ইসলাম-পূর্ব আরবের সামগ্রিক পরিচয় এবং-

ইসলাম-পূর্ব আরবের সামগ্রিক পরিচয় এবং-

রচনায়: ডক্টর আসকার ইবনে শাইখ

ভাষাতত্ত্ববিদগণের কারও কারও মতে ‘আরব’ ও ‘ই’রাব’ শব্দ দু’টির অর্থ ‘সুমার্জিত’ পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও সুন্দর ভাষায় কথা বলা’ বিধায় এবং আরবের অধিবাসীরা নিজেদের ভাষাগত পাণ্ডিত্যের ক্ষেত্রে দুনিয়ার আর কাউকে তাদের সমকক্ষ মনে করত না বলে নিজেদেরকে ‘আরব’ নামে অভিহিত করত, এবং দুনিয়ার বাদবাকি সকল জাতিকেই ‘আজম’ বা ‘মূক’ অর্থাৎ ‘উপযুক্তভাবে কথা বলতে অক্ষম’ বলে অভিহিত করত। আবার কারও কারও মতে, ‘আরাবত’ শব্দের অর্থ ‘বৃক্ষলতাহীন মরুসদৃশ ভূমি বিধায় সমগ্র ভূখণ্ডটিকেই ‘আরব’ (আরাবত শব্দের রূপান্তর) অভিহিত করা হত। এ দু’টি মতের কোনটিকেই কম যুক্তিপূর্ণ মনে হয় না।

প্রায় ১৫ শত মাইল দীর্ঘ ও ৬ শত মাইল প্রশস্ততাবিশিষ্ট প্রায় ১২ লক্ষ বর্গমাইল আয়তনের এ বিরাট দেশটির অনেকাংশই বালুকাময় মরুভূমি। বাদবাকি অংশ পাহাড়-পর্বতে সমাকীর্ণ। এই মরু আর পাহাড়-পর্বতের মধ্যে কোন কোন অংশ আবার উর্বর ও শস্যশ্যামল ভূমি। আরবের দীর্ঘতম পর্বতমালা হচ্ছে জাবাল-উস-ছারাত, যা দক্ষিণে ইয়ামন থেকে আরম্ভ করে উত্তরে সিরিয়া পর্যন্ত চলে গেছে; এর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ৮ হাজার ফুট। এই তো হল আরব দেশের বাহ্য-পরিচয়; কিন্তু এর বাহ্য পরিচয়ের নিচে? প্রায় সর্বত্রই স্বর্ণ-রৌপ্যাদি নানা মহাদামী ধাতুর খনি; শুধুমাত্র খনিজ ধাতু-দ্রব্যাদিই নয়, তেল ও পেট্রোলজাত দ্রব্যাদির প্রাচুর্যে ও ভরপুর আরবের বুক।

ঐতিহাসিকগণ আরবের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রকে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন: আরবে বায়েদা, আরবে আরবা এবং মুস্তারিবা। আরবে বায়েদা হচ্ছে আরবের প্রাচীনতম গোত্রসমূহ, যারা ইসলাম-পূর্ব কালেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল; আরবে আরবা হচ্ছে আরবে বায়েদার ধ্বংসের পর যারা এর আসল বাসিন্দা ছিল এবং যাদের আদি বাসস্থান ছিল ইয়ামন; এবং আরবে মুস্তারিবা হচ্ছে বনী ইসরাঈলের বংশধর, যারা বহিরাগত হিসাবে হেজাজে বসতি স্থাপন করেছিল।

আমাদের এসব বর্ণনার সূত্র হচ্ছে আল্লামা শিবলী নো’মানী রচিত এবং বাংলা ভাষায় কতিপয় অনুবাদকারীর সহায়তায় মাওলানা মুহিউদ্দীন খান সম্পাদিত গ্রন্থ ‘সীরাতুন্ নবী’। এই ‘সীরাতুন নবী’ অনুসারে: “ইসলামের আবির্ভাব-কাল পর্যন্ত আদনানী বলিয়া কথিত বনী কাহতান এবং বনী ইসমাঈলই আরব দেশের প্রকৃত অধিবাসী ছিল। এতদ্ব্যতীত স্বল্প-সংখ্যক ইয়াহুদী অধিবাসীও ছিল। সুতরাং দেখা যাইতেছে যে, তৎকালীন আরবের অধিবাসীরা বিভিন্ন তিন জাতির সমষ্টি ছিল। প্রত্যেকটি জাতিই অসংখ্য শাখা- গোত্রের সমন্বয়ে গঠিত ছিল। এইসব গোত্র ইয়ামন হইতে সিরিয়া পর্যন্ত সর্বত্র ছড়াইয়া-ছিল। উহাদের আবার আরও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শাখা ছিল।” (পৃ. ১০৩)

ইসলাম-পূর্ব আরবে কোন শক্তিশালী একক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অভাবে সেখানে যেসব আঞ্চলিক রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল, সেগুলো হচ্ছে: ১. মায়ীনী রাজ্য; ২. ছাবায়ী রাজ্য; ৩. হাজারামাউত রাজ্য; ৪. কাতবানী রাজ্য; এবং ৫. নাবেতী রাজ্য। (হযরত ইসমাঈল (আ)-এর এক পুত্র ‘নাবেত-এর নামানুসারে এ রাজ্যের নামকরণ হয়েছিল।)

মায়ীনী রাজ্যটির অবস্থান ছিল দক্ষিণ আরবে, যার দু’টি নগরীর নাম কার্ন ও মারীন। প্রাচীন স্মৃতিফলক থেকে এ রাজ্যের অন্যূন ২৫ জন রাজার নাম পাওয়া যায়। আর প্রাচীন স্মৃতিফলক থেকে জানা যায় যে, খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে ছাবায়ী নামের এই রাজ্যটি অস্তিত্ববান ছিল। উল্লেখ্য যে, মায়ীনী রাজ্য এবং ছাবায়ী রাজ্য দু’টি ছিল সমসাময়িক। ছাবায়ী রাজ্যের রাজধানীর নাম ‘মাআরিব’। প্রাচীন স্মৃতিফলক থেকে এ রাজ্যের ২৬ জন রাজার নাম পাওয়া যায়। কিন্তু এই রাজারা ছিল ছাবায়ী রাজ্যের আক্রমণকারী বিজয়ী হিমিয়ারী। ‘সীরাতুন নবী’র ভাষ্যমতে: “হিমিয়ারীগণ ইয়াহুদী ধর্ম গ্রহণ করিয়াছিল। প্রায় এই সময়ই আবিসিনিয়ার অধিবাসীরা দক্ষিণ আরবে রাজ্য স্থাপন করিতে শুরু করিয়াছিল। তাহারা এককালে হিমিয়ারীদিগকে পরাজিত করিয়া নিজেদের স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করিয়া লইয়াছিল।” (পৃ. ১০৬-১০৭)

এনসাইক্লোপিডিয়া বৃটানিকায় জার্মান পণ্ডিত প্রফেসর নোলডেকীর কথায়: ‘খ্রিস্টজন্মের হাজার বছর আগে দক্ষিণ-পশ্চিম আরবে অর্থাৎ ইয়ামনে যে হিমিয়ারী ও ছাবায়ী রাজ্য দু’টির অস্তিত্ব ছিল, গ্রীষ্মকালীন বৃষ্টিপাতের দরুন তা কৃষি উৎপাদনের খুবই উপযোগী ছিল। এই রাজ্যটি সভ্যতা ও সংস্কৃতির উন্নত স্তরে গিয়ে পৌঁছেছিল। তৌরীতের অনেক স্থানে এমন সব বক্তব্য রয়েছে যা ছাবা (সাবা) জাতির প্রভাব- প্রতিপত্তি ও শান-শওকতের কথা প্রমাণ করে। এ প্রসঙ্গে হযরত সুলায়মান (আ)-এর সঙ্গে সাবার রাণী বিলকিসের সাক্ষাৎ-কাহিনী সবিশেষ উল্লেখযোগ্য’। ডাউটি ও ইউটিং সাহেবদ্বয়ের গবেষণার জন্য আমরা ‘সামুদ’ জাতির ঐশ্বর্যের কথা জানতে পেরেছি।

নাবেতী রাজ্যের সীমানা চিহ্নিত ছিল সিরিয়ার সীমানা পর্যন্ত। ‘সামুদ’ জাতিরই স্থলবর্তী হয়েছিল ‘নাবেতী’ জাতি। ‘আরবের ঐতিহাসিক ভূগোল’ প্রণেতা রেভারেন্ড ফ্রস্টারের মতে: ‘নাবেতীরা একদিকে যেমন ব্যবসা-বাণিজ্যে পারদর্শী ছিল, অন্যদিকে তেমনি বনী ইসমাঈলভুক্ত হওয়ার কারণে যুদ্ধের ঝুঁকি গ্রহণেও পিছপা ছিল না’। কাতবানী রাজ্য সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় না।

এই-ই ছিল ইসলাম-পূর্বকালে বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজ্যের অবস্থা এবং ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বেই এসব রাজ্য ধ্বংসও হয়ে গিয়েছিল। ‘সীরাতুন নবী’ অনুসারে : “রাজা-বাদশার স্থলে ইয়ামন দেশে বড় বড় সরদার রহিয়া গিয়াছিল। তাহাদিগকে কাইল অথবা মিকওয়াল বলা হইত। ইরাকে আলে মুনযির বংশীয়গণ প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিল। তাহারা ছিল পারস্যের প্রভাবাধীন। আরব দেশের বিখ্যাত খুরনাক এবং সাদীর প্রাসাদসমূহ হইতেছে তৎকালের স্মৃতিচিহ্ন। সিরিয়া দেশের সীমান্তবর্তী এলাকার শাসনকর্তা ছিল গাসসান বংশীয় বাদশাগণ। তাহারা ছিল রোমান সম্রাটের প্রভাবাধীন। এই বংশের সর্বশেষ শাসনকর্তা ছিল জাবালা ইবনে আইহাম গাসসানী। (পৃ. ১০৯)

এখানে এমনি রাষ্ট্রীয় অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে: ‘তখন কেমন ছিল আরবের তাহযীব-তামদ্দুনের অবস্থা?’ মানব-সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারা আলোচনা করতে গিয়ে ফরাসি পণ্ডিত লিবন মন্তব্য করেন যে, ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে কোন এক সময়ে আরবের তাহযীব-তামাদ্দুনও উন্নত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। কারণ, সভ্যতার ক্রমবিকাশের নীতি অনুযায়ী কোন জাতিই হঠাৎ করে অসভ্যতার অবস্থা থেকে চরম উন্নত সভ্যতার স্তরে উপনীত হতে পারে না’।

সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে যে, ইসলামের আবির্ভাবকালে আরবে বিদ্যমান ছিল জাহেলিয়াতের অন্ধকার। হ্যাঁ, সে জাহেলিয়াতের সঙ্গে তখনকার মানুষের জ্ঞান-গম্যির অবস্থা জড়িত নয়; সে জাহেলিয়াতের সঙ্গে জড়িত মানুষের মানবতাহীনতার কথা। ‘জাহেলিয়া’ শব্দের অর্থ হচ্ছে তমসা, অজ্ঞতা, বর্বরতা বা কুসংস্কার। ঐতিহাসিক ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান তাঁর রচিত ‘ইসলামের ইতিহাস’ গ্রন্থে বলেন: ‘আইয়ামে জাহেলিয়া বা অজ্ঞতার যুগের সময়কাল সম্বন্ধে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ আছে।… শিক্ষা-দীক্ষা, শিল্প-সাহিত্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় প্রাক-ইসলামী যুগের আরবগণ এরূপ উন্নতির শিখরে উঠিয়াছিল যে, সাধারণভাবে ইসলামের অভ্যুত্থানের পূর্ব-যুগকে আইয়ামে জাহেলিয়া বলা যাইতে পারে না। নিকলসন অজ্ঞতার যুগকে ইসলামের আবির্ভাব-পর্বের এক শতাব্দীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করেন। হিট্টি তাঁহার অভিমত সমর্থন করিয়া বলেন যে, নবী, ঐশী কেতাব, ধর্মীয় চেতনার অবর্তমানে হযরত মুহম্মদ (সা)-এর নবুয়ত প্রাপ্তির এক শতাব্দী পূর্বে (৫১০-৬১০ খ্রিস্টাব্দে) আরব জাতির যে রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক অধঃপতন ঘটে উহাকেই ‘অজ্ঞতার যুগ’ বলা হয়।’ (পৃ.৩৭ )

আমার ব্যক্তিগত ধারণা, জাহেলিয়ার অর্থসমূহের মধ্যে ‘তমসা ও অজ্ঞতা’ বাদে ‘বর্বরতা’ ও ‘কুসংস্কার’ শব্দ দু’টিই অপেক্ষাকৃত সঠিক। ইসলাম-পূর্বকালে আরবের বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজ্যে এবং পার্শ্ববর্তী দেশসমূহেও তাহযীব-তমদ্দুনের উন্নত অবস্থা বিরাজমান থাকলেও তার প্রভাব আমাদের আলোচ্য আরবাংশে অনুভূত হতে পারে; কিন্তু সভ্যতা-সংস্কৃতির কোন কোন উপাদানের উন্নতি হলেও যে সংশ্লিষ্ট জনপদসমূহে অন্যায়-অবিচার-অত্যাচারের মাধ্যমে বর্বরতা ও কুসংস্কার বিদ্যমান থাকবে না, এমন কোন কথা নেই। এবং তেমনি অবস্থায় সংশ্লিষ্ট জনপদের মানুষকে ‘জাহেল’ বলতে বাধা কোথায়? ‘সীরাতুন নবী’র ভাষ্য মতে: “কিন্তু আরবের মূল এবং আভ্যন্তরীণ এলাকায় তাহযীব-তামদ্দুনের অবস্থা তেমন উন্নত ছিল না। আরবী ভাষা শব্দসম্ভারে পরিপূর্ণ এবং অত্যন্ত ব্যাপকতর হওয়া সত্ত্বেও তামদ্দুনিক এবং সমাজ-ব্যবস্থার আসবাব-উপকরণ সম্পর্কীয় বিষয়াদির জন্য খাস আরবী শব্দ পাওয়া যায় না। বরং যাহা কিছু আছে তাহা ইরান এবং রোম হইতে ধার করা হইয়াছে। মুদ্রা বুঝাইবার জন্য কোন শব্দই নাই। দিরহাম ও দিনার দুইই বিদেশী ভাষার শব্দ।… ফার্সী চেরাগকেই ছেরাজে রূপান্তরিত করিয়া আরবী ভাষায় ঢুকান হইয়াছে।… যে ক্ষেত্রে অনুরূপ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বস্তুসমূহের জন্যই ‘শব্দ’ ছিল না, সেই ক্ষেত্রে বিভিন্নমুখী তামদ্দুনিক বস্তু বুঝাইবার জন্য শব্দ কোথা হইতে আসিত!… অনেক বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম-এর সময় পর্যন্ত আরাম-আয়েশের আসবাব-উপকরণ অতি অল্পই ছিল। পর্দার হুকুম নাযিল হওয়া প্রসংগে বুখারী শরীফ ও অন্যান্য হাদীসগ্রন্থের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, তখন পর্যন্ত বাড়ীর সংলগ্ন পায়খানার ব্যবস্থা ছিল না। এইজন্যই স্ত্রীলোকদিগকেও প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য বাড়ীর বাহিরে যাইতে হইত। তিরমিযী শরীফের ‘বাবুল ফাকর’ বা দারিদ্র্যের বর্ণনা অধ্যায়ে বর্ণিত আছে যে, তখন পর্যন্ত চালুনীর প্রচলন ছিল না। ফুঁকিয়া ফুঁকিয়া ভূষি উড়াইয়া দেওয়ার পর যাহা থাকিত তাহাই আটা হইত। বুখারী শরীফের একটি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তখন রাত্রিতে গৃহে প্রদীপ জ্বলিত না।… ইতিহাস এবং সাহিত্যে স্পষ্টত বর্ণিত আছে যে, আরবগণ বিষাক্ত কীট, গোসাপ, গিরগিটি, রক্তচুষা ইত্যাদি কীট এবং জানোয়ারের চামড়াও ভক্ষণ করিত।” (পৃ. ১১১-১১৩)

এই হল তাদের নিম্নজীবন যাপনের একদিক; কিন্তু তাদের জীবনের অন্যান্য দিকও ছিল। মরুভূমির নিরবচ্ছিন্ন শুষ্কতা ও একঘেঁয়েমি দুরন্ত-দুর্ধর্ষ আরব বেদুঈনদের শরীর ও মন-মানস গঠনেও অপরিসীম প্রভাব বিস্তার করেছে। সাবলীল, স্বাধীন ও মুক্ত জীবনের অধিকারী এই মানুষগুলোর সমাজবদ্ধতার রীতি খুব সহজ-সরল। তাঁবুতে বসবাসকারী কয়েকটি যাযাবর পরিবার নিয়ে একটি গোত্র, কয়েকটি গোত্র নিয়ে একটি · কবিলা বা বংশের সৃষ্টি। গোত্রের অধিনায়ক একজন বেদুঈনই হচ্ছেন শেখ। গোত্রের লোকদের পরিচিতি বনূ বা বনীরূপে। একই গোত্রের মধ্যকার কোন হত্যাকাণ্ডের জন্য অপরাধীকে কেউ সাহায্য করত না বটে, কিন্তু অপর কোন গোত্র যদি এমনি হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী হত, তাহলে সমগ্র গোত্রের জন্য সেই হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ অবশ্যকরণীয় হয়ে পড়ত। এমনি অবস্থায় রক্তের বদলে রক্তের দাবিই ছিল গোত্রভিত্তিক আরব সমাজের অলঙ্ঘনীয় রীতি।

আর রক্তসম্পর্ক? অবর্জনীয়, চিরস্থায়ী। একপাত্রে খাদ্য গ্রহণ অথবা গোত্রের কোন সদস্যের রক্ত চুষলেই সে ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেত ওই গোত্রের। আর গোত্রভুক্ত হওয়া মানে যে কি, তা তো আগেই বলা হয়েছে। এবং কোন আরব তরুণ বা বয়স্ক ব্যক্তির সাধারণ বৈশিষ্ট্য বা রূপ কেমন ছিল! ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যসসম্পন্ন, অতিথিপরায়ণ, পৌরুষের গরিমায় উজ্জ্বল, তীর-তলোয়ার সজ্জিত এক অশ্বারোহী! বচনে-বাচনে কাব্যময়তা ও বাগ্মিতার চমক, ব্যবহারে বিশ্বস্ততা-এই-ই একজন আরব।

আমরা যদি ঐতিহাসিক হিট্টির মতানুসারে, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বেকার শত বর্ষকে (৫১০-৬১০ খ্রিস্টাব্দকে) ‘জাহেলিয়া যুগ’ বলে ধরে নিই– অন্তত হেজাজের ক্ষেত্রে, তাহলে স্বীকার করে নিতে হয় যে, এ যাবত আল্লাহ্ প্রেরিত নবী-রাসূলদের তওহীদের আদর্শ থেকে কালে কালে বিচ্যুত মানব জাতি এক সঙ্কটজনক ও অভিশপ্ত অবস্থায় পতিত হয়েছিল। (সভ্যতা-সংস্কৃতির আলোকপ্রাপ্ত পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদ-রাজ্য-সাম্রাজ্যেও তখন অমানবতার জাহেলিয়াত বিদ্যমান ছিল)। ঐতিহাসিক ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসানের কথায়: “ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে ইয়াহুদীগণ ধর্মগুরুর প্রদর্শিত পথ ও একেশ্বরবাদের পথ ভুলিয়া পৌত্তলিকতার আশ্রয় গ্রহণ করে। খ্রিস্টানগণ হযরত ঈসা (আ)-এর প্রচারিত ধর্মমত হইতে বিচ্যুত হইয়া ত্রিত্ববাদে (Trinity) বিশ্বাসী হইয়া পড়ে। দক্ষিণ আরবে খ্রিস্টান, ইয়াহূদী ও পরবর্তীকালে জরথুস্ত্র ধর্মের প্রভাব ধর্মীয় ক্ষেত্রে এক নৈরাশ্যজনক পরিবেশের সৃষ্টি করে। এই চরম দুর্গতিসম্পন্ন জাতিকে ন্যায় ও সত্যের পথে পরিচালিত করিবার জন্য একজন মহাপুরুষের আবির্ভাব অবশ্যম্ভাবী হইয়া পড়িল। আমীর আলীর ভাষায়, ‘পৃথিবীর ইতিহাসে পরিত্রাণকারীর আবির্ভাবের এত বেশী প্রয়োজন এবং এমন উপযুক্ত সময় অন্যত্র অনুভূত হয় নাই’। অবশেষে আল্লাহ্ মানব জাতিকে হেদায়েতের জন্য হযরত মুহম্মদ (সা)-কে শ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ পয়গম্বররূপে বিশ্বে প্রেরণ করিলেন। শুধু আরবের জন্য নয়, বরং সমগ্র বিশ্বে কুসংস্কারের কুহেলিকা ভেদ করিয়া তৌহিদের বাণী প্রচার করিবার জন্য তিনি মক্কায় ভূমিষ্ঠ হইলেন। তিনি অনন্ত কল্যাণ ও স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, আপোসহীন তৌহিদবাদের প্রতীক।” (ইসলামের ইতিহাস, ১৯৭৬, পৃ.৪৯-৫০)

দেখা যাচ্ছে, দুরন্ত-দুর্ধর্ষ, মানবতা-বিবর্জিত ও পাপ-পঙ্কিলে জর্জরিত অথচ মানুষের অশোধিত প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরপুর এবং মুক্ত প্রকৃতির নিখাদ সন্তানের মৌলিক গুণাবলী প্রকাশে প্রয়োজনে অভ্যস্ত আরব জাতির মধ্যেই বিশ্বমানবতার ভাবী ত্রাণকর্তা মুক্তিদাতা ও শান্তির পথ-প্রদর্শকের আবির্ভাব হয়! মৌলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ যথার্থই বলেন: “যিনি জগতের মানব সমাজের মুক্তির জন্য যুগপৎভাবে তাহাদের দেহ ও মনকে এক আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য যাবতীয় পার্থিব শক্তির অধীনতা হইতে মুক্ত করিবার জন্য আবির্ভূত হইবেন, আরবের ন্যায় সম্পূর্ণ মুক্ত ও চিরস্বাধীন দেশ ব্যতীত অন্য কোথাও তাঁহার প্রথম আবির্ভাব হইতে পারে না। স্বাধীন দেশ-মাতৃকার ক্রোড়ে প্রতিপালিত স্বাধীন আরব, স্বাধীন আরবের অবনমিত মস্তক, তাহার গৌরব-গরিমায় স্ফীত স্বাধীন বক্ষের কঠোর কর্তব্যনিষ্ঠা এবং তাহার অবিচল কর্মশক্তি প্রভৃতি সমগ্র সদৃগুণ লইয়া এমন এক সাধকদল গঠনের আবশ্যক ছিল, যাহারা সেই ভাবী মুক্তিদাতার অগ্র-পশ্চাতে ও দক্ষিণে-বামে দণ্ডায়মান হইয়া বলিবে: আমরা আপনাদিগকে স্বর্গের আহ্বানে সত্যের সেবার জন্য তাঁহার দূতের মারফতে বিক্রয় করিয়া ফেলিলাম।” (মোস্তফা চরিত, পৃ. ১৭৮-১৭৯)

ইসলামের অভ্যুদয় হল, মহান আল্লাহর নির্দেশাবলী সম্বলিত পবিত্র আল- কুরআনের প্রয়োগরূপ নবীজী (সা)-র সীরাতে অনুসৃত হয়ে বিশুদ্ধ তৌহিদবাদ প্রতিষ্ঠিত হল; কিন্তু তা হল বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সংগ্রামের পর।

এই যে বিশ্বমানবতার সর্বাঙ্গীণ মুক্তির লক্ষ্যে পবিত্র আল-কুরআনের নির্দেশিত প্রয়োগ-রূপ ‘রহমাতুল্লিল ‘আলামীন’ হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আশ্চর্য সীরাতের স্বরূপ অনুভব ও অনুসরণের প্রয়োজন আজকের সমস্যা জর্জরিত পৃথিবীতে সর্বাধিক বলে নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি। তৌহিদের মহান আলোকে মানুষের মধ্যে সর্ববিধ পরিবর্তনের মাধ্যমে ইসলামের মহনাবী (সা) আরবের তথা মুসলিম বিশ্বের জন্য সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে যে অভূতপূর্ব সংস্কারধর্মী বিপ্লবের সূচনা করে সাফল্য অর্জন করে গেছেন, তা তুলনাবিহীন। স্বনামধন্য পাশ্চাত্য মনীষী বার্নার্ড শ’র কথায়: ‘যদি গোটা বিশ্বের বিভিন্ন ধর্ম, সম্প্রদায়, আদর্শ ও মতবাদসম্পন্ন মানব জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করিয়া একনায়কের শাসনাধীনে আনা হইত তবে একমাত্র মুহম্মদ (সা)-ই সর্বাপেক্ষা সুযোগ্য নেতারূপে তাহাদিগকে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে পরিচালিত করিতে পারিতেন’।

ইসলামের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কথা চিন্তা করে ঐতিহাসিক এডওয়ার্ড গীবন বলেন: ‘ইহা এমন একটি স্মরণীয় বিপ্লব, যাহা পৃথিবীর সমস্ত জাতিসমূহে একটি নতুন এবং চিরস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করিয়াছে।’ এনসাইক্লোপিডিয়া বৃটানিকায় যথার্থই বলা হয়েছে: ‘বিশ্বের সমস্ত ধর্মপ্রচারকদের মধ্যে মুহাম্মদ (সা) সর্বাপেক্ষা কৃতী বা সার্থক ছিলেন’।

এই তো গেল কতিপয় অমুসলিম মনীষীর মন্তব্য। আর আমরা যারা ইসলাম- অনুসারী বলে দাবি করি, আমাদের নবীজী (সা) সম্বন্ধে আমাদের কি মন্তব্য হতে পারে! ‘সীরাতুন নবী’র ‘প্রকাশকের নিবেদন’-এ বলা হয়েছে: ‘মানব জীবনের পরম সাফল্য হইতেছে তাহার ইহ ও পারলৌকিক জীবনে প্রকৃত শান্তি লাভ করা। আর এই সাফল্য সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করিয়া থাকে ভাল-মন্দ সব কিছুর একমাত্র নিয়ন্তা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের অনুগ্রহ ও শুভেচ্ছা লাভ করার উপর। এই পরম সৌভাগ্য কি করিয়া লাভ হইবে সেই সম্পর্কেই স্বয়ং রাব্বুল ‘আলামীন অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় বলিয়াছিলেন-’হে রাসূল! আপনি তাহাদিগকে বলিয়া দিন, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসিতে চাও, তবে আমাকে অনুসরণ কর। এর দ্বারা তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করিতে সমর্থ হইবে’। সুতরাং দেখা যাইতেছে যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের জীবনাদর্শকে পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করিয়াই শুধুমাত্র আমরা জীবনের সাফল্য লাভ করিতে সমর্থ হইব।”

আজ এই দিনে আমাদের আকুল প্রার্থনা; হে রাব্বুল আলামীন আল্লাহ ! আপনি আমাদেরকে আপনার প্রিয়তম নবীজির (সা) পবিত্র সীরাতকে অনুভব ও অনুসরণ করে আদর্শ, কামিয়াবীপূর্ণ জীবন ও কল্যাণ-সমাজ গঠনের তৌফিক দান করুন! সাল্লাল্লাহু “আলা মুহাম্মদ ওয়া সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম!

***উক্ত লিখাটি ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত ‘কল্যাণ সমাজ গঠনে মহানবী (সা)’ প্রবন্ধ সংকলন থেকে সংগৃহীত। 

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
slot gacor skybet88 slot online skybet88 skybet88 skybet88 slot gacor skybet88 skybet88 slot bonus new member skybet88 slot shopeepay skybet88 skybet88 skybet88 slot shopeepay slot gacor skybet88 demo slot skybet88 skybet88 skybet88 skybet88 skybet88 skybet88