ইসলামের ইতিহাস

কোরআনের ঐতিহাসিক অলৌকিকতা

লেখকঃ হারুন ইয়াহিয়া

কোরআনে “হামান” শব্দ:

প্রাচীন মিসর সম্পর্কে কোরআনের কিছু তথ্য বহুল ঐতিহাসিক বিষয় উন্মোচিত করে যেগুলো কিনা সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত অনুদঘাটিত ছিল। এই বিষয়গুলো আমাদের আরো নির্দেশ করছে যে এ কোরআন এক নিশ্চিৎ মহাবিজ্ঞের পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছে।কোরআনে ফেরাউনের পাশাপাশি হামান নামক একটি চরিত্রের উল্লেখ রয়েছে। ফেরাউনের একজন কাছের মানুষ হিসেবে এ নামটি কোরআন শরীফের ছয়টি ভিন্ন অংশে উক্ত হয়েছে।আশ্চর্যের বিষয় যে, তাওরাতের যে অংশে মূসার জীবনী রয়েছে, তাতে এ নামটি কখনো উল্লেখ করা হয়নি। তবে ওল্ড টেষ্টামেন্টের সর্বশেষ অধ্যায়ে ব্যাবিলনের এক রাজার সাহায্যকারী হিসেবে এ নামটি পাওয়া যায়, যে রাজা কি-না মূসার সময়ের ১১০০ বছর পরে ইসরাঈলীদের উপর নিষ্ঠুর অত্যাচার চালিয়েছিল।

কিছু অমুসলিম, যারা দাবী করে যে, রাসুলুল্লাহ (দঃ) তাওরাত এবং বাইবেল থেকে নকল করে কোরআন শরীফ সাজিয়েছেন, তারা জোর গলায় বলে যে, এ প্রক্রিয়ার সময় নবী (দঃ) কিছু কিছু বিষয়ে ত্রু
টি সহকারে কোরআনে এনেছেন।কিন্তু ২০০ বছর আগে যখন মিসরীয় প্রাচীন সংকেত লিপি হাইআরোগ্লিফিক উদঘাটন করে বুঝা গেল আর প্রাচীন লিপিগুলোয় হামান শব্দটির উল্লেখ রয়েছে জানা গেল তখন এই দাবির অসারতা প্রমাণিত হলো।এই আবিষ্কারের আগে প্রাচীন মিসরীয় লিখা আর অভিলিখন (শিলার গায়ে লিখা) বুঝা যেতো না।হাইআরোগ্লিফিক বা সংকেত লিখনে লিখা প্রাচীন মিসরীয় ভাষা যুগ যুগ টিকে ছিল। তবে, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শতাব্দিতে খৃষ্টান ধর্ম প্রচার আর অন্যান্য সংস্কৃতির প্রসারের ফলে মিসরীয়রা প্রাচীন বিশ্বাস আর হাইআরোগ্লিফিক বা সংকেত লিপি ভুলে যায়। সংকেত লিখনের সর্বশেষ জানা উদাহরণটি ৩৯৪ সনের একটি অভিলিখন ছিল। এরপর এ ভাষাটি স্মৃতি থেকে মুছে গিয়েছিল, আর কেউ তা লিখতে বা বুঝতে পারতো না। ২০০ বছর আগে পর্যন্ত এ অবস্থাটি বিদ্যমান ছিল।১৭৯৯ সনে “Rosetta Stone” নামের একটি ট্যাবলেট বা লিপিফলক আবিষ্কারের ফলে প্রাচীন মিসরীয় সংকেতলিপি বা হাইআরোগ্লিফিক এর রহস্যের সন্ধান পাওয়া গেল ; ফলকটি ছিল খ্রীষ্টের জন্মের ১৯৬ বছর আগের। এই অভিলিখন খানির গুর
ত্ব এমনি ছিল যে, এটি তিনটি ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে লিখা ছিল ; উপায়গুলো ছিল হাইআরোগ্লিফিক, ডেমোটিক (প্রাচীন মিসরীয় হাইআরেটিক লিখনের সহজরূপ) আর গ্রীক । গ্রীক লিখনটির সাহায্য নিয়ে প্রাচীন মিসরীয় সংকেত লিখনগুলোর অর্থ বের করা হলো ।

Jean-Francoise Chamollion নামের একজন ফরাসী লোকের সহায়তায় লিপিখানির অনুবাদ সম্পূর্ণ করা হয়েছিল। এভাবে এই ভুলে যাওয়া ভাষা এবং এর সঙ্গে জড়িত কিছু ঘটনার প্রকাশ ঘটল।এমন করে প্রাচীন মিসরের সভ্যতা, ধর্ম আর সমাজ জীবনের বিশাল এক জ্ঞানের খোঁজ পাওয়া গেল। হাইআরোগ্লিফিক এর সংকেতগুলোর গূঢ়ার্থ বুঝতে পারায় গুরু
ত্বপূর্ণ জ্ঞানের সন্ধান পাওয়া গেল ,বাস্তবিকই ”হামান” শব্দটি মিসরীয় সংকেতলিপিতে লিখা ছিল। ভিয়েনার Hof Museum এ নামটির উল্লেখ রয়েছে।সমগ্র অভিলিখনগুলোর সংগ্রহের উপর নির্ভর করে তৈরী অভিধান People in the New Kingdom এ হামানকে “পাথর চূর্ণকারীদের নেতা” হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়েছে। ফলাফলটি একটি অত্যন্ত গুর
ত্বপূর্ণ সত্যের উন্মোচন করে দিল। কোরআন বিরোধীদের মিথ্যা দাবীর বিপরীতে দেখা গেল এই সেই ব্যক্তি হামান, যে কিনা মূসার (আঃ) সময়কালে ফেরাউনের একজন অতি কাছের মানুষ হিসেবে মিসরে বসবাস করে আসছিল। কোরআনে যেমন বলা হয়েছে ঠিক তেমনি, হামান নির্মাণ কাজে নিয়োজিত ছিল।অধিকন্তু কোরআনের একটি আয়াতে একটি ঘটনায় যেমন উক্ত আছে যে ফেরাউন হামানকে একটি টাওয়ার নির্মাণের কথা বলছে, সেটি প্রত্নতত্ত্ববিদদের প্রাপ্ত তথ্যাবলীগুলোর সঙ্গে একদম মিলে যায় :

 “ফেরাউন বলল : হে সভাসদবৃন্দ ! আমি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন উপাস্য আছে বলে আমি মনে করি না। হে হামান! তুমি আমার জন্য ইট পোড়াও, তারপর আমার জন্য একটি সুউ‪চ্চ প্রাসাদ নির্মাণ কর, যাতে আমি মূসার মা’বুদের প্রতি উঁকি মেরে দেখতে পারি। তবে আমারতো ধারণা যে, সে অবশ্যই মিথ্যাবাদী।“ -(কোরআন, ২৮ : ৩৮)

পরিশেষে, হামানের অস্তিত্ত্বের বিষয়টি কোরআন বিরোধীদের বানোয়াট জাল দাবিকেই শুধু গুর
ত্বহীন বলে প্রমাণ করেনি, বরং আবারো একবার প্রমাণ করে দিল যে, কোরআন এসেছে সর্বশক্তিমান আল্লাহর তরফ থেকে। একরকম অলৌকিকভাবেই কোরআন সেই সমস্ত ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহ সম্পর্কে আমাদের জানিয়েছে যা নবীর (দঃ) সময়ে ঘটেনি কিংবা জানা ছিল না।

কোরআনে মিসরের শাসকগণের উপাধি:
মিসরের প্রাচীন ইতিহাস ঘেঁটে এ তথ্যই বেরিয়ে আসে যে, সে অঞ্চলে মুসা (আঃ) ই একমাত্র নবী হয়ে আসেননি। মুসার (আঃ) সময়ের বহু আগে ইউসুফ (আঃ) মিসরে বসবাস করে গেছেন।মুসা (আঃ) এবং ইউসুফ (আঃ) এ দুজনের ঘটনাবলী পড়তে গিয়ে আমরা কিছূ সাদৃশ্যের বা তুলনার মুখোমুখি হই। কোরআনে ইউসুফ (আঃ) এর সময়কার মিসরের শাসকদের সম্বোধন করতে গিয়ে মালিক শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।

“মালিক (বাদশাহ) বলল : ইউসুফকে আমার কাছে নিয়ে এসো, আমি তাকে আমার একান্ত সহচর করে রাখব।তারপর সে যখন তার সাথে কথা বলল তখন সে বলল নিশ্চয়ই আজ আপনি আমাদের কাছে অতিশয় মর্যাদাবান ও বিশ্বস্ত।“ -(কোরআন, ১২ : ৫৪)

কিন্তু মুসার (আঃ) সময়ে শাসকদের ডাকা হতো “ফেরাউন ” ।

“আর আমি তো মূসাকে নয়টি প্রকাশ্য মু’জিযা দিয়েছিলাম, আপনি বনী ইসরাঈলকে জিজ্ঞেস করু
ন ; যখন সে তাদের কাছে এসেছিল তখন ফেরআউন তাকে বলেছিল : “হে মূসা!আমি তো মনে করি, অবশ্যই তুমি যাদুগ্রস্ত।“ -(কোরআন, ১৭ : ১০১)

আজ যে সমস্ত ঐতিহাসিক রেকর্ড পাওয়া যা‪চ্ছে তাতে শাসকগণের ভিন্ন ভিন্ন নামকরণের কারণ খুঁজে পাওয়া যা‪চ্ছে। পূর্বে প্রাচীন মিসরে রাজপ্রাসাদকে ফেরাউন বলা হতো আর এখান থেকেই এসেছে এই শব্দটি। প্রাচীন রাজবংশের শাসকগণ তাদের উপাধি হিসেবে এই নামটি ব্যবহার করেননি। মিসরের ইতিহাসে নূতন রাজ্যযুগের পূর্ব পর্যন্ত রাজাদের উপাধি হিসেবে এ নামটি শুরু হয়নি। এই সময়কালটি ১৮ তম রাজবংশের সঙ্গে শুরু
 হয় আর বিংশতম রাজবংশ থেকে রাজাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে গিয়ে এই ”ফেরাউন” শব্দটি টাইটেল হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
এখানে আরেকবার কোরআনের অলৌকিকত্ব প্রমাণের আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় : ইউসুফ (আঃ) প্রাচীন রাজত্বে বর্তমান ছিলেন যে যুগে রাজাদের ফেরাউন নয় বরং মালিক বলে সম্বোধন করা হতো। উল্টো যেহেতু মুসা (আঃ) নূতন রাজ্যের যুগে বর্তমান ছিলেন, তাই তখনকার শাসকদের ”ফেরাউন” নামে ডাকা হতো।সন্দেহ নেই যে এমন পৃথক করে বলার জন্য একজনকে মিসরের ইতিহাস জানতে হবে। কিন্রু চতুর্থ শতকের মাঝেই মিসরের ইতিহাস সম্পূর্ণরূপে ভুলে যায় মানুষ ; কারণ মানুষ আর মিসরের ভাষা (হাইআরোগ্লিফিক) বুঝতে পারেনি ; দীর্ঘদিন পর মিসরের ইতিহাস পুণরায় উনিশ শতকে উদ্ধার করা হয়। সুতরাং কোরআন নাযিল হওয়ার সময় মিসরের ইতিহাস সম্পর্কে কোন পুংখানুপুঙ্খ জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব ছিল না। অগণিত সাক্ষ্য-প্রমাণের মাঝে এটিও প্রমাণ করে যে কোরআন আল্লাহর বাণী।

Source

মতামত দিন