সহীহ ও যয়ীফ হাদীসের আলোকে মুহাররাম মাস

আরবী পঞ্জিকার প্রথম মাস মুহাররাম মাস। সহীহ হাদীসের আলোকে আমরা এই মাসের ফযীলত ও মর্যাদা সম্পর্কে নিম্নের বিষয়গুলো জানতে পারি

 

প্রথমত: এই মাসটি বছরের চারটি “হারাম’ মাসের অন্যতম। এই মাসগুলো ইসলামী শরীআহতে বিশেষভাবে সম্মানিত।  এ সম্পর্কে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন : “আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন হতেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট মাস গণনায় মাস বারটি, তন্মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস। এটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং এই নিষিদ্ধ মাসগুলির মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।

( সুরা আত-তাওবা আয়াত ৩৬)।

এই হারাম মাসগুলো হলো : মুহাররাম, রজব, যিলকাদ ও যিলহাজ্জ মাস।

দ্বিতীয়ত , এই মাসকে সহীহ হাদীসে “আল্লাহর মাস’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং এই মাসের নফল সিয়াম সর্বোত্তম নফল সিয়াম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সহীহ মুসলিমে রয়েছে –

রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন : রামাদানের পর সর্বোত্তম সিয়াম হলো  আল্লাহর মাস মুহাররাম মাস । ( মুসলিম, আস-সহীহ ২/৮২১)।

 

তৃতীয়ত, এই মাসের ১০ তারিখ ‘আশূরা’র দিনে সিয়াম পালনের বিশেষ ফযীলত রয়েছে। আশূরার সিয়াম সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন :

“এই দিনের সিয়াম গত এক বত্সরের পাপ মার্জনা করে।

এই দিনে রাসূলুল্লাহ (সা) নিজে সিয়াম পালন করতেন, উম্মতকে সিয়াম পালনে উত্সাহিত করেছেন এবং ১০ তারিখের সাথে সাথে ৯ বা ১১ তারিখেও সিয়াম পালন করতে উত্সাহ দিয়েছেন।

চতুর্থত, সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, এই দিনে মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল মূসা (আ) ও তাঁর সঙ্গী বনী ইসরাঈলকে ফিরআউনের হাত থেকে উদ্ধার করেন এবং ফির’আউন ও তার সঙ্গীদেরকে ডুবিয়ে মারেন। (বুখারী, আস-সহীহ ২/৭০৪, ৩/১২৪৪; মুসলিম, আস-সহীহ ২/৭৯৬)।

সহীহ হাদীস থেকে মুহাররাম মাস ও আশুরা সম্পর্কে শুধু এতটুকুই জানা যায় । পরবর্তীকালে অনেক বানোয়াট ও মিথ্যা কাহিনী এক্ষেত্রে প্রচলিত হয়েছে। এখানে দুইট বিষয় লক্ষণীয় :

প্রথম বিষয়: এই দিনটিকে ইয়াহুদীগণ সম্মান করত। এ কারণে ইয়াহুদীদের মধ্যে এই দিনটি সম্পর্কে অনেক ভিত্তিহীন কল্প-কাহিনী প্রচলিত ছিল। পরবর্তীযুগে ইসরাঈলী রেওয়াতে হিসেবে সেগুলি মুসলিম সমাজে প্রবেশ করেছে। প্রথম যুগে মুসলিমগণ এগুলো সত্যা বা মিথ্যা বলে বিশ্বাস না করে ইসারাঈলী কাহিনী হিসেবেই বলেছেন। পরবর্তী যুগে তা ‘হাদীসে’ পরিণত হয়েছে।

দ্বিতীয় বিষয়: রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ইন্তিকালের অর্ধ শতাব্দী পরে ৬১ হিজরীর মুহাররাম মাসের ১০ তারিখে আশূরার দিনে তাঁর প্রিয়তম নাতি হযরত হুসাইন (রা) কারবালার প্রান্তরে শহীদ হন। এই ঘটনা মুসলিম উ্মমাহর মধ্যে চিরস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করে। হুসাইন (রা)-এর পক্ষের ও বিপক্ষের অনেক বিবেকহীন দুর্বল ঈমানের মানুষ “আশূরার’ বিষয়ে অনেক হাদীস বানিয়েছে। কেউ দিনটিকে ‘শোক দিবস’ হিসেবে এবং কেউ দিনটিকে ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে পালনের জন্য নানা প্রকারের কথা বানিয়েছেন। তবে মুহাদ্দিসগণের নিরীক্ষা পদ্ধতিতে এ সকল জালিয়াতি ধরা খুবই সহজ ছিল।

মুহাররাম ও আশরা সম্পর্কে জাল বা দুর্বল হাদীস ও সাহাবী-তাবিয়ীগণের মতামত

  1. অত্যন্ত দুর্বল সূত্রে কোন কোন সাহাবী বা তাবিয়ী থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, এই িদনে আল্লাহ আদম (আ)-এর তাওবা কবুল করেন।
  2. অনুরুপভাবে অনির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, এই দিনে ঈসা (আ) জন্মগ্রহণ করেন।
  3. মুহররাম মাসে বা আশূরার দিনে দান-সাদকার বিষয়ে যা কিছু বলা হয় সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে এ বিষয়ে কিছুই বর্ণিত হয় নি। তবে অত্যন্ত দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য সূত্রে একজন সাহাবী (রা) থেকে বর্ণিত হয়েচে, তিনি বলেছেন, আশুরার দিনে সিয়াম পালন করলে যেহেতু  এক বত্সরের সাওয়াব পাওয়া যায়, সেহেতু এই দিনে দান করলেও এক বত্সরের দানের সাওয়াব পাওয়া যেতে পারে । এছাড়া এই দিনে দানের বিষয়ে যা কিছু বলা হয় সবই বাতিল ও ভিত্তিহীন কথা।
  4. একটি হাদীসে বলা হয়েছে : ” যে ব্যক্তি আশূরার দিনে তার পরিবারের জন্য প্রশস্তভাবে খরচ করবে, আল্লাহ সারা বত্সরই সেই ব্যক্তিকে প্রশস্ত রিযক প্রদান করবেন ।  এই হাদীসটি কয়েকটি সনদে বর্ণিত হলে । মুহাদ্দিসগণ একে অত্যন্ত দুর্বল ও খুবই আপত্তিকর বলেছেন। অন্যদিকে ইমাম আহমাদ ও ইবনু তাইমিয়া একে জাল ও বানোয়াট বলে গণ্য করেছেন। বরং এটি সহীহ হাদীসের বিরোধী। সহীহ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইয়াহুদীরা আশুরার দিনে উত্সব-আনন্দ করে তোমরা তাদের বিরোধীতা করবে, এই দিনে সিয়াম পালন করবে এবং উত্সব বা আনন্দ করবে না। ( মোল্লা কারী, আল-আসরার পৃ ২৪৪-২৪৫, আল-আসার, আব্দুল হাই লাখনবী হানাফী, পৃ ১০০-১০২)।
  5. অন্য হাদীসে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আশূরার দিনে চোখে ‘ইসমিদ’ সুরমা ব্যবহার করবে কখনোই তার চোখ উঠবে না।  এই হাদীসটিও জাল ও বানোয়াট। মুহাদ্দিসগণ বলেছেন, ইমাম হুসাইন (রা) এর হত্যাকারীগণ আশুরার দিনে সুরমা মাখার বিদ’আতটি চালু করেন। এই কথাটি তাদেরই বানানো। কোন দুর্বল রাবী বেখেয়ালে তা বর্ণনা করেছেন।

 

মুহাররম মাস বিষয়ক মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কথাবার্তা :

 

উপরের কথা গুলো কোন কোন মুহাদ্দি জাল বলে গণ্য করলেও কেউ কেউ তা দুর্বল বলে গণ্য করেছেন। নিচের কথাগুলি সকল মুহাদ্দিসগণ একবাক্যে জাল বলে স্বীকার করেছেন।  এগুলোকে আমরা তিনভাবে ভাগ করতে পারি।

প্রথমত, মুহাররম মাসে সিয়ামের ফযীলত বিষয়ে জাল কথা :  আশুরার দিনে সিয়াম পালন করলে এক বছরের গোনাহ কাফফারা হবে বলে সহীহ হাদীসে রযেছে। কিন্তু জালিয়াতগণ এতে সন্তুষ্ট না থেকে কিছু কথা বানিয়েছে সেগুলো হলো :

” হাদীসে আছে- যে ব্যক্তি মহররমের মাসে রোযা রাখিবে, আল্লাহ তাহাকে প্রত্যেক রোযার পরিবর্তে ৩০দিন রোযা রাখার সমান সওয়াব দিবেন। আরও হাদীসে আছে- যে ব্যক্তি আশুরার দিন একটি রোযা রাখিবে সে দশ হাজার ফেরেশতার, দশ হাজার শহীদের ও দশ হাজার হাযীর সওয়াব পাইবে।

আরও হাদীসে আছে –  যে ব্যক্তি আশুরার তারিখে স্নেহ-পরবশ হইয়া কোন এতীমের মাথঅয় হাত ঘুরাইবে, আল্লাহ ঐ এতিমের মাথার প্রত্যেক চুলে পরিবর্তে তাহাকে বেহশদের এক একটি ‘দরজা’ প্রদান করিবেন। আর যে ব্যক্তি উক্ত তারিখের সন্ধ্যায রোযাদারকে খানা খাওয়াইবে বা ইফতার করাইবে, সে ব্যক্তি সমস্ত উম্মতে মোহাম্মদীকে খানা খাওয়াইবার ও ইফতার করাইবার ন্যায় ছওয়াব পাইবে।

হযরত (সা) আরও বলিলেন- যে ব্যক্তি আশুরার তারিখে রোযা রাখিবে, সে ৬০ বছর রোযা নামায করার সমতুল্য ছওয়াব পাইবে। বে ব্যক্তি ঐ তারিখ বিমার পোরছী করিবে, সে সমস্ত আওলাদে আদমের বিমার-পোরছী করার সমতুল্য ছওয়াব পাইবে।……………তাহার পরিবারে ফারগতি অবস্থা হইব।ে ৪০ বত্সরের গুনাহর কাফফারা হইয়া যাইব।………..(হাদীস )

অনুরুপ আরেকটি মিথ্যা কথা হলো : “হযরত রাসূলুল্লাহ (সা) এরশাদ করিয়াছেন, যে ব্যক্তি মহররম মাসের প্রথম ১০দিন রোযা রাখিবে, সে ব্যক্তি যেন ১০ হাজার বত্সর যাবত দিনের বেলা রোজা রাখিল এবং রাত্রিবেলা ইবাদতে জাগরিত থাকিল।………. মহরম মাসে ইবাদতকারী ব্যক্তি যেন ক্বাদরের রাত্রির ইবাদতের ফযীলত লাভ করিল। ……..তোমরা আল্লাহ তা’আলার পছন্দনীয় মাস মহররমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিও। যেই ব্যক্তি মহররম মাসের সম্মান করিবে, আল্লাহ তাআলা তাহাকে জান্নাতের মধ্যে সম্মানিত করিবেন এবং জাহান্নামের আযাব হইতে বাঁচাইয়া রাখিবেন।……. মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখা আদম (আ) ও অন্যান্য নবীদের উপর ফরজ ছিল। এই দিবসে ২০০০ নবী জন্মগ্রহণ করিয়াছেন এবং ২০০০ নবীর দোয়া কবুল করা হইয়াছে…………..

মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এগুলো সবই বানোয়াট কথা ও জাল হাদীস।

অথচ বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ বানোয়াট গল্প ও বানোয়াট আমলের গল্প গুজবে ভর্তি বই  মকছোদুল মো’মেনীন ও বার চান্দের ফযীলত, নেক আমল প্রভৃতি বানোয়াট কিতাবে আরো বিস্তারিত বর্ণনা করেছে। দুর্ভাগ্য এই সব আলেমের জন্যই আমরা আজ ভেজাল আমল করতে অভ্যস্থ। এসব বই লেখকদের আল্লাহ সঠিক পথের হিদায়াত দিন।

 

মুহাররাম মাসের সালাত :

মুহাররাম মাসের কোন দিবস বা রাত্রে এবং আশুরারর দিবসে বা রাত্রে কোন বিশেষ সালাত আদায়ের কোন প্রকার নির্দেশনা বা উত্সাহ কোন হাদীসে বর্ণিত হয় নি। এ বিষয়ক সকল কথাই বানোয়াট। আামাদের দেশে প্রচলিত কোন কোন প্রস্তুকে মুহাররাম মাসের ১ম তারিখে দুই রাকআত সালাত আদায় করে বিশেষ দোয়া পাঠের বিশেষ ফযীলতের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এগুলি সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। ( এসব বর্ণনা রয়েছে বার চান্দের ফযীলত, মুফতী হাবিব ছামদানী বইয়ে রয়েছে পৃ ১১-১২, নেক আমল, অধ্যাপিকা কামরুন নেসা দুলাল, পৃ ২৯৮)।

আশুরার দিনে বা রাতে বিশেষ সালাত :

আশুরার দিনে সিয়াম পালনের উত্সাহ দেওয়া হলেও আশুরার দিনে বা রাত্রে কোন বিশেষ সালাত আদায়ের বিধান দেওয়া হয় নি। তবে জালিয়াতগণ অনেক কথা বানিয়েছে। যেমন, যে ব্যক্তি আশুরার দিবসে যোহর ও আসরে মধ্যবর্তী সময়ে………….অথবা আশুরার রাত্রিতে এত রাকআত সালাত অমুখ অমুক সূরা এতবার পাঠ করে আদায় করবে……. সে এত এত পুরষ্কার লাভ করবে। সরলপ্রাণ মুসলিমদের মন জয় করার জন্য জালিয়াতগণ এ সকল কথা বানিয়েছে, যা অনেক সময় সরলপ্রাণ আলিম ও বুযুর্গকেও ধোকাগ্রস্থ করেছে।

আশুরায় অতীত ও ভবিষ্যত ঘটনাবলীর বানোয়াট ফিরিস্তি :

মিথ্যাবাদীরা রাসূল (সা)-এর নামে জালিয়াতি করে বলেছে :

  • আশুরার দিনে আল্লাহ আসমান ও যমিন সৃষ্টি করেছেন।
  • এই দিনে তিনি কলম সৃষ্টি করেছেন।
  • এই দিনে তিনি লাওহে মাহফূয সৃষ্টি করেছেন।
  • এই দিনে তিনি আরশ সৃস্টি করেছেন।
  • এই দিনে তিনি আরশের উপরে সমাসীন হয়েছেন।
  • এই দিনে তিনি জান্নাত সৃস্টি করেছেন।
  • এই দিনে তিনি জিবরাঈল (আ) সৃষ্টি করেছেন।
  • ফিরিশতাগণকে সৃষ্টি করেছেন।
  • আদমকে  (আ) সৃষ্টি করেছেন।
  • আদম (আ)কে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন।
  • ইদরীস (আ)কে আসমানে উঠিয়ে নেন।
  • দাউদের (আ) তাওবা কবুল করেছেন।
  • সুলাইমান (আ)-কে রাজত্ব প্রদান করেছেন।
  • তিনি তাওরাত নাযিল করেন।
  • ইবরাহীম জন্মগ্রহণ করেন……..খলীল উপাধি লাভ করেন।
  • ইবরাহীম (আ) নমরুদের অগ্নিকুন্ডু থেকে রক্ষা পান।
  • নূহ (আ)-কে নৈাকা থেকে বের করেন।
  • আইউব (আ)-এর বিপদ-মুসিবত দূর করেন।
  • ইসমাঈল (আ)-কে কুরবানী দেয়া হয়েছিল।
  • ইউনূস (আ) মাছের পেট থেকে বাহির হন।
  • ইয়াকূব (আ) দৃষ্টি শক্তি ফিরে পান।
  • ইয়াকূব (আ) ইউসূফের (আ) সাথে মিলিত হন।
  • এই দিনে হযরত মুহাম্মদ (সা) জন্মগ্রহণ করেছেন।
  • এই দিনে কিয়ামত সংঘটিত হবে……………..প্রভৃতি।

এইগুলো সবই ভিত্তিহীন।

 

আল্লাহ আমাদের আশুরার প্রকৃত ইতিহাস জেনে আমল করা তাওফিক দিন। সেই সাথে ভেজাল আমল থেকে বিরত থাকার তাওফিক দিন।

 

লেখাটি সংগ্রহ করা হয়েছে : ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রচিত হাদীসের নামে জালিয়াতি : প্রচলিত মিথ্যা হাদীস ও ভিত্তিহীন কথা পৃ: ৩৮৬-৩৯২ ।  লেখাটি ঈষত সংক্ষেপিত ।

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button
slot gacor skybet88 slot online skybet88 skybet88 skybet88 slot gacor skybet88 skybet88 slot bonus new member skybet88 slot shopeepay skybet88 skybet88 skybet88 slot shopeepay slot gacor skybet88 demo slot skybet88 skybet88 skybet88 skybet88 skybet88 skybet88 mgs88 mgs88