রমযান মাসের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী ও এর কিছু শিক্ষা (দ্বিতীয় পর্ব)

 রমযান মাসের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী ও এর শিক্ষা

১০ই রমযান:

ক- খাদিজা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার মৃত্যু:

নবুওয়াতের দশম বছর রমযান মাসের ১০ তারিখ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন সঙ্গিনী, সুখে দুঃখে তাঁর পাশে দাঁড়ানো বন্ধু, সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারিণী খাদিজা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা মারা যান। এ বছরই রমযান মাসে। অন্য বর্ণনায় রজব মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মক্কায় ছায়াদানকারী, একমাত্র অভিভাবক চাচা আবূ তালিব মারা যান। ফলে ইহিহাসের পাতায় এ বছরকে ‘আমুল হুযন’ তথা দুঃখের বছর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

মুহাম্মাদ ইবন সালেহ ও আব্দুর রহমান ইবন আব্দুল আযীয থেকে বর্ণিত, তারা বলেন,

«تُوُفِّيَتْ خَدِيجَةُ لِعَشْرٍ خَلَوْنَ مِنْ شَهْرِ رَمَضَانَ وَذَلِكَ قَبْلَ الْهِجْرَةِ بِثَلَاثِ سِنِينَ وَهِيَ يَوْمَئِذٍ بِنْتُ خَمْسٍ وَسِتِّينَ سَنَةً».

“খাদিজা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা হিজরতের তিন বছর পূর্বে রমযানের ১০ দিন অতিবাহিত হলে মারা যান, তখন তার বয়স ছিল ৬৫ বছর।”[1]

খ- আব্দুল্লাহ ইবন মুবারক ও ইমাম মুযানী রহ.-এর মৃত্যু:

১৮১ হিজরীর ১০ রমযান ইসলামের ইতিহাসে এক অনবদ্য মুজতাহিদ, আধ্যাত্মিক পুরুষ, বিশিষ্ট মুহাদ্দিস আব্দুল্লাহ ইবন মুবারক রহ. মারা যান।[2]

২৬৪ হিজরীর রমযান মাসে ইমাম শাফে‘ঈর অন্যতম ছাত্র আবূ ইবরাহীম ইসমাঈল ইবন ইয়াহইয়া ইবন ইসমাঈল ইবন আমর ইবন মুসলিম আল-মুযানী আল-মিসরী রহ. মারা যান।[3]

রমযানে সৎ ও অসৎলোকদের মৃত্যু থেকে শিক্ষা:

পবিত্র রমযান মাসে খাদিজা আয়েশা, ফাতিমা, আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমসহ অনেক সাবাহী ও নেককার বান্দাহদের মৃত্যু হয়। তাদের মৃত্যু থেকে আমরা শিক্ষা লাভ করতে পারি যে, একমাত্র আমলই নাজাতের মাফকাঠি। রমযানে আল্লাহ কবরের ‘আযাব মাফ করেন। এ মাসের অসংখ্য ফযীলত থাকায় নেককার বান্দাদের এ মাসে মৃত্যু আল্লাহর অশেষ নি‘আমত।

পক্ষান্তরে অনেক অত্যাচারী, যালিম যেমন, হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের মৃত্যু ইত্যাদি দ্বারা আল্লাহ বান্দাদেরকে সতর্ক করেন যে, যুলুম নির্যাতন করে কেউ আল্লাহর সীমা থেকে পার পেতে পারে না। একদিন না একদিন আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হতেই হবে। তাছাড়া যালিমদেরকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া মুসলিমনের জন্য এক ধরণের বিজয়।

গ- মিসরে অভিশপ্ত ইয়াহুদীদের ওপর মুসলিমদের বিজয়:

১৯৭৩ সালের অক্টোবর মাস। ইসরাইল ও মিসরের মধ্যে চলছিলো তুমুল যুদ্ধ। ইয়াহূদীরা মিসরের সিনাই অঞ্চল দখল করে নিয়ে যায়। মিসরের মুসলিমদের প্রতিরোধের স্রোতে ভেসে যায় অভিশপ্ত ইয়াহূদীর দল। অবশেষে ১০ই রমযান মুসলিমগণ চুড়ান্ত বিজয় লাভ করেন। ফিরে পান তাদের হারিয়ে যাওয়া সিনাই অঞ্চল।

শিক্ষা: আধুনিক যুগেও আল্লাহ তাঁর দীনদার মানুষকে সাহায্য করেন যেমনিভাবে তিনি সাহায্য করেছিলেন বদরের ময়দানে, শর্ত একটাই, তা হলো তাঁর দীনের দিকে ফিরে যাওয়া, তাঁর ওপর তাওয়াক্কুল করা।

১১ রমযান:

সাঈদ ইবন জুবায়ের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর শাহাদাত:

৯৫ হিজরীর ১১ রমযান মোতাবেক ৭১৪ খৃস্টাব্দে হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ কর্তৃক সাঈদ ইবন জুবায়ের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে শহীদ করা হয়।

১২ রমযান:

ক- ৫৯৭ হিজরীর এ দিনে ইমাম আবুল ফরয ইবন জাওযী রহ. মারা যান।

খ- ২৫৪ হিজরীর ১২ রমযান মিসরের রাজা আহমদ ইবন তুলুন ইরাক থেকে মিসরে প্রবেশ করেন।

গ- ২৬৫ হিজরীর ১২ রমযান মোতাবেক ৭ মে ৮৭৯ সালে মিসরের বিখ্যাত ইবন তুলুন মসজিদ নির্মাণ কাজ শুরু হয়।

ঘ- ৬৬৬ হিজরীর ১২ রমযান মোতাবেক ২৫ মে ১২৬৮ সালে জাহের বিবরিসের নেতৃত্বে আন্তিয়খিয়া মুসলমানরা জয়লাভ করেন।

১৩ রমযান:

ক- ঈসা ‘আলাইহিস সালাম ইঞ্জীল প্রাপ্ত হন:

ওয়াসেলাহ ইবন আসকা‘ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

“أُنْزِلَتْ صُحُفُ إِبْرَاهِيمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ فِي أَوَّلِ لَيْلَةٍ مِنْ رَمَضَانَ، وَأُنْزِلَتِ التَّوْرَاةُ لِسِتٍّ مَضَيْنَ مِنْ رَمَضَانَ، وَالْإِنْجِيلُ لِثَلَاثَ عَشْرَةَ خَلَتْ مِنْ رَمَضَانَ، وَأُنْزِلَ الْفُرْقَانُ لِأَرْبَعٍ وَعِشْرِينَ خَلَتْ مِنْ رَمَضَانَ “.

“রমযানের প্রথম রাতে ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালামের ওপর সহিফাসমূহ নাযিল হয়, রমযানের ছয়দিন অতবাহিত হলে মূসা ‘আলাইহিস সালামের ওপর তাওরাত নাযিল হয়, তেরোই রমযান অতিবাহিত হলে ঈসা ‘আলাইহিস সালামের ওপর ইঞ্জিল নাযিল হয় আর ২৫ রমযান মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর আল-কুরআন নাযিল হয়।”[4]

শিক্ষা: আল্লাহ রমযান মাসে ইঞ্জীল নাযিল করেছেন যেমনিভাবে এ মাসেই তিনি কুরআন নাযিল করেছেন। কুরআনের অনুসারীরা সঠিক ইঞ্জীলের ওপর ঈমান আনা সত্ত্বেও ইঞ্জীলধারীরা কুরআনের ওপর ঈমান আনে না;  অথচ দু’টিই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত। সুতরাং শুধু কুরআনের ওপর ঈমান আনলেই হবে না আল্লাহর নাযিলকৃত সব কিতাবের ওপর ঈমান আনা ফরয।

খ- উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কর্তৃক বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়:

১৫ হিজরীর ১৩ রমযান, ১৮ অক্টোবর ৬৩৬ খৃস্টাব্দে উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ফিলিস্তিনে আগমন করেন এবং বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয় লাভ করে।

শিক্ষা: এটি রমযানে আল্লাহর সাহায্যের আরেক নিদর্শন। সুতরাং এ মাসে আল্লাহর দীনকে বিজয়ী করতে আমাদেরকে আরও অগ্রসর হতে হবে।

১৪ রমযান:

ক- ৩৫৯ হিজরীর ১৪ রমযান, ২০ জুলাই ৯৭০ খৃস্টাব্দে জামেউল আযহারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। দু’ বছর পরে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়।

বরকতময় মাসে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে বিশ্ববিখ্যাত জামেউল আযহারের ভিত্তি স্থাপন মুসলিমদেরকে আরও ভালো কাজে একধাপ এগিয়ে নিতে উৎসাহিত করে।

খ- ১২৬৫ হিজরীর ১৪ রমযান, ৩ আগস্ট ১৮৪৯ খৃস্টাব্দে মিসরের বিখ্যাত মুসলিম শাসক মুহাম্মাদ আলী পাশা মারা যান।

১৫ রমযান:

ক- হুসাইন ইবন আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা জন্মগ্রহণ: ৩ হিজরী ১৫ রমযান, ১ মার্চ ৬২৫ খৃস্টাব্দে হুসাইন ইবন আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু জন্মগ্রহণ করেন।

খ- ৩৭ হিজরীর ১৫ রমযান উবাইদুল্লাহ ইবন উমার ইবন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু মারা যান।

গ- ১২২৪ হিজরীর ১৫ রমযান, ২৪ অক্টোবর ১৮০৯ সালে উসমানী সম্রাজ্য রাশিয়ার ওপর জয়লাভ করে।

১৬ রমযান:

৮৪৫ হিজরীর ১৬ রমযান, ২৭ জানুয়ারী ১৪৪২ সালে ইতিহাসবিদ আহমদ ইবন আলী আল-মাকরীযী রহ. মারা যান।

লেখকঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন আল-আযহারী

চলবে…………

তথ্যসূত্রঃ

[1] তাবাকাত আল-কুবরা, ইবন ‘সাদ, (৮/২/১৮), মুদ্রণ: দারু সাদির, বৈরুত, প্রথম সংস্করণ ১৯৬৮।

[2] সিয়ারু ‘আলামিন নুবালা, ৮/৪১৯।

[3] সিয়ারু ‘আলামিন নুবালা, ১০/১৩৬।

[4] মুসনাদ আহমদ, হাদীস নং ১৬৯৮৪, শুয়াইব আরনাউত হাদীসটিকে দ‘য়ীফ বলেছেন। জামেউস সগীর, হাদীস নং ১৪৯৭, আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন এবং সনদের রাবীদেরকে সিকাহ বলেছেন। তিনি আরো বলেছেন, ইবন ‘আসাকেরে (২/১৬৭) আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত হাদীস হাদীসের শাহেদ।

মতামত দিন