সুন্নাহ হাদীস

হাদীছ ব্যতীত কুরআনের প্রতি আমল করা অসম্ভব

হাদীছ ব্যতীত কুরআনের প্রতি আমল করা অসম্ভবঃ

আল হামদুলিল্লাহ্, ওয়াস্ সালাতু ওয়াস্ সালামু আলা রাসূলিল্লাহ্। আম্মা বা’দ:

কুরআন আল্লাহর বাণী। আল্লাহ ইহা নাযিল করেছেন মুহাম্মাদ (সাঃ)এর উপর। তিনি নিজে কুরআনের প্রতি আমল করেছেন এবং কিভাবে আমল করতে হবে তা তাঁর সাহাবায়ে কেরামকে শিখিয়েছেন। সুতরাং কুরআনের প্রতি আমল করতে চাইলে নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)এর নিকট থেকেই জানতে হবে তিনি কিভাবে এই কুরআনের প্রতি আমল করেছেন। তাঁর অনুসরণ না করলে কখনই কুরআন পুরাপুরি রূপে বুঝা যাবে না এবং আমলও করা যাবে না। কেননা কুরআনের প্রতিটি কথার বিবরণ ও ব্যাখ্যার দায়িত্ব  আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর রাসূল (সাঃ)কে দিয়েছেন।

তিনি বলেন, وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ “নিশ্চয় আমি আপনার নিকট যিকির (কুরআন) নাযিল করেছি, যাতে করে আপনি বিশদভাবে মানুষের নিকট বর্ণনা করে দেন যা তাদের নিকট নাযিল করা হয়েছে।” (সূরা নাহালঃ ৪৪)

আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেন, “তাঁর চরিত্র ও জীবনী ছিল কুরআন।” অর্থাৎ কুরআন পাঠ করার সাথে তাঁর জীবনী পাঠ করলে এবং তাঁর হাদীছ পাঠ করলে কিভাবে তিনি কুরআনের প্রতি আমল করেছেন তা বাস্তবভাবে বুঝা যাবে।

আইয়্যুব সুখতিয়ানী থেকে বর্ণিত। জনৈক ব্যক্তি মুত্বার্রেফ বিন আবদুল্লাহ বিন শিখখীরকে বলল, কুরআন ব্যতীত অন্য কিছু আমাদের নিকট বর্ণনা করবেন না। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ আমরা কুরআনের বিপরীতে কিছু চাই না। কিন্তু আমরা তাঁকে চাই যিনি কুরআন সম্পর্কে আমাদের চেয়ে বেশী জ্ঞান রাখতেন।” (ইবনে আবদুল বার্ জামে’ বায়ানুল ইলম ২/১১৯৩)

অতএব রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)এর সম্পূর্ণ জীবনীর অনুসরণ না করেবাহ্যিকভাবে কুরআন মানার দাবী করা হলেও, মূলত: তা অমান্য করারই শামিল। কেননা তাঁর জীবনী আমাদের আদর্শ। (আহযাব: ৩২) তাঁকে অনুসরণ করলেই আমরা সঠিক হেদায়াত লাভ করব। (বাকারা: ১৩৫) তাঁকে অনুসরণ করলে আল্লাহকেই অনুসরণ করা হয়। (নিসা: ৮০) তাঁকে অনুসরণ করলে আল্লাহ্ আমাদের ভালবাসবেন এবং আমাদের গুনাহ মাফ করে দিবেন। (আল ইমরানঃ ৩১)

হাদীছ মানা যে আল্লাহর নির্দেশ এ সম্পর্কে  এই পোস্টটি পড়ুন।

হাদীছ না মানলে কুরআনকে যথাযথভাবে মানা হয় নাঃ

(১) সালাত। মুসলমানের উপর সবচেয়ে বড় ফরয ইবাদত। এই ইবাদত কার উপর, কোন কোন সময়, দিনে-রাতে কতবার, কত রাকাত, কি পদ্ধতিতে আদায় করতে হবে, রুকু-সিজদার নিয়ম ইত্যাদি কোন কিছুই কুরআনে উল্লেখ হয়নি। সালাতের জন্যে কি পদ্ধতিতে কি শব্দ উচ্চারণ করে আহ্বান করতে হবে? মানুষ মৃত্যু বরণ করলে তার জানাযা সালাত কি পড়তে হবে? দু’ঈদের সালাত বলতে কি কিছু আছে? এগুলো নবী (সাঃ)এর হাদীছ থেকেই জানতে হবে।

(২) যাকাত। ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ। কোন ধরণের সম্পদ,কি পরিমাণ, কত দিন কাছে থাকলে, কি পরিমাণ যাকাত বের করতে হবে। উট, গরু, ছাগল, শস্য, স্বর্ণ-রৌপ্য ইত্যাদি সম্পদের যাকাতের বিস্তারিত বিবরণ কি? রামাযান শেষে যাকাতুল ফিতর দিতে হবে কি না? ইত্যাদি হাদীছ থেকে জানতে হবে।

(৩) পবিত্রতার ক্ষেত্রে কুরআনে কিছুটা বিস্তারিত থাকলেও নারীদের ঋতু অবস্থায় তার সাথে কি আচরণ করতে হবে তার বিবরণ হাদীছ থেকে নিতে হবে। কুরআনের বাহ্যিক অর্থ অনুযায়ী ঐ অবস্থায় ঋতুবতীর সাথে উঠা-বসা, পানাহার, কথা বলা, শুয়ে থাকা, স্পর্শ করা কোন কিছুই করা যাবে না (২:২২২)। কিন্তু হাদীছ বলেছে, ঐ অবস্থায় শুধুমাত্র সহবাস ব্যতীত সবকিছু করা যাবে।

(৪) হজ্জ। ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ। জীবনে কয়বার হজ্জ ফরয? ইহরাম কিভাবে করতে হবে, কা’বা ঘরের তাওয়াফ কিভাবে, কয়বার করতে হবে? কিভাবে কতবার সাফা-মারওয়া সাঈ করতে হবে, মিনা, আরাফাত, মুযদালিফা, কুরবানী করতে হবে? ইত্যাদির বিস্তারিত বিবরণ হাদীছ থেকেই নিতে হবে।

(৫) সিয়াম। এ সম্পর্কে কিছু মাসআলা কুরআনে থাকলেও বিস্তারিত বিবরণ হাদীছ থেকেই নিতে হবে।

(৬) চোরের হাত করতে হবে কুরআনে আছে। কিন্তু কি পরিমাণ সম্পদ চুরি করলে হাত কাটা যাবে আর কি পরিমাণে হাত কাটা যাবে না তার বিবরণ হাদীছ থেকে নিতে হবে। কেননা ১টাকা চুরি করা আর ১ লক্ষ টাকা চুরি করার অপরাধ কিন্তু একই। উভয় ক্ষেত্রে ব্যক্তি চোর সাব্যস্ত হবে। কিন্তু শাস্তির ক্ষেত্রে অবশ্যই একসমান হবে না।

তাছাড়া হাত কাটলে কি পরিমাণ কাটতে হবে? কব্জি থেকে না কনুই থেকে না সম্পূর্ণ হাত কাটতে হবে?

(৭) মা অনুপস্থিত থাকলে দাদী মীরাছ পাবে কি না?

(৮) স্ত্রীর ফুফু বা খালাকে বিবাহ করা কি বৈধ? দুগ্ধ সম্পর্কিত কোন্ কোন্ নারীকে বিবাহ করা হারাম ইত্যাদি বিবরণ কুরআনে নেই। আছে হাদীছে।

(৯) কুরআনে মদ্যপান হারাম করা হয়েছে। এখন হেরোইন, আফীম, গাঁজা ইত্যাদি মাদকদ্রব্য কুরআনের কোন আয়াতের মাধ্যমে হারাম করবেন? হাদীছের মূলনীতির মাধ্যমে তা হারাম হবে। “যা বেশী খেলে বা সেবন করলে মাদকতা আসে, তার অল্পটাও হারাম।” (আবু দাউদ)

(১০) কুরআন বলছে মৃত প্রাণী খওয়া হারাম। কিন্তু হাদীছ বলছে পানির মাছ মৃত হলেও তা খাওয়া খালাল। কুরআনে পশুকুলের মধ্যে শুধু শুকরকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কুকুর-শিয়াল, বিড়াল, বাঁদর, বাঘ-ভল্লুক, সাপ-বিচ্ছু, পোকা-মাকড়, কিট-পতঙ্গ, ঈগল, চিল, বাজ, শুকন… ইত্যাদি হারাম হওয়ার ব্যাপারে হাদীছে মূলনীতি বেঁধে দেয়া হয়েছে। তা হচ্ছে, “দাঁত দ্বারা শিকার করে এরকম সকল হিংস্র পশু হারাম। আর থাবা দিয়ে শিকার করে এমন প্রত্যেক পাখি হারাম।” (বুখারী ও মুসলিম)

(১১) কুরআনে সূরা নিসায় (আয়াত ১০১) সফর অবস্থায় শত্রুর ভয় থাকলে সালাতকে কসর করতে বলা হয়েছে; অথচ রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) ভয় থাকুক আর না থাকুক উভয় অবস্থায় সালাত কসর করে বলেছেন, “সালাত কসর করা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সাদকা, অতএব তোমরা আল্লাহর সাদকা গ্রহণ কর।” (মুসলিম)

(১২) কুরআন বলে, “কে আল্লাহর সৌন্দর্যকে হারাম করেছে, যা তিনি তার বান্দাদের জন্যে পাঠিয়েছেন? (আ’রাফঃ ৩২) অথচ হাদীছে রাসূলু্ল্লাহ্ (সাঃ) পুরুষদের জন্যে স্বর্ণ ও রেশম ব্যবহারকে হারাম করেছেন। (হাকেম)

এধরণেরে আরো অসংখ্য অগণিত বিষয় আছে যা কুরআনকে সামনে রেখে তার ব্যাখ্যা হাদীছ থেকেই জেনে নিতে হবে।

জনৈক মহিলা ইবনে মাসউদ (রাঃ)কে বলল, আপনারা নাকি বলেন, “যে নারীরা (হাতে বা মুখমন্ডলে) খোদাই করে নকশা করে এবং যারা নকশা করিয়ে নেয়, যে নারীরা ভ্রুর চুল উঠিয়ে নেয় এবং যে নারীরা দাঁত সুন্দর করার জন্যে তাতে ফাঁক সৃষ্টি করে এদের সবাইকে আল্লাহ্ লা’নত করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, সত্য কথা। মহিলাটি বলল, আমি আল্লাহর কিতাব প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেছি, কিন্তু কোথাও তো একথা পাই নি? ইবনে মাসউদ (রাঃ) বললেন, তুমি যদি কুরআন পড়তে তবে তা পেতে। তুমি কি পড়নি আল্লাহর বাণী: ومَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا “রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহন কর এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক।” (হাশরঃ৭)সে বলল,একথা তো কুরআনে আছে। তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)কে উক্ত কথা বলতে শুনেছি। (বুখারী ও মুসলিম)

অতএব যারা কুরআন মানার দাবী করবে,তাদের হাদীছ না মেনে উপায় নেই। হাদীছ মানলেই কুরআন মানা হবে এবং সত্যিকার অর্থে তারা কুরআনের অনুসারী হবে এবং প্রকৃত মুসলমান হবে।

সূত্র

মতামত দিন