ইসলামের ইতিহাস

মিরাজের ইতিহাস ও শিক্ষা ( পর্ব ১)

মিরাজের ইতিহাস ও শিক্ষা

রচনায়:-  মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব

মিরাজ ইসলামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। যেখানে আল্লাহ তাআলা সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও রাসূল (সা)-কে মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আক্বসায় প্রথমে এবং পরবর্তীতে বায়তুল মাক্বদাস হতে অলৌকিক সিঁড়ির মাধ্যমে সাত আসমানেন উপর আরশের নিকট আল্লাহর সান্যিধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। এ বিষয়ে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,

سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا ۚ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ [١٧:١]

অনুবাদঃ পরম পবিত্র মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রিবেলায় ভ্রমন করিয়েছিলেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত। যার চারিদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি। যাতে আমি তাকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। (সূরা ইসরা; আয়াতঃ০১)

مِعْرَاجٌ (মি‘রাজ) করন কারক, অর্থ- যার দ্বারা আরোহন করা হয়, অর্থাৎ সিঁড়ি। যা عَرُوْجٌ (আরুজুন) মূল ধাতু হ’তে উৎপন্ন। যার অর্থ ‘আরোহন করা’। শারঈ অর্থে- বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদ থেকে যে অলৌকিক সিঁড়ির মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সপ্ত আসমানের উপরে আরশের নিকটে আল্লাহ্‌র সান্নিধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়, সেই সিঁড়িকে ‘মি‘রাজ’ বলা হয়। পারিভাষিক অর্থে, হিজরতের পূর্বে একটি বিশেষ রাতের শেষ প্রহরে বায়তুল্লাহ হ’তে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত বোরাকে ভ্রমণ, অতঃপর সেখান থেকে অলৌকিক সিঁড়ির মাধ্যমে সপ্ত আসমান পেরিয়ে আরশে আল্লাহ্‌র সান্নিধ্যে গমন ও পুনরায় বায়তুল মুকাদ্দাস হয়ে বোরাকে আরোহন করে প্রভাতের আগেই মক্কায় নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তনের ঘটনাকে মি‘রাজ বলা হয়।

اَسْرَي ক্রিয়াটি اِسْرَاءٌ মূল ধাতু হ’তে উৎপন্ন। অর্থঃ রাত্রিতে চলা। سَارِيَةٌ অর্থঃ রাত্রি কালীন বৃষ্টি। এরপর لَيْلًا শব্দটি যোগ করায় আরও স্পষ্টভাবে এ অর্থ ফুটে উঠেছে।لَيْلًا শব্দটি نكرة ব্যবহার করে এদিকেও ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, সমগ্র ঘটনায় সম্পূর্ণ রাত্রি নয়, বরং রাত্রির একটা অংশ ব্যয়িত হয়েছে। আয়াতে উল্লেখিত মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত সফরকে ‘ইসরা’ বলা হয় এবং সেখান থেকে আসমান পর্যন্ত সফরকে মে‘রাজ বলা হয়। ‘ইসরা’ অত্র আয়াতে এবং ‘মে‘রাজ’ সূরা নাজম ১৩-১৮ আআয়তে উল্লেখিত হয়েছে এবং বহু ‘মুতাওয়াতির’ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে।

সূরা নাজমের আয়াতগুলি নিম্নরূপঃ

وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَىٰ [٥٣:١٣]عِندَ سِدْرَةِ الْمُنتَهَىٰ [٥٣:١٤] عِندَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَىٰ [٥٣:١٥] إِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشَىٰ [٥٣:١٦] مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَىٰ [٥٣:١٧] لَقَدْ رَأَىٰ مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَىٰ [٥٣:١٨] 

‘আর তিনি (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে (জিব্রীল আলায়হিস সালামকে) আরো একবার (নিজ আকৃতিতে) অবতীর্ণ হ’তে দেখেছিলেন। ‘সিদ্‌তারুল মুনতাহা’-র নিকটে। সেখানে ‘জান্নাতুল মাওয়া’ রয়েছে। কী চমৎকার সেই দৃশ্য ! যখন সিদ্‌রাতুল মুনতাহাকে আবৃতকারীরা আবৃত করছিল। দৃষ্টি বক্র হয়নি, সীমা অতিক্রম করেনি। নিশ্চয় তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন তাঁর প্রতিপালকের বড় বড় নিদর্শনসমূহ’ (সূরা নাজম; আয়াতঃ ১৩-১৮)

অত্র সূরার ৫ থেকে ১১ নং আয়াত পর্যন্ত স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছে যে,

عَلَّمَهُ شَدِيدُ الْقُوَىٰ [٥٣:٥] ذُو مِرَّةٍ فَاسْتَوَىٰ [٥٣:٦] وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَىٰ [٥٣:٧] ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّىٰ [٥٣:٨] فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَىٰ [٥٣:٩] فَأَوْحَىٰ إِلَىٰ عَبْدِهِ مَا أَوْحَىٰ [٥٣:١٠] مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَىٰ [٥٣:١١]

‘তাঁকে (রাসূলকে) শিক্ষা দান করে এক শক্তিশালী ফেরেশতা (জিব্রীল)। সে সহজাত শক্তি সম্পন্ন। সে নিজ আকৃতিতে প্রকাশ পেল। ঊর্ধ্ব দিগন্তে। অতঃপর নিকটবর্তী হ’ল ও ঝুলে গেল। তখন দুই ধনুকের ব্যবধান ছিল বা তারও কম। তখন আল্লাহ্‌ স্বীয় দাসের প্রতি যা প্রত্যাদেশ করবার, তা করলেন। রাসূলের হৃদয় মিথ্যা বলেনি যা সে দেখেছে’ (সূরা নাজম;আয়াতঃ ০৫-১১)।

আনাস ও ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত ভাষ্যে এগুলি মি‘রাজ রজনীতে আল্লাহ্‌র সঙ্গে তাঁর রাসূলের সরাসরি কথোপকথন ও শিক্ষা লাভের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ছাহাবী এবং সহীহ্‌ হাদিস সমূহের বর্ণনা ও সর্বোপরি আয়াতগুলির পূর্বাপর বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে এটা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, এগুলি জিবরাইল (আঃ) সম্পর্কে বলা হয়েছে। যাতে বলে দেওয়া হয়েছে যে, রাসূলের নিকটে প্রেরিত ওহীতে কোনরূপ সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশ নেই। জিব্রীল আল্লাহ্‌র নিকট থেকে সরাসরি ‘ওহী’ নিয়ে তা যথাযথভাবে তা পৌঁছে দিয়ে থাকেন। যেখানে কোনরূপ যোগ-বিয়োগের অবকাশ নেই।

أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ বলার মাধ্যমে একথা বুঝানো হয়েছে যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজস্ব ক্ষমতা বলে ভ্রমণ করেননি। বরং তাঁকে ভ্রমণ করানো হয়েছে। নিঃসন্দেহে এর মধ্যে যেমন আল্লাহ্‌র সর্বোচ্চ ক্ষমতা ও বান্দার অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে, তেমনি আল্লাহ্‌র রহমত হ’লে বান্দা যে ফেরেশতাদের ডিঙিয়ে যেতে পারে এবং উন্নতির সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে পারে, তারও ইঙ্গিত রয়েছে। লক্ষণীয় যে, এখানে أَسْرَىٰ بِرُوْحِهِ না বলে أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ বলা হয়েছে। এতে পরিষ্কার বলে দেওয়া হয়েছে যে, এই ভ্রমণ সপ্নযোগে ছিল না, বরং আত্মা ও দেহের সমন্বয়ে বান্দার সশরীরে ছিল। আর সশরীরে না হ’লে বিস্ময়েরই বা কি আছে? সাধারণ মানুষ তো হর-হামেশা মক্কা-মদীনা এমনকি কেউ মঙ্গল গ্রহে ঘুরে আসছে।

সম্মান ও গৌরবের স্তরে بِعَبْدِهِ শব্দটি একটি বিশেষ প্রেমময়তার ইঙ্গিত বহন করে। কেননা আল্লাহ্‌ তা‘য়ালা স্বয়ং কাউকে ‘আমার বান্দা’ বললে এর চাইতে বড় সম্মান মানুষের জন্যে আর কিছুই হ’তে পারে না।

ইসরা ও মি‘রাজের সমগ্র সফর যে আত্মিক ছিল না, বরং দৈহিক ছিল, একথা কুরাআনের স্পষ্ট আয়াত ও অনেক মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।

হাফেয ইবনু কাসীর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, অধিকাংশ বিদ্বান এ বিষয়ে একমত যে, মি‘রাজ দৈহিক ছিল, আত্মিক নয়। জাগ্রত অবস্থায় ছিল, ঘুমন্ত অবস্থায় নয়। তাছাড়া এ বিষয়ে সকলে একমত যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রথমে যদি ঘুমন্ত অবস্থায় কোন সপ্ন দেখতেন, অতঃপর জাগ্রত অবস্থায় তা পুনরায় বাস্তবে দেখতে পেতেন। কেননা তিনি এমন কোন সপ্ন দেখতেন না। যা আলোকোজ্জ্বল প্রভাতের মত সত্য প্রমাণিত না হ’ত। আলোচ্য ভায়াতের শুরুতে سُبْحَانَ শব্দের মধ্যে এদিকেই ইঙ্গিত রয়েছে। কেননা এ শব্দটি আশ্চর্যজনক ও বিরাট কোন বিষয়ের জন্যে ব্যবহৃত হয়। মে‘রাজ যদি শুধু আত্মিক অর্থাৎ সপ্নজগতে সংঘটিত হ’ত, তবে তাতে আশ্চর্যের বিষয় কিছু ছিল না। এছাড়া রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন মি‘রাজের ঘটনা হযরত উম্মে হানী (রাঃ)-এর কাছে বর্ণনা করলেন, তখন তিনি পরামর্শ দিলেন যে, আপনি কারও কাছে একথা প্রকাশ করবেন না। প্রকাশ করলে কাফেররা আপনার প্রতি আরো বেশি মিথ্যারোপ করবে। অতএব ব্যাপারটি যদি নিছক সপ্নেই হ’ত। তাহ’লে এ ধরনের পরামর্শ দেওয়ার কি কারন ছিল? এবং মিথ্যারোপ করারই বা কি কারন ছিল? উল্লেখ্য যে, মি‘রাজের রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বীয় চাচাতো বোন উম্মে হানী বিনতে আবু ত্বালিব-এর বাড়িতে ঘুমিয়ে ছিলেন এবং সেখান থেকেই রাত্রির শেষ প্রহরে তিনি উঠে যান।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন ঘটনা প্রকাশ করলেন, তখন কাফেররা যথারীতি মিথ্যারোপ করল এবং ঠাট্টা বিদ্রূপ করল। এমনকি কতক নও-মুসলিম এ সংবাদ শুনে ‘মুরতাদ’ বা ধর্মত্যাগী হয়ে গেল। যদি ব্যাপারটি কেবল সপ্নের হ’ত, তাহ’লে এতসব তুলকালাম কাণ্ড ঘটার সম্ভাবনা ছিল কি? অবশ্য এ ঘটনার আগে সপ্নের আকারে কোন আত্মিক মি‘রাজ হয়ে থাকলে তা এর পরিপন্থী নয়।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, মি‘রাজকে অবিশ্বাস করে যেসব মুসলমান তখন ‘মুরতাদ’ হয়ে গিয়েছিল, তাদের উদ্দেশ্য করে নিন্মোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়

وَمَا جَعَلْنَا الرُّؤْيَا الَّتِي أَرَيْنَاكَ إِلَّا فِتْنَةً لِّلنَّاسِ

‘এবং যে দৃশ্য আমরা আপনাকে দেখিয়েছি, তা কেবল মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য’।

নিঃসন্দেহে উক্ত পরিক্ষায় অবিশ্বাসীরা ব্যর্থ হয়েছে। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন,

قال ابن عباس رضي الله عنهما هي رؤيا عين أريها رسول الله صلى الله عليه وسلم ليلة أسري به  অর্থাৎ ‘এটি হ’ল প্রত্যক্ষ দর্শন, যা রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে মি‘রাজের রাত্রিতে স্বচক্ষে দেখানো হয়েছিল’।

কারন এটা প্রায় নিশ্চিতভাবে বলা চলে যে, বিষয়টি স্রেফ সপ্ন হ’লে কোন মুসলমান ‘মুরতাদ’ হয়ে যেত না। এখানে رؤيا বা ‘সপ্ন’ বলে رؤيت বা ‘দেখা’ বুঝানো হয়েছে। কিন্তু একে رؤيا শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করার কারন এই হতে পারে যে, এ ব্যাপারটিকে রূপক অর্থে رؤيا বলা হয়েছে। অর্থাৎ মি‘রাজের বাস্তব ঘটনার দৃষ্টান্ত এমন, যেমন কেউ সপ্ন দেখে, পক্ষান্তরে যদি رؤيا শব্দের অর্থ স্বপ্নই নেওয়া হয়, তবে এমনটিও অসম্ভব নয়। কারন, মি‘রাজের ঘটনাটি দৈহিক হওয়া ছাড়াও এর আগে আত্মিক বা সপ্নযোগেও হয়ে থাকতে পারে। এ কারনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস এবং আয়েশা (রাঃ) থেকে যে সপ্নযোগে মি‘রাজ হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে, তাও যথাস্থানে নির্ভুল হবে। কিন্তু এতে দৈহিক না হওয়া প্রমাণিত হয় না।

হাফেয ইবনু কাসীর (রহিমাহুল্লাহ) স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে মি‘রাজ সংক্রান্ত রেওয়াত সমূহ সনদ সহ বর্ণনা করেছেন। বর্ণনাকারী পঁচিশ জন ছাহাবীর নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁরা হ’লেনঃ

উমার ইবনুল খাত্তাব, আলী ইবনু আবী তালিব, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ, আবু যর গিফারী, মালিক ইবনু ছা’ছা, আবু হুরায়রা, আবু সাইদ খুদরী, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস, শাদ্দাদ ইবনে আউস, উবাই ইবনে কা’ব, আব্দুর রহমান ইবনু কুর্ত্ব, আবু হাব্বাহ এবং আবু লায়লা আনছারী, আব্দুল্লাহ ইবনু আমর, জাবের ইবনু আব্দুল্লাহ, হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান, বুরায়াদাহ, আবু আইয়ুব আনসারী, আবু উমামা, সামুরা ইবনে জুনদুব, আবুল হামরা, সোহায়েব রুমী, উম্মে হানী, আয়েশা ও আসমা বিনতে আবু বকর (রাযিআল্লাহু ‘আনহুম)।

অত:পর ইবনু কাছীর বলেন,

فحديث الإسراء أجمع عليه المسلمون، واعترض فيه الزنادقة الملحدون

‘মি’রাজ’ সম্পর্কে সব মুসলমানের ঐক্যমত রয়েছে। শুধু যিন্দীক্ব ও ধর্মদ্রোহীরা একে মানেনি।৫

মি’রাজের সংক্ষিপ্ত ঘটনা ও কুদরতের নিদর্শনাবলী :

হাফিয আবুল ফিদা ইমাদুদ্দীন ইসমাঈল ইবনু কাছীর (৭০১-৭৭৪ হি:) স্বীয় জগদ্বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থে আলোচ্য আয়াতের সংশ্লিষ্ট মি’রাজ বিষয়ক হাদীসসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা শেষে বলেন,

‘সত্য কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ইসরা-র সফর জাগ্রত অবস্থায় করেন, স্বপ্নে নয়। মক্বা মুকাররামা হতে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত রাত্রিকালীন এ সফর বুরাক্ব যোগে করেন। বায়তুল মুকাদ্দাসের দ্বারে উপনীত হয়ে তিনি বুরাক্বটি অদূরে বেঁধে দেন ও বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদে প্রবেশ করেন। অত:পর ক্বিবলার দিকে মুখ করে দু’রাকআত ‘তাহিইয়াতুল মাসজিদ’ সলাত আদায় করেন। অত:পর সিঁড়ি আনা হয়, যাতে নীচ থেকে উপরে যাওয়ার জন্যে ধাপ বানানো ছিল। তিনি উক্ত সিঁড়ির সাহায্যে প্রথম আকাশে, অত:পর সপ্ত আকাশসমূহে গমন করে। (এ সিঁড়িটি কি এবং কিরুপ ছিল, তার প্রকৃত স্বরুপ আল্লাহই ভালো জানেন। ইদানিংকালেও স্বয়ংক্রিয় লিফট ছাড়াও অনেক প্রকার সিঁড়ি পৃথিবীতে প্রচলিত আছে। অতএব এ অলৌকিক সিঁড়ি সম্পর্কে সন্দেহ ও দ্বিধার কোন কারণ নেই)। প্রত্যেক আকাশে নিকটবর্তী ফেরেশতারা তাঁকে অভ্যর্থনা জানায় এবং প্রত্যেক আকাশে স্ব স্ব স্থানে অবস্থানরত আম্বিয়াগণকে তিনি সালাম দেন। এভাবে ষষ্ঠ আসমানে মূসা (আ) এবং সপ্তম আকাশে ইবরাহীম (আ)-এর সাথে সাক্ষাত হয়। অতপর তিনি পয়গম্বরগণের স্থান সমূহ অতিক্রম করে এমন এক ময়দানে পৌছেন, যেখানে ভাগ্যলিপি লেখার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। অত:পর তার উপরে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’য় নিয়ে যাওয়া হয়। যেখানে আল্লাহ তা’আলার নির্দেশে স্বর্ণের প্রজাপতি এবং বিভিন্ন রঙ-এর প্রজাপতি সমূহ ইতস্তত: ছুটাছুটি করছিল। ফেরেশতারা স্থানটিকে ঘিরে রেখেছিলো। এখানে তিনি জিবরাঈলকে তার ৬০০ ডানা সহ স্বরুপে দেখেন। সেখানে তিনি একটি দিগন্ত বেষ্টিত সবুজ রঙ্গের ‘রফরফ’ দেখতে পান। সবুজ রঙ্গের গদিবিশিষ্ট পাল্কীকে রফরফ বলা হয়। অত:পর তার উপরে বায়তুল মামূর দেখানো হয়। তিনি সেখানে সাথীদের নিয়ে সালাত আদায় করেন। দুনিয়ায় কা’বার প্রতিষ্ঠানা হযরত ইবরাহীম (আ) বায়তুল মা’মুরের প্রাচীর গাত্রে হেলান দিয়ে উপবিষ্ট ছিলেন। কেননা এটি হল আসমানের কাবা। বায়তুল মা’মুরে দৈনিক সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে। ক্বিয়ামাত পর্যন্ত তাদেরে সেখানে পুনর্বার প্রবেশ করার পালা আসবে না।

রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘এমন সময় সকল প্রকার রং বিশিষ্ট একটি মেঘ আমাকে ঢেকে ফেলে। তখন জিবরাইল আমাকে ছেড়ে যায় এবং আমি আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাজদায় পড়ে যাই। তখন আল্লাহ আমাকে বলেন, “হে মুহাম্মাদ! আসমান ও যমীন সৃষ্টির শুরু থেকে আমি তোমার উম্মতের জন্য ৫০ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছি। অতএব তুমি ও তোমার উম্মত তা গ্রহণ কর। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, অত:পর মেঘটি সরে গেল এবং চারিদিক পরিষ্কার হয়ে গেল। তখন জিবরাঈল এসে আমার হাত ধরল। কিন্তু তিনি কিছু বললেন না। তখন মূসার কাছে নেমে এলাম, তিনি আমাকে পুনরায় ফিরে গিয়ে সালাতের পরিমাণ কমিয়ে আনার জন্য পীড়াপীড়ি করলেন। মূসা (আ)-এর পরামর্শক্রমে রাসূল (সা) কয়েকবার আল্লাহর নিকটে যান ও সলাতের ওয়াক্তের পরিমাণ কমানোর অনুরোধ করেন। অত:পর তা অনুগ্রহ বশে হ্রাস করে পাঁচ ওয়াক্ত করে দেওয়া হয়, যা ৫০ ওয়াক্তের শামিল হবে।

এর দ্বারা সব ইবাদাতের মধ্যে সালাতের বিশেষ গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) স্বচক্ষে জান্নাত, জাহান্নাম, মাক্বামে মাহমুদ, হাউযে কাওসার ইত্যাদি পরিদর্শন করেন। অত:পর তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসেফিরে আসেন এবং বিভিন্ন আসমানে যে সকল আম্বিয়াগণের সঙ্গে সাক্ষাত হয়েছিল, তাঁরাও তাঁর সাথে বায়তুল মুকাদ্দাসে অবতরণ করেন। তখন সলাতের সময় হয়ে যায় এবং তিন আম্বিয়াগণকে নিয়ে সলাত আদায় করেন। সম্ভবত: সেটা সেদিনকার ফজরের সালাত ছিলো।

ইবনু কাছীর বলেন, সলাতে আম্বিয়াগণের ইমামতি করার এ ঘটনাটি কারও কারও মতে আসমানে ওঠার পুর্বৈ সংগঠিত হয়। কিন্তু বাহ্যত: এ ঘটনাটি সেখান থেকে প্রত্যাবর্তনের পরে ঘটে। কেননা, আসমানে আম্বিয়াগণের সাথে সাক্ষাতের ঘটনায় এ কথাও বর্ণিত রয়েছে যে, জিব্রাঈল (আ) আম্বিয়াগণের সাথে তাঁকে পৃথক পৃথকভাবে পরিচয় করিয়ে দেন। ইমামতির ঘটনা প্রথমে হয়ে থাকলে এখানে পুনরায় পরিচয় করিয়ে দেয়ার কোন প্রয়োজন ছিলো না। এছাড়া সফরের আসল উদ্দেশ্য ছিল উর্দ্ধ জগতে গমন করা। কাজেই একাজটি প্রথমে সেরে নেওয়াই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। আসল কাজ সমাপ্ত হওয়ার পর সব আম্বিয়াগণ বিদায় দানের জন্য তাঁর সাথে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত আসেন এবং জিব্রাঈলের ইঙ্গিতে তাঁকে সবাই ইমাম বানিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে কার্যত: তাঁর নেতৃত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেওয়া হয়। তাঁকে শুরুতে বায়তুল মুকাদ্দাসে ও শেষে সিদরাতুল মুনতাহাতে দুধ, মদ, মধু ইত্যাদি দ্বারা আপ্যায়ন করা হয়। কিন্তু তিনি কেবল দুধ গ্রহণ করেন। বায়তুল মুক্বাদ্দাসে বিদায়ী সলাত শেষে তাঁকে জাহান্নামের দারোগা ‘মালেক’ ফেরেশতার সাথে পরিচয় করে দেওয়া হয় এবং তিনি রাসূলকে প্রথমে সালাম দেন। এরপর তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে বিদায় নেন এবং বুরাক্বে সওয়ার হয়ে অন্ধকার থাকতেই মক্কা মুকাররামায় ফিরে আসেন । আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।৬

কুরতুবী বলেন, এ বিষয়ে বিদ্বানগণের মধ্যে কোন মতভেদ নেই যে, মি’রাজের পরদিন দুপুরে সূর্য ঢলে পড়ার সময় জিবরাইল (আ) নেমে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-কে সলাতের ওয়াক্ত সমূহ নির্ধারণ করে দেন ও সলাতের নিয়ম-কানুন শিক্ষা দেন।৭

উল্লেখ্য যে, নবীগণের মধ্যে ১ম আসমানে আদম (আ), ২য় আসমানে ইয়াহইয়া ও ঈসা (আ) দুই খালাতো ভাই, ৩য় আসমানে ইউসুফ (আ), ৪র্থ আসমানে ইদরীস (আ), ৫ম আসমানে হারুন (আ), ৬ষ্ঠ আসমানে মূসা (আ) ও ৭ম আসমানে ইবরাহীম (আ)-এর সঙ্গে সাক্ষাত হয়। ৭ম আসমানের উপর ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ এবং তারও উপরে আরশ। ৮

 

মিরাজ থেকে কি কি নিয়ে আসেন :

মি’রাজে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে তিনটি বস্তু প্রদান করা হয় :

  • পাঁচ ওয়াক্ত সলাত
  • সূরা বাক্বারাহর শেষ আয়াতগুলি অর্থ্যাত ২৮৫-২৮৬ আয়াত।
  • উম্মতে মুহাম্মাদীর মধ্যে যারা কখনো শিরক করেনি, তাদেরকে ক্ষমা করার সুসংবাদ।৯

উল্লেখ্য যে, সূরা বাক্বারাহ মাদানী সূরার অন্তর্ভূক্ত। অথচ মি’রাজ হয়েছে মক্কাতে। যেখানে সূরা বাক্বারাহর শেষ দুই আদায়ন নাযিল হয়েছে। এর জবাবা এই যে, জিব্রাইলের মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি এ দু’টি আয়াত রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ হয় তাঁকে প্রার্থনা শিক্ষা দেওয়ার জন্য, যাতে আল্লাহ তাঁর দো’আ কবুল করতে পারেন। অত:পর জিবরাইলের মাধ্যে পুনরায় এ আয়াত দু’টি সূরা বাক্বারাহর বাকী আয়াতগুলির সাথে মদীনায় নাযিল হয়। এভাবে সমস্ত কুরআন জিবরাইলের মাধ্যমে নাযিল হয়। তাছাড়া এ আয়াত দু’টি এমনই মর্যাদাপূর্ণ যে সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেন, দুটি এমন নূর আমাকে দেওয়া হয়েছে, যা ইতিপূর্বে কোন নবীকে দেওয়া হয়নি। একটি হল, সূরা ফাতিহা। অন্যটি হলো বাক্বারাহর শেষদু’টি আয়াত। যে ব্যক্তি এ দুটি থেকে একটি হরফ পাঠ করবে, তাকে তা দেওয়া হবে।১০ নি:সন্দেহে দু’বার নাযিলের মাধ্যমে অত্র আয়াত দুটির উচ্চ মর্যাদা ও অধিক গুরুত্ব বুঝানো হয়েছে।১১

উল্লেখ্য যে, মি’রাজে রাসুলুল্লাহ (সা) “আত্তাহিইয়াতু” প্রাপ্ত হয়েছিলেন বলে ব্যাপকভাবে একটি কথা প্রচলিত আছে, যা মিরক্বাত, রাদ্দুল মুহতার, মিসকুল খিতাম প্রভৃতি গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। বর্ণনাটি নিম্নরুপ :

ইবনুল মালেক বলেন, বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা) মি’রাজে গিয়ে ‘আত্তাহিইয়াতু’-র মাধ্যমে আল্লাহর প্রশংসা করেন। জবাবে আল্লাহ বলেন, আসসালামু আলাইকা…….. ‘হে নবী! আপনার উপর শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত সমূহ নাযিল হোক। তখন রাসুল (সা) বলেন, আসসালামু আলায়না……… ‘আমাদের উপরে এবং আল্লাহর নেককার বান্দাদের উপরে শান্তি বর্ষিত হোক। তখন জিবরাঈল (আ) বলেন, আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু…………. ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল।

উপরোক্ত বর্ণনাটির কোনরুপ সনদ বা সূত্র যাচাই না করেই মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী (মৃত ১০১৪ হি) মন্তব্য করেন যে, এ বক্তব্যের দ্বারা তাশাহহুদে রাসূলকে (হে নবী! বলে) সম্বোধন করার কারণ প্রকাশিত হয়েছে। আর এর মাধ্যমে সালাতের শেষে রাসুলের মি’রাজের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা মুমিনদের জন্য মিরাজ স্বরুপ।১২ সম্ভত তাঁকে অনুকরণ করেই পরবর্তী লেখকগণ স্ব স্ব গ্রন্থে এটা উদ্ধৃত করে গেছেন। বিংশ শতকের সূক্ষ্নদর্শী ভাষ্যকার আল্লামা উবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী (১৩২২-১৪১৪/১৯০৪-১৯৯৪) উক্ত বর্ণনা উল্লেখ করে মন্তব্য করেন,

বর্ণনাটির সূত্র আমি খুঁজে পাইনি। যদি এটা প্রমাণিত হ’ত, তবে কতই না সুন্দর ব্যাখ্যা হত এটা।১৩  অতএব ভিত্তিহীন বক্তব্য থেকে বিরত থাকাই উত্তম।

(চলবে)

 

 তথ্যসূত্র :

১। মিশকাত হা/৫৮৬২-৬৬।

২. ত্বাবারাণী, তাফসীর ইবনে কাসীর ৩/২৪।

৩. সূরা ইসরা, আয়াত নং-৬০। কুরতুবী ১০/২৮৬।

৪. তাফসীর ইবনু কাছীর ৩/২৫।

৫. তাফসীর ইবনু কাছীর ৩/২৬।

৬. ঐ, তাফসীর ৩/৮-২৫; মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মুসলিম, মিশকতা হা/৫৮৬২-৬৬।

৭. তাফসীরে কুরতুবী ১০/২১১।

৮. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৮৬২ “মিরাজ” অনুচ্ছেদ।

৯. মুসলিম, মিশকাত হা/৫৮৬৫।

১০. মুসলিম, মিশকাত হা/২১২৪।

১১. মিরক্বাত ১১/১৫৬।

১২. মিরক্বাত ২/৩৩১।

১৩. মির’আত ৩/২৩৩, হা/৯১৫ এর ব্যাখ্যা ‘তাশাহহুদ’ অনুচ্ছেদ।

( আত-তাহরীক সেপ্টেম্বর ২০০৪ সংখ্যা থেকে সংগৃহীত ও ঈষত পরিমার্জিত)।

মতামত দিন