ইসলামিক গল্প

এবং হিমু যখন প্র্যাকটিসিং মুসলমান (পর্ব-৭)

রাতে তাহাজ্জুতের নামায খুশুর সাথে লম্বা করে পড়া হচ্ছে না । বিশ মিনিটের সার্কেল থেকে বেড় হতে পারছি না। এক রাকাতে কয়েকটি সুরা একবারে ধীরে ধীরে পড়লেও ফলাফল একই, বিশ মিনিট। আমার মনে হয় আমি পদ্ধতি গত ভুলে আছি । সময় ধরে নামায ঠিক করতে চাইলে তাতে যাই হোক নামায ঠিক হচ্ছে বলে তো মনে হচ্ছে না। চিন্তা করেছি সময় ধরে এইভাবে আর করবো না , বরং বড় সুরা গুলো মুখস্ত করতে হবে। নবিজী (সাঁ) একবার নাকি সুরা বাঁকারা , সুরা আল ইমরান , সুরা নিসা এক রাকাতে পড়েছিলেন।— আল্লাহু আঁকবার।

এরকম ভাবে শুধু একটা বড় সুরা পড়তে পারলেই রাতের নামাযে আল্লাহর সাথে আরও মধুর সময় কাটানো যেতো। এখন তাই রাতে বেশি জেগে থাকছি না। দিনে সুরা বাকারা মুখস্ত করার একটা এটেমট নিয়েছি। রাতে অল্প স্বল্প নামায পড়ছি । ঘুমিয়ে পড়ছি। দিনে সুরা মুখস্ত করছি। একটু টায়ার্ড লাগলে হাটতে বেড় হচ্ছি। হেঁটে হুটে আবার এসে পড়ছি। দিনে হাঁটা হাঁটি করার মধ্যেও কিছু থ্রিল আছে। হঠাত হঠাত খুব বিপদ জনক কারও সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। যার সঙ্গে নিশি রাতে দেখা হবার কোন সম্ভাবনাই নেই। রাত তিনটার সময় নিশ্চয়ই রেশমা খালার সাথে নিউমার্কেটের কাছে দেখা হবে না। প্রায় দু বছর পর রেশমা খালার সঙ্গে দেখা। পাঁজেরো নামের অভদ্র গাড়ির ভেতর পেছনের সিটে তিনি বসে আছেন। তার মাথায় কাপড়। তিনি মাথায় কাপড় দিয়ে চলবেণ ভাবাই যায় না। অবশ্য আমাকে দেখে মাথায় কাপড় চড়াতে পারেন। ইদানীংকার আমার পরিবর্তন সম্পর্কে প্রায় সবাই জেনে গেছে মনে হয়।

রেশমা খালা হাত উঁচিয়ে ডাকলেন , এই হিমু এই …। ড্রাইভার ক্রমাগত হর্ন দিতে লাগলো। আমার উচিত দ্রুত পালিয়ে যাওয়া। কোন গলিটলির ভেতর ঢুকে পড়া। গলি না থাকলে ম্যানহলের ঢাকনি খুলে তার ভেতর সেঁধিয়ে যাওয়া। কিছু কিছু ট্রাকের পেছনে লেখা থাকে ১০০ হাত দুরে থাকুন । রেশমা খালা সেই ট্রাকের চেয়েও ভয়াবহ। আশে পাশে গলি বা ম্যানহোল নেই। কাজেই বাধ্য ছেলের মতো আমি হাসি মুখেই এগিয়ে গেলাম। রাস্তা পার হবার আগেই খালা চেঁচিয়ে বলল ঃ হিমু তুই নাকি গলার কাঁটা নামাতে পারিস।

ভদ্র মহিলার বয়স পঞ্চাশ উর্ধ হলে এই মূহুর্তে খুকি সেজে আছেন । আমাকে দেখেই হোক বা যে কারণেই হোক মাথায় বড় করে কাপড় টেনে দিয়েছেন। এই বয়সের মহিলারা খুকি সেজে বের হলে বেশ বে মানান লাগে।

আমি গাড়ির কাছে চলে এলাম। রেশমা খালা চোখ বড় বড় করে বললেন বাদলের মার কাছে ঘটনা শুনলাম। বড় বড় সার্জন কাত হয়ে গেছে। তুই গিয়েই মন্ত্র তন্ত্র পড়ে কাঁটা নামিয়ে ফেললি । কি রে সত্যি?

না এক বিন্দুও সত্যি না ।

সত্যি না । তাহলে কি ওরা মিথ্যা বলছে । আমার সাথে ফাজলামো করিস

না ফাজলামি করছি না।

চুপ থাক বেয়াদব । মিথ্যা কথা বলবি না। শোন তোকে আমি হারিকেন দিয়ে খুঁজতেঁসিলাম । তোর ঠিকানা কি ? কোন ভিজিটিং কার্ড আছে?

ঠিকানাই নাই , আবার কার্ড।

তুই এক কাজ করনা। আমার বাড়িতে চলে আয়। এক তলাটা তো খালিই পড়ে থাকে। একটা ঘরে থাকবি । আমার সঙ্গে খাবি। ফ্রি থাকা- খাওয়া।

দেখি চলে আসতে পারি।

আসতে পারি টারি না । চলে আয়। তুই কাঁটা নামানো ছাড়া আর কি পারিস?

আপাতত কিছুই পারি না।

কে জেনো ঐদিন বলল তুই ভুত-ভবিষ্যৎ সব বলতে পারিস । তোর সিক্সথ সেন্স নাকি খুব ডেভেলপড।

আমি হাসলাম।

হাসিটা মনে হল রেশমা খালাকে আরও অভিভূত করল।

এই হিমু গাড়িতে উঠে আয়।

যাচ্ছেন কোথায়?

কোথাও যাচ্ছি না। খালি বাড়িতে থাকতে কতক্ষণ আর ভাল লাগে । এই জন্যেই গাড়ি নিয়ে মাঝে মাঝে বের হই।

বাড়ি খালি না -কি?

ও আল্লাহ তুই কি কিছুই জানিস না? তোর খালুর ইন্তেকালের পর বাড়ি খালি না ? এত বড় বাড়িতে একা থাকি, অবস্থাটা চিন্তা করতে পারিস।

দারোয়ান মালী ড্রাইভার এরা তো আছে।

খালি বাড়ি কি দারোয়ান , মালী , ড্রাইভার এইসবে ভরে? তুই চলে আয়। তোর কাঁটা নামানোর ক্ষমতার কথা শুনে দারুণ ইন্টারেস্টিং লাগছে। দাঁড়িয়ে আছিস ক্যান? গাড়িতে উঠ।

খালা আমার কোন ক্ষমতা ণেই । সব ক্ষমতা আল্লাহর । বাদলের গলায় কাঁটা বিঁধেছে , বাদল আল্লাহর কাছে কান্না কাটি করেছে। আল্লাহ সারিয়ে দিয়েছেন।

ভণিতা করিস না হিমু । তুই সত্যিই কাঁটা নামাতে পারিস এখণ আমি একশ ভাগ শিওর হলাম। যারা পারে তারা ক্রেডিট নেয় না । কথা না বলে গাড়িতে উঠে আয়।

আজ তো খালা যেতে পারবো না। জরুটি কাজ।

তোর আবার কিসের জরুরি কাজ , হাটা ছাড়া তোর আবার কাজ কি?

খালাকে বলা যাচ্ছে না সুরা বাঁকারা মুখস্ত করার বিষয় টা । এই অত্যন্ত গুরুত্ব পূর্ন কাজটাকে তার কাছে গুরুত্ব হীন মনে হবে। আজকাল মুসলিম নামধারি প্রায় সবার কাছেই কুরআন মুখস্ত করার মতো গুরুত্ব পূর্ন কাজকে গুরুত্বহীনই মনে হয়। আমি একটু রহস্য করে বললাম

আছে খালা অনেক গুরুত্ব পূর্ন একটা কাজ আছে । দুই দুনিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্যে একটা খুব গুরুত্ব পূর্ন কাজ করছি।

কি বলছিস এসব ?

জ্বি খালা ।

খালা খানিকটা ভরকে গেছে। দুই দুনিয়া বলতে সে কি বুঝেছে আল্লাহই ভালো জানেন , তবে স্বস্তির ব্যপার হল এখন আর তার বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্যে টানা হেচরা করবে না

আচ্ছা ঠিক আছে আমার বাসায় থাকতে না চাইলে না থাকবি । গাড়িতে উঠ , তোকে কিছুদূর এগিয়ে দেই। রোঁদের মধ্যে হাঁটছিস দেখে মায়া লাগছে।

কেউ গাড়িতে উঠার জন্য বেশি রকম পিরা পিড়ি করলে ধরে নিতে হবে গাড়ি নতুন কেনা হয়েছে। আমি গাড়িতে উঠতে উঠতে বললাম, গাড়ি নতুন কিনলে?

নতুন কোথায়, ছয় মাস হয়ে গেলো না।

ছয় মাসে সম্পর্ক পুরাতন হয় গাড়ি হয় না। দারুণ গাড়ি।

তোর পছন্দ হয়েছে?

পছন্দ মানে! এরোপ্লেণের মতো গাড়ি।

এই গাড়ির সব চেয়ে বড় সুবিধা কি জানিস? সামনা সামনি কলিশন হলে এই গাড়ির কিছু হবে না কিন্তু অন্য গাড়ি ভর্তা হয়ে যাবে।

বাহ দারুণ তো।

তোর সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগছে রে হিমু। চাকরি বাকরি কিছু করছিস।

আপনার হাতে চাকরি আছে?

না । তোর খালুর মৃত্যুর পর মিল টিল সব বিক্রি করে ক্যাশ টাকা করে ফেলেছি অনেক। এখন চিন্তা করছি ব্যংক এ রাখবো । আমি একা মানুষ মিল টিল চালানো তো সম্ভব না । সবাই লুটে পুটে খাবে দরকার কি?

সুদ খাওয়া তো হারাম খালা । তুমি এখন সুদ খেলে পরে তো রক্ত পুঁজ এগুলো খেতে হবে।

তুই হলুদ পাঞ্জাবি ছেড়ে খইরি জোব্বা ধরার পর থেকে তোর কথা বার্তা বদলে গেছে হিমু।

গাড়ি চলছে। কোন বিশেষ দিকে যাচ্ছে না । মনে হচ্ছে ড্রাইভার তার ইচ্ছামত চালাচ্ছে। মিরপুর রোড ধরে চলতে চলতে ফট করে ধান্মন্ডি চার নম্বারে ঢুকে পড়ল। আবার কিছুক্ষণ পর মীরপুর রোডে চলে এল।

হিমু !

জ্বি খালা।

তোর খালুর স্মৃতি রক্ষার্থে একটা কিছু করতে চাই। কর্মযোগী পুরুষ ছিল। পথের ফকির থেকে কলকারখান , গার্মেন্টশস করেনি এমন জিনিস ণেই। স্ত্রী হিসেবে তার স্মৃতি রক্ষার জন্যে আমার তো কিছু করা দরকার।

করলে তো ভালোই

না না করা দরকার। ভাল কিছু করা দরকার। উনার নামে একটা আর্ট মিউজিয়াম করলে কেমন হয়।

খালু সাহেবের নামে আর্ট মিউজিয়াম করা যাবে না । মানাবে না।

মানাবে না কেন?

গনি মিয়া মিউজিয়াম অফ মর্ডান আর্ট শুনতে ভালো লাগছে না। খালু সাহেবের নামটা গনি মিয়া না হয়ে আরেক্টু সফিস্টিকেটেড হলে মিউজিয়াম অব মর্ডান আর্ট দেয়া যেত।

গাড়ি মিরপুর রোড থেকে আবার ধানমণ্ডি ২৭ নম্বরে ঢুকে পরেছে। আবারো মনে হয় মিরপুর আসবে। ভালো যন্ত্রণায় পড়া গেল।

খালা , আমার তো এখন যাওয়া দরকার।

আহ বোস না। তোর সঙ্গে কথা বলতে ভাল লাগছে। কথা বলার মানুষ পাই না। কেউ আমার বাড়িতে আসে না। এটা একটা আশ্চর্য কাণ্ড। তোর খালুর মৃত্যুবার্ষিকি উপলক্ষে কার্ড ছাপিয়ে পাঁচশ লোককে দাওয়াত দিয়েছি। তিনটা দৈনিক পত্রিকায় কোয়ার্টার পেইজ বিজ্ঞাপন দিলাম লোক কত হয়েছে বল তো?

একশ?

আরে না আঠারো জন। এর মধ্যে আমার নিজের লোকই সাতজন। ড্রাইভার দারোয়ান কাজের দুটা মেয়ে।

আমাকে তো খবর দিলে না?

তোকে খবর দেব কিভাবে? তোর কি কোন স্থায়ী ঠিকানা আছে। ঠিকানা ণেই। রাস্তায় যে ফকিরগুলি আছে তাদেরও ঠিকানা আছে । রাতে তারা একটা নির্দিষ্ট জায়গায় ঘুমায়। আজিজ মার্কেটের বারান্দায় যে ঘুমুবে সে সেখানেই ঘুমুবে। সে কমলাপুর রেল ষ্টেশনে ঘুমাবে না। আর তুই তো আজ এই মেসে , কাল ঐ মেসে। হিমু তুই চলে আয় তো আমার কাছে। গুলশানের বাড়ি নতুন করে রিনোভেট করছি। টাকা পয়সা খরচা করে হুলুস্থুল করেছি। তোর ভালো লাগবে। আসবি।

সবই কি সুদের টাকায় করা ?

না আমাদের ঘরের সিন্দুকে তোর খালু সাহেব যে পরিমাণ টাকা রেখে গিয়েছিলো সেগুলোই খরচ করে এখনও শেষ করতে পারছি না। সুদের টাকা এখনও জমছে । হাট দিচ্ছি না । ভয় পাস না। তুই আসলে সুদের টাকা তোকে খেতে হবে না। আসবি?

ভেবে দেখি।

ভাবতে হবে না তুই চলে আয়। থাকা খাওয়ার খরচের হাত থেকে তো বেঁচে গেলি। মাঝে মাঝে না হয় কিছু হাত খরচও নিবি।

কত দেবে হাত খরচ?

চা-পানের খরচ আর কি। কি, থাকবি? তুই থাকলে একটা ভরসা হয়। দিন কালের যে অবস্থা। চাকর দারওয়ান এরাই বটি দিয়ে কুপিয়ে কোনদিন না মেরে ফেলে। এমন ভয়ে ভয়ে থাকি । চলে আয় হিমু। আজই চলে আয় বাড়িতো চিনিসই চিনিস না?

হু ।

তোকে দেখে আরেকটা কথা ভাবছি। বিশেষ বিশেষ ক্ষমতা আছে , প্যারা নরমাল পাওয়ার যাদের এদেরকে বাড়িতে এনে রাখলে কেমন হয়? এস্টোলজার , পামিস্ট । বুঝতে পারছিস কি বলছি?

হু পারছি , ইন্সটিটিউট অফ সাইকিক রিসার্চ টাইপ কিছু।

ঠিক বলেছিস বাংলাদেশে তো এরকম আগে হয় নি নাকি হয়েছে?

না হয়নি । তবে এই জিনিস করলে তোমার নামে করতে পারো । খালু সাহেবের নামে এই সব করা অর্থহীন । তোমার এইসব কর্মকান্ডের জন্যে ওপারে বেচারার ওপরে স্টিম রোলার চলতে পারে। খালু সাহেবের জন্যে কিছু করতে চাইলে একটা মাদ্রাসা টাইপ করতে পারো। এতিম কিছু ছেলে পুলে বড় হয়ে ডাকাত , খুনি না হয়ে আলেম হবে।দীনের আলো ছড়াবে । তোমাদের জন্য দোয়া করবে।এ পার থেকে নিয়ম করে ঐ পারে সোয়াব ট্রান্সফার করা হবে , খালু সাহেবও ওপারে পায়ের ওপর পা তুলে সোয়াব নিতে থাকবে। ব্যংককে টাকা রেখে যেমন সুদ খেতে চাঁচ্ছ ব্যপারটা অনেকটা সে রকম এখানে ইনভেস্ট করে ওখানে ক্রেডিট ট্রান্সফার করে নেও। — খালা এই খানে আমি নামবো। ড্রাইভার গারি থামাও। গাড়ি না থামালে আমি জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে নেমে পড়ব ।

ড্রাইভার গাড়ি থামাল। রেশমা খালা বলল, কি ঠিক হল ? তুই আসছিস?

হু। আমার এ মাসের হাত খরচের টাকাটা দিয়ে দাও।

থাকাই শুরু করলই না । হাত খরচ কি?

আমি তো খালা চাকরি করছি না যে মাসের শেষে বেতন । এটাতো খালা হাত খরচ।

তুই আগে বিছানা বালিশ নিয়ে উঠে আয় তারপর দেখা যাবে।

আচ্ছা।

আমি লম্বা লম্বা পা ফেলা শুরু করলাম, উদ্ধার পাওয়া গেছে , আলহামদুলিল্লাহ । এখন চেষ্টা করা উচিত যত দ্রুত সরে পড়া যায়। সম্ভাবনা খুব বেশি যে খালা তার গাড়ি নিয়ে আমার পেছনে পেছনে আসবেন। আমার উচিত ছোট কোন গলিতে ঢুকে পড়া , যেখানে পাঁজেরো টাইপ গাড়ি ঢুকতে পারে না।

এই হিমু , এই । এক সেকেন্ড শুনে যা এই এই।

বধির হয়ে যাওয়ার ভান করে আমি গলি খুঁজছি। গাড়ির ড্রাইভার ক্রমাগত হর্ন দিচ্ছে। না ফিরলে চারিদিকে লোক জড়ো হয়ে যাবে। বাধ্য হয়ে ফিরলাম।

নে – হাত খরচ নে। না দিলে আবার হাত খরচ দেয়া হয় নি এই অজুহাতে আসবি না।

রেশমা খালা একটা এক হাজার টাকার চকচকে নোট জানালা দিয়ে বাড়িয়ে ধরল।

তুই সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় চলে আসিস । সন্ধ্যার পর থেকে আমি বাসায় থাকি। নানান সমস্যা আছে বুঝলি। ভয়ংকর ব্যপার ঘটেছে । কাউকে বলা দরকার। রাতে এক ফোটা ঘুমুতে পারি না।

চলে আসবো।

টাকাটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো পকেটে রাখ। হারিয়ে ফেলবি তো।

খালা আমার পকেট ণেই । যাবতীয় টাকা পয়সা আমাকে হাতে নিয়ে ঘুরতে হয়।

বলিস কি?

খালা যাই?

যাই বলে দেরি করলাম না । প্রায় দৌড়ে এক গলিতে ঢুকে পড়লাম।

আচ্ছা টাকা কি কেউ হাতে নিয়ে ঘুরে? বাসের কন্টাক্টররা টাকা হাতে রাখে। আর কেউ? এক হাজার টাকার চক চকে একটা নোট হাতে রাখতে বেশ ভালোই লাগছে। নোটটা এতই নতুন যে ভাজ করতে ইচ্ছে করছে না। চনমনে রোধ ওঠায় কিঞ্চিত গরম লাগছে। নোটের সাইজ টা আরেকটু বড় হলে টাকা দিয়ে বাতাস খেতেখেতে যাওয়া যেতো।

খালার হাত থেকে উদ্ধার পেয়েছি আগারগাও এ। সেখান থেকে কোথায় যাবো বুঝতে পারছি না। হেঁটে হেঁটে মিরপুর রোঁডে উঠে নিউমার্কেট চলে যাওয়া যায়। ইচ্ছে করলে মোহাম্মাদ পুরের ভেতর থেকে রিক্সা নিয়ে যেতে পারি। ভাড়া দেয়া সমস্যা হবে না।

বুড়ো,— কবরে এক পা দিয়ে রাখা রিক্সা ওয়ালা , যাদের রিক্সায় কেউ চড়ে না, এমন কেউ যে রিক্সা ঠিকমতো টানতেও পারে না।বয়সের ভারে কানেও ঠিক শোনে না। গাড়ির সামনে হঠাৎ রিকশা নিয়ে উপস্থিত হয়। এই সব রিক্সা চড়া মানে পদে পদে বিপদের মধ্যে পড়া । যেহেতু রেশমা খালার বাড়িতে আমি থাকতে যাবো না। সেহেতু এই এক হাজার টাকা কোন একটা সতকর্মে ব্যয় করতে হবে।

ভাড়া হিসেবে পুরো নোট টা দিয়ে দিলে সাধারণ মানের একটা সতকর্ম করা হবে।

পছন্দ সই কোন রিক্সা ওয়ালা পাওয়া যাচ্ছে না। বুড়ো রিক্সা ওয়ালা কেউ ণেই। বুড়োরা আজ কেউই রিক্সা বেড় করেনি। আসাদ গেট এসে একজনকে পাওয়া গেলো , চলন সই ধরনের বুড়ো। রিকশার সীটে বসে চা য়ে বনরুটি ভিজিয়ে খাচ্ছে। সকালের ব্রেক ফাস্ট বোধ হয় না । বারটার মতো বাজে। লাঞ্চ হবারও সম্ভাবনা কম । বোধ করি প্রি লাঞ্চ।

চাচা মিয়া যাবেন?

বুড়ো প্রায় ধমকে উঠলো — না। খাওয়ার মাঝখানে বিরক্ত করায় সে সম্ভবত খেপে গেছে।

কাছেই যাব। বেশি দুর না । নিউ মার্কেট ।

ঐদিকে যামু না।

ফার্ম গেট যাবেন ফার্ম গেট গেলেও আমার চলে।

যামু না।

যাবেন না কেনো?

ইচ্ছা করতাসে না।

আমি না হয় অপেক্ষা করি আপনি চা শেষ করেন তারপর যাবো। ফার্ম গেট যেতে না চান তাও সই। অন্য যেখানে যেতে চান যাবেন। আমাকে কোন এক জায়গায় নামিয়ে দিলেই হবে।

মনে হল আমার প্রস্তাবে সে রাজি হয়েছে। কিছু না বলে চা বনরুটি শেষ করল। লুঙ্গির ভাজ থেকে বিড়ি বেড় করে আয়েশ করে বিড়ি টানতে লাগলো। আমি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছি। কাউকে দান করতে যাওয়াও সমস্যা। দান করতেও ধৈর্য লাগে। হুট করে দান করা যায় না। বুড়ো বিড়ি টানা শেষ করে রিকশার সীট থেকে নামল। আমি উঠতে যাচ্ছি, সে গম্ভীর গলায় বলল, কইছি না যামু না। ত্যাক্ত করেন ক্যান?

সে খালি রিকশা টেনে বেরিয়ে গেল। একটু সামনে গিয়ে দুজন যাত্রীও নিল। যে কোন কারণেই হোক আমাকে তার পছন্দ হয় নি। এক হাজার টাকার চক চকে নোটটা তাকে দেয়া গেলো না। আসলে আল্লাহ যার রিজিকে এই হাজার টাকার নোটটা রেখেছেন তার হাতেই এই নোট পৌঁছে যাবে , সেটা যেমন করেই হোক।আল্লাহ প্রদত্ত রিজিকের ব্যপারটা যে কত ইন্টারেস্টিং তা কিছু টা চোখ কান খোলা রেখে পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যায়।

আমি ফার্ম গেঁটের দিকে রাওয়ানা হলাম । নানা কিসিমের অভাবী মানুষ ঐ জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। ভিক্ষার বিচিত্র টেকনিক দেখতে হলে ফার্ম গেঁটের চেয়ে ভাল কন জায়গা হতে পারে না। একবার একজনকে পেয়েছিলা ইংরেজিতে ভিক্ষা করেন।

Sir I am a needy man sir,

Three school going daughters

Lost my job, presently penny less.

আমি বললাম , ইংরেজিতে ভিক্ষা করছেন কেন? বাংলা ভাষার জন্যে বাঙ্গালিরা এতো প্রান দিয়েছে সে কি ইংরেজিতে ভিক্ষা করার জন্য। ভিক্ষার জন্য বাংলার চেয়ে ভালো ভাষা আর হতেই পারে না।

ইংরেজি ভাষার ভিক্ষুক নাক মুখ কুচকে তাকাল। আমি বললাম, ফেব্রুয়ারি মাসেও কি ইংরেজিতে ভিক্ষা করেন নাকি তখন বাংলা ভাষায়?

আরেকজন আছেন ভদ্র চেহারা । ভদ্র পোশাক। তিনি এসে খুবই আদবের সঙ্গে বলেন, ভাই কিছু মনে করবেন না — কয়টা বাজে? আমার ঘড়িটা বন্ধ।

যাকে জিজ্ঞেস করা হয় তিনি ভদ্রলোকের ভদ্রতায় মুগ্ধ হয়ে যান। ঘড়ি দেখে সময় বলেন।

অসংখ্য ধন্যবাদ।আজকাল মানুষ এমন হয়েছে সময় জিজ্ঞেস করলে রেগে যায় ।

না না ঠিক আছে।

তখন ভদ্রলোক গলা নিচু করে বলেন– ভাই সাহেব, একটা মিনিট সময় হবে? দুটা কথা বলতাম।

যে সময় দিয়েছে সেই মরেছে। তার বিশ পঁচিশ টাকা খসবেই।

আরেকজন ভদ্রলোক কে মাঝে মাঝে দেখা যায়। খদ্দরের পায়জামা পাঞ্জাবি পড়া। মুখে দাড়ি গফের জঙ্গল , হাতে বেনসনের প্যাকেট । ভদ্রলোকের পাঞ্জাবির পকেটে সম্রাট আকবরের সময়কার একটা মোহর। দেড় ভরির মত ওজন। তার গল্প হচ্ছে— তিনি এরকম মুদ্রা ভর্তি একটা ঘটি পেয়েছেন। কাউকে জানাতে চাচ্ছেন না। জানালে সরকার সীজ করে নিয়ে যাবে। তিনি গোপনে মুদ্রাগুলি বিক্রি করতে চান। তাই বলে সস্তায় না। সোনার যা দাম সেই হিসেবে কিনতে হবে। কারণ খাঁটি সোনার মোহর। ভদ্রলোকের মূল ব্যবসার জায়গা ফার্মগেট না। ফার্মগেঁটে তিনি অন্য উদ্দেশ্যে আসেন। উদ্দেশ্যটা আমার কাছে পরিষ্কার না।

পরিচিত ভিক্ষুকের কাউকেই পেলাম না তবে আশ্চর্য জনক ভাবে আব্দুর রশিদ কে পেয়ে গেলাম। চশমা দেখে চিনলাম। চশমার ডাঁট নেই , সুতা দিয়ে কানের সঙ্গে বাঁধা। হাতে এক তাড়া কাগজ নিয়ে এর তার কাছে যাচ্ছেন। মনে হচ্ছে ডাক্তারের প্রেস্ক্রিপশান। হলুদ রঙের বড় একটা খামও আছে। নির্ঘাত এক্সরে প্লেট।

আব্দুর রশিদ সাহেব না ? কেমন আছেন ? চিনতে পারছেন?

ভদ্রলোক চশমার আড়াল থেকে পিট পিট করে তাকাচ্ছেন। চিনতে পারছেন কি না বোঝা যাচ্ছে না।

‘চশমার ডাঁট আবার ফেলে দিয়ে সুতা লাগিয়েছেন? এতে কি ভিক্ষার সুবিধা হয়?

আপনাকে চিনতে পারছি না।

চিনবেন না কেন? আমি বদরুল সাহেবের বন্ধু। আপনার হাতে কি?প্রেসক্রিপশন? এতো পুরনো টেকনিকে গেলেন কেন?

আব্দুর রশিদ কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন , ছেলে মরণাপন্ন। লাংসে পানি জমেছে। প্লুরিসি। প্রফেসর রহমান ট্রিটমেন্ট করছেন। বিশ্বাস না হলে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ নং ওয়ার্ডে যেতে পারেন।

অবস্থা খারাপ?

আব্দুর রশিদ জবাব দিলেন না । তার কিছু একটা মনে পরে গেছে। সে ক্রুড় দৃষ্টিতে আমাকে দেখছেন। আমি বললাম,

টাকা পয়সা কিছু জোগাড় করতে পেরেছেন?

তা দিয়ে আপনার দরকার কি?

দরকার আছে । আমি এককাপ চা খাব। চা এবং জড়দা ছাড়া একটা পান। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে।

হাতে এক হাজার টাকার নোট তো আছে।

হু আছে , এটা দিয়ে খেতে চাইছি না। এই টাকার ব্যপারে অন্য নিয়ত করে ফেলেছি। খাওয়াবেন এক কাপ চা? আপনার কাছে আমার চা পাওনা আছে । ঐ দিন আপনাকে চা- সিঙ্গারা খাইয়ে ছিলাম।

আব্দুর রশিদ চা খাওয়াতে নিয়ে গেলেন। শুকনো গলায় বললেন, চা এর সঙ্গে আর কিছু খাবেন?

‘সিঙ্গারা খাওয়ান। তাহলে শোধবোধ হয়ে যাবে। আপনি আমার কাছে ঋণী থাকবেন না আমিও ঋণী থাকব না।

চা এর সঙ্গে সিঙ্গারাও এলো । আমি গলার স্বর নামিয়ে বললাম , রশিদ সাহেব ভিক্ষার একটা নতুন টেকনিক আপনাকে শিখিয়ে দেই । কি দেবো ?

রশিদ সাহবে চা এ চুমুক দিচ্ছেন। তার চোখ মুখ কঠিন। আমি খানিক টা ঝুঁকে এসে বললাম।এই পুড়ন টেকনিকে আর কতো দিন,—- ইনকাম কি হয় ?

গলায় চা আটকেছে মনে হল, আব্দুর রশিদ সাহেবের , তিনি কাশছেন।

আপনাকে এখন আমি সহজে ইনকামের দুইটা ইফেক্টিভ টেকনিক শিখিয়ে দেবো, একটা ভিক্ষার টেকনিক। আরেকটা ভিক্ষার থেকেও সহযে উপয়ার্জনের টেকনিক।

হিমু ভাই কলা খাবেন , এই দোকানে ফ্রেশ চম্পা কলা পাওয়া যায়।

আমি খুশি খুশি চম্পা কলা ছিলিয়ে কামড় দিচ্ছি , স্বাদ ভালো আলহামদুলিল্লাহ

আব্দুর রশিদ অবাক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে,

‘ভিক্ষার থেকে সহজ পদ্ধতিও আছে নাকি?

আলবত আছে। দেখি আপনার কাছে বিক্রি করার মতো কিছু আছে?

না হিমু ভাই।

কিছুই নেই।

এই অষ্টধাতুর আংটিটা আছে। ভুজুং ভাজুং বুঝিয়ে আমার কাছে তিনশ টাকায় বিক্রি করেছিলো

ঠিক আছে এই আংটিটা আমার কাছে বিক্রি করে দিন।

এইটা দিয়ে আপনি কি করবেন।

শই শই খেলবো

নিয়া যান আপনারই আংটি ।

আমি আংটি টা হাতে নিলাম তারপর আমার হাতেড় এক হাজার টাকার নোটটা তার হাতে দিয়ে বললাম,

সামনে মা ফার্মেসি আছে, সেখানে গিয়ে চাইনিজ একটা ব্লাড সুগার মাপার মেশিন কিনবেন। এই টাকার সাথে আরও অল্প কিছু টাকা হয়ত লাগবে। তারপর রাস্তার পাশে বসে যাবেন। পথচারীদের ব্লাড সুগার মেপে দেবেন । মার্কেট বুঝে টাকা নেবেন। আজকাল প্রায় সবার ডায়াবেটিস। ব্যবসাঁটা ভালো জমবে ইন শা আল্লাহ।

রশিদ সাহেবের ভ্রু কুচকে আছে

আমি তার অষ্টধাতু আংটি নিয়ে হাটা ধরলাম। সিটি কর্পোরেশনের দেয়া নতুন ডাস্টবিনে ফেলতেই টুং করে শব্দ হল। তাকে ভিক্ষার সহজ টেকনিকটা আর বলা হল না। আসার সময় অবশ্য আরেকটা চাম্বা কলা ছিঁড়ে নিয়ে এলাম। কলাটা সুস্বাদু। আলহামদুলিল্লাহ।

রাসুলুল্লাহ (সা) এর কাছে যখন একজন ভিক্ষা চাইতে এসেছিলো তাকে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) ভিক্ষা না দিয়ে। তার ঘরের জিনিস বিক্রি করিয়ে তার জন্যে একটা কুড়াল তৈরি করে দিয়েছিলেন। তাকে লাকরি কাটতে বলেছিলেন। সেই লাকরি কেটে সেই লোক স্বাবলম্বি হয়ে গিয়েছিলো। আসলে হালাল রিজিকে বারাকাহ থাকে । ব্যপক বারাকাহ।

(চলবে ইন শা আল্লাহ … )

রচনায় : আলী আবদুল্লাহ

মতামত দিন