ বলতে গেলে অনেক ব্যক্তিগত কথা চলে আসে যেগুলো আমি বলতে চাই না। কিন্তু এটা নিয়ে লেখার অনুরোধ আমি অনেক পেয়েছি। বেশ কিছু বোনদের দেখে একসময় আমি বলা যায় বাধ্য হয়েছি মুখ খুলতে। চেষ্টা করেছি যতটা সম্ভব ব্যক্তিগত কথা না বলতে। কিন্তু কিছু কথা মনে হয় না বললেই নয়।

আমি যখন আইবিএ ৪র্থ বর্ষে পড়ি তখন আমার প্রথম ইসলামী অর্থনীতি পড়ার প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়। কিন্তু মাহরাম নেই বলে আমি বাইরে পড়তে যাওয়ার কথা ভাবি নি। নিজেই অনলাইনে নিজস্ব উদ্যোগে যতটুকু পারি পড়েছি। একটা সময় ছিলো যখন আমার বায়োডাটাতে Expectation From Future Spouse এ এটা লেখা ছিলো যে আমি পরিবারের প্রতি আমার দায়িত্বে অবহেলা না করে এই ফিল্ড নিয়ে পড়তে চাই। একটা সময়ে আমি বুঝতে পারলাম যে আমার এই clause টুকু প্র্যাক্টিসিং ছেলেদের খুব অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছে। তারা এটা পছন্দ করছে না। বিয়ে নিয়ে আমার খুব বাজে অভিজ্ঞতা আছে। চারদিকে শুনতে শুনতে আমিও একটা সময়ে বিশ্বাস করা শুরু করলাম যে হাজব্যাণ্ডকে ৪-৫ পদ রান্না করে খাওয়ানো, তার নিঃশর্ত আনুগত্য করাই জান্নাতে যাওয়ার সহজতম উপায়। আমি আমার বায়োডাটা থেকে ওই অংশ টুকু সরিয়ে নিলাম। ওই অংশটুকু সরিয়ে নেয়ার পর আমার প্রথম যার সাথে বিয়ের কথা হয় তার সাথেই আল্লাহ আমার বিয়ে লিখে রেখেছিলেন। আমার পড়াশোনা, আমার রিসার্চের ইচ্ছা কোনো কিছু নিয়ে তার সাথে আমার তেমন কোনো কথা হয় নি যদিও ঊনি ইমেইলে আমার জীবন নিয়ে উদ্দেশ্য জানতে চেয়েছিলেন। তখন আমি ইসলামী অর্থনীতির ব্যাপারে আমার আগ্রহের কথা উল্লেখ করেছিলাম, কিন্তু পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে সচেতনভাবে এটার প্রতি আমার তীব্র ঝোঁকের কথা অনুহ্য রেখেছিলাম।

নিশ্চয়ই আল্লাহ কল্পনাতীত দিক থেকে আমাদের জন্য রিযিক্বের দরজা খুলে দিতে পারেন। যে মানুষ ইসলামী অর্থনীতির ব্যাপারে আমার তীব্র আগ্রহের কথা না জেনেই, আমাকে সামনা সামনি না দেখেই বিয়ে করেছিলো, আমার পড়াশোনার ব্যাপারে আমি আমার চেয়ে তাঁকে বেশী আগ্রহী পেয়েছি। তার মত মানসিকতার ছেলে সেক্যুলারদের মাঝে অহরহ খুঁজে পাওয়া যায়, দুঃখ জনক হলেও সত্যি যে প্র্যাক্টিসিং ছেলেদের মাঝে এমনটা পাওয়ার জন্য অনুবীক্ষণ যন্ত্র লাগবে। বিয়ের পর বউয়ের সার্টিফিকেট ছিঁড়ে ফেলেছে এমন ‘প্র্যাক্টিসিং ছেলের’ কাহিনীও আমি জানি। তাই আমার বেটার হাফের প্রতিদান আল্লাহর কাছে ইনশাল্লাহ। এছাড়াও আল্লাহ আমাকে একটা অনুকূল শ্বশুর বাড়ী দিয়েছেন, যাদের কাছে পড়াশোনাটা highest priority. আল্লাহ আমাকে পড়াশোনার প্রতি তীব্র আগ্রহ দিয়েছেন। ঊনি আমার জীবন এমনভাবে ডিজাইন করেছেন যেন আমি পড়া চালিয়ে যেতে বাধ্য হই। আমি বিশ্বাস করি যে এইসব নিয়ামত অনেক বড় পরীক্ষা। এগুলো অনেক দুর্লভ নিয়ামত। আমি জীবনে ইসলামী অর্থনীতির ফিল্ডে আদৌ কিছু করতে পারবো নাকি আমি জানি না। কিন্তু আমি মৃত্যুর পর আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে বলতে চাই ইয়া রাব্বি, I tried my best.

আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ বিভিন্ন মানুষকে বিভিন্ন দিকে মেধা দিয়ে পাঠিয়েছেন। The same prescription cannot be applied for every disease. তাই আমি আবারো বলছি আমি জনে জনে পিএইচডি করতে আসতে বলছি না, রান্না করা, ঘরের কাজকে আমি ছোট করেও দেখছি না। এসব কাজ আমি কতটা সম্মান করি আমার পরিচিতরা জানেন। আমার চেনা আপু আছেন যারা অর্থনীতিতে পড়েছেন, কিন্তু তারা এই বিষয়টা পছন্দ করতেন না। তাদের কেউ পরে মেয়েদের জন্য মেয়ে টেইলর হতে চেয়েছেন, কেউ তাজউইদের শিক্ষিকা। তাদের জন্য আমার বিনম্র শ্রদ্ধা। They are people of impact in my eyes inshaAllah. May Allah accept it from us and them.

Given said that, আমাদের মাথায় রাখতে হবে Diffusion of responsibility র কন্সেপ্টটা। এটা একটু ভেঙ্গে বলি। এটার মানে হচ্ছে যে আপনার সামনে একটা ছিনতাই বা কোনো অপরাধ হচ্ছে আপনি ভাবছেন আরেকজন এগিয়ে যাবে। সমস্যাটা হয় যখন সবাই ভাবতে থাকে যে আরেকজন এগিয়ে যাবে। এটাই হচ্ছে Diffusion of responsibility। যখন মেয়ে ডাক্তার, সাইক্যোলজিস্ট, ইকোনোমিস্ট এগুলাকে Communal responsibility ভাবেন, মানে এসব সার্ভিস কারো না কারো কাছ থেকে চান, কিন্তু এই জীবনটা অনেক চ্যালেঞ্জিং বলে নিজের বা নিজের মেয়ে/ স্ত্রীর জন্য বেছে নেন না, তখন একটা প্রজন্মের মাঝে আপনি দেখবেন এই সার্ভিস দেয়ার কেউ থাকছে না, কারণ সবাই আপনার মত করে ভাবছে। যারা দেশ থেকে আমাকে চিনেন তারা জানেন যে আমার তাজউইদের অবস্থা বেশী সুবিধার না। সেই আমি এখানে এসে তাজউইদের ক্লাস নেয়া শুরু করেছি বাধ্য হয়ে কারণ আমার এখানে বাঙ্গালীদের মাঝে অনেকেই আছেন যারা অক্ষর ভুলে গেছেন চর্চার অভাবে। এটা হচ্ছে একটা উদাহরণ যখন Diffusion of responsibilityর কারণে অবস্থা কী ভয়াবহ হতে পারে, যখন ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো’ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সত্যি কথা হচ্ছে যে Somehow আল্লাহ আমার জন্য কুরআন পড়া, অ্যারাবিক পড়া এবং পড়ানোকে সহজ করে দিয়েছেন। প্রায়ই আমার মনে হয় যে সবকিছু ছেঁড়ে ছুঁড়ে দিয়ে মানুষকে আরবী শিখাই, IOU তে যা পড়েছি সেটুকুই শিখাই। তাতেও তো ‘কিছু একটা করা হবে’। কারণ আমি নিজের জন্য বর্তমানে যে পথ বেছে নিয়েছি তা মারাত্মক চ্যালেঞ্জিং। আমি যে ম্যাথ ব্যাকগ্রাউণ্ড না থাকার জন্য এই পিএইচডির পড়া নিয়ে কী suffer করি! তারপরও চোখের পানি নাকের পানি মুছে আবার উঠে দাঁড়াই নিজের নিয়ামতগুলোর হিসাব কিভাবে দিবো এই আশংকায়!

তাই আসুন আমরা আমাদের টার্গেটের লেভেলটা একটু বাড়াই। আজকে যেমন আমরা কল্পনাও করতে পারি না যে আমাদের বাচ্চারা ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়বে, সেরকম আসুন আমরা এমন একটা সময় গড়ার টার্গেট করি যেখানে এটা অসম্ভব ব্যাপার হবে যে কারও শুধু ১০টা সূরা মুখস্থ। Peer pressure জিনিসটা যে কী সেটা আমি বিদেশে এসে বুঝেছি। এখানে আমার মত ২-১টা দুর্লভ প্রজাতির প্রাণী ছাড়া সবার রান্না মজা। সবাই এখানে ‘রান্না’ এই স্কিলটাতে Excel করে যদিও বা সে দেশে থাকতে পানি টাও গ্লাসে ঢেলে খেত না! আমার চোখে এ এক অদ্ভূত ব্যাপার! আমরা আসলে জানিনা কার মাঝে কী আগুন লুকিয়ে আছে, আমরা জানি না কার সম্ভাবনা কতটুকু। আমরা যদি পারস্পরিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ইসলামের ব্যাসিক জ্ঞান, হিফয, প্যারেন্টিং, ইকোনমিক্স, ল, সাইকোলজি এসব Applied ফিল্ড এর জ্ঞান নিয়ে নিজেদের মাঝে লেভেলটা বাড়াই তাহলে আমরা খুব দ্রুত একটা বিশাল পরিবর্তন দেখতে পাবো ইনশাল্লাহ। সবাই যেন আমরা একই কাজ না করি, একজন আরেকজনের দক্ষতা থেকে উপকৃত হই।

তাই এই নোট সেইসব মেয়েদের জন্য যাদের আল্লাহ আমার মত বা তার চেয়ে বেশী নিয়ামত দিয়েছেন। যারা কো এডুকেশনের ফিতনা এড়ানোর ক্ষমতা রাখেন, তবুও এটাকে unconditionally হারাম ভেবে তাদের নিয়ামতগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় আছে। তাদের প্রতি আমার অনুরোধ, আল্লাহর সাথে নিয়মিত কথা বলার অভ্যাস করুন, তাহাজ্জুদের জন্য উঠুন। নিজের Strength এবং weakness এর একটা লিস্ট করুন, বর্তমানে যা করছেন, কেন করছেন সেটা লিখে ফেলুন, সর্বোপরি আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। আকুল হয়ে দুআ করুন, আল্লাহর পথে সৈনিক হতে চাওয়ার আন্তরিক দুআ আল্লাহ ফিরিয়ে দিবেন না ইনশাল্লাহ।

এই সিরিজ নিয়ে অযথা বিতর্ক না হোক এই দুআ করি। আমি তথাকথিত নারী বাদী নই, এই ট্যাগ পেলে সেটা অপবাদ হবে। আমি নিজে চেষ্টা করি পরিবারের প্রতি আমার দায়িত্ব সাধ্যমত পালন করতে, কতটা পারি সেটার বিচারক আল্লাহ। কিন্তু চেষ্টার কমতি করি না।

যা কিছু বলেছি তাতে যদি ভালো কিছু থেকে থাকে তবে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর যদি ভুল কিছু বলে থাকি তাহলে তা আমার নফসের এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা। আল্লাহ আমাদের মাফ করুন।

Original Source

মতামত দিন