পর্যালোচনা হাদীস

সাকালাইন-এর হাদীসের অপব্যাখ্যার প্রতিবাদ

সাকালাইন-এর হাদীস ক?

[আরবীতে الثَّقَل (সাকাল) শব্দের অর্থ গুরুভার। বহুবচন أثقال (আসকাল), আর দ্বিবচন হচ্ছে الثَّقلين (সাকালাইন)। বাংলা অর্থ দু’টি গুরুভার সম্পন্ন বস্তু। হাদীসে এই শব্দের দ্বিবচন ব্যবহার হয়েছে, সেখান থেকে তার নাম পড়েছে ‘সাকালাইনের হাদীস’।]

হাদীসুস সাকালাইন, হাদীসুস সাকালাইন কী?

ইমাম মুসলিম তার সহীহ গ্রন্থে যায়েদ ইবন আরকাম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

 «وأنا تارك فيكم الثقلين أولهما كتاب الله فيه الهدى والنور فخذوا بكتاب الله وأستمسكوا به قال زيد : فحث على كتاب الله ورغب فيه ثم قال : «وأهل بيتي أذكركم الله في أهل بيتي أذكركم الله في أهل بيتي أذكركم الله في أهل بيتي».

“আমি তোমাদের মাঝে দু’টি ভারী বস্তু রেখে যাচ্ছি: একটি আল্লাহর কিতাব, তাতে রয়েছে হিদায়াত ও নুর, তোমরা আল্লাহর কিতাবকে ধারণ কর এবং মজবুতভাবে আঁকড়ে ধর। যায়েদ বলেন: সুতরাং এভাবে তিনি আল্লাহর কিতাবকে আঁকড়ে ধরার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ও তাতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। অতঃপর বলেন: (দ্বিতীয় ভারী বস্তুটি হচ্ছে) আমার পরিবার; আমার পরিবারের ব্যাপারে তোমাদেরকে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। আমার পরিবারের ব্যাপারে তোমাদেরকে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। আমার পরিবারের ব্যাপারে তোমাদেরকে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। (সহীহ মুসলিম)

হাদসের ভাষ্য ?

হাদীসটিতে বলা হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «إني تارك فيكم الثقلين» অর্থাৎ ‘আমি তোমাদের ভেতর দু’টি ভারী বস্তু ছেড়ে যাচ্ছি’। প্রথম ভারী বস্তু আল্লাহর কিতাব, এ ব্যাপারে হাদীসে যেভাবে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিতাব ধারণ করার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ও সেটি আঁকড়ে ধরতে বলেছেন। অতঃপর দ্বিতীয় ভারী বস্তুটির কথা বললেন, আর তা হলো রাসূলের পরিবার-পরিজন। তিনি পরিবার সম্পর্কে বলেন:

«أذكركم الله في أهل بيتي أذكركم الله في أهل بيتي أذكركم الله في أهل بيتي».

“আমার পরিবারের ব্যাপারে তোমাদেরকে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। আমার পরিবারের ব্যাপারে তোমাদেরকে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। আমার পরিবারের ব্যাপারে তোমাদেরকে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।”

হাদীসের বাহ্যিক অর্থ বলে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পরিবারের হক দেখা-শুনার কথা বলেছেন, কিন্তু শিয়ারা এই অর্থ গ্রহণ করেনি, বরং তারা উম্মে সালামার হাদীস, আলির হাদীস ও আবু সাঈদ খুদরীর হাদীস তার সাথে যোগ করে ভিন্নার্থ গ্রহণ করে। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসটি দেখুন:

«إني تركت فيكم ما إن أخذتم به لن تضلوا كتاب الله سببه بيد الله وسببه بإيديكم وأهل بيتي».

“আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে যাচ্ছি, যাবত তোমরা সেটি আঁকড়ে থাকবে গোমরাহ হবে না। তা হচ্ছে, আল্লাহর কিতাব, তার এক পার্শ্ব আল্লাহর হাতে ও অপর পার্শ্ব তোমাদের হাতে। আর আমি ছেড়ে যাচ্ছি (তোমাদের মাঝে) আমার পরিবার”।

এই হাদীসের বাহ্যিক অর্থের দাবি, তিনি আহলে-বাইতকে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন। হাদীসটি ইবন আবু আসিম ‘আস-সুন্নাহ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, তবে হাদীসটি সহীহ নয়, যা তার জন্য বড় আপদ। এর সনদে সাফির ইবন যায়েদ নামক একজন বর্ণনাকারী আছেন, আবু হাতিম, নাসাঈ, আবু যুরআহ, ইয়াকুব ইবন শায়বাহ ও ইবন মাদিনী প্রমুখ তাকে দুর্বল বলেছেন। অতএব, এটি দিয়ে দলীল পেশ করা সম্ভব নয়।

এটি রেখে, এবার আমরা আবু সাঈদ খুদরীর হাদীস দেখি, তাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«إني قد تركت الثقلين أحدهما أكبر من الآخر كتاب الله عز وجل حبل ممدود من السماء إلى الأرض وعترتي أهل بيتي ألا إنهما لن يفترقا حتى يردا علي الحوض»

“আমি দু’টি ভারী বস্তু রেখে যাচ্ছি, একটি অপরটি থেকে বড়। (প্রথমটি) আল্লাহর কিতাব, যা আসমান থেকে জমিন পর্যন্ত দীর্ঘ এবং (দ্বিতীয়টি) আমার পরিবার। জেনে রেখ, এ দু’টি যাবত না হাউজে আমার নিকট উপস্থিত হবে বিচ্ছিন্ন হবে না”। হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমদ, তিরমিযি, আবু ইয়া‘লা ও ইবনু আবী আসিম। এর সনদে একজন বর্ণনাকারী আতিয়্যাহ আউফী আছেন, তাকে দুর্বল বলেছেন আহমদ, আবু হাতিম ও নাসাঈ প্রমুখগণ, বরং সকল আহলে-ইলমের দৃষ্টিতে সে দুর্বল। অতএব, হাদীসটি দলীল যোগ্য নয়।

চতুর্থ হাদীস, যায়েদ ইবন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তাতে রয়েছে:

«إني تارك فيكم خليفتين كتاب الله حبل ممدود ما بين السماء والأرض أو ما بين السماء إلى الأرض وعترتي أهل بيتي وإنهما لن يفترقا حتى يردا على الحوض».

“আমি তোমাদের মাঝে দু’টি প্রতিনিধি রেখে যাচ্ছি: আল্লাহর কিতাব, যা আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী দীর্ঘ রশি অথবা আসমান থেকে জমিন পর্যন্ত দীর্ঘ রশি এবং আমার পরিবার। এ দু’টি বিচ্ছিন্ন হবে না, যাবত না হাউজে উপস্থিত হবে”।

হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আহমদ ও তাবরানী। এর সনদে কাসিম ইবন হাসসান বর্ণনাকারী রয়েছেন। আহমদ ইবন সালিহ ও ‘আজালি তাকে সেকাহ বলেছেন, ইবন হিব্বান তাকে নির্ভরযোগ্য রাবিদের ভেতর উল্লেখ করেছেন, কিন্তু বুখারী ও ইবন কাততান তাকে দুর্বল বলেছেন, ইবন আবু হাতিম তার সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বন করেছেন, যাহাবী তাকে দুর্বল বলেছেন এবং ইবন হাজার বলেছেন মাকবুল। (অর্থাৎ অনুরূপ কারও দ্বারা সমর্থিত হলে)। তাছাড়া এর সনদে আরেক বর্ণনাকারী রয়েছেন শরীক ইবন আব্দুল্লাহ, তার স্মৃতি শক্তি খুব দুর্বল।

পঞ্চম হাদীস, জাবির ইবন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«يا أيها الناس إني قد تركت فيكم ما إن أخذتم به لن تضلوا كتاب الله وعترتي أهل بيتي».

“হে লোক সকল, আমি তোমাদের ভেতর এমন বস্তু রেখেছি, সেটি যদি আঁকড়ে ধর তাহলে তোমরা গোমরাহ হবে না: আল্লাহর কিতাব। আর আমার বংশধর, তারা তো আমার পরিবার”।

হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তিরমিযী ও তাবারানী। এর সনদে একজন বর্ণনাকারী যায়েদ ইবন হাসান আনমাত্বি রয়েছেন, আবু হাতিম তাকে মুনকারুল হাদীস বলেছেন, যাহাবী ও ইবন হাজার বলেছেন সে দুর্বল।

এসব বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয়, সাকালাইনের হাদীসটি যায়েদ ইবন আরকামের সূত্রেই সহীহ, অন্যান্য সূত্র সহীহ নয়, কিন্তু তাতে আহলে-বাইতকে আঁকড়ে ধরার কথা নেই। সেখানে তাদের অধিকার রক্ষা করার কথা এসেছে, আর আঁকড়ে ধরার নির্দেশটি কেবল আল্লাহর কিতাবের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এ ব্যাখ্যার সমর্থন দেখুন সহীহ মুসলিমে জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে:

«وقد تركت فيكم ما لن تضلوا بعده أبداً إن اعتصمتم به كتاب الله».

“আমি তোমাদের ভেতর এমন বস্তু রেখে দিয়েছি, যদি সেটি তোমরা আঁকড়ে ধর তাহলে তোমরা কখনো গোমরাহ হবে না: তা হলো, আল্লাহর কিতাব”। এখানে শুধু ‘আল্লাহর কিতাব’ বলা হয়েছে। এ হাদীসে আহলে বাইত ও তার পরিবারের কথা বলা হয় নি। হাদীসটি বর্ণনা করেছেন জা‘ফর আস-সাদিক, তার বাবা মুহাম্মাদ আল-বাকির থেকে, তিনি জাবির ইবন আব্দুল্লাহ থেকে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে।

বস্তুত নবী পরিবারকে আঁকড়ে ধরার কথা যে হাদীসে বলা হয়েছে সেটি ইমাম আহমদ ও ইবন তাইমিয়াহ দুর্বল বলেছেন, তবে কতক আহলে ইলম সহীহ বলেছেন, যেমন আলবানি প্রমুখগণ, কিন্তু গবেষণায় যা প্রমাণ হয় সেটিই গ্রহণযোগ্য। গবেষণার দৃষ্টিতে সনদ ও অর্থের বিচারে হাদীসটি সহীহ নয়, যে গবেষণা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের নীতি ও আদর্শ, তারা এসব ব্যাপারে কারও অন্ধ অনুকরণ করে না, বরং প্রণীত মূলনীতিসমূহ অনুযায়ী অনুসরণ করে মাত্র।

হাদসটি সহীহ মানলে ক অর্থ হবে?

মেনে নিলাম হাদীসটি সহীহ, কিন্তু তার ফলাফল কী হবে? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘সাকালাইন’ অর্থাৎ দু’টি ‘সাকাল’ বা ভারী বস্তু আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন, ‘সাকাল’ বা ভারী বস্তু দু’টি কি? উত্তর: প্রথম ‘সাকাল’ আল্লাহর কিতাব, দ্বিতীয় ‘সাকাল’ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবার।

ইবন আসির বলেন, “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘সাকাল’ শব্দ বলেছেন। কারণ, দু’টি বস্তু আঁকড়ে ধরা ও তার উপর আমল করা আসলেই সাকাল তথা খুব ভারী। আর প্রত্যেক মূল্যবান ও গুরুতর বস্তুকে সাকাল বলা হয়। অতএব, কুরআন ও নবী পরিবারের বড়ত্ব ও সম্মানের কারণে তাদেরকে সাকাল বলা হয়েছে”। [দেখুন: ইবনুল আসির ‘গারিবুল হাদীস’: (খণ্ড ১ পৃ. ২১৬)]

হাদীসের প্রকৃত অর্থ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাকালাইনের হক সংরক্ষণ করার নির্দেশ দিয়েছেন, তাই সাহাবীগণ তাদের হক সেভাবে দিয়েছেন। দেখুন, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন: «إرقبوا محمداً في أهل بيته».  “মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার পরিবারের ব্যাপারে খেয়াল রাখবে”। বাণীটি বুখারী তার সহীহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। আবু বকর আরও বলেন, সেই সত্ত্বার কসম, যার হাতে আমার নফস, আমার বংশের চেয়েও যত্ন-আত্তির জন্য আমার নিকট বেশি প্রিয় রাসূলুল্লাহর বংশ। এ বাণীটিও ইমাম বুখারী তার সহীহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

শিয়াদের অপব্যাখ্যা কয়েকটি কারণে প্রত্যাখ্যাত:

প্রথম কারণ: হাদীসে বর্ণিত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইতরাহ কে?

উত্তর: কারও ‘ইতরাহ’ হচ্ছে, তার পরিবারের লোকেরা, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইতরাহ অর্থ যাদের ওপর যাকাত হারাম, যেমন বনু হাশিম। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইতরাহ বা পরিবার। এবার দেখি তার ইতরাহকে আঁকড়ে ধরেছে আহলুস-সুন্নাহ, না শিয়ারা?

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত শিয়াদের ইলমের সনদ নেই, তারা নিজেরাও স্বীকার করে তাদের কিতাব ও হাদীসের সনদ নেই, বরং তাদের কাছে যা রয়েছে তা তো কতক কিতাবের সমষ্টি, যা হাতে পেয়ে তা বলতে আরম্ভ করেছে, তোমরা এগুলো বর্ণনা করবে, কারণ তা হক।

হুর আমেলী ও অন্যান্য শিয়া ইমামগণ সনদ সম্পর্কে বলেন: শিয়াদের কোনোও সনদ নেই, তারা সনদের ওপর নির্ভরও করে না। অতএব, তাদের কিতাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিবার থেকে আগত হাদীসসমূহের বর্ণনা আসবে কীভাবে?!

আমরাই বরং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইতরার অনুসারী। আমরা তাদের প্রতি তাদের প্রাপ্য হক হ্রাস-বৃদ্ধি ছাড়াই আদায় করেছি। যেমন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমরা আমাকে নিয়ে সীমালঙ্ঘন করো না, যেমন খ্রিস্টানরা ঈসা ইবন মারইয়ামকে নিয়ে করেছে, তবে তোমরা বল আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল”।

দ্বিতীয় কারণ: নবী পরিবারের ইমাম অর্থাৎ আলি ইবন আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং ইলমের দিক থেকে তার পরের অবস্থানে থাকা উম্মতের বড় আলেম ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন: “আলী অপেক্ষা খিলাফতের বেশি হকদার আবু বকর ও উমার”। বরং একাধিক বর্ণনায় এসেছে, আলী বলেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর আবু বকর ও উমার সর্বোত্তম ব্যক্তি। বরং শিয়াদের বর্ণনায় এসেছে, আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন: “আমি আপনাদের মন্ত্রী ও সহযোগী হবো এটিই আমার আমির হওয়া অপেক্ষা আপনাদের জন্য উত্তম”। অতএব, আলী নিজে আবু বকর ও উমারের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করছেন, যিনি নবী পরিবারের ইমাম, তাহলে অন্যদের অস্বীকার করার সুযোগ কোথায়?

তৃতীয় কারণ: এই হাদীস নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নের বাণীর সমর্থক:

«تركت فيكم ما إن تمسكتم به لن تضلوا أبداً كتاب الله وسنتي».

“আমি তোমাদের ভেতর এমন বস্তু রেখে গেলাম, যদি সেটি আঁকড়ে ধর তাহলে তোমরা কখনো গোমরাহ হবে না: আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নত”।

তিনি আরও বলেন:

«عليكم بسنتي وسُنة الخلفاء الراشدين من بعدي عضوا عليها بالنواجذ».

“তোমরা আমার সুন্নত ও আমার পরবর্তী খলিফাদের সুন্নত আঁকড়ে ধর, মাড়ির দাঁত দিয়ে সেটি কামড়ে ধর”। এভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে মাড়ির দাঁত দিয়ে রাসূলের ও রাসূলের খলীফায়ে রাশেদদের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরার নির্দেশনা দিয়েছেন।

অপর হাদীসে তিনি বলেন:

«اقتدوا بالَذّين من بعدي , أبي بكر وعمر».

“আমার পরবর্তী দু’জনের অনুসরণ কর: আবু বকর ও উমার”।

অপর হাদীসে তিনি বলেন:

«اهتدوا بهدي عمار وتمسكوا بعهد ابن مسعود».

“তোমরা আম্মারের আদর্শ অনুসরণ কর ও ইবন মাসউদের অঙ্গিকার আঁকড়ে ধর”। অথচ এ হাদীস প্রমাণ করে না যে, আম্মার ও ইবন মাসউদ প্রমুখগণ সবাই ইমাম বা শাসক হবেন। বরং এটাই বুঝানো উদ্দেশ্য যে, তারা সবাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিদায়াতের ওপর আছেন। আমরা বিশ্বাস করি একযোগে তার পরিবারের সবাই কখনো গোমরাহ হবেন না।

চতুর্থ কারণ: শিয়ারা (রাসূলের চাচা) আব্বাসের দুর্নাম করে, অনুরূপ দুর্নাম করে তার ছেলে আব্দুল্লাহর এবং হাসানের সন্তানদেরও দুর্নাম করে। তাদের অভিযোগ, এরা সবাই হুসাইনের সন্তানদের হিংসা করে, বরং স্বয়ং হুসাইনের সন্তানদেরও দুর্নাম করে তারা; বিশেষ করে হুসাইনের যেসব সন্তান তাদের নিকট ইমাম হিসেবে স্বীকৃত নয়, যেমন যায়েদ ইবন আলী। অনুরূপ (তাদের ১১তম ইমাম) হাসান আসকারির ভাই ইবরাহীমেরও দুর্নাম করে। সুতরাং বুঝা গেল যে, শিয়ারা কেউই নবী ও তাঁর পরিবার-পরিজনের ঘনিষ্ঠজন বা প্রকৃত বন্ধু নয়! তাদের প্রকৃত বন্ধু তো তারাই যারা নবী ও তার পরিবার-পরিজনের প্রশংসা ও গুণ-গাণ করে, তাদের হক ও অধিকার প্রদান করে, তাদের অধিকার প্রদানে কোনোও ত্রুটি করে না।

পঞ্চম কারণ: শিয়াদের চোখ ইসলামকে অনুসরণ করার জন্য নয়, বরং সেটি হচ্ছে পারস্যের সাম্প্রদায়িক চেতনাকে পুনর্জীবন দান করা। তাদের নিকট ইসলাম ও কুফর মূল বিষয় নয়, বরং মূল বিষয় হচ্ছে আরব ও পারস্যের দ্বন্দ্ব, তার প্রমাণ কয়েকটি:

১. সালমান ফারসীকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যান্য সাহাবী অপেক্ষা অতিরিক্ত সম্মান করা, তাদের দাবি তার নিকট অহি করা হয়, কেন!? কারণ, তিনি পারস্যের।

২. হাসানের সন্তানদের সম্মান না করে শুধু হুসাইনের সন্তানদের সম্মান করা, কেন? কারণ হুসাইন পারস্যের সম্রাট শাহার বানু বিনতে ইয়াযদাযারদকে বিয়ে করেছেন, তার গর্ভেই জন্ম নিয়েছে আলী (জয়নুল আবেদীন) ইবন হুসাইন ইবন আলী অর্থাৎ শিয়াদের চতুর্থ ইমাম। (আল্লাহ তাদের সবার ওপর সন্তুষ্ট হোন)। শিয়াদের দাবি, হাশেমী বংশের সাথে পারস্য সাম্রাজ্যের বংশ একাকার হয়ে গেছে।

৩. শিয়ারা বলে, ‘পারস্যের বাদশাহ কিসরা জাহান্নামে রয়েছে, (তবে তার আযাব হচ্ছে না), তার ওপর আগুন হারাম, কেন?! কিসরাকে সম্মান প্রদর্শন করার একটি চক্রান্ত এটি, যদিও সে কুফুরীর ওপর মারা গেছে, তবুও শিয়ারা বলে ‘তার ওপর আগুন হারাম’!

৪. শিয়াদের আরেক পণ্ডিত, তবে সেই শেষ নয়, সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের সম্পর্কে বলে, যার নাম ইহকাকী হায়েরী: ‘ঐসব বেজন্মা প্রবৃত্তি পূজারি আরব বেদুঈনরা পারস্যের নারীদের সতীত্ব পিপাসী ছিল’।

দেখুন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথীদের কীভাবে বদনাম করছে, আর সে সময়ের পারস্যের নারীদের কি প্রশংসা করছে?! অথচ, তারা অগ্নি পূজারি ছিল। অগ্নি পূজারিরা পবিত্র আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথীরা পারস্যের নারীদের ইজ্জত পিয়াসু। এভাবেই তারা ইসলামের আদর্শ-পুরুষদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে। অতএব, তাদের দৃষ্টি ইসলাম ও কুফরের দিকে নয় অথবা আলীকে গ্রহণ ও অন্যদের ত্যাগ করা নয়, বরং তাদের দৃষ্টি হচ্ছে পারস্যের সাম্প্রদায়িকতা উজ্জীবিত করার দিকে।

অনুবাদ: সানাউল্লাহ নজির আহমদ

সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

মতামত দিন