ইসলামের ইতিহাস হাদীস

হাদীছ সংকলনে ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ)- এর অবদান

রচনায় : আবু তাহের।

উপক্রমণিকাঃ

একমাত্র মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নৈকট্য ও সান্নিধ্য অর্জনের লক্ষ্যে যুগ যুগ ধরে কঠোর সাধনা ও পরিশ্রম এবং মহা আত্মত্যাগের বিনিময়ে যে সকল মহাপুরুষ চিরভাস্বর হয়ে আছেন, রেখে গেছেন মহান আদর্শ ও সমকীর্তি, তাঁদেরই নির্ঘন্টে সোনার অক্ষরে লেখা একটি নাম আবুল হাফছ ওমর বিন আব্দুল আযীয বিন মারওয়ান বিন হাকাম বিন আবিল আছ বিন উমাইয়া বিন ক্বারশী আল-উমারী। তিনি ছিলেন একজন জলীলুল ক্বদর তাবেঈ এবং ইসলামের ৫ম খলীফা। হাদীছ শাস্ত্রে তিনি অনন্য সাধারণ জ্ঞান ও বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। ৯৯ হিজরীর সফল মাসে তিনি খলীফা নিযুক্ত হওয়ার সাথে সাথেই হাদীছ সংকলনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে হাদীছ সংগ্রহ ও সংকলনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি রাসূল (সাঃ)-এর হাদীছ সমূহকে সংকলন করার জন্য স্বীয় জীবন সোপর্দ করেছিলেন। নিম্নে হাদীছ সংকলনে তাঁর অবদান আলোচনা কর হলঃ

হাদীছ সংকলনের কারণঃ

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)- এর যুগে পবিত্র কুরআনের সাথে সংমিশ্রণের ভয়ে হাদীছ লিপিবদ্ধকরণ নিষিদ্ধ ছিল। তবুও কোন কোন ছাহাবী হাদীছ লিখে রাখতেন। তবে তা ব্যাপক কোন গ্রন্থ হিসাবে বিবেচিত ছিল না। যেমন আলী (রাঃ)- এর ছহীফা। সে যুগে হাদীছ সাধারণতঃ ছাহাবাগণের স্মৃতির ফলকে সংরক্ষিত ছিল। তাই ছাহাবাগণের ইন্তেকালের ফলে হাদীছ বিলুপ্ত হওয়ার আশংকায় ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ) হাদীছ সংকলনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

তিনি মদীনার শাসনকর্তা আবুবকর বিন মুহাম্মাদ বিন হাযম- এর প্রতি এ মর্মে ফরমান জারী করেন-

انظر ما كان من حديث رسول الله صلى الله عليه وسلم أو سنته أوحديث عمر أو نحو هذا فاكتبه لى فإ نى خفت دروس العلم وذهاب العلماء-

‘রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ, তাঁর সুন্নাত অথবা ওমর (রাঃ)-এর বাণী কিংবা অনুরূপ যা কিছু পাওয়া যায়, তার প্রতি দৃষ্টি দাও এবং আমার জন্য লিখে নাও। কেননা আমি ইলমে হাদীছের ধারকদের অন্তর্ধান ও হাদীছ সম্পদ বিলুপ্তির আশংকা করছি’।

হাদীছের প্রতি ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ)-এর গুরুত্ব ও সম্মানঃ

খলীফা ওমর বিন আব্দুল আযীয হাদীছের প্রতি চরম শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। জীবনের সকল ক্ষেত্রে তিনি হাদীছের প্রতি আজ্ঞাবহ ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে আল্লামা যাহাবী যথার্থই বলেছেন,

كان فقيها مجتهدا عارفا بالسنن كبير الشأن ثبتا حجة حافظا قانتا الله اواها منيبا-

‘তিনি ছিলেন ফক্বীহ, মুজতাহিদ, সুন্নাত ও হাদীছে বিশেষ পারদর্শী, বিরাট মর্যাদাসম্পন্ন, লব্ধপ্রতিষ্ঠ হাদীছ অভিজ্ঞ, গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য হাদীছ বর্ণনাকারী, হাদীছের হাফেয, আল্লাহর বিধান পালনকারী, বিনয়ী ও আল্লাহভীরু’। তিনি তার অধীনস্ত সকলকে হাদীছের প্রতি আনুগত্য করার ফরমান জারী করেন। তিনি এক ভাষণে বলেন,

إنى اوصيك بتقوى الله واتباع سنة رسوله-

‘আমি তোমাকে তাক্বওয়া অর্জনের এবং রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছের আনুগত্যের নির্দেশ দিচ্ছি’।

তিনি একজন শাসনকর্তার নামে নিম্নোক্ত ভাষায় একটি নির্দেশনামা প্রেরণ করেনঃ

أما بعد فأمر أهل العلم أن ينشروا العلم فى مساجدهم فان السنة كانت قد أميتت-

‘হাদীছবিদ ও বিদ্বান লোকদেরকে আদেশ করুন! তাঁরা যেন মসজিদে মসজিদে হাদীছের শিক্ষাদান ও তার ব্যাপক প্রচার করেন। কারণ হাদীছের ইলম প্রায় বিলীন হওয়ার উপক্রম হচ্ছে’।

হযরত ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ) হাদীছ-এর প্রতি এতই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন যে, রাষ্ট্রীয় ফায়ছালার বিরুদ্ধে হাদীছ পেলে ফায়ছালা প্রত্যাহার করতেন এবং হাদীছকে গ্রহণ করতেন। যেমন তাঁর খিলাফত কালে (৯৯-১০১হিঃ) বিশ্বস্ত তাবেঈ মাখলাদ বিন খুফাফ আল-গিফারী একটি গোলাম খরীদ করেন ও তার জন্য খাদ্য ক্রয় করেন। তিনি বলেন যে, (কিছুদিনের মধ্যেই) তার কিছু (গোপন ও পুরাতন) দোষ আমার নিকটে প্রকাশিত হয়ে পড়ে (যা বিক্রেতা আমাকে বলেনি)। আমি তখন খলীফার দরবারে অভিযোগ দায়ের করলাম। তিনি আমাকে খাদ্যসহ উক্ত গোলাম ফেরত দানের ফায়ছালা দেন। অতঃপর আমি ঊরওয়া বিন যুবায়ের (২৩-৯৩হিঃ)-এর নিকটে গেলাম ও তাঁকে সব খুলে বললাম। তিনি বললেন, আমি সন্ধ্যায় খলীফার নিকট যাবো ও তাঁকে আয়েশা (রাঃ) (মৃঃ ৫৭হিঃ) বর্ণিত রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ শুনাবো যে, রাসূল (ছাঃ) এ ধরনের একটি ব্যাপারে যামানতের বিনিময়ে জরিমানা (الخراجبالضمان) আদায়ের নির্দেশ দান করেছিলেন। গিফারী বলেন, ঊরওয়ার একথা শুনে আমি নিজেই ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ)-এর নিকটে গেলাম ও ঊরওয়া বর্ণিত নবী (ছাঃ)-এর হাদীছ শুনালাম। ওমর (রহঃ) তখন বললেন, আমি যে ফায়ছালা দিয়েছিলাম তার চেয়ে এখন আমার জন্য ফায়ছালা কতই না সহজ হয়ে গেল। আল্লাহ জানেন আমি আমার ফায়ছালার মধ্যে ‘হক্ব’ ব্যতীত কিছুই আশা করিনি। এক্ষণে এ ব্যাপারে আমার নিকটে রাসূল (ছাঃ) হ’তে হাদীছ পৌঁছে গেছে। অতএব আমি আমার পূর্ব সিদ্ধান্ত বাতিল করে রাসূল (ছাঃ)-এর ফায়ছালা জারী করলাম। এরপর ঊরওয়া (রাঃ) খলীফার নিকটে গেলেন এবং খলীফা আমাকে (ক্রয়মূল্য ফেরত নেওয়া ছাড়াও) খাদ্য দানের বিনিময় মূল্য গ্রহণের ফায়ছালা দান করলেন, যা ইতিপূর্বে বিক্রেতাকে প্রদানের জন্য আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে লিখিত অন্য এক ফরমানে বলেন,

لا رأى لأحد مع سنة سنها رسول الله صلى الله عليه وسلم-

‘(তবে সাবধান) রাসূলের সুন্নাতের (হাদীছের) বিপরীতে কারো কোন রায় গৃহীত হবে না’।১০

 

হাদীছ সংগ্রহ ও সংকলনঃ

ইসলামী শরী‘আতের দ্বিতীয় উৎস হ’ল হাদীছ। হাদীছ বিহীন ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার চিন্তা করা যায় না। তাই ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ) খলীফা নিযুক্ত হওয়ার সাথে সাথেই হাদীছ সংগ্রহ ও সংকলনের সংকল্প গ্রহণ করেন এবং এ মর্মে নিম্নোক্ত ভাষায় প্রাদেশিক গভর্ণরগণের নিকট ফরমান জারী করেন,

فانظروا حديث رسول الله صلى الله عليه وسلم فاجمعوه-

‘রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছের প্রতি নযর দাও এবং তা সংগ্রহ ও সংকলনের কাজ শুরু কর’।১১

মদীনার শাসনকর্তার প্রতি নির্দেশঃ

তিনি মদীনার শাসনকর্তা আবুবকর বিন মুহাম্মাদ বিন হাযম-এর প্রতি হাদীছ সংকলনের নির্দেশ জারী করেন। ফলে আবুবকর হাদীছ সংগ্রহ ও সংকলন শুরু করেন। আল্লামা ইবনে সা‘দ বলেন, আবুবকর বিন হাযমকে হযরত আয়েশা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীছ ও তাঁর ক্রোড়ে লালিত-পালিত এবং তাঁর নিকট শিক্ষা প্রাপ্ত উমরা বর্ণিত হাদীছও লিখে পাঠাবার জন্য ফরমান প্রেরণ করেছিলেন।১২ এই নির্দেশের ফলে আবুবকর বিন হাযম বিপুল পরিমাণ হাদীছ সংগ্রহ ও সংকলন করেন। পরবর্তীতে এরই ভিত্তিতে সর্বত্র হাদীছের প্রচার ও প্রসার ঘটেছে।

সালিম বিন আবদুল্লাহর প্রতি হাদীছ সংকলনের ফরমানঃ

খলীফা ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ) সালিম বিন আবদুল্লাহকে হাদীছ সংকলন করে তাঁর নিকট প্রেরণ করার ফরমান জারী করেন। এ মর্মে আল্লামা সুয়ূত্বী ইমাম যুহরীর সূত্রে বর্ণনা করেছেন-

كتب عمربن عبد العزيز الى سالم بن عبد الله يكتب إليه بسيرة عمر بن الخطاب فى الصدقات-

‘ওমর বিন আব্দুল আযীয সালিম বিন আব্দুল্লাহ্কে হযরত ওমরের যাকাত ও ছাদাক্বা সম্পর্কে অবলম্বিত রীতি-নীতি লিখে পাঠাবার জন্য আদেশ করেছিলেন।১৩

আল্লামা সুয়ূত্বী সালিম সম্পর্কে বলেন,

فكتب إليه بالذى سأل وكتب إليه إنك إن عملت بمثل عمر فى زمانه ورجاله فى مثل زما نك ور جالك كنت عند الله خيرا من عمر-

‘সালিম যে সম্পর্কে আদিষ্ট হয়েছিলেন তা তিনি পুরোপুরি লিখে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে তিনি তাঁকে এটাও লিখে পাঠিয়েছিলেন যে, ‘হযরত ওমর (রাঃ) তাঁর আমলে ও তদানীন্তন লোকদের মধ্যে যেসব কাজ করেছিলেন, আপনিও যদি আপনার আমলে এখানকার লোকদের মধ্যে সেসব কাজ করেন, তবে আপনি আল্লাহর নিকট ওমর ফারূক (রাঃ) হ’তেও উত্তম ব্যক্তি বলে বিবেচিত ও পরিগণিত হবেন’।১৪

ইমাম যুহরীকে হাদীছ সংকলনের জন্য নিয়োগঃ

হযরত ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ) ইমাম যুহরীকে বিশেষভাবে হাদীছ সংকলনের জন্য নিয়োগ করেন। যুহরী নিজেই বলেন,

امرنا عمر بن عبد العزيز بجمع السنن فكتبناها دفترا دفترا فبعث إلى كل أرض له عليها سلطان دفترا-

‘ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ) আমাদেরকে হাদীছ সংগ্রহ ও সংকলনের জন্য আদেশ করেছিলেন। এই আদেশ পাওয়ার পর আমরা হাদীছের বিরাট বিরাট গ্রন্থ লিখে তার নিকট প্রেরণ করি। অতঃপর তিনি নিজেই তাঁর রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত প্রতিটি প্রদেশে এক একখানি গ্রন্থ পাঠিয়ে দেন।১৫ আল্লামা যুহরী যে এ কাজে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারবেন তার প্রমাণ স্বরূপ ওমর বিন আব্দুল আযীয নিজেই মন্তব্য করেন-

لم يبق احد اعلم بسنة ماضية من الزهرى-

‘সুন্নাত ও হাদীছ সম্পর্কে যুহরী অপেক্ষা বড় আলিম আর একজনও জীবিত নেই’।১৬ ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন, ‘সর্বপ্রথম যিনি হাদীছ সংকলন করেন তিনি হ’লেন যুহরী’।১৭ আল্লামা যুহরী নিজেই এভাবে বলেন, ‘আমার পূর্বে ইলমে হাদীছ আর কেউই সংকলন করেননি’।১৮

ছহীহ হাদীছ সংকলনের ফরমানঃ

বিচক্ষণ খলীফা ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ) যখন দেখলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নামে মানুষ জাল হাদীছ রচনা করছে, তখন তিনি স্বীয় কর্মচারীদেরকে কেবলমাত্র যাচাই বাছাই করে একমাত্র রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ তথা ছহীহ হাদীছ সংকলন করার কঠোর নির্দেশ জারী করেছিলেন। এতুদুদ্দেশ্যে তিনি এ মর্মে স্মারকলিপি প্রেরণ করেন যে,

ولايقبل إلاحديث النبى صلى الله عليه وسلم وليفشوا العلم وليجلموا حتى يعلم فان العلم لا يهلك حتى يكون سرا-

‘আর হাদীছে রাসূল ছাড়া যেন কিছু গ্রহণ করা না হয়। লোকেরা যেন এ ইলমে হাদীছকে ব্যাপকভাবে প্রচার করে। হাদীছ শিক্ষাদানের জন্য যেন মজলিস অনুষ্ঠিত হয়, যাতে যারা জানে না তারা যেন শিখে নিতে পারে। কেননা ইলম গোপন করা হ’লে তা বিনাশপ্রাপ্ত হয়’।১৯

হাদীছ সংকলনে স্বয়ং ওমর বিন আব্দুল আযীযঃ

নানা ব্যস্ততার মধ্যেও খলীফা ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ) স্বয়ং এ মহান খেদমতে জড়িয়ে পড়েন। আল্লামা আবু কালাবা এ প্রসঙ্গে চমৎকার উদ্ধৃতি উপস্থাপন করেছেন,

‘ওমর বিন আব্দুল আযীয একদা যোহর ছলাতের জন্য মসজিদে আসলে আমরা তাঁর হাতে কিছু কাগজ দেখতে পেলাম। পরে আছরের ছলাতের জন্য বের হয়ে আসলেও তাঁর সঙ্গে সেই কাগজই দেখলাম। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে আমীরুল মুমেনীন! এই লিখিত জিনিসটি কি? উত্তরে তিনি বললেন, আওন ইবনে আব্দুল্লাহ আমার নিকট হাদীছ বর্ণনা করেছেন, তা আমার খুব পসন্দ হয়েছে। তাই আমি তা লিখে নিয়েছি। তাতে এই হাদীছটিও রয়েছে’।২০

এভাবে ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ) নিজে হাদীছ লেখার কাজে আত্মনিয়োগ করেন এবং রাষ্ট্রের সকল মুহাদ্দিছগণের হাদীছ সংকলনের নির্দেশনামা জারী করে হাদীছের অনেক গ্রন্থ সংকলন করেন। সংগত কারণেই এ মহান ব্যক্তিকে প্রথম শতকের ও ইসলামের প্রথম মুজাদ্দিদরূপে ভূষিত করা হয়েছে।২১

ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ)- এর তত্ত্বাবধানে সংকলিত হাদীছের গ্রন্থসমূহঃ

ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ) হাদীছ সংকলনের পদক্ষেপ গ্রহণ করার পর বেশী দিন এ ধরণীতে বেঁচে ছিলেন না। তবে তাঁর এ আনজামের ফলে পরবর্তী বহু মনীষী এহেন গুরুত্বপূর্ণ কাজে জীবন কুরবান করে হাদীছের বড় বড় গ্রন্থ সংকলন করেছেন। আমরা নিম্নেখলীফার তত্ত্বাবধানে যে কয়টি গ্রন্থ সংকলিত হয়েছিল তা উপস্থাপন করছি।

১.       ইমাম যুহরী সংকলিত গ্রন্থাবলীঃ

আল্লামা যুহরী বলেন, ‘ওমর বিন আব্দুল আযীয আমাদেরকে হাদীছ সংগ্রহ ও সংকলনের নির্দেশ দিলেন। এই নির্দেশে আমরা হাদীছের বিরাট বিরাট গ্রন্থ লিখে তাঁর নিকট পাঠিয়ে দিলাম। তারপর তিনি নিজেই তাঁর রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত প্রতিটি প্রদেশে এক একখানি গ্রন্থ পাঠিয়ে দিলেন।২২

২.       আবুবকর বিন হাযম-এর সংকলিত গ্রন্থঃ

মদীনার বিচারক আল্লামা আবুবকর বিন হাযম বহু হাদীছের গ্রন্থাবলী সংকলন করেন। কিন্তু তা খলীফার নিকট জমা দেওয়ার পূর্বেই খলীফা ইন্তেকাল করেন।

৩.       সালিম বিন আব্দুল্লাহ-এর রিসালাহঃ

সালিম বিন আব্দুল্লাহ হযরত ওমরের যাকাত ও ছাদাক্বাহ সম্পর্কে রীতি-নীতি অবলম্বিত ‘রিসালাহ’ লিপিবদ্ধ করেন।

৪.       ইমাম শা‘বীর সুনানঃ

ইমাম শা‘বী (রহঃ) তদানীন্তক কূফার কাযী ছিলেন। তিনি খলীফার আদেশ পেয়ে একই বিষয়ের হাদীছ সমূহ একই স্থলে সন্নিবদ্ধ করার কাজে সর্বপ্রথম হাত দেন। অবশ্য তিনি প্রথম অবস্থায় হাদীছ সংকলনের পক্ষপাতী ছিলেন না। পরে খলীফার নির্দেশে বাধ্য হয়ে এ মহান কাজে জড়িয়ে পড়েন।

৫.       ইমাম মাকহূল এর সুনানঃ

আল্লামা মাকহূল (রহঃ) ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ)-এর কাযী ছিলেন। খলীফার আদেশে তিনি এ কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে ‘কিতাবুস সুনান’ নামক একটি গ্রন্থ সংকলন করেন।

৬.       রুবাই বিন ছবাইহ ও সা‘দ বিন আবী আরূবা হাদীছ সংকলনে এক অনন্য ভূমিকা রাখেন। এ প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনে হাজার আসক্বালানী বলেন,

فأول من جمع ذلك الربيع بن صبيح وسعد بن أبى عروبه وغير همأ فكانوا يصنفون كل باب على حدة-

‘সর্বপ্রথম হাদীছ সংগ্রহ ও সংকলনের কাজে অংশ নেন রুবাই বিন ছবাইহ ও সা‘দ বিন আবী আরূবা এবং অন্যান্যারা। তাঁরা হাদীছের প্রত্যেকটি অধ্যায়কে স্বতন্ত্র্যভাবে গ্রন্থাবন্ধ করতেন’।২৩

যবনিকাঃ

আলোচনার শেষ প্রান্তে এসে আমরা বলতে পারি, ইসলামের ৫ম খলীফা হিসাবে পরিচিত ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ) চিলেন ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ব্যক্তিত্ব। তিনি তাঁর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল উমাইয়া খলীফাগণ হ’তে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ছিলেন। তিনি অসংখ্য প্রতিকূল অবস্থাকে অসম ধৈর্য ও সাহসিকতার সাথে মোকাবেলা করেছেন। প্রতিকূলতার আকাশ ছোঁয়া ঢেউয়ে যেখানে পূর্ববর্তী উমাইয়া খলীফাগণ তৃণখন্ডের ন্যায় ভেসে গেছেন, সেখানেও তিনি দৃঢ় হিমাদ্রির ন্যায় হক্বের উপর শির উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি তাঁর অর্জিত জ্ঞান, সুন্দর জীবনের সকল রসসুধা বিন্দু বিন্দু করে জাতির উদ্দেশ্যে নিংড়িয়ে দিয়েছেন। জাতির মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে তিনি জীবনের স্বার্থকতা অন্বেষণ করেছেন। হাদীছ সংকলন তাঁর জীবনের অনন্য অবদান। হাদীছ সংকলনের ফরমান জারী করার পর এ মহামানব বেশী দিন জীবিত ছিলেন না। তিনি হাদীছ শাস্ত্রের অথৈ জলরাশির মধ্যে কিছু সংখ্যক নুড়ি কুড়িয়েছিলেন মাত্র এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত অবস্থিত সকল হাদীছ বিজ্ঞানীগণকে ঐ সমুদ্রের গভীরে ডুব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ফলে তাঁর মৃত্যুর পর বহু হাদীছ বিজ্ঞানীগণ এ মহান কাজে জীবন সোপর্দ করে বহু বড় বড় হাদীছের কিতাব সংকলন করেছিলেন। তাই আজ আমরা ঘরে বসে ‘ক্বা-লাল্লাহু’ ওয়া ‘ক্বা-লা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)’ পড়তে পারছি। ফালিল্লা-হিল হাম্দ। নতুবা হাদীছ খুঁজে পাওয়া যেত না। কিন্তু এরপর ও হাদীছ শত্রুদের কালো থাবা হ’তে রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ রেহাই পায়নি। ঐ সব সংকলিত হাদীছের গ্রন্থ সমূহের মধ্যে রয়েছে লক্ষ লক্ষ জাল ও যঈফ হাদীছ। তাই এ সন্ধিক্ষণে প্রয়োজন আজ ওমর বিন আব্দুল আযীয এর মত একজন রাষ্ট্রনায়ক যিনি দুনিয়ার সকল সংকলিত হাদীছের গ্রন্থ সমূহকে একত্রিত করে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে যোগ্য হাদীছ বিশেষজ্ঞদেরকে নিয়োগ করে জাল ও যঈফ হাদীছ সমূহ ছাটাই করে কেবলমাত্র ছহীহ হাদীছ সমূহ জাতিকে উপহার দিবেন। বাংলাদেশ সহ সমগ্র মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীদের প্রতি সেই প্রত্যাশাই রইল।

 

দলীলসমূহঃ

১.       জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী, তারীখুল খুলাফা (দিল্লী ছাপা), পৃঃ ২২২।

২.  মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, আহলেহাদীছ আন্দোলনঃ উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ; দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষিত সহ (রাজশাহীঃ হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৯৬খৃঃ), পৃঃ ১৪২।

৩.       তারীখুল খুলাফা, পৃঃ ২২২।

৪.       বঙ্গানুবাদ সহীহ আল-বুখারী (ঢাকাঃ তাওহীদ ট্রাষ্ট বাংলাদেশ, ১৯৯৮খৃঃ), ১ম খন্ড, পৃঃ ১০২।

৫.       ঐ, ১/৯৫ পৃঃ।

৬.       মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম, হাদীস সংকলনের ইতিহাস (ঢাকাঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৯২ খৃঃ), পৃঃ ৩১৫। গৃহীতঃ তাযকিরাতুল হুফফায ১/১০৬ পৃঃ।

৭.       রাহমাতুল্লাহ আব্দুল গণী, সিয়ার ওয়া আযকার ফী সীয়ারি ওয়া আছার (রিয়াদঃ প্রথম সংস্করণ, ১৪১৭হিঃ), ২য় খন্ড, পৃঃ ৭৯।

৮.       হাদীস সংকলনের ইতিহাস, পৃঃ ৪০৩। গৃহীতঃ সীরাতে ওমর বিন আব্দুল আযীয, পৃঃ ৯৪।

৯.       আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ১৪২-১৪৩।

১০.     ঐ, পৃঃ ১৪৩ ও ১৪৯। গৃহীতঃ ড. মুহাম্মাদ মুছতফা আযমী, দিরাসাত ফিল হাদীছি নববী ওয়া তারীখু তাদভীনিহি, পৃঃ ১৯; ইবনুল ক্বাইয়িম, ই‘লামুল মুওয়াককেঈন ২/২৮২ পৃঃ।

১১.      আলহাজ্জ মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল কুদ্দুস, লোবাবুত তাওয়ারীখ (রহমানিয়া দারুত তাছনীফ, ১৯৬০ খৃঃ), পৃঃ ২০৭।

১২.     ইসলামী বিশ্বকোষ, ৬ষ্ঠ খন্ড, ‘উমর বিন আব্দুল আযীয’ অধ্যায়।

১৩.     হাদীস সংকলনের ইতিহাস, পৃঃ ৩৯৯।

১৪.      ঐ, গৃহীতঃ তারীখুল খুলাফা, পৃঃ ৪১।

১৫.     ঐ, পৃঃ ৪০১।

১৬.     ঐ, পৃঃ ৪০১।

১৭.     ঐ, পৃঃ ৪০২।

১৮.     ঐ, পৃঃ ৪০২।

১৯.     বঙ্গানুবাদ সহীহ আল-বুখারী ১/৯৬ পৃঃ।

২০.     সুনানে দারেমী (মিসরী ছাপা), ১০৩ পৃঃ।

২১.     ইবনে কাছীর, আল-বেদায়া ওয়ান-নেহায়া ৯/৯৪ পৃঃ।

২২.     আল্লামা যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায ১/১০৭ পৃঃ।

২৩.     হাদীস সংকলনের ইতিহাস, পৃঃ ৪০৫-৪০৬।

মতামত দিন