ইসলামিক গল্প

স্বপ্নের সংসার!

ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলামের সকল বিধানই মানুষের জন্য চির কল্যাণকর। যে কেউ ইসলামের বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন করবে, নিঃসন্দেহে সে সুখের সন্ধান পাবে। লাভ করবে সুখ-সমৃদ্ধ শান্তিময় জীবন। পক্ষান্তরে কেউ যদি নিজের মনমত চলে, ইসলামি বিধি-বিধানকে লঙ্ঘন করে অবলীলায়,  তার জীবনে নেমে আসে চরম অশান্তি; উন্মুক্ত হয় বিপদ-মসিবত ও জ্বালা-যন্ত্রণার দ্বার!

প্রিয় পাঠক-পাঠিকা! আমি এখন এমনই একটি সত্য ঘটনা আপনাদের শোনাব। ঘটনাটি ২০০৭ খৃস্টাব্দের। ঘটেছে জামালপুর জেলায়। আমার বিশ্বাস, শিক্ষণীয় এই ঘটনাটি আপনাদের বিবেককে নাড়া দিবে। চিন্তার জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করবে। ফলে একদিকে যেমন মনের ভেতর বিবাহপূর্ব প্রেম-ভালোবাসার প্রতি সিমাহীন ঘৃণা সৃষ্টি হবে ঠিক তেমনি ইসলামি বিধি-বিধান পালনের প্রতিও সৃষ্টি হবে আগ্রহ-স্পৃহা।

নুসরাত জাহান। জ্ঞান-গরিমায় অনন্যা। ষোড়শী রূপসী কন্যা। উচ্চতায় ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি। ডাগরচক্ষু বিশিষ্ট নুসরাতের ঘনকালো কেশদাম কোমর ছাড়িয়ে হাঁটু ছুঁই ছুঁই করে। হালকা-পাতলা গড়নের নুসরাতকে দেখলে মনে হয় যেন ডানাকাটা পরী! ওর রূপ-লাবণ্য শুধু ছেলেদেরকেই আকর্ষণ করে না মেয়েরাও তার দিকে তাকিয়ে থাকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে। নুসরাতের অমায়িক ব্যবহার ও ভদ্র আচার-আচরণ তার সৌন্দর্যকে আরো একধাপ বাড়িয়ে দেয়। মোটকথা শুধু রূপেই নয়, গুণেও সে অন্যদের চেয়ে অনেকদূর এগিয়ে। পড়াশুনা ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ওর নাম থাকে সকলের শীর্ষে। তাই অনেক মেয়েই ঈর্ষা করে আফসোসের স্বরে বলে- আহা! যদি নুসরাতের মতো হতে পারতাম!

ধার্মিক পরিবারের মেয়ে নুসরাত। কলেজে আসা-যাওয়া করে বোরকা পরিধান করে। সেই সাথে সব সময় চেষ্টা করে শরিয়তের বিধি-বিধান মেনে চলতে। যার ফলে রূপে-গুণে অনন্যা হওয়া সত্ত্বেও কোনো ছেলের ‘প্রেম’ নামক পাতানো ফাঁদে কখনো পা দেয়নি। অবশ্য এ পর্যন্ত ওর কাছে প্রেম-প্রস্তাব যে আসেনি তা নয়। তবে যখনই তার কাছে কোনো ছেলে কোনোভাবে প্রেমের অফার দিয়েছে তখনই সে ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেছে। বলে দিয়েছে বিয়ের পূর্বে কারো সাথেই আমি প্রেম করব না। কাউকেই ভালোবাসব না। এ আমার প্রতিজ্ঞা, এ আমার ওয়াদা! কেননা ইসলামি শরিয়তে তা জায়েয নেই। তবে বিয়ের পর আমি আমার স্বামীর সঙ্গে প্রেম করব! তাকে ভালোবাসব হৃদয়-মন উজাড় করে। তাকেই বিলিয়ে দেব আমার আপন সত্ত্বা। ফলে তখনকার প্রেমই হবে আমার সত্যিকার প্রেম, তখনকার ভালোবাসাই হবে আমার পবিত্র ভালোবাসা। এতে সুখ-শান্তি আর আনন্দে ভরে ওঠবে আমাদের দাম্পত্য জীবন!!

নুসরাতের ছিল একটি নিজস্ব মোবাইল। কিন্তু মোবাইল নামক এই ছোট্ট যন্ত্রটিই যে এক সময় কাল হয়ে দাড়াবে, ওর জীবনে চরম ধ্বংস ডেকে আনবে সেকথা কে জানত? একদিন তার মোবাইলে হঠাৎ রিং বেজে ওঠে। অপরিচিত নম্বর। ফলে খানিক ইতস্ততঃ করলেও অবশেষে রিসিভ করে। সঙ্গে সঙ্গে অপর প্রান্ত থেকে একটি ছেলেকণ্ঠ শোনা যায়। সে বলে আমি মুনীর। সময় থাকলে আপনার সাথে কিছু কথা বলতে চাই!

আমার সাথে আপনার কী কথা থাকতে পারে তা আমার জানা নেই। তবে আপনি যেহেতু বলতে চাচ্ছেন বলুন। ভদ্রতা রক্ষার খাতিরে বলল নুসরাত।

কথা বলার অনুমতি পেয়ে মুনীর খুব খুশি হয়। সে বেশ কিছুক্ষণ প্রাণভরে কথা বলে নুসরাতের সাথে! কথাবার্তার এক পর্যায়ে নুসরাতের রূপ-লাবণ্য আর দৈহিক সৌন্দর্যের ভূয়সী প্রশংসা করে মুনীর। সেই সঙ্গে মধুমাখা সাহিত্যের নিপুণ ছোঁয়ায় ওর নানাবিধ গুণের প্রশংসা করতেও ভুলে যায়নি !

ছোটবেলা থেকে অনেকে অনেকভাবে নুসরাতের রূপ-গুণের প্রসংশা করে আসছে। কিন্তু ওর নিশ্চিত বিশ্বাস, মুনীরের মতো এত সুন্দর, এত প্রাঞ্জল ও সাবলীলভাবে তার রূপ-সৌন্দর্যের বর্ণনা আর কেউ দেয়নি বা দিতে পারেনি। উপরন্তু মুনীরের মোলায়েম সুমধুর কণ্ঠ তাকে আরো বেশি কাবু করে ফেলে। ভাবে সে- ছেলেদের কথাও কি এত সুন্দর হয়! হয়কি তাদের কণ্ঠ এতটা হৃদয়গ্রাহী! এতটা আকর্ষণীয়!! সবাই বলে আমার কণ্ঠ ভালো। অথচ এখন দেখছি, আমার চেয়ে মুনীরের কণ্ঠ কয়েকগুণ বেশি ভালো!!

মুনীর যখন মোবাইলে নানা প্রসঙ্গ নিয়ে নুসরাতের সাথে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছিল তখনই ওর মনে এসব কথা বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল। এসব চিন্তা করতে করতে নুসরাত এক পর্যায়ে মুনীরের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। সে ভুলে যায় তার পূর্বের সেই ওয়াদার কথা! ভুলে যায় ইসলামি বিধি-বিধান, কঠিন গুনাহ ও কঠোর শাস্তির কথা!! ভুলে যায় তার বংশ-ঐতিহ্যের কথা। ফলে সেদিনই মুনীরের সাথে ওর বন্ধুত্বের ভিত রচিত হয়। যা কয়েক মাসের মধ্যে বন্ধুত্বের সীমা ছাড়িয়ে ‘প্রেম’ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে!!

এরপর থেকে মুনীরের সাথে নুসরাতের চলতে থাকে প্রেম-প্রেম খেলা! ওরা বাসিন্দা হয়ে যায় প্রেম-নগরীর!! শয়তানের প্ররোচনায় দু’জনই এগিয়ে যায় বহুদূর। বিরতিহীনভাবে চলতে থাকে ওদের প্রেমের গাড়ী!!!

এভাবে দীর্ঘদিনে প্রেমনগরীর দীর্ঘপথ অতিক্রমের পর হঠাৎ একদিন নুসরাতের হুঁশ ফিরে আসে। ফিরে আসে তার আসল চেতনা। তার মনে আবার জাগ্রত হয়- আরে! বিবাহপূর্ব প্রেম-ভালোবাসা তো ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। ইসলাম বলেছে- বিনা প্রয়োজনে কোনো গাইরে মাহরাম পুরুষের সাথে কথা বলা, খোশগল্প করা অবৈধ ও অন্যায় কাজ। তাহলে আমি যে মুনীরের সাথে মোবাইলে দিন-রাত অহরহ কথা বলছি সেটাও তো অন্যায় হচ্ছে। কবীরা গুনাহ হচ্ছে। তাহলে এখন কী করা যায়? যদি আমি গুনাহের দিকে তাকাই তবে তো মুনীরকে ভুলে যেতে হবে। অথচ মুনীরকে ভুলা আমার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। মুনীর ছাড়া আমার জীবন অর্থহীন, বেকার! মুনীরকে ছাড়া আমার পক্ষে একদিনও বেঁচে থাকা  সম্ভব নয়!! তাহলে এখন উপায়?

নুসরাত স্বীয় করণীয় সম্পর্কে ভাবতে থাকে। তবে বেশিক্ষণ তাকে ভাবতে হলো না। কেননা ভাবনার জগতে কিছুদূর এগুনোর পর চিরশত্র“ শয়তান তাকে গুনাহের ধারা অব্যাহত রাখার সুন্দর একটি যুক্তি (?) শিখিয়ে দিল। বলে বিয়ের পূর্বে মুনীরের সাথে কথা বলতে যখন এতই তোমার ভয়, তাহলে মোবাইলে তার সাথে বিয়েটা সেরে নিলেই হয়! তবেই তো হারাম, অবৈধ, নাজায়েয ইত্যাদির কোনো প্রশ্ন আসবে না।

শয়তানের এই বুদ্ধিটি নুসরাতের বেশ মনপুত হয়। কারণ এই পদ্ধতি অবলম্বন করলে সাপও মরবে লাঠিও ভাঙ্গবে না। অর্থাৎ গুনাহও হবে না, মুনীরও হারাবে না!!

শয়তানের শিখানো বুদ্ধি মতো কাজ করে নুসরাত। প্রথমে সে অনেক কষ্টের মাধ্যমে ভাবীকে হাত করে বাপ-মাকে রাজী করায়। তারপর মোবাইলে বিয়ে করে মুনীরকে। অথচ কে এই মুনীর? কী তার পরিচয়? কে তার পিতা? কোথায় তার বাড়ি? কী তার ঠিকানা? ইত্যাদি কিছুই সে ভালোভাবে জানল না। জানার প্রয়োজনও বোধ করল না। এমনকি মুনীরকে দেখারও প্রয়োজন বোধ করল না একটিবার। শুধু মোবাইলের মাধ্যমেই যতটুকু জানার জেনে নিল। এটাকেই সে বিশ্বাস করল এবং পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করল। অর্থাৎ ওরা এসব বিষয়ে প্রশ্ন তুললে নুসরাত ও তার ভাবী এত শক্তভাবে মুনীরের সাফাই গাইল যে, অভিভাবকরা ওদের কথাকেই সঠিক বলে ধরে নিল। তারা ভাবল, ছোটবেলা থেকে নুসরাতকে যেমন দেখে এসেছি, তাতে ধারণা করা যায়, সে কোনোদিন এমন কাজ করবে না, যদ্বারা তাদের লজ্জিত হতে হবে!

এখানে নুসরাতের অভিভাবকদের যে মারাত্মক ভুলটি হয়েছে তা হলো, তারা নুসরাতের উপর মাত্রাতিরিক্ত আস্থা ও বিশ্বাস প্রদর্শন করেছে। ফলে তার মতামতকেই তারা প্রাধান্য দিয়ে বিবাহের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ মোবাইলেই সমাধা করে ফেলেছে। অথচ মোবাইলের এই বিবাহ কী পদ্ধতিতে হয়েছে এবং শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে তা কতটুকু সহিহ্ হয়েছে তাও আলোচনার দাবী রাখে! সে যাহোক, আমি বলছিলাম অভিভাবকদের ভুলের কথা। অভিভাকরা নুসরাতের উপর আস্থা থাকার কারণে সরেজমিনে গিয়ে ছেলের খোঁজ খবর নেয়নি। অথচ তাদের জানা উচিত ছিল যে, সৃষ্টিগতভাবেই মেয়েদের আকল-বুদ্ধি কম থাকে। তাদের জ্ঞানে থাকে অপরিপক্কতা। ফলে পুরুষদের মতো দূরদর্শী চিন্তা-ভাবনা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। তাছাড়া মেয়েরা অনেকক্ষেত্রেই আবেগতাড়িত হয়ে কাজ করে। ফলে ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়।

যাহোক নুসরাত এবার মুনীরের সাথে স্বামী-স্ত্রীসুলভ কথাবার্তা বলে এবং তার কথাবার্তার পরিমাণ পূর্বের তুলনায় কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। দিনরাত মিলিয়ে প্রত্যহ ১০/১৫ বার কথা হয় মুনীরের সাথে। সে মুনীরকে ‘জান’ বলে সম্বোধন করে। মুনীরও তাকে ‘জান’ বলে ডাকে। কিন্তু মুনীরের এই ‘জান’ বলা যে শুধুই অভিনয়, তা কখনো বুঝার চেষ্টা করেনি নুসরাত!

মোবাইলে টাকা না থাকলে এবং মুনীরের ফোন আসতে বিলম্ব হলে প্রচণ্ড অস্থির হয়ে ওঠে নুসরাত। নিজ রুমে গিয়ে কান্না শুরু করে দেয় হাউমাউ করে। প্রতিদিন ভোরে মুনীরের ফোনেই তার ঘুম ভাঙ্গে। যেহেতু নুসরাত সত্যিকারের স্বামী হিসেবেই মুনীরকে জানে, তাই সে কোথাও যাওয়া কিংবা কোনো কাজ করার পূর্বে মুনীরের নিকট ফোন করে অনুমতি নেয়!

নুসরাতের এসব কর্মকাণ্ড দেখে ওর বান্ধবীরা বলে- আহা! নুসরাত কত স্বামীভক্ত! কত পতিপ্রাণা!! বর্তমান যুগে এমন স্ত্রী লাখেও একটা মিলে না। আসলে স্ত্রী হলে এমনই হওয়া উচিত!

মুনীরের সাথে কথা বলে, মুনীরকে নিয়ে কল্পনা করে বেশ সুখেই কেটে যাচ্ছিল নুসরাতের দিনকাল। সে মুনীরকে নিয়ে এত বেশি ভাবত যে, কোন্দিন কত মিনিট সে মুনীরের সাথে কথা বলেছে তাও ডাইরীতে লিখে রেখেছে। শুধু তাই নয় মুনীরের যেসব কথা তার বেশি ভালো লেগেছে সেসব কথা সে ডাইরীতে তুলে রেখেছে। যাতে বাসর রাতে এসব লেখা উপহার হিসেবে মুনীরকে দিতে পারে!

একদিন সকাল বেলা। মুনীরকে নিয়ে ভাবছে নুসরাত। ঠিক এমন সময় মুনীরের মোবাইল থেকে কল আসে নুসরাতের মোবাইলে। নুসরাত বেশ খুশিমনে মোবাইল রিসিভ করে। কিন্তু একি! এযে মুনীর নয়! এযে মেয়েকণ্ঠ! ক্ষণিকের জন্য নুসরত কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। পরে স্বাভাবিক হয়ে জিজ্ঞেস করে-

কে ?

উত্তর এল- “আমি মিশু। মুনীরের একমাত্র প্রিয় মানুষ। প্রাণের মানুষ!! আজ থেকে তুমি মুনীরকে জনমের মতো ভুলে যাও। আর কোনোদিন ওর কাছে ফোন করো না। ও আমার। শুধুই আমার। আর হ্যাঁ, একটা কথা ভালো করে জেনে রেখো, মুনীর এতদিন তোমার সাথে প্রেমের মিথ্যে অভিনয় করেছে। তোমাকে সে ধোঁকা দিয়েছে। সে তোমাকে মোটেও ভালোবাসে না। সে যাকে ভালোবাসে- সে হলাম আমি। মুনীরের হৃদয় একমাত্র আমি ছাড়া আর কেউ জয় করতে পারেনি। পারবেও না। আমি মুনীরকে গভীরভাবে ভালোবাসি। আমাদের এ ভালোবাসা একদিন দু’দিনের নয়, বহুদিনের; সেই ছোটকাল থেকে। তোমার অবগতির জন্য আরো জানাচ্ছি যে, মুনীরের সাথে আমার দৈহিক সম্পর্কও স্থাপিত হয়েছে। আমার এসব কথা তোমার হয়তো বিশ্বাস হবে না। বিশ্বাস না হলেও করার কিছুই নেই। তবে আমি জানি, আমি যা বলেছি সত্য বলেছি। একটুও মিথ্যে বলিনি। মুনীর আর আমি এক গ্রামের বাসিন্দা। সুতরাং ওকে আমার চেয়ে তোমার বেশি না চেনারই কথা। তাই বলছি, এখনও সময় আছে, মুনীরকে ভুলে যাও। অন্যথায় ঠকবে।”

জবাবে  নুসরাত বলল- “তুমি মিথ্যে বলছ। মুনীর কখনো তোমার হতে পারে না। মুনীর আমার। শুধুই আমার। সে অন্য কারো হওয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। আমি জানি, মুনীর আমার সাথে প্রতারণা করবে না। অতএব তোমার কথা আমি মোটেও বিশ্বাস করি না।” এ বলে নুসরাত লাইন কেটে দিল।

মিশুকে এসব কথা খুব কঠিন গলায় বললেও নুসরাতের বুকে পানি নেই! ভিতরে শুরু হয়েছে চরম অস্থিরতা। এমনকি মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার উপক্রম! এতদ্সত্ত্বেও নুসরাত একটু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল এবং মোবাইল হাতে নিয়ে মুনীরের কাছে ফোন করে সবকিছু খুলে বলল।

সবশুনে মুনীর বলল- নুসরাত! কারো কথায় তুমি কান দিও না। আমি তোমার আছি। তোমার হয়েই থাকব।

এরপর পুরো একমাস নুসরাতের কাছে একটি কলও দেয়নি মুনীর। শুধু তাই নয়, নুসরাত যেন কল দিতে না পারে, সেজন্য সে সিম খুলে রেখে দিয়েছে। ফলে নুসরাত দুঃখ-কষ্ট ও পেরেশানিতে পাগলের মতো হয়ে গেছে! নাওয়া খাওয়া ভুলে গেছে! চোখ থেকে বিদায় নিয়েছে রাতের ঘুম!!

একমাস পর যখন মুনীর আবার ফোন করে এতদিন ফোন না করার কারণ হিসেবে মিথ্যে অজুহাত পেশ করল, তখন নুসরাত তা নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করল এবং তার আত্মায় পুনরায় পানি এল। সে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিল এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এল। সেদিন থেকে ওদের কথাবার্তা আগের মতোই চলতে লাগল।

এ ঘটনা যখন নুসরাতের বান্ধবীরা শুনল তখন তারা বলল, যে ছেলে তোমাকে বিয়ে করে অন্য মেয়ের সাথেও সম্পর্ক গড়তে পারে এবং দীর্ঘ একমাস পর্যন্ত তোমার সাথে কথা না বলে থাকতে পারে, কেন তুমি আবার তাকে প্রশ্রয় দিলে? কেন তুমি তার কথা বিশ্বাস করলে? আমাদের মনে হচ্ছে, সে একটা ভণ্ড, প্রতারক। সে তোমার সাথে প্রেম নয়, প্রেমের অভিনয় করছে। তোমার জীবনকে ধ্বংস করার উপায় খুঁজছে। সে তোমাকে নিশ্চিত ধোঁকা দিচ্ছে। অতএব তোমার মঙ্গল এতেই যে, তুমি তাকে ভুলে যাও। কোনোদিন তার কাছে ফোন করো না এবং সে ফোন করলেও তুমি রিসিভ করো না।

কিন্তু নুসরাতের সাফ উত্তর- মুনীর কোনোদিন আমাকে ধোঁকা দিবে না। সে আমার সাথে প্রতারণা করতে পারে না। কেননা সে আমার, আমি তার। আমরা দু’জন দু’জনার। ওকে ছাড়া আমি যেমন বাঁচব না, আমার বিশ্বাস, সেও আমাকে ছাড়া বাঁচবে না।

এরপর পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন সবাই মিলে নুসরাতকে বুঝাল। সবাই মুনীরকে ভুলে যেতে বলল। কিন্তু নুসরাত কারো কথায়ই কর্ণপাত করল না। বরং আগের মতোই সে মুনীরের সাথে কথাবার্তা ও যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে লাগল।

২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসের ২৯ তারিখ। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা। নুসরাত ফোন দিল মুনীরকে। ফোন রিসিভ করার পর নুসরাত কিছুটা অভিমানের সুরে বলল, মুনীর! তুমি জানি কেমন হয়ে যাচ্ছ!! এখন তুমি আগের মতো আমাকে ভালোবাস না। আগের মতো সাজিয়ে গুছিয়ে সুন্দর করে কথা বল না। আচ্ছা শুনি! এমন করছ কেন তুমি ? প্রিয় জান্! তুমি কি জানো না, তুমি এমন করলে আমি বাঁচব না!!

জবাবে মুনীর যা বলল তা শুনার জন্য কোনোদিন প্রস্তুত ছিল না নুসরাত। মুনীর বলল, তোমার বাঁচার প্রয়োজন নেই। বিশ্বাস করো, আমি তোমার সাথে প্রেম করিনি। তোমাকে একদিনের জন্যও আমি মন থেকে ভালোবাসিনি। এতদিন আমি তোমার সাথে শুধুই অভিনয় করেছিলাম। দেখতে চেয়েছিলাম, তুমি শেষ পর্যন্ত কোথায় যাও! তোমার প্রেম ও ভালোবাসার সফর কোথায় গিয়ে ক্ষ্যান্ত হয়!! শোনো নুসরাত! আজ আমি আমার অভিনয় শেষ করলাম!! আর মোবাইলের মাধ্যমে তোমার আমার যে বিয়ে হয়েছে সেটি যদি সত্যিকার অর্থেই বিয়ে হয়ে থাকে, তাহলে এখনই তোমাকে তিন তালাক দিলাম! সুতরাং আজ থেকে তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তুমি আমাকে চিরদিনের জন্য ভুলে যাও। এতটুকু বলে মোবাইল বন্ধ করে দিল মুনীর!!!

মুনীরের মুখ থেকে এসব কথা শুনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে নুসরাত। মরার মতো পড়ে থাকে কিছুক্ষণ। পরে যখন জ্ঞান ফিরে, তখন সে পাগলের মতো জান জান বলে চিৎকার করতে থাকে। কিন্তু তার এ চিৎকার বাতাসের সাথে মিলিয়ে যায়। মুনীরকে কিছুই করার থাকল না তার কিংবা তার অভিভাবকদের। কেননা তাদের কাছে মুনীরের ফোন নম্বর ছাড়া আর কিছুই ছিল না। একবার অবশ্য নুসরাতের পিতা মুনীরের একটি ঠিকানা সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। কিন্তু পরে খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, সেই ঠিকানায় মুনীর নামের কোনো ছেলের অস্তিত্ব নেই!

প্রিয় পাঠক-পাঠিকা! ঠিকানাবিহীন মুনীরকে কোথায় খুঁজে পাবে নুসরাত ? কীভাবে করবে তার সাথে পুনঃ যোগাযোগ ? মুনীরের বিরহ বেদনায় নুসরাত আজ মৃতপ্রায়! স্যালাইন আর ঔষধপত্রের মাধ্যমে জ্বলে আছে তার নিভু নিভু জীবন প্রদীপ! কখন তা একেবারে নিভে যায় কে জানে ?

সময় হারিয়ে নুসরাত তার ভুল বুঝেছে। তাই সে এখন আক্ষেপ করে বারবার বলছে, আহা! কতই না ভালো হতো যদি ইসলামের বিধি-বিধান পুরোপুরি মেনে চলতাম। অবৈধ প্রেমে না জড়াতাম। স্বীয় প্রতিজ্ঞায় অটল থাকতাম। হায়! কতই না মঙ্গল হতো, যদি আমি মুনীর নামক মহা-প্রতারকের ফাঁদে পা না দিতাম। হায় আফসোস!! বান্ধবী ও আত্মীয়-স্বজনরা যখন বলেছিল, অন্তত তখনও যদি মুনীরকে ভুলে যেতাম!!!

মুহতারাম পাঠকবৃন্দ! হয়তো নুসরাতের জীবন প্রদীপ চিরতরে নিভেই গিয়েছে! কেননা এ ঘটনা লিখে পাঠানোর পর একদিনও সে ফোন করে জানতে চায়নি যে, তার এ হৃদয়বিদারক ঘটনাটা হৃদয় গলে সিরিজে ছাপা হয়েছে কিনা? বা কখন কোন্ খণ্ডে ছাপা হবে? যাহোক আমাদের এখন তার জন্য দোয়া করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। হে আল্লাহ! তুমি তাকে ক্ষমা করো। আর তার এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে গোটা পৃথিবীর মেয়েদেরকে বিবাহপূর্ব প্রেম-ভালোবাসা থেকে বিরত থাকার তাওফিক দাও। আমীন।

মোবাইল ফোন ব্যবহার : বৈধতার সীমা কতটুকু ? বই থেকে সংগৃহীত

মতামত দিন