ইসলামের ইতিহাস

রমযান মাসের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী ও এর কিছু শিক্ষা (চতুর্থ ও শেষ পর্ব)

 রমযান মাসের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী ও এর শিক্ষা

২২ রমযান:

ক- তায়েফ বিজয়:

৮ম হিজরীর ২২ রমযান মোতাবেক ১২ জানুয়ারী ৬৩০ খৃস্টাব্দে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফে যান এবং তা জয়লাভ করেন।

খ- ইমাম ইবন মাজাহ রহ. এর মৃত্যু:

২৭৩ হিজরীর ২২ রমযান মোতাবেক ২০ ফেব্রুয়ারি ৮৮৬ খৃস্টাব্দে ইমাম ইবন মাজাহ রহ. মারা যান।

২৩ রমযান:

ক- ৯ হিজরীর ২৩ রমযান (৬৩১ খৃস্টাব্দ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে আরবের বিখ্যাত ‘লাত’ মূর্তি ধ্বংস করা হয়।

খ- ২২০ হিজরীর ২৩ রমযান মোতাবেক ২০ সেপ্টেম্বর ৮৩৫ খৃস্টাব্দে মিসরের তুলুন রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা আহমদ ইবন তুলুন জন্মগ্রহণ করেন।

২৪ রমযান:

আমর ইবন ‘আস মসজিদ নির্মাণ:

২০ হিজরীর ২৪ রমযান মোতাবেক ৫ সেপ্টেম্বর  ৬৪১ খৃস্টাব্দে সাহাবী আমর ইবন ‘আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর নেতৃত্বে মুসলমানরা মিসরের কায়রোতে বিখ্যাত আমর ইবন ‘আস মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। [1]

২৫ রমযান:

ক- মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাযিল:

রমযান মাসকে আল্লাহ তা‘আলা আসমানী কিতাবসমূহকে নাযিলের মাস হিসেবে নির্বাচন করেছেন। এ মাসেই কদরের রাতে নাযিল হয় মানবতার মুক্তির দিশারী সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী কিতাব ‘আল কুরআন’। তাছাড়া তাওরাত, যবুর, ইঞ্জীল ও ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালামের সহীফাসহ অনেক কিতাব এ মাসে নাযিল হয়। আল-কুরআনে এসেছে,

﴿شَهۡرُ رَمَضَانَ ٱلَّذِيٓ أُنزِلَ فِيهِ ٱلۡقُرۡءَانُ هُدٗى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَٰتٖ مِّنَ ٱلۡهُدَىٰ وَٱلۡفُرۡقَانِۚ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ ٱلشَّهۡرَ فَلۡيَصُمۡهُۖ وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوۡ عَلَىٰ سَفَرٖ فَعِدَّةٞ مِّنۡ أَيَّامٍ أُخَرَۗ يُرِيدُ ٱللَّهُ بِكُمُ ٱلۡيُسۡرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ ٱلۡعُسۡرَ وَلِتُكۡمِلُواْ ٱلۡعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُواْ ٱللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَىٰكُمۡ وَلَعَلَّكُمۡ تَشۡكُرُونَ١٨٥﴾ [البقرة: ١٨٥]

“রমযান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে মাসটিতে উপস্থিত হবে, সে যেন তাতে সিয়াম পালন করে। আর যে অসুস্থ হবে অথবা সফরে থাকবে তবে অন্যান্য দিবসে সংখ্যা পূরণ করে নেবে। আল্লাহ তোমাদের সহজ চান এবং কঠিন চান না। আর যাতে তোমরা সংখ্যা পূরণ কর এবং তিনি তোমাদেরকে যে হিদায়াত দিয়েছেন, তার জন্য আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা কর এবং যাতে তোমরা শোকর করো।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৫]

ওয়াসেলাহ ইবন আসকা‘ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

“أُنْزِلَتْ صُحُفُ إِبْرَاهِيمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ فِي أَوَّلِ لَيْلَةٍ مِنْ رَمَضَانَ، وَأُنْزِلَتِ التَّوْرَاةُ لِسِتٍّ مَضَيْنَ مِنْ رَمَضَانَ، وَالْإِنْجِيلُ لِثَلَاثَ عَشْرَةَ خَلَتْ مِنْ رَمَضَانَ، وَأُنْزِلَ الْفُرْقَانُ لِأَرْبَعٍ وَعِشْرِينَ خَلَتْ مِنْ رَمَضَانَ “.

“রমযানের প্রথম রাতে ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালামের ওপর সহিফাসমূহ নাযিল হয়, রমযানের ছয়দিন অতবাহিত হলে মূসা ‘আলাইহিস সালামের ওপর তাওরাত নাযিল হয়, তেরই রমযান অতিবাহিত হলে ঈসা ‘আলাইহিস সালামের ওপর ইঞ্জীল নাযিল হয় আর ২৫ রমযান মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর কুরআন নাযিল হয়।”[2]

খ- আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের বিজয়: “কুরআন আল্লাহর সৃষ্ট নয়”:

কুরআন কি আল্লাহর সৃষ্টি? নাকি তার জাত? বা সিফাত? আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মতে, কুরআন মাখলুক নয়, আবার তা আল্লাহর জাতও নয়; বরং কুরআন আল্লাহর কালাম, তার সিফাত। খলিফা মুতাসিম বিল্লাহ ইমাম আহমদ রহ.-কে নানাভাবে যুলুম নির্যাতন করে জোর করে কুরআন আল্লাহর মাখলুক বলানোর নানা ষড়যন্ত্র করেন। তাঁকে বন্দি করে নির্যাতন করেন; কিন্তু তিনি এত যুলুম নির্যাতনের পরেও সত্যের পথে অটুট ছিলেন। ২২১ হিজরীর ২৫শে রমযান তাঁকে বন্দি করে নির্মম নির্যাতন করলে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। তাঁর হুশ ফিরে আসলে সাওম ভঙ্গ করানোর চেষ্টা করা হলেও তিনি সাওম ভঙ্গ করেন নি; বরং তিনি ধৈর্য ধারণ করেন। পরিশেষে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদাই বিজয় লাভ করে।[3]

গ-‘আইন জালুত বিজয়:

৬৫৮ হিজরীর ২৫শে রমযান শুক্রবার মিসরের আমির সাইফুদ্দিন কুতযের নেতৃত্বে হালাকু খানের শাম দেশীয় তাতার সেনাপতি কাতবাগানুইনকে পরাজিত করে ‘আইনে জালুত বিজয় লাভ করেন।[4]

ঘ- তাছাড়া ৫৪৪ হিজরীর ২৫ রমযান মোতাবেক ২৬ জানুয়ারী ১১৫০ খৃস্টাব্দে বিশিষ্ট মুফাসসির ও ফকীহ ‘ফখরুদ্দিন রাযী’ রহ. জন্মগ্রহণ করেন।

২৬ রমযান:

ক- তাবুক যুদ্ধ শেষে প্রত্যাবর্তন:

৯ হিজরীর ২৬ রমযান মোতাবেক ৫ জানুয়ারী ৬৩১ খৃস্টাব্দে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক যুদ্ধ শেষে বিজয়ী বেশে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।

খ- ৮০৮ হিজরীর ২৬ রমযান মোতাবেক ১৬ মার্চ ১৪০১ খৃস্টাব্দে বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী আব্দুর রহমান ইবন খালদূন মারা যান।

২৭ রমযান:

ক- হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের মৃত্যু:

৯৫ হিজরীর ২৭শে রমযান কদরের রাত্রিতে আল্লাহ মুসলিম উম্মাহর ওপর এক বিশেষ রহমত নাযিল করেন। সেদিন অত্যাচারী হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ আস-সাকাফী মারা যায়। এ অত্যাচারীর মৃত্যুতে সমকালীন আলিমগণ অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। তার মৃত্যুতে মুসলিমর ওপর থেকে এক বালা-মুসীবতের অবসান ঘটেছিল।[5]

খ- মুসলিমদের জার্মান বিজয়:

এছাড়াও ১১০৭ হিজরীর ২৭ রমযান মোতাবেক ২০ এপ্রিল ১৬৯৬ খৃস্টাব্দে উসমানী শাসনামলে মুসলিম বাহিনী জার্মান বাহিনীর ওপর বিজয় লাভ করে।

২৮ রমযান:

ক- সাকি গোত্রের ইসলাম গ্রহণ:

৯ম হিজরীর ২৮ রমযান মোতাবেক ১ জানুয়ারী ৬৩১ খৃস্টাব্দে তায়েফের সাকিফ গোত্রের প্রতিনিধিদল মদীনায় এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাদের আগমনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে উষ্ণ সংবর্ধনা জানান এবং তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ সুফিয়ান ইবন হরব ও মুগীরা ইবন শু‘বা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে পাঠিয়ে তাদের ভ্রান্ত মূর্তিসমূহ ভেঙ্গে ফেলেন।[6]

খ- সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব:

২য় হিজরীর ২৮ শে রমযান আল্লাহ তা‘আলা মুসলিমদের ওপর যাকাতুল ফিতর ওয়াজিব করেন।

গ- স্পেনে ইসলামের বিজয় পতাকা:

৯১ হিজরীর ২৮ রমযান বীরপুরুষ তারেক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে মুসলিমরা ইউরোপের তৎকালীন প্রাণকেন্দ্র স্পেন বিজয় লাভ করেন। তারেক ইবন জিয়াদের মাত্র বারোহাজার সৈন্য সেদিন স্পেনের সম্রাট লুজলাইকের লক্ষাধিক সৈন্যবাহিনীকে পরাজিত করেছিলেন।

২৯ রমযান:

ক- কায়রোয়ান শহর নির্মাণ:

৪৮ হিজরীর ২৯ রমযান মোতাবেক ৯ নভেম্বর ৬৬৮ খৃস্টাব্দে বিশিষ্ট সাহাবী ‘উকবা ইবন নাফে‘ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর নির্দেশে বিখ্যাত কায়রোয়ান শহর নির্মাণ করা হয়।

খ- আমর ইবন ‘আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর মৃত্যু:

৪৩ হিজরীর ৩০ রমযান মোতাবেক ৬৬৪ খৃস্টাব্দে আমর ইবন ‘আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ১০০ বছর বয়সে মারা যান।

৩০ রমযান:

ইমাম বুখারীর মৃত্যু:

২৫৬ হিজরীর ৩০ রমযান মোতাবেক ৩১ আগস্ট ৮৬৯ খৃস্টাব্দে মুহাম্মাদ ইবন ইসমাইল আল বুখারী রহ. মারা যান।[7]

এছাড়াও রমযান মাসে আরো অনেক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এখানে রমযানে সংঘটিত আরো কিছু ঘটনা নিম্নে উল্লেখ করা হলো।

খন্দকের যুদ্ধের প্রস্তুতি:

ইসলামের আরেক মহাবিজয়ের নাম খন্দকের যুদ্ধ। নির্ভরযোগ্য মতানুসারে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ৫ম হিজরীর শাওয়াল মাসে। আর এ যুদ্ধের প্রস্তুতি বিশেষ করে মদীনার তিনদিকে খন্দর খননের কাজ হয়েছিল রমযান মাসে।[8]

খন্দকের যুদ্ধের শিক্ষা:

১- পরামর্শের গুরুত্ব: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর সরাসরি আসমান থেকে অহী নাযিল হওয়া সত্বেও তিনি এ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করেন। নানা জনের নানা মতের পরে তিনি সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর পরামর্শ গ্রহণ করেন এবং মদীনার চারপাশে খন্দক খননের সিদ্ধান্ত নেন।

২- এ যুদ্ধের প্রস্তুতিকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের সাথে সাওমা রেখে পরিখা খনন কাজে অংশ গ্রহণ করেন। তিনি সমগ্র পৃথিবীর সর্দার ও সেনাপতি হওয়া সত্বেও তিনি সাধারণ মানুষের মতোই কাজ করেছিলেন।

৩- উৎসাহ উদ্দীপনামূলক সাহিত্য চর্চা:

এ যুদ্ধে সাহাবীদের কষ্ট লাঘব করতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিখা খননের সময় কবিতা আবৃতি করেছিলেন। সুস্থ সুন্দর সাহিত্য ও শিল্পচর্চা এ যুদ্ধ থেকে আমরা শিক্ষা লাভ করি।

৪- এ যুদ্ধের পরিখা খননকালে সাহাবীরা খুধা ও তৃষ্ণায় কাতর হওয়া সত্বেও ধৈর্য ধারণ করেন। এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামও নিজে না খেয়ে পেটে পাথর বেঁধে খনন কাজ করেছিলেন।

৫- আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস, তাওয়াক্কুল ও বুদ্ধিমত্ত্বার সাথে কাজ করে মুসলমনরা এ যুদ্ধে বিজয় লাভ করেন। এ যুদ্ধ মুসলিমদের সমরকৌশল ও ইসলামী  আর্কিটেক্ট এর প্রমাণ বহন করে।

ইফকের ঘটনা:

মুনাফিকরা সর্বকালেই ইসলামের গোপন শত্রু। তারা পুতঃপবিত্র উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করে ইসলামের বিজয়কে কলুষিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা জানে না যে, মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্থানে যাবে। ৫ম বা ৬ষ্ঠ হিজরীতে শাবান মাসে বনী মুস্তালিক যুদ্ধ (মুরাইসিয়ার যুদ্ধ) শেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিজয়ী বেশে মদীনা ফেরার পথে বিশ্রামের জন্য মুসলিম বাহিনী অবতরণ করেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা প্রকৃতির আহ্বানে সাড়া দিতে গিতে গলার হার হারিয়ে ফেলেন। তিনি উক্ত হার খুঁজতে বিলম্ব করলে করেন। এদিকে মুসলিম বাহিনী মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার সাওয়ারী বহনকারীরা ধারণা করেছিলো যে, তিনি হাওদার মধ্যে অবস্থান করছেন। তাই তারা হাওদা সাওয়ারীর ওপর নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেলেন। কিছুদূর যাওয়ার পরে প্রকৃত অবস্থা জানাজানি হয়ে গেলে মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ ইবন উবাই আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা শুরু করেন। এ ঘটনা শাবান মাসে ঘটে এবং রমযান পর্যন্ত ব্যাপ্তি ছিল। ধৈর্য ও সাহায্যের মাস রমযানে আল্লাহ তা‘আলা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে অহীর মাধ্যমে পাক-পবিত্রা ঘোষণা করেন। এ ঘটনা কুরআনে এভাবে এসেছে,

﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ جَآءُو بِٱلۡإِفۡكِ عُصۡبَةٞ مِّنكُمۡۚ لَا تَحۡسَبُوهُ شَرّٗا لَّكُمۖ بَلۡ هُوَ خَيۡرٞ لَّكُمۡۚ لِكُلِّ ٱمۡرِيٕٖ مِّنۡهُم مَّا ٱكۡتَسَبَ مِنَ ٱلۡإِثۡمِۚ وَٱلَّذِي تَوَلَّىٰ كِبۡرَهُۥ مِنۡهُمۡ لَهُۥ عَذَابٌ عَظِيمٞ١١ لَّوۡلَآ إِذۡ سَمِعۡتُمُوهُ ظَنَّ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتُ بِأَنفُسِهِمۡ خَيۡرٗا وَقَالُواْ هَٰذَآ إِفۡكٞ مُّبِينٞ١٢ لَّوۡلَا جَآءُو عَلَيۡهِ بِأَرۡبَعَةِ شُهَدَآءَۚ فَإِذۡ لَمۡ يَأۡتُواْ بِٱلشُّهَدَآءِ فَأُوْلَٰٓئِكَ عِندَ ٱللَّهِ هُمُ ٱلۡكَٰذِبُونَ ١٣ وَلَوۡلَا فَضۡلُ ٱللَّهِ عَلَيۡكُمۡ وَرَحۡمَتُهُۥ فِي ٱلدُّنۡيَا وَٱلۡأٓخِرَةِ لَمَسَّكُمۡ فِي مَآ أَفَضۡتُمۡ فِيهِ عَذَابٌ عَظِيمٌ١٤ إِذۡ تَلَقَّوۡنَهُۥ بِأَلۡسِنَتِكُمۡ وَتَقُولُونَ بِأَفۡوَاهِكُم مَّا لَيۡسَ لَكُم بِهِۦ عِلۡمٞ وَتَحۡسَبُونَهُۥ هَيِّنٗا وَهُوَ عِندَ ٱللَّهِ عَظِيمٞ١٥ وَلَوۡلَآ إِذۡ سَمِعۡتُمُوهُ قُلۡتُم مَّا يَكُونُ لَنَآ أَن نَّتَكَلَّمَ بِهَٰذَا سُبۡحَٰنَكَ هَٰذَا بُهۡتَٰنٌ عَظِيمٞ١٦ يَعِظُكُمُ ٱللَّهُ أَن تَعُودُواْ لِمِثۡلِهِۦٓ أَبَدًا إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِينَ١٧ وَيُبَيِّنُ ٱللَّهُ لَكُمُ ٱلۡأٓيَٰتِۚ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ١٨ إِنَّ ٱلَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ ٱلۡفَٰحِشَةُ فِي ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٞ فِي ٱلدُّنۡيَا وَٱلۡأٓخِرَةِۚ وَٱللَّهُ يَعۡلَمُ وَأَنتُمۡ لَا تَعۡلَمُونَ ١٩ وَلَوۡلَا فَضۡلُ ٱللَّهِ عَلَيۡكُمۡ وَرَحۡمَتُهُۥ وَأَنَّ ٱللَّهَ رَءُوفٞ رَّحِيمٞ٢٠﴾ [النور : ١١،  ٢٠]

“নিশ্চয় যারা এ অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। এটাকে তোমরা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর মনে করো না, বরং এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের থেকে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য রয়েছে, যতটুকু পাপ সে অর্জন করেছে। আর তাদের থেকে যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে, তার জন্য রয়েছে মহাআযাব। যখন তোমরা এটা শুনলে, তখন কেন মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা তাদের নিজদের সম্পর্কে ভাল ধারণা পোষণ করল না এবং বলল না যে, ‘এটা তো সুস্পষ্ট অপবাদ’? তারা কেন এ ব্যাপারে চারজন সাক্ষী নিয়ে আসল না? সুতরাং যখন তারা সাক্ষী নিয়ে আসেনি, তখন তারাই আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী। আর যদি দুনিয়া ও আখিরাতে তোমাদের ওপর আল্লাহর দয়া ও তাঁর অনুগ্রহ না থাকত, তবে তোমরা যাতে লিপ্ত ছিলে, তার জন্য তোমাদেরকে অবশ্যই কঠিন আযাব স্পর্শ করত। যখন এটা তোমরা তোমাদের মুখে মুখে ছড়াচ্ছিলে এবং তোমরা তোমাদের মুখ দিয়ে এমন কথা বলছিলে, যাতে তোমাদের কোন জ্ঞান ছিল না; আর তোমরা এটাকে খুবই তুচ্ছ মনে করছিলে, অথচ এটা আল্লাহর নিকট খুবই গুরুতর। আর তোমরা যখন এটা শুনলে, তখন তোমরা কেন বললে না যে, ‘এ নিয়ে কথা বলা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তুমি অতি পবিত্র মহান, এটা এক গুরুতর অপবাদ’। আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন যে, যদি তোমরা মুমিন হও, তাহলে আর কখনো এর পুনরাবৃত্তি করবে না। আর আল্লাহ তোমাদের জন্য আয়াতসমূহ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করছেন এবং আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না। আর যদি তোমাদের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়া না থাকত, (তাহলে তোমরা ধ্বংস হয়ে যেতে) আর নিশ্চয় আল্লাহ বড় মেহেরবান, পরম দয়ালু।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ১১-২০]

শিক্ষা:

১- মুনাফিকরা সবসময়ই ইসলামের শত্রু। সুতরাং তাদের থেকে সাবধান।

২- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা পাক-পবিত্রা ছিলেন। আল্লাহ তার পবিত্রতার সাক্ষ্য দিয়েছেন।

৩- বিপদে পড়লে ধৈর্য্হারা না হয়ে আল্লাহর ওপর আস্থা রেখে বিপদের মোকাবিলা করা উচিৎ। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে যখন সবাই দোষারোপ করছিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই যখন তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেন, তখন তিনি একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করে দিন-রাত আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে তাঁর সাহায্য চান। অবশেষে তিনি আল্লাহর সাহায্য প্রাপ্ত হয়ে পবিত্রতার মালা পরিধান করেন।

হিমইয়ার সম্রাটের দূত প্রেরণ ও তাদের ইসলাম গ্রহণ:

৯ হিজরীর রমযান মাসে হিমইয়ারের রাজা তাঁর ইসলাম গ্রহণের সংবাদ দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট দূত প্রেরণ করেন।

বীর সেনাপতি আব্দুর রহমান গাফেকীর শাহাদাত:

১১৪ হিজরীর রমযান মাসে স্পেনের বীর সেনাপতি, খৃস্টানদের আতঙ্ক আব্দুর রহমান গাফেকী তুরের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। এ যুদ্ধে যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে মুসলমানেরা খৃস্টান ডিউককে পরাজিত করেছিল; কিন্তু যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে মুসলিমরা পরাজয় বরণ করেন।[9]

ইসলামের শীতল ছায়া তলে ফ্রান্স:

মুসলমানরা স্পেন জয় করে উত্তর দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। খলিফা উমার ইবন আব্দুল আযীযের শাসনামলে ‘সামহ ইবন মালেক আল-খাওলানী’-এর নেতৃত্বে মুসলিমগণ ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চল বিজয় লাভ করেন। মুসলিম সেনাবাহিনী ‘আনবাসাহ ইবন সুহাইম’-এর নেতৃত্বে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ত্রিশ কিলোমিটার দূরে ‘মাসূন শালুন ও সান্স’ ইত্যাদি শহর দখল করেন। ফ্রান্সে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন হলে ধীরে ধীরে তা ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

মসজিদে আকসা খৃস্টানদের জোরদখল:

৪৯২ হিজরীর রমযান মাস মুসলিমদের ইতিহাসে একটি দুঃখ-বেদনা ও শোকের মাস। সেদিন খৃস্টানরা মুসলিমদের প্রথম কিবলা মসজিদে আকসা জবর দখল করে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে সেনাপতি সালাহ উদ্দিন আইয়ুবীর নেতৃত্বে ৫৩৮ হিজরীর ২৭ শে রজব শুক্রবার ভোরে মুসলিমরা পুনঃদখল করেন।

লেখকঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন আল-আযহারী

তথ্যসূত্রঃ

[1] হুসনুল মুহাদারাহ, আল্লামা সুয়ূতী, ১/৪৭।

[2] মুসনাদ আহমদ, হাদীস নং ১৬৯৮৪, শুয়াইব আরনাউত হাদীসটিকে দ‘য়ীফ বলেছেন। জামেউস সগীর, হাদীস নং ১৪৯৭, আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন এবং সনদের রাবীদেরকে সিকাহ বলেছেন। তিনি আরো বলেছেন, ইবন ‘আসাকেরে (২/১৬৭) আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত হাদীস হাদীসের শাহেদ।

[3] নিয়াউর রাইয়ান, ১/৩৬৯।

[4] তারিখে ইবন ওয়ারদী, ২/২০১।

[5] আল বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ৯/১৪৩-১৪৬।

[6] আল বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: (৫/৪০)।

[7] সিয়ারু ‘আলামিন নুবালা, ১০/১৯।

[8] আল বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: (৪/১০৬-১১৫)।

[9] দেখুন: মা‘আরিকুল মুসলিমীনা ফি রমাদান, পৃ. ৫৪-৫৫।

মতামত দিন