পর্যালোচনা ভ্রান্ত মতবাদ

নাস্তিক্যবাদের বাস্তবতা

১.১ ভূমিকা
এই বইটি মূলত ইসলামের মূল শিক্ষা তাওহিদ কে ঘিরে এবং মুসলিম দের জন্য লেখা। তবে আমাদের দেশে সাম্প্রতিককালে নাস্তিকতা ও সংশয়বাদ অনেক কে প্রভাবিত করেছে – আর এ ধরনের দর্শনের বাস্তবতা সম্পর্কে এবং এর পাশাপাশি ধরম সম্পর্কে শারবিক ধারনা না থাকাই এর কারন। তাই এ বিষয় আলোকপাত করার জন্য এই বইএর প্রথম দুই অধ্যায়কে ব্যবহার করা হল।
১.২ নাস্তিক কি নাস্তিক ?
নাস্তিক্কবাদের প্রচারকরা একে যেভাবে উপস্থাপন করে তা হলঃ নাস্তিকতা অর্থ ধর্মের বাধন ছিন্ন করে মুক্ত মনের মানুষ হওয়া। কিন্তু বাস্তবতা অনেকটা ভিন্ন। মূলত নাস্তিকতা প্রকিতিপূজা, ব্যক্তিপূজা ও প্রব্রিত্তিপূজার এর সংমিশ্রণ।

নাস্তিক স্রস্টার সমস্ত বৈশিষ্ট্য ‘অচেতন’ ও ‘জড়’ প্রকৃতির ওপর আরোপ করেছে, ফলে সে ‘জড়বস্তু’ কে সৃষ্টি, প্রতিপালন, ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণের বইশিশ্ত আরোপ করার মাধ্যমে নিজেকে গাছ, পাথর, সূর্য, চন্দ্র, মাছ, কচ্ছপ পূজারীর পরজায় নামিয়ে এনেছে!
তেমনি নাস্তিকরা কিছু ‘বিখ্যাত’ ব্যক্তিবর্গের অন্ধ অনুসারী। শুধুমাত্র তাদের খ্যতির কারনেই অনেক নাস্তিক তাদের যুক্তির ভুল ধরতে প্রস্তুত নয়।
উপরন্ত প্রবৃত্তির তাড়না এবং ভগের লালসা নাস্তিকদের একটা বড় অংশকে প্রেরনা যোগায় স্রস্টা কে অস্বীকার করতে।
এজন্য নাস্তিকদের বহু-ঈশ্বরবাদীদের (Polytheist) অন্তরভুক্ত হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে।
১.৩ নাস্তিকদের প্রকৃতিপূজা
একজন আস্তিক দাবী করে জে স্রস্টা চিরকার বিদ্যমান ছিল আছেন এবং থাকবেন, একজন নাস্তিক দাবী করে যে অচেতন জড় প্রকৃতি চিরকাল বিদ্যমান ছিল এবং থাকবে।
একজন আস্তিক দাবী করে যে জ্ঞ্যনী স্রস্টা তাকে সৃষ্টি করেছেন। একজন নাস্তিক দাবী করে যে জড় প্রকৃতি তাকে সৃষ্টি করেছে।
একজন আস্তিক সর্বশক্তিমান স্রস্টার প্রতি ভক্তি নিয়ে একমাত্র তাঁর উদ্দেশ্যে মাথা নত করে। একজন নাস্তিক প্রকৃতি কে ভক্তি করে প্রকৃতির জন্য মাথা নোয়ায়, বিভিন্ন উপলক্ষে নাছ-গান ও অশালীন কিছু আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকৃতির পূজা করে।
আস্তিক স্রস্টার প্রতি কৃতজ্ঞয়তা প্রকাশ করে, নাস্তিক জড় প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞয়তা প্রকাশ করে গান, কবিতা, স্মৃতি রচনা করে থাকে অথচ প্রকৃতি সেটা শুনতেই পায় না :

                                “যখন তোমরা ডাক তখন কি তোমাদের সে ডাক শুনতে পায়?” [আল-কুরআন]

আস্তিক স্রস্টা কে ভালবাসে, নাস্তিক স্রস্টা কে বাদ দিয়ে জড় প্রকৃতি কে ভালবাসে।
নাস্তিকদের অন্তরে পৌত্তলিকতার প্রতি ভালবাসার কারনে তারা মূর্তি, ভাস্কর্য ইত্তাদি বানাতে তৎপর
তাই নাস্তিকতা নতুন কোন বৈপ্লবিক দর্শন নয়, বরং নাস্তিকতা হল কুসংস্কারাচ্ছন্ন অসভ্য মানুষের মাঝে বিদ্যমান গাছ, সূর্য, চন্দ্র, পাথর, প্রানী পূজার নবরূপ ও সাম্প্রতিক বহিপ্রকাশ।
তাই আধুনিক, সভ্য, শিক্ষিত মানুষের জন্য প্রকৃতি পূজার এই প্রাচীন কুসংস্কারে ফিরে যাওয়া মানায় না।
১.৪ নাস্তিকদের ব্যক্তিপূজা
বর্তমান সময় অনেক নাস্তিক বিভিন্ন বিখ্যাত দার্শনিক ও বিজ্ঞায়নীর অন্ধ অনুসারী, এদেরকে তারা নবী-রাসূলদের মত ভক্তি করে, আর তাই ধার্মিক মানুষেরা জাভাবে বিনা প্রশ্নে নবী-রাসূলদের শিক্ষা কে মাথা পেতে মেনে নেয়, নাস্তিকরাও তেমনিভাবে বিনা প্রশ্নে তাদের দারশনিক-বিজ্ঞ্যানী ‘অগ্রপথিকদের’ মতবাদকে শিরোধার্য হিসাবে মেনে নেয়। এই সমস্ত দার্শনিক বিজ্ঞ্যানীদের ভ্রান্তিগুলো খুব স্পষ্ট যুক্তিতর্কের আলোকে তুলে ধরা হলেও নাস্তিকদের শেষ কথা হল : আমরা দার্শনিক বিজ্ঞ্যানীদের অবাধ্য হব না।
১.৫ নাস্তিকদের প্রবৃত্তি পূজা
যাবতীয় অনৈতিক গুনাবলীর সর্বাধিক বহিপ্রকাশ ঘটে নাস্তিকদের মাঝে, আর সেটাই স্বাভাবিক। বহু-ঈশ্বরবাদী নাস্তিকদের একজন দেবতা হল তাদের প্রবৃত্তি। যদি নাস্তিকতা কে সত্য ধরে নেয়া হয় এবং পৃথিবীর শকল লোক আজ নাস্তিক হয়ে যায়, তবে অল্প কয়েক প্রজন্মের মাঝেই পৃথিবীর বুক থেকে মানব সভ্যতা দ্রুত বিলুপ্ত হবে! আস্তিকরা আছে বলেই পৃথিবীতে মানব সভ্যতা তিকে আছে।
১.৬ নাস্তিক্কবাদ-আস্তিক্যবাদঃ ‘চেকমেট’ আর্গুমেন্ট
আমরা শকলেই জীবনের কোন এক পর্যায় উপলব্ধি করি যে আমরা ‘আছি’। আমরা নিজের ইচ্ছায় এই পৃথিবী তে আসিনি। হঠাত একদিন নিজেকে ‘আবিস্কার’ করলাম।
অবশ্য স্রস্টা সম্পর্কে সঠিক ধারনায় বিশ্বাসী হলে ছোটবেলা থেকেই নিজের উৎসও টা জানার ইচ্ছা থাকে। তারপরেও বিশশবিদ্যালয়ে পদার্পণের পর ‘বুদ্ধিমান’, বিজ্ঞ্যান্মনস্ক’, ‘মুক্তচিন্তার’, অধিকারীদের সান্নিধ্যে এসে অনেকের মনে নতুন করে চিন্তা জাগে, সত্যিই কি আমরা আছি? আমার কি কোন স্রস্টা আছে? এত এত বিজ্ঞ্যানিরা বুঝি নাস্তিক? বুদ্ধিমানেরা বুঝি নাস্তিক?
এই নিবন্ধে মূলত অতি সংক্ষেপে স্রস্টার অস্তিত্বের সপক্ষে এক্তি “চেকমেট” আর্গুমেন্ট দেয়া হবে। অর্থাৎ নাস্তিকতা-আস্তিকতা বিতর্কের ‘অনেক অনেক কথা’ কে কিছু মূল পয়েন্ট ও নীতিতে শ্রেনিবিন্যস্ত করে প্রত্যেকটি ক্যাটাগরি কে এমনভাবে মূল্যায়ন করা হবে যেন এ সঙ্ক্রান্ত অতীত ও ভবিষ্যতের সব আর্গুমেন্ট ও কাউন্টার আর্গুমেন্ট ‘কভার’ হয়ে জায়। এই লেখা পরেই যে শব নাস্তিক আস্তিক হয়ে যাবে তা নয়। তবে আশা করি প্রক্রিত সত্যান্নেষী কে পথ দেখাবে।
১.৭ আস্তিকদের সবচেয়ে মৌলিক ও সবচেয়ে শক্তিশালি যুক্তি
দুটি :
১) অস্তিত্ব : অর্থাৎ স্রস্টা ছাড়া অস্তিত্ব কে ব্যাখ্যা করা যায় না।
২) ডিজাইন : অর্থাৎ স্রস্টার ‘অ্যাসাম্পশন’ ছাড়া মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ থেকে শুরু করে সুবিশাল গ্যালাক্সি- এবং এর কোন কিছুর ডিজাইন কে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
আস্তিকদের এই দুটি যুক্তিই মানুষের স্বাভাবিক ও সহজাত চিন্তা প্রক্রিয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
যেমন : মানুষ কোন কিছুর সম্পর্কেই একথা ভাবেনা যে এটা ‘এমনি এমনি’ হয়েছে, তবে মহাবিশ্বকে কেন ‘এমনি এমনি’ ভাবতে যাবে? ধারা যাক কেউ একজন নাস্তিক এর পকেট থেকে বের করে একটা কিছু দেখিয়ে বলল : এটা হঠাৎ ‘এমনি এমনি’ তার পকেটে চলে এসেছে! নাস্তিক কিন্তু কখনই তার কথা বিশ্বাস করবে না। এই নাস্তিক যত বড় সন্দেহবাদি বা অবিশ্বাসীই হোক না কেন তার মনে ১০০% ‘বিশ্বাস’ তৈরী হবে যে সে মিথ্যা বলছে। এক্ষেত্রে এই নাস্তিক একজন দৃঢ় বিশ্বাসী, অথচ সে দাবী করে যে সে সন্দেহবাদী! সঠিক কথা হল : নাস্তিক দ্বৈত নীতিতে চলে : সকল ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস আর সুবিধামত অবিশ্বাস ও সন্দেহ! যাহোক কোন কিছুর ‘এমনি এমনি’ হওার ধারনা মানুষের মৌলিক চিন্তাপ্রক্রিয়ার বিরোধী, যে মহাবিশ্ব ‘এমনি এমনি’ এসেছে বলে দাবী করে, সে মূলত স্ববিরোধী।
তেমনি কোন ডিজাইন ‘ডিজাইনার’ ছাড়া ‘এমনি এমনি’ হয় না – এটাও মানুষের চিন্তা প্রক্রিয়ার একটা মুলনিতি, মানুষ কখনই এর অন্যথা করে না – সে যত বড় বিজ্ঞ্যানীই হোক কিংবা যত বড় মূর্খই হোক।
পরিকল্পনা, নকশা, গোছানো, কিছু জটিলতা, নৈপুণ্য, সৌন্দর্য, প্রক্রিয়া, বিভিন্ন অংশের সমন্বয় : এই বিষয়গুলো যেখানে উপস্থিত, সেখানেই কোন এক সত্তার হস্তক্ষেপ আছে বলে মানুষ বিশ্বাস করে।
কেউ এক্তি ঘরে ঢুকে দেখতে পায় সেখানে চেয়ার-টেবিল যথাস্থানে সারিবদ্ধভাবে গোছানো, মেঝে পরিচ্ছন্ন, ফুলদানিতে সতেজ ফুল রাখা, সবকিছু নিজনিজ স্থানে ঠিকঠাক ভাবে আছে, তখন কোন বারতি গবেষণা ছারাই তার মস্তিস্ক এই সিদ্ধান্তে আসে এ ঘোরটি ‘কেউ’ গুছিয়েছে। এর বিপরীতে ধরা যাক কেউ যদি বলতে চায় যে প্রচণ্ড এক ঘূর্ণিঝড়ের ফলে ঘড়টি ‘গোছানো’ হয়েছে, তবে তাকে চিন্তার সহজাত প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে বেশ ‘অস্বাভাবিক, এবং ‘জটিল’ কোন তত্ত দাঁর করাতে হবে। আর এক্ষেত্রে আমরা নিশ্চিত যে তার তত্ত কেউ ‘বিশ্বাস’ করবে ন্না, সে যতই বিখ্যাত বা মেধাবী হোক না কেন।
কেউ যদি একটা সাদা কাগজে ‘ক’ অক্ষর টি লেখা পায়, তার মস্তিস্ক সহজাতভাবেই তাকে জানিয়ে দেবে যে এটা ‘কেউ’ লিখেছে। কালির দোয়াত উলটে পড়ে ‘ক’ লেখা হয়েছে – এমন তত্ত দাঁর করাতে চাইলে তাকে যৌক্তিক চিন্তার সহজাত প্রক্রিয়া পরিত্যাগ করতে হবে।
একজন লেখক লিখেছেন : “কোন একটা সমন্বয় বা ‘ব্যবহার’ আরেকটা সহজ উদাহরন হচ্ছে রাস্তার ট্রাফিক বাতি। ‘সবুজ-হলুদ-লাল-হলুদ-সবুজ’ – এভাবে পরজায়ক্রমিকভাবে বাতিগুলো জ্বলতে থাকে। আমরা হয়ত সবসময় ওভাবে ভেবে দেখিনা, কিন্তু যদি দেখতাম তবে সহজেই জানতাম যে ওই বাতিগুলো এভাবে একটা নিয়ম মেনে যে একটা নিদিষ্ট সময় পর পর জ্বলছে বা নিভছে, তা কোন কাকতালীয় ব্যাপার নয়, বরং ‘কেউ একজন’ এই ‘ব্যবস্থা’ সুচিন্তিতভাবে উদ্ভাবন করেছেন”
তেমনি একজন ব্যক্তি কখনই এ কথা বিশ্বাস করে না যে একটি ছাপাখানায় বিস্ফোরণ ঘটে ‘গীতাঞ্জলি’ রচিত হয়েছে!
১.৮ অস্তিত্বের যুক্তির সম্ভাব্য পাল্টা যুক্তি এবং খণ্ডন
পাল্টা যুক্তি ১ : মহাবিশ্বের বা এর কোন অংশের ডিজাইনকেই অস্বীকার করা, অর্থাৎ এ কথা দাবী করা যে মহাবিশ্বের কোন ডিজাইনার নেই!
খণ্ডন : এই কথা খুব বেশী লকে বলে না, আর যারা বলে তারা এটা বুঝিএই দেয় যে তারা স্রস্টার অস্তিত্বকে বাঙ্গ করছে, সেক্ষেত্রে এর জবাব দেয়ার প্রয়োজন নেই, কেননা এটা কোন যুক্তিই নয়। কেউ যদি নিজেকে একটু মহাবিশ্বের বিশালতা, নিপুনতা, এর বিভিন্ন অংশে বিদ্যমান প্রক্রিয়া, জীবজগৎ, প্রাণী জগৎ নিয়ে পরাশনা করে, তার সামনে আসবে একের পর এক দিজাইনের অশংখ গানিতিক নমুনা, এরপরও মানতে না চাইলে কিছু বলার নেই।
পাল্টা যুক্তি ২ : মহাবিশ্বের সব ডিজাইন যে ব্যাখা করা যায়, সুতরাং ডিজাইনার নেই, এবং এর ব্যাখা করার জন্য রয়েছে বিভিন্ন তত্ব যেমন ডারউইনিজম…ইত্যাদি।
খণ্ডন : এই যুক্তি দাঁড়িয়ে আছে একটি চরম ভূল ‘আক্সিওম’ এর ওপর, তা হল :
“যদি কোন কিছুর ডিজাইন কে ব্যাখা করা সম্ভব হয় তার মানে তার ডিজাইনার নাই!”
কি আশ্চর্য কথা! ঘড়ির ডিজাইন আমি ব্যাখা করতে পেরেছি, সুতরাং ঘড়ির কোন মেকার নেই!
সুপার কম্পিউটার ব্যাখ্যা করতে পেরেছি, তাই সুপার কম্পিউটার কেউ বানায় নি!
সুতরাং ডিজাইন ব্যাখ্যা করতে পারা মূলত আস্তিক্যবাদকে আরও শক্তিশালী করবে। বিজ্ঞানীরা যতই মহাবিশ্বের ডিজাইন ব্যাখ্যা দেবে, তারা তত বেশী করে স্রস্টার অস্তিত্য প্রমান করে ছাড়বে।
পাল্টা যুক্তি ৩ : কোন জটিল কিছু যদি অপেক্ষাক্রিত সরল ধাপ অতিক্রম করে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। তার মানে এর কোন ডিজাইনার নেই।
খণ্ডন: আগের যুক্তির মতই এটাও পুরোপুরি খোঁড়া যুক্তি। একটি ঘড়ি কিভাবে ছোট ছোট সরল যন্ত্রাংশ একটির সাথে অপরটি জোড়া দিয়ে তৈরী হয়েছে, তার বিবরন প্রকাশ করলে বলা যাবে যে কেউ একে বানায় নি? “আমি নাস্তিক” লেখাটি কেউ লেখেনি, কেননা আ, ম, ি ,ন ,স , ত, ক এসব সরল জিনিসপত্র দিয়েই লেখাটি ‘হয়েছে’! মন ‘মুক্ত’ হলেই বুঝি এ সমস্ত আশ্চর্য খোঁড়া যুক্তি বের হয়।
পাল্টা যুক্তি ৪ : আর কোন সম্বাব্য পালটা যুক্তি নেই, শেষ। এ ক’ টাই ছিল
১.১০ ডারুইনিজম জাতীয় তত্তগুলো খন্ডন করার প্রয়োজন নেই?
না, ওপরের ২ আর ৩ এ খন্ডন হয়ে গেছে। ডারুইনিজম যে একটি অপ্রঠিস্তিত অপ্রমানিত এবং বিজ্ঞানিমহলে বিতর্কিত বৈজ্ঞানিক তত্ত, আমারা সেদিকে যাব না, কেননা ঘোড়া আর মন্ত্রী দিয়ে “চেকমেট” করার পর কিস্তি দিয়েও রাজাকে ‘খাওয়া’ যায় কিনা সেটা দেখার প্রয়োজন নেই।
বিবর্তনবাদের ‘পরস্পরবিরোধী’ যে কয়েকটি ভারিয়েন্ট আছে, তার যে কোন একটি ঠিক ধরে নিয়ে যদি বলা হয় যে জীবজগতের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করা গেল, তবে তাতে স্রস্টার অস্তিত্তের ধারনা আরও দৃঢ় হয়। কোন কিছু কে ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ করতে পারা এর গঠনশৈলীর প্রমান। গীতাঞ্জলী বিশ্লেষণ করে দেখা গেল সেখানে সব ক, খ ,গ ,ঘ , ঙ , চ , ছ , জ … সুতরাং রবীন্দ্রনাথ নেই – এ কথা বলবে কি ?
তেমনি যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেয়া হয় যে জীবজগতের উৎপত্তি বা ক্রমবিকাশের কোন পর্যায় ‘রান্ডম’ কিছু প্রক্রিয়া দায়ী, তবে তাতেও স্রস্টার অস্তিত্তের ধারণা দৃঢ়তর হয়। রান্ডম=> ডিজাইন প্রমানিত হলে, আরও বেশী করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে স্রস্টা আছে! অবশ্য প্রকৃতিতে ‘র‍্যন্ডম’ কিছুর প্রমান আদৌ মিলছে কিনা সেটাও প্রশ্ন।
১.১১ সিদ্ধান্ত ও উপলব্ধি
মূল যুক্তিতর্ক এখানেই শেষ। এবার সিদ্ধান্তের পালা।
সিদ্ধান্ত ১ : পৃথিবীতে একজনও প্রকৃত নাস্তিক নেই। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি। নাস্তিক মূলত স্রস্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে, কিন্তু সে সেটা স্বীকার করতে চায় না – এটাই বাস্তবতা। ওপরের আরগুমেন্ট বুঝতে খুব বেশী বিদ্যার প্রয়োজন হয় না, আর বিদ্যা বেশী হলেও এই আরগুমেন্ট ভুল প্রমান করা যায় না। মূলত সকল মানুষ এভাবেই চিন্তা করে থাকে, এখানে সেটা লেখনীতে প্রকাশ মাত্র। এজন্য জেনে রাখা ভাল যে পৃথিবী তে কোন প্রকৃত নাস্তিক নেই। এছারা আমরা আগেই দেখেছি যে নাস্তিক মূলত বহূ–ঈশ্বরবাদি ।
সিধান্ত ২ : বিজ্ঞান দিয়ে স্রস্টাকে ‘অপ্রমাণ’ করা বিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুযায়ীই অসম্ভব ব্যাপার। কেননা বিজ্ঞান বলে দেয় ‘কিভাবে’ হয়। কিন্তু ‘কেন’ হয়? এর উত্তর দেয়া বিজ্ঞানের কাজ নয়। বরং এটা মানুষের যুক্তি চিন্তা ও দর্শনের সবচেয়ে মৌলিক কথা যে ‘এমনি এমনি’ হয়না। সুতরাং পৃথিবীর ইতিহাসে ‘সকল’ বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব , যদি তা সত্যিই বৈজ্ঞানিক হয়, তবে তা কোন ব্যাতিক্রম ছারাই স্রস্টা থাকার আর্গুমেন্ট কে শক্তিশালী করবে। তবে কোন কোন বিজ্ঞানীর ‘সাহিত্য চেতনা’ যখন ডানা মেলে দর্শনের আকাশে উড়তে চায় তখন নাস্তিকতার জন্ম হতে পারে, সুতরাং ইকুয়েশন হল :
বিজ্ঞানীর নাস্তিকতা = বিজ্ঞানি-বিজ্ঞান+সাহিত্য*দর্শন
১.১২ মানুষ নাস্তিক কেন হয়?
তাহলে মানুষ নাস্তিক কেন হয়?
কয়েকটি কারণে:
১) স্রস্তাকে মানতে ইচ্ছে না করা।
২) স্রস্টার প্রতি কোন ধরনের রাগ থাকা।
৩) ধর্মের বিধিবিধান কে কষ্টকর মনে হওয়া।
৪) ফ্যাশন।
৫) কোন বিজ্ঞানীর অন্ধ অনুকরণ।
৬) সংসয়ের অজুহাতে।
এগুলো কোনটিই নাস্তিকতার পক্ষে কোন যুক্তি নয় যে খন্ডন করা হবে। তবে এ সম্পর্কে কিছু মন্তব্য:
১) স্রস্তাকে মানতেভইচ্ছে না করা এক প্রকার অহংকার, আর দুর্বল সৃষ্টির জন্য এই অহংকার মানায় না তাছারা স্রস্টার নির্দেশ অনুযায়ী চলা মানুষের নিজের জন্যই উপকারী, স্রস্টাকে না মানলে নিজেরই ক্ষতি।
২) স্রস্টা সৃষ্টি করেছেন পরীক্ষা করার জন্য, জীবন পরীক্ষা, আর তাই সেখানে ‘মন্দ’ থাকতেই হবে, নতুবা পরীক্ষা হবে কিভাবে? তবে সকলকে তার অবস্থা অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। পরিক্ষার সম্মুখীন হলে রাগ না করে জানা ভাল যে ধৈর্য ধারন করে স্রস্টার নির্দেশে অটল থাকলে পরিনতি কল্যাণকর।
৩) ধর্মের বিধিবিধান কষ্টকর বা অযৌক্তিক মনে হওয়া : কেউ কোন বানোয়াট মিথ্যা ধর্মের অনুসারী হলে এমনটি হতে পারে, অথবা সত্য ধর্ম সম্পরকেও ভুল কথা জানার ফলে এমন হতে পারে। এর সমাধান হল ধর্মের মূল উৎসে ফিরে যাওয়া। ধর্মের নামে চালু “নেয়ামুল কুরআন” জাতীয় আজগুবি বই পড়ার দরকার নেই।
৪) ফ্যাশন : ফ্যাশন হল দাসত্ব। ফ্যাশন করা হল কাকের ময়ূর হওয়ার চেষ্টা। প্রত্তেক ব্যাক্তির এতটুকু আত্মসম্মানবোধ থাকা উচিত যে আমি অযৌক্তিক ভাবে কাউকে অনুকরণ করব না।
৫) কোন বিজ্ঞানীর অন্ধ অনুকরণ : অনেকে দাবী করে অধিকাংশ বিজ্ঞানীই নাস্তিক হয়। এক্ষেত্রে অবশ্য প্রকৃত পরিসংখান যাচাই করা দরকার যে কতজন বিজ্ঞানী ‘নাস্তিক’। যাহোক বিজ্ঞানীদের নাস্তিক হওয়ার ফর্মুলা একটু আগেই আমরা দেখেছি। আসলে বিজ্ঞানীরাই নাস্তিক হয় বিষয়টি এরকম নয়, বরং তা পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে সম্পৃক্ত। যেমন : ইসলাম ধর্মের সাথে সঠিক পরিচিতি নিয়ে বেড়ে উঠলে একজন বিজ্ঞানী সচরাচর নাস্তিক হয় না। বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোতে বিজ্ঞানীদের মাঝে নাস্তিকতা খুব কমই পাওয়া যাবে, আর যেখানে তা পাওয়া যায়, সেখানে তা এই কারণে যে সে দেশে প্রকৃত ইসলাম চর্চা হয় না।
খৃষ্টান দেশে খৃষ্টান পটভূমিতে বিজ্ঞানীরা নাস্তিক হবেই, কেননা তাদের ধর্ম মিথ্যা, বানোয়াট, সুতরাং সেখানে যারা বড় হয়েছে, তারা সহজাতভাবেই ধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধা নিয়ে বড় হবে। আবার মুসলিম দেশেও এটা হতে পারে যদি সেখানে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা চালু না থেকে “নেয়ামুল কুরআন” জাতীয় বইপত্র ইসলামের নামে চালু থাকে।
মোটকথা বিজ্ঞানীরা যখন নাস্তিক হয়, তখন সেটা বিজ্ঞানের কারণে হয় না, তাদের ব্যাক্তিগত দর্শন কিংবা সামাজিক পটভূমির কারণে হয়, যার সাথে বিজ্ঞানের কোন সম্পর্ক নেই।
৬) সংশয়ের অজুহাত : কোন কিছু মানতে না চাইলে এটি একটি সহজ অজুহাত। সংশয়বাদীরা প্রকৃতপক্ষে দ্বিমুখী নীতিতে বিশ্বাসী। স্রস্টা ও ধর্ম সংক্রান্ত সবকিছুতেই একজন সংশয়বাদীর সন্দেহ হয়, কিন্তু পারথিব স্বার্থে সে বিশ্বাসী হয়ে থাকে, যেমন : কালকে সূর্যটা উঠবে, এ বিষয় সে মটেই কোন সন্দেহ পোষণ করে না। মাধ্যাকর্ষণ জাতীয় প্রাকৃতিক নিয়মগুলো অপরিবর্তিত থাকবে, এ ব্যাপারে ‘প্রকৃতির ওপর’ তার অগাধ আস্থা, নতুবা সে দুনিয়ার সুখ ভগ করবে কিভাবে? কিন্তু ধর্মের প্রসঙ্গ আসলেই সে সংসয়ের দাবী করে থাকে।
১.১৩ সহজ চ্যালেঞ্জ
বিশ্বের সকল নাস্তিক এবং বড় বড় বিজ্ঞানিদের জন্য একটি সহজ চ্যালেঞ্জ আছে! মহাবিশ্ব যদি ‘এমনি এমনি’ই হয়ে থাকে আর অচেতন প্রকৃতি যদি নিজেই এত সব ‘করে’ থাকে তবে নাস্তিক অ তাদের বিজ্ঞানিদেরকে আমরা একটি ছোট্ট জিনিস করে দেখাতে বলতে পারি : আপনাদের সর্বাধুনিক জ্ঞ্যান, বিদ্যাবুদ্ধি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি নিয়ে অস্তিত্বহীনতা থেকে একটি মাছিকে অস্তিত্বে এনে দিন তো!
সহজ চ্যালেঞ্জ! বোবা প্রকৃতি যদি মহাবিশ্বে এত কিছু করতে পারে, তবে এত জ্ঞ্যানীগুনী সবাকেরা সবাইকে অবাক করে দিয়ে ‘নাই’ থেকে একটি মাছি বানাতে পারবে না? একটা মরা মাছি বানালেও চলত! আর যদি সেটা সম্ভব না হয়, তবে তাদের সেই জাহান্নামকে ভয় করা উচিৎ যার জ্বালানী হবে মানুষ!
১.১৪ শেষকথা
আল্লাহ আছেন, এতটুকু মানার সৎ সাহস যাদের আছে, তাদেরকে সততার সাথে খুঁজতে হবে সত্য ধর্ম কোনটি।
লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ নাসিল শাহরুখ
উৎসঃ ফেসবুক

মতামত দিন