ভ্রান্ত মতবাদ

হত্যা নয়, সত্যগ্রহ

রচনায় : আব্দুল হামীদ মাদানী

লিসান্স, মদীনা ইউনিভার্সিটি

কর্মরত : সঊদীআরব

বাদ প্রতিদিন পত্রিকায় ১৪/১১/১০ তারখ রবিবারের এডিশনে সানোয়াজ খান নামে এক ভদ্রলোক ‘সামাজিক কল্যাণে খরচ হোক কোরবানির অর্থ শীর্ষক একটি লেখা নজরে পড়ল। তিনি ধর্ম মানেন কি না জানি না, তবে মনে হয় তিনি সত্যিকার অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদী, বস্তুবাদী। তা না হলে তার এ লেখা ‘সংবাদ-প্রতিদিন’ ছাপবে কেন?

তিনি লিখেছেন, যেসব জিনিস মানুষের প্রকৃতিগত, যার গুরুত্ব মানুষ আপন বিবেক দ্বারা অনুভব করে, যার উপকার কি অপকার বস্তুগত বা অনুভূত নয়, শুধুই ভাবপ্রবণ—তা হচ্ছে অর্থহীন, অকেজো ও অপ্রয়োজনীয়। এরূপ জিনিষকে কোনও গুরুত্ব দেওয়া এমনকী তার অস্তিত্ব পর্যন্ত স্বীকার করা অন্ধত্ব, কুসংস্কার ও সেকেলেপনার শামিল।

তার মানে ধর্মের যে বিধানে পার্থিব কোন উপকার মানব-বিবেকে অনুভূত নয় ‘তার অস্তিত্ব পর্যন্ত স্বীকার করা অন্ধত্ব, কুসংস্কার ও সেকেলেপনার শামিল’।

চমৎকার! তার মানে ধর্ম-বিধানও সানোয়াজ সাহেবদের মত আক্কেল আলীদের আক্কেলে ওজন ক’রে পালন করতে হবে। অন্যথা তা অর্থহীন হবে! এই জন্যই তিনি লিখেছেন,

‘শিক্ষা, কৃষ্টি ও সভ্যতা থেকে মানুষের অন্ততঃ এতটুকু উপকার অবশ্যই লাভ করা উচিত, যে তার চিন্তাধারা ও ধ্যান-ধারণা বিক্ষিপ্ত, অসংলগ্ন ও অব্যবস্থিত হবে না। সে পরিচ্ছন্ন এবং সহজ সরল চিন্তা পদ্ধতি অবলম্বন করবে। মানুষের ন্যায়-নীতি ও বিচার বুদ্ধি জগতের চূড়ান্ত ফয়সালা নির্ভর করে তার পর্যবেক্ষণের উপর। সেটা কী ধর্মীয় ক্ষেত্রে, কী সামাজিক জীবন ধারণের ক্ষেত্রে। ধর্মের নিয়ম বা নিয়মাবলি পালনের ক্ষেত্রে শুধু আত্মিক দিক নয়, সামাজিক প্রেক্ষাপটও চিন্তা করা উচিত। ইসলাম ধর্মের কোরবানি সেই রকমই একটি ধর্মীয় আচার যার মধ্যে ত্যাগের থেকে আবেগই বেশি।’

সানোয়াজ সাহেব! ইসলাম-ধৰ্ম তেমন কোন ধর্ম নয়, যাকে মানুষের সীমিত জ্ঞানের শাক-বেচা দাঁড়িপাল্লা দিয়ে মহান সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত স্বর্ণতুল্য সকল বিধানকে ওজন করা যাবে। তবে এ কথা সুনিশ্চিত যে, ইসলামের প্রত্যেকটি বিধানে যৌক্তিকতা আছে। তা আপনার মাথা ও বুদ্ধি উপলব্ধি করতে পারুক, চাহে না পারুক। যেহেতু শরীয়তে এমন কোন বিধি নেই, যা অযৌক্তিক ও অপ্রয়োজনীয়। প্রত্যেক বিধানে ইহলৌকিক, পারলৌকিক অথবা ইহ-পারলৌকিক যৌক্তিকতা অবশ্যই আছে।

হ্যাঁ, এ কথা সত্যি যে, ‘প্রত্যেক মুসলমানের উচিত, ইসলামী-বিধিব্যবস্থার তাৎপর্য ও যৌক্তিকতা উপলব্ধি করা। কোনও জাতি চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা এবং জ্ঞানসাধনার ও তথ্যানুসন্ধ্যানের পথে অগ্রসর হলে সেই জাতি মানসিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক প্রগতিও অর্জন করে।’

কিন্তু কোন বিধির যৌক্তিকতা বুঝে না এলে আপনি তাকে ‘অর্থহীন অকেজো বা অপ্রয়োজনীয়’ বলবেন—এ অধিকার আপনার নেই।

কুরবানীর যৌক্তিকতা অবশ্যই আছে। যেহেতু মহান সৃষ্টিকর্তা তার আদেশ দিয়েছেন এবং তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ দূত তা পালন করেছেন। ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, “নবী (সাঃ) দশ বছর মদীনায় অবস্থানকালে কুরবানী করেছেন।” (মুসনাদ আহমাদ, তিরমিযী)

তিনি কোন বছর কুরবানী ত্যাগ করতেন না। (যাদুল মাআদ ২/৩১) যেমন তিনি তার কর্ম দ্বারা কুরবানী করতে উম্মতকে অনুপ্রাণিত করেছেন, তেমনি তিনি তার বাক্য দ্বারাও উদ্বুদ্ধ ও তাকীদ করেছেন। যেমন তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি (ঈদের) নামাযের পূর্বে যবেহ করে, সে নিজের জন্য যবেহ করে। আর যে নামাযের পরে যবেহ করে, তার কুরবানী সিদ্ধ হয় এবং সে মুসলমানদের তরকার অনুসারী হয়।” (বুখারী ৫২২৬নং)

তিনি আরো বলেন, “সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে কুরবানী করে না, সে যেন অবশ্যই আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।” (মুসনাদ আহমাদ ২/৩২১, ইবনে মাজাহ ২/১০৪৪, হাকেম ২/৩৮৯)

সকল মুসলিমগণ কুরবানী বিধেয় হওয়ার ব্যাপারে একমত। এ ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই। (মুগনী ১৩/৩৬০, ফাতহুল বারী ১০/৩)

তবে কুরবানী করা ওয়াজেব, না সুন্নাত—এ নিয়ে মতান্তর আছে। আর দুই মতেরই দলীল প্রায় সমানভাবে বলিষ্ঠ। যাতে কোন একটার প্রতি পক্ষপাতিত্ব সহজ নয়। যার জন্য কিছু সংস্কারক ও চিন্তাবিদ উলামা কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার পক্ষ সমর্থন করেন। তাঁদের মধ্যে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রঃ) অন্যতম। কিন্তু অধিকাংশ সাহাবা, তাবেয়ীন এবং ফকীহগণের মতে কুরবানী সুন্নাতে মুআক্কাদাহ (তাকীদপ্রাপ্ত সুন্নাত)। অবশ্য মুসলিমের জন্য মধ্যপন্থা এই যে, সামর্থ্য থাকতে কুরবানী ত্যাগ না করাই উচিত।

কুরবানীর একাধিক যৌক্তিকতা আছে যেমনঃ

কুরবানীতে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে ইবাদাতের খাতে অর্থব্যয় (ও স্বাৰ্থত্যাগ) হয়।

এর মাধ্যমে তাওহীদবাদীদের ইমাম ইব্রাহীম (আঃ)-এর সুন্নাহ জীবিত হয়। এর মাধ্যমে ইসলামের একটি প্রতীকের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

এর মাধ্যমে পরিবার-পরিজনদের নিয়ে মাংস-ভোজনে আনন্দ উপভোগ করা হয়।

দরিদ্রজনের উপর খরচ করা হয়। কুরবানীর মাংস দান ক’রে তাদের মনেও খুশীর ঝড় আনয়ন করা হয়, যারা সারা বছরে হয়তো একটা দিনও মাংসের মুখ দেখতে পায় না। কুরবানীর চামড়া-বেচা অর্থ তাদের মাঝে বিতরণ করা হয়।

আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের জন্য কুরবানীর মাংস হাদিয়া ও উপঢৌকন পেশ করা হয়।

নিজের যে খুশী হয়, তার চেয়ে বেশি খুশী হয় অপরকে খুশী করে। এর মাধ্যমে মুসলিম ঈদের খুশীর নিতান্ত স্বাদ গ্রহণ করে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর আনুগত্য করতে পেরেই মুসলিম আনন্দলাভ করতে পারে। সেই খুশীই তার আসল খুশী। রমযানের সারা দিন রোযা শেষে ইফতারের সময় তার খুশী হয়। পূর্ণ এক মাস রোযা করে সেই বিরাট আনুগত্যের মাধ্যমে ঈদের দিনে তারই আনন্দ অনুভব করে থাকে। এই খুশীই তার যথার্থ খুশী। বাকী অন্যান্য পার্থিব সুখ-বিলাসের খুশী খুশী নয়। বরং তা সর্বনাশের কদমবুসী। আল্লাহ পাক কিছু জাহান্নামবাসীদের উদ্দেশ্যে বলবেন, “এ এ-কারণে যে, তোমরা পৃথিবীতে অযথা আনন্দ করতে ও দম্ভ প্রকাশ করতে।” (মু’মিন : ৭৫ )

কুরবানীর যৌক্তিকতা প্রকাশ ক’রে কবি নজরুল লিখেছেন,

‘ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন!

খঞ্জর মারো গর্দ্দানেই,

পঞ্জরে আজি দরদ নেই,

মর্দ্দানী’ই পৰ্দ্দা নেই,

ডরতা নেই আজ খুন-খারাবীতে রক্ত-লুব্ধ মন!

খুনে খেলবো খুন-মাতন!

দুনো উন্মাদনাতে সত্য মুক্তি আনতে যুঝবো রণ!

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন!”

খান সাহেব লিখেছেন, ‘প্রতিবছর মুসলমানগণ কোরবানির জন্য যে অর্থ ব্যয় করে, সেটা যদি কোনও জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দুঃস্থ বালক-বালিকাদের শিক্ষা ও গরিব বিধবাদের প্রতিপালন এবং অন্যান্য সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মের জন্য ব্যয় করা হয় তাহলে সমাজ এবং সম্প্রদায় দুয়েরই উন্নতি হবে। এই জন্য তৈরি হোক না কোরবানির অর্থে সামাজিক উন্নয়নমূলক তহবিল’।

খান সাহেব হয়তো গোশতের খান খান না। অথবা বেশি খেতে ও খাওয়াতে পছন্দ করেন না। অথবা গোরক্ষা-আন্দোলনের প্রভাবে পড়েছেন। তাই সামাজিক কল্যাণে ব্যয় করার মতো অর্থ কুরবানীর মূল্যকেই দেখতে পেয়েছেন!

তিনি ইসলামের অন্যান্য ব্যবস্থা দেখতে পাননি অথবা দেখতে চাননি। ইসলামের তৃতীয় রুকন ফরয যাকাতের কথা তিনি বলতে পারেননি। ওশরের কথা তিনি হয়তো জানেন না। আর জানলে ও লিখলেও ‘সংবাদ-প্রতিদিন’ বা অন্যান্য ঐ শ্রেণীর পত্রিকা ছাপবেও না।

আপনি অবশ্যই জানেন, মানবিক ও সামাজিক কল্যাণের জন্য ইসলামের সুন্দর অর্থব্যবস্থা আছে। প্রত্যেক ধনী মুসলিম ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ অথবা তার সমমূল্যের টাকা এক বছর জমা রাখলে শতকরা আড়াই টাকা হারে যাকাত বাধ্যতামূলকভাবে গরীব-মিসকীনকে দিতে হয়।

যে চাষীর ৭৫০ কেজি ধান, গম ইত্যাদি ফসল হয়, সেই চাষীকেই ১০ অথবা ২০ ভাগের এক ভাগ ওশর গরীব-মিসকীনকে বাধ্যতামূলকভাবে দান করতে হয়। চেষ্টা করুন না, সেই বিস্মৃত যাকাত ও ওশর চালু করতে। লাগান না সেসব অর্থ মানবিক ও সামাজিক কল্যাণে।

খান সাহেব! দান করতে বললে কেউ করবে না। আজ কুরবানী কোনভাবে বন্ধ ক’রে দিলেও তার অর্থ কেউ দান করবে না। তাছাড়া কুরবানী দিয়েও তো দান করা যায়।

সুতরাং যেটা ‘জরুরী নয়’ বলে মনে করেন, সেটা বাদ না দিয়ে যতটা জরুরী, ততটা পালন ক’রে যেটা জরুরী (যাকাত) সেটা ভাল ক’রে পালন করলেই মানুষের কল্যাণ আছে।

তবে এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, কুরবানী পালনে মুসলিমদের বাড়াবাড়ি আছে। যেহেতু অধিকাংশ মুসলিমদের মনে-প্ৰাণে কুরবানীর এ আবেগ কেবল আনন্দ উপভোগের জন্য, কেবল গোশত খাওয়ার জন্য। অনেকের কেবল সুনাম নেওয়ার জন্য।

অনেকে সমাজে নাম নেওয়ার জন্য বহু টাকা দিয়ে কুরবানীর পশু ক্রয় করে এবং পত্র-পত্রিকা ও টিভির পর্দায় তাদের তথা মূল্যবান কুরবানীর পশুর ছবি-সহ প্রশংসা ও শাবাশি প্রচার করা হয়।

অবশ্যই তাদের এই অতিরিক্ত অর্থ সামাজিক কল্যাণ-খাতে ব্যয় করা উচিত। যেহেতু কেবল গোশত খাওয়া বা নাম নেওয়ার উদ্দেশ্যে দেওয়া কুরবানী মহান আল্লাহর নিকট কবুল হয় না।

আর এ কথাও সত্যি যে, অনেকে উক্ত খুশী পালন করার জন্য ঋণ ক’রে অথা সূদের উপর টাকা নিয়ে কুরবানীর পশু ক্রয় করে। অথচ ঋণ ক’রে কোন সুন্নাত তো দূর অস্ত, কোন ফরয পালন করতেও মুসলিম বাধ্য নয়।

অনুরূপ ভিক্ষা করেও কুরবানী বৈধ নয়। বরং অপ্রয়োজনে ভিক্ষা করা ইসলামে অবৈধ।

অতঃপর জ্ঞাতব্য যে, যেমন হজ না ক’রে তার খরচ সদকাহ করলে ফরয আদায় হয় না, তেমনি কুরবানী না ক’রে তার মূল্য সদকাহ করে অভীষ্ট সুন্নাত আদায় হয় না। যেহেতু যবেহ হল আল্লাহর তা’যীম-সম্বলিত একটি বিশেষ ইবাদত এবং তাঁর দ্বীনের এক নিদর্শন ও প্রতীক। আর মূল্য সদকাহ করলে তা বাতিল হয়ে যায়।

পক্ষান্তরে কুরবানী নবী (সাঃ)-এর সুন্নাহ এবং সমগ্র মুসলিম জাতির এক আমল। আর কোথাও কথিত নেই যে, তাঁদের কেউ কুরবানীর পরিবর্তে তার মূল্য সদকাহ করেছেন। আবার যদি তা উত্তম হত, তাহলে তারা নিশ্চয় তার ব্যতিক্রম করতেন না। (ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ ২৬/৩০৪)

ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) বলেন, ‘যবেহ তার স্বস্থানে কুরবানীর মূল্য সদকাহ করা অপেক্ষা উত্তম। যদিও সে মূল্য কুরবানীর চেয়ে পরিমাণে অধিক হয়। কারণ, আসল যবেহই উদ্দেশ্য ও অভীষ্ট। যেহেতু কুরবানী নামাযের সংযুক্ত ইবাদত। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ

অর্থাৎ, অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামায পড় ও কুরবানী কর (কাউসারঃ ২)

তিনি অন্যত্র বলেন,

قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

অর্থাৎ, বল, অবশ্যই আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মৃত্যু বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই। (আনআম : ১৬২)

বলা বাহুল্য, প্রত্যেক ধর্মাদর্শে নামায ও কুরবানী আছে যার বিকল্প অন্য কিছু হতে পারে না। আর এই জন্যই যদি কোন হাজী তার তামাত্তু’ বা ক্বিরান হজ্জের কুরবানীর বদলে তার তিনগুণ অথবা তার থেকে বেশী মূল্য সদকাহ করে, তাহলে তার পরিবর্তে হবে না। অনুরূপভাবে কুরবানীও। আর আল্লাহই অধিক জানেন। (তুহফাতুল মাওদুদ ৩৬পৃঃ)

আশা করি একনিষ্ঠ মুসলিম পাঠক বুঝতে পেরেছেন যে, খান সাহেবের উক্তি, ‘কোরবানি কেবল আচার পালন আর অন্ধ অনুকরণ ছাড়া আর কিছু নয়’—এ কথাটি কত বড় দুঃসাহসিকতার পরিচয়। আর এইভাবে যারা শরীয়তের বিধানকে ফুঁক দিয়ে উড়িয়ে দেন, ইসলামে তাদের বিধান কী, তাও কারো অজানা নয়।

তিনি আরো লিখেছেন, ‘ধর্ম যদি মানুষের সৎজীবন যাপন ও মঙ্গল কামনার জন্য হয় তাহলে কোরবানির অর্থ কোনও সামাজিক মঙ্গলের জন্য ব্যয় করাও যে ধর্মপালনেরই একটা অঙ্গ এবং তার সঙ্গে সেই জাতিরও উন্নতি। তাতে যে সৃষ্টিকর্তা আরও বেশি সন্তুষ্ট হবে সেটা ধর্মাচারণকারীদের ভেবে দেখা উচিত’।

অবশ্যই ধর্মীয় আচরণ মানুষের সৎ জীবন যাপন ও মঙ্গল লাভ করার জন্য বিধিবদ্ধ হয়েছে। আর কীসে কীভাবে মঙ্গল আছে, তা স্রষ্টা অপেক্ষা কোন সৃষ্টি অধিক জানতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ

অর্থাৎ, তোমরা যা পছন্দ কর না, সম্ভবতঃ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং তোমরা যা পছন্দ কর, সম্ভবতঃ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না। (বাক্বারাহ : ২১৬)

মহানবী (সাঃ) বলেছেন, “আমার পূর্বে প্রত্যেক নবীর জন্য জরুরী ছিল, তার উম্মতকে এমন কর্মসমূহের নির্দেশ দেওয়া, যা তিনি তাদের জন্য ভালো মনে করেন এবং এমন কর্মসমূহ থেকে ভীতি-প্রদর্শন করা, যা তিনি তাদের জন্য মন্দ মনে করেন।” (মুসলিম)

বলাই বাহুল্য যে, সৃষ্টিকর্তা কীসে বেশি সন্তুষ্ট হবেন, সেটা ধর্মচারণকারীদের ভেবে দেখা উচিত নয়, ভাবলেও তা করা উচিত নয়। যেহেতু সৃষ্টিকর্তার দূত বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমার এই দ্বীনে (নিজের পক্ষ থেকে) কোন নতুন কথা উদ্ভাবন করল—যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য।” (বুখারী ও মুসলিম)

মুসলিমের অন্য এক বর্ণনায় আছে, “যে ব্যক্তি এমন কাজ করল, যে ব্যাপারে আমাদের নির্দেশ নেই, তা বর্জনীয়।”

শেষ কথা এই যে, শরীয়তের বিধানসমূহকে সঠিকরপে পালন করার মাঝেই আছে প্রকৃত মঙ্গলময় জীবন যেটি জরুরী, সেটি জরুরীরপে এবং যেটি অ-জরুরী, সেটি অ-জরুরীরূপে পালন করলে মানব-জাতি কল্যাণের ভাণ্ডার পেতে পারে। অন্যথা অকল্যাণের তুফান ছাড়া আর কী?

মতামত দিন