কুরআন সুন্নাহ

আল-কুরআনের সাথে সুন্নাহর সম্পর্ক (দ্বিতীয় পর্ব)

পবিত্র কুরআনের আম [ব্যাপক] হুকুমকে সহীহ সুন্নাহর দ্বারা খাস [নির্দিষ্ট] করার কয়েকটি উদাহরণ নিম্নে পেশ করা হল:

[ক] আল্লাহ তা’আলার বাণী,﴿ وَأُحِلَّ لَكُم مَّا وَرَآءَ ذَٰلِكُمۡ ٢٤ ﴾ [النساء: ٢٤]  “আর তা ছাড়া [বাকী সকল নারীদেরকে বিবাহ করা] তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে”।[1]

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম আলুসী বলেন: “এ আয়াতে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে, পূর্ববর্তী আয়াতে যে সমস্ত নারীদের বিবাহ করতে নিষেধ করা হয়েছে তারা ব্যতীত অন্য সকল নারীকে পৃথক পৃথক অথবা একসাথে বিবাহ করা বৈধ”।

 

অতএব কুরআনুল করীমের এ হুকুমটি হল আম বা ব্যাপক যা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, উল্লেখিত ব্যক্তি ও নিয়ম ছাড়া অন্য সকল ব্যক্তি [নারী] ও নিয়মে বিবাহ করা বৈধ। মূলত: এ ব্যাপক হুকুমে বৈধ হলেও হাদিস দ্বারা একটি বিশেষ হুকুমকে নির্দিষ্ট করে তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রসিদ্ধ সাহাবী আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: «نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ تُنْكَحَ الْمَرْأَةُ عَلَى عَمَّتِهَا أَوْ خَالَتِهَا،

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন মহিলাকে তাঁর ফুপীসহ এবং কোন মহিলাকে তার খালা সহ একত্রে বিবাহ করতে নিষেধ করেছেন”।[2]

সুতরাং, এ হাদিস দ্বারা কুরআনের ব্যাপক বৈধতা হুকুমের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট হুকুমকে অবৈধ বলে খাস করা হল। এ হাদিস না হলে কুরআনের আম [ব্যাপক] হুকুমের দ্বারা কোন মহিলাকে তার ফুপীসহ এবং কোন মহিলাকে তার খালাসহ একত্রে বিবাহ করা বৈধ ছিল। কিন্তু হাদিস সে ব্যাপকতার মধ্য হতে এ খাস [নির্দিষ্ট] হুকুমটিকে অবৈধতার বিধান দিয়েছে। কারণ হাদিসও আল্লাহ তা’আলার ওহীর অন্তর্ভুক্ত।

অতএব, প্রমাণিত হয় সুন্নাহ্ হল কুরআনের পরিপূরক, সুন্নাহ ছাড়া শুধু কুরআন দ্বারাই ইসলাম পূর্ণভাবে মানা সম্ভব নয়।

[খ] আল্লাহ তা’আলার বাণী, ﴿يُوصِيكُمُ ٱللَّهُ فِيٓ أَوۡلَٰدِكُمۡۖ لِلذَّكَرِ مِثۡلُ حَظِّ ٱلۡأُنثَيَيۡنِۚ ١١﴾ [النساء: ١١] “আল্লাহ তা’আলা তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, একজন পুরুষের অংশ দুজন নারীর অংশের সমান[3]।”

এ আয়াতের ব্যাপক ভাষা হতে বুঝা যায় যে, প্রতিটি পিতা-মাতা স্বীয় সন্তানদেরকে রেখে যাওয়া সম্পদের ওয়ারিশ বানাতে পারে। অনুরূপভাবে সকল প্রকার সন্তান পিতা-মাতার সম্পদের ওয়ারিশ হতে পারে। মূলত: হাদিস উক্ত আম [ব্যাপক] বিষয়টিকে খাস [নির্দিষ্ট] করে দিয়েছে, অর্থাৎ শুধু পিতা হলেই সন্তানকে ওয়ারিশ বানাতে পারবে না, অনুরূপ সন্তান হলেই পিতা-মাতার ওয়ারিশ হতে পারবে না, বরং কতগুলো বাধা রয়েছে, সে সব বাধামুক্ত পিতা-পুত্ররাই শুধু ওয়ারিশ বানাতে পারবে এবং ওয়ারিশ হতে পারবে। পবিত্র কুরআনে উক্ত বাধাসমূহ আলোকপাত করা হয়নি বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদিসে উক্ত বাধাসমূহ আলোকপাত করা হয়েছে, বাধাসমূহ নিম্নরূপ:

১. রিসালাত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «لاَ نُوْرِثُ مَا تَرَكْنَا صَدَقَةً » “আমরা [নবী-রাসূল] কাউকে কোন ওয়ারিশ বানাই না বরং যা রেখে যাই তা সাধারণ দান [হিসাবে বায়তুল মালে জমা হবে]।”।[4] অর্থাৎ নবী-রাসূলগণ কাউকে ওয়ারিছ বানান না এবং তাঁদের পরিত্যক্ত সম্পদের কেউ ওয়ারিশ হওয়ার দাবী করতে পারে না। «»

২. ধর্মের ভিন্নতা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «لاَ يَرِثُ المُسْلِمُ الكَافِرَ وَلاَ الكَافِرُ المُسْلِمَ»

“কোন মুসলমান কাফির এর ওয়ারিশ হতে পারে না অনুরূপভাবে কোন কাফির মুসলমানের ওয়ারিশ হতে পারে না।”[5]  অর্থাৎ সন্তান যদি মুসলমান হয় তাহলে কাফির পিতার ওয়ারিশ হতে পারবে না, অথবা সন্তান যদি কাফির হয় তাহলে মুসলমান পিতার ওয়ারিশ হতে পারবে না, অনুরূপভাবে পিতা-মাতাও সন্তানদের ওয়ারিশ বানাতে পারবে না।

৩. হত্যা ঘটিত কারণ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «لاَ يَرِثُ الْقَاتِلُ شَيْئًا» “হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির কোন সম্পদের ওয়ারিশ হতে পারবে না।”[6] অর্থাৎ হত্যাকারী যদি সন্তান হয় আর নিহত ব্যক্তি যদি পিতা-মাতা হয় তাহলে হত্যাকারী সন্তান স্বীয় পিতা-মাতার পরিত্যক্ত সম্পদের ওয়ারিশ হতে পারবে না।

অতএব পবিত্র কুরআনে পিতা-মাতাকে স্বীয় সন্তানদের ওয়ারিশ বানানোর যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, সে বিধানটি আম [ব্যাপক], যাহা হতে হাদিসে উল্লেখিত তিনটি বিষয়- রিসালাত, ধর্মের ভিন্নতা ও হত্যা খাস, অর্থাৎ ইহা ওই আম হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে না। এ তিনটি ক্ষেত্রে কোন পিতা-মাতার অঢেল সম্পদ থাকলেও স্বীয় সন্তানদের ওয়ারিশ বানাতে পারবে না।

[গ] আল্লাহ তা’আলা বলেন, ﴿وَٱلسَّارِقُ وَٱلسَّارِقَةُ فَٱقۡطَعُوٓاْ أَيۡدِيَهُمَا ٣٨﴾ [المائ‍دة: ٣٨]   “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও”।[7]

এ আয়াতে চুরি করা বা চোর শব্দটি আম [ব্যাপক] ভাবে এসেছে, অর্থাৎ চুরি করলেই তার হাত কাটতে হবে। চাই নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদ চুরি করুক বা তার চেয়ে কম করুক, অনুরূপভাবে সংরক্ষিত সম্পদ হতে চুরি করুক বা অসংরক্ষিত সম্পদ হতে চুরি করুক,  মোট কথা কুরআনের আয়াতে এমন আম বা ব্যাপকভাবে নির্দেশ এসেছে যাতে প্রমাণিত হয় যে, যে কোন চোর যে ভাবেই চুরি করুক না কেন সকল ক্ষেত্রে সকল চোরের হাত কাটতে হবে। মূলত: এ ব্যাপক [আম] বিধানটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদিসের মাধ্যমে নির্দিষ্ট [খাস] হয়। অর্থাৎ শুধুমাত্র ওই চোরের হাত কাটা হবে, যে সংরক্ষিত ও নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদ চুরি করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

عَنْ عَائِشَةَ، عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا تُقْطَعُ يَدُ السَّارِقِ إِلَّا فِي رُبْعِ دِينَارٍ فَصَاعِدًا»

“আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এক চতুর্থাংশ দিনার সমপরিমাণ বা ততোধিক সম্পদ চুরি করা ছাড়া কোন চোরের হাত কাটা যাবে না”।[8]

পবিত্র কুরআনের নির্দেশে চুরি কৃত মালের পরিমাণ অনির্দিষ্ট থাকলেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় হাদিসে তাহা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। অর্থাৎ কোন ব্যক্তি যদি ১/৪ দিনার এর কম পরিমাণ সম্পদ চুরি করে তাহলে তার হাত কাটা যাবে না। অনুরূপভাবে কুরআনের নির্দেশে সম্পদ সংরক্ষিত বা অসংরক্ষিত কোন নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় নাই, কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

…”وَمَنْ سَرَقَ مِنْهُ شَيْئًا بَعْدَ أَنْ يُؤْوِيَهُ الْجَرِينُ، فَبَلَغَ ثَمَنَ الْمِجَنِّ، فَعَلَيْهِ الْقَطْعُ، “…..

“যে ব্যক্তি ফসল সংরক্ষণ করার পর চুরি করে, আর চুরিকৃত সম্পদ ঢালের সমমূল্য হয় তাহলে ওই চোরের হাত কাটা হবে।”[9]

এ হাদিসে মূলত: কুরআনের আম [ব্যাপক] হুকুমটি সুন্নাহর মাধ্যমে দুই ভাবে [পরিমাণ ও সংরক্ষণে] খাস [নির্দিষ্ট] হয়ে গেল।

অতএব কুরআন ও সুন্নাহর সম্পর্কের দ্বিতীয় অবস্থা হল সুন্নাহ কুরআনের মুতলাক [সাধারণ] হুকুমকে মুকাইয়াদ [সীমাবদ্ধ] হিসাবে, মুজমাল [সংক্ষিপ্ত] হুকুমকে মুফাসসাল [বিস্তারিত] হিসাবে এবং ‘আম [ব্যাপক] হুকুমকে খাস [নির্দিষ্ট] হিসাবে বর্ণনা করে থাক।

সুন্নাহ কুরআনুল করীমের গোপন রহস্য বর্ণনাকারী। মূলত: এটা আল্লাহ তা‘আলারই উদ্দেশ্য, এ জন্যেই তিনি স্বীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নির্দেশ দিয়ে বলেন,

﴿وَأَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلذِّكۡرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيۡهِمۡ وَلَعَلَّهُمۡ يَتَفَكَّرُونَ ٤٤ ﴾ [النحل: ٤٤]

“আর আপনার প্রতি উপদেশ বাণী [কুরআন] অবতীর্ণ করেছি যাতে মানুষের প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে আপনি তা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিতে পারেন, ফলে তারা চিন্তা গবেষণা করবে”।[10]

এ আয়াত স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, সুন্নাহ হল পবিত্র কুরআনের বর্ণনা দানকারী। অতএব সুন্নাহ ব্যতীত কুরআন মেনে চলা অসম্ভব, এ জন্যই অনেক ইসলামী মনীষীগণ ইসলাম জানা ও মানার ক্ষেত্রে কুরআনের আগে সুন্নাহকে প্রাধান্য দিয়েছেন। যার বাস্তব দৃষ্টান্ত হল সাহাবায়ে কিরামের উপদেশাবলি, ইমাম আল খতীব আল বাগদাদী স্বীয় সনদে বর্ণনা করেন: একদা সাহাবী ঈমরান বিন হুসাইন রাদিআল্লাহু আনহু কিছু ব্যক্তিসহ [শিক্ষার আসরে] বসে ছিলেন। শ্রোতাদের মধ্য হতে একজন বলে ফেললেন, আপনি আমাদেরকে কুরআন ছাড়া অন্য কিছু শোনাবেন না। তিনি [সাহাবী] বললেন, নিকটে আস, অতঃপর বললেন, তুমি কি মনে কর, যদি তোমাদেরকে শুধু কুরআনের উপরই ছেড়ে দেয়া হয়? তুমি কি যোহরের সালাত চার রাকা’আত, আসর চার রাকাত, মাগরিব তিন রাক’আত, প্রথম দুই রাক’আতে কিরাত পাঠ করতে হয় ইত্যাদি সব কিছু কুরআনে খুঁজে পাবে? অনুরূপভাবে কাবার তাওয়াফ সাত চক্কর এবং সাফা মারওয়ার তাওয়াফ ইত্যাদি কি কুরআনে খুঁজে পাবে? অতঃপর বললেন: হে মানব সকল! তোমরা আমাদের [সাহাবীদের] নিকট হতে সুন্নাহর আলোকে এ সব বিস্তারিত বিধি-বিধান জেনে নাও। আল্লাহর কসম করে বলছি! তোমরা যদি সুন্নাহ মেনে না চল, তাহলে অবশ্যই ভ্রষ্ট হয়ে যাবে।”

অতএব সঠিক পথ প্রাপ্ত হতে হলে কুরআনের সাথে কুরআনের রহস্য বর্ণনাকারী ইসলামের পূর্ণতা রূপ দানকারী সুন্নাহকে অবশ্যই আঁকড়ে ধরতে হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে তাওফিক দান করুন। আমীন!

তৃতীয় অবস্থা: তৃতীয় অবস্থা হল এমন সব বিষয় যাহা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইতিবাচক বা নেতিবাচক কোন বর্ণনা আসেনি, সে সব বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদিস হালাল-হারামের হুকুম বর্ণনা করে দিয়েছে, যেমন- কোন মহিলাকে তার খালাসহ অথবা ফুঁপিসহ একত্রে দুজনকে বিবাহ করা হাদিসে হারাম করা হয়েছে। বিবাহিত ব্যভিচারীকে রজম করার বিধান এবং দাদীর জন্য মিরাছী অংশ ইত্যাদি হুকুম গুলি সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে কোন নির্দেশনা নেই, অথচ হাদিসে তার বৈধতা ও অবৈধতা বর্ণনা করা হয়েছে।

পবিত্র কুরআনের সাথে সুন্নাহর সম্পর্কের যে তিনটি অবস্থা রয়েছে তন্মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থায় সকল আলেম সমাজ একমত কিন্তু এ তৃতীয় অবস্থা সম্পর্কে কিছু আলেম সমাজ দ্বিমত পোষণ করেছেন। তবে হাদিসে ওই সব বিধান পাওয়াটাকে কেউ অস্বীকার করেন নি। তাই অধিকাংশ আলেম সমাজ তৃতীয় অবস্থা সম্পর্কে ঐকমত্য পোষণ করেছেন।

ইমাম ইবনুল কাইয়ূম [রাহিমাহুল্লাহ] কুরআনের সাথে সুন্নাহর সম্পর্কের তিনটি অবস্থা বর্ণনা করার পর বলেন: কুরআনের চেয়ে হাদিসে যে সব বিধান অতিরিক্ত বর্ণিত হয়েছে [অর্থাৎ, তৃতীয় অবস্থাটি] এটা মূলত: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতেই ওই সব বিধান প্রবর্তিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাঁর [সুন্নাহর] আনুগত্য অপরিহার্য, কোন ক্রমেই তাহা অমান্য করা যাবে না। আর এটা কুরআনের উপর কোন বাড়াবাড়িও নয়, বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্য বিষয়ক আল্লাহর নির্দেশ পালনেরই অন্তর্ভুক্ত। এ ক্ষেত্রে যদি তাঁর আনুগত্য না করা হয়, তাহলে তাঁর আনুগত্যের কোন অর্থই হয় না এবং তাঁর আনুগত্যের স্বতন্ত্রতা বর্জিত হয়। আর কুরআনের সাথে মিলে যাওয়া বিষয় ছাড়া কুরআনের অতিরিক্ত বিষয়ে যদি তাঁর আনুগত্য স্বীকার করা না হয় তাহলে তাঁর আনুগত্যের বিশেষত্ব কোথায়? অথচ আল্লাহ তা’আলা বলেন,

﴿ مَّن يُطِعِ ٱلرَّسُولَ فَقَدۡ أَطَاعَ ٱللَّهَۖ ٨٠ ﴾ [النساء : ٨٠]  [

“যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্য করল সে প্রকৃত পক্ষে আল্লাহ তা’আলারই আনুগত্য করল”।[11]

অতএব কোন জ্ঞানী ব্যক্তির পক্ষে কিভাবে সম্ভব যে, তিনি কুরআনের চেয়ে অতিরিক্ত বিধান সম্বলিত হাদিস গ্রহণ করবেন না? তিনি কি কোন মহিলাকে স্বীয় খালা বা ফুপীর সাথে একত্রে দু’জনের বিবাহ নিষিদ্ধের হাদিস, রক্ত বা বংশীয় ভাবে যা হারাম হয় দুগ্ধ পানের মাধ্যমে তাহা হারামের হাদিস, খিয়ারে শর্তের হাদিস, শুফায়ার হাদিস, স্বগৃহে বসবাস কালে বন্ধকের হাদিস গ্রহণ করেন না? অথচ এ সবই কুরআনের চেয়ে অতিরিক্ত বিধান সম্বলিত হাদিস [অর্থাৎ এ বিধানগুলি কুরআনে বর্ণিত হয়নি শুধু হাদিসে বর্ণিত হয়েছে]। অনুরূপভাবে দাদীর মিরাছের হাদিস, বিবাহিত কৃতদাসের স্বাধীনতার হাদিস, মেয়েদের ঋতু অবস্থায় রোযা, সালাত নিষিদ্ধের হাদিস, রোযা অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর মিলন ঘটলে কাফফারা ওয়াজিবের হাদিস, বিধবা মহিলার ইদ্দত পালন কালে শোক পালনের হাদিস গ্রহণ করেন না? অথচ এসব হাদিসই কুরআনের অতিরিক্ত বিধান সম্বলিত হাদিস”। বস্তুত: কুরআনের নির্দেশেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলা অপরিহার্য চাই তা কুরআনে থাকুক আর নাই থাকুক।

কুরআনের নির্দেশ:  ﴿وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَىٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْۚ ٧ ﴾ [الحشر: ٧]  “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের যা দিয়েছেন তোমরা তা গ্রহণ কর এবং যা হতে বারণ করেছেন তা হতে বিরত থাক।”[12]

কুরআনের অন্যত্র এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সকল সিদ্ধান্ত [বিধি-বিধান] সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়া ছাড়া ঈমানদার হওয়া সম্ভব নয়, তা কুরআনে আছে বা নাই? এ প্রশ্নের কোন সুযোগ নেই।

আল্লাহ তা’আলা বলেন:

﴿فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا ٦٥ ﴾ [النساء : ٦٥]

“তোমার রবের কসম তারা কখনও ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ফায়সালা কারী হিসাবে মেনে নেয়। অতঃপর তোমার ফায়সালার ব্যাপারে তাদের মনে কোন দ্বিধা-সংকোচ থাকবে না এবং সন্তুষ্টচিত্তে তা গ্রহণ করে নিবে[13]।”

অতএব কুরআনের নির্দেশেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা কিছু নিয়ে এসেছেন [কুরআন ও সকল প্রকার সহীহ হাদিস] সবই প্রতিটি মু’মিন নর-নারীর গ্রহণীয় ও পালনীয় বিষয়, আল্লাহ আমাদের সে তাওফিক দান করুন। আমীন!

[1] সূরা আন-নিসা: ২৪

[2] বুখারি, হাদিস: ৫১০৮, মুসলিম: 1408

[3] সূরা নিসা, আয়াত: ১১

[4] বুখারি, হাদিস: ৪০৩৫,

[5] বুখারি: ৬৭৬৪

[6] আহমদ: ৩৪৬, ইবনু মাযা: ২৬৪৫

[7] সূরা আল-মায়িদাহ: ৩৮

[8] মুসলিম, হাদিস: ১৩২২, নাসায়ী, হাদিস: ৪৯৪৬

[9] আবু দাউদ: ১৭১০

[10] সূরাহ আন-নাহল: ৪৪

[11] সূরা আন-নিসা, ৮০

[12] [সূরা আল-হাশর, ৭]

[13] [সূরা আন-নিসা, ৬৫]

বইঃ সুন্নাহের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা 

লেখকঃ জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের

মতামত দিন