সুন্নাহ

ইসলামী শরীয়তে সুন্নাহর গুরুত্ব ও তাৎপর্য

ইসলাম কোন মানব রচিত জীবন ব্যবস্থা নয় বরং এটি একটি ওহী ভিত্তিক আল্লাহ প্রদত্ত ও মনোনীত জীবন ব্যবস্থা। ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি হল কুরআন ও সুন্নাহ। পবিত্র কুরআন যেমন ওহী প্রদত্ত, সুন্নাহও তেমনি ওহী প্রদত্ত। শরীয়তের এ দুটি মূলনীতি একটির সাথে অপরটি আঙ্গাঙ্গিন ভাবে জড়িত। এ দুটির কোন একটিকে বাদ দিয়ে শরীয়তের কথা চিন্তা করার কোন অবকাশ নাই। কুরআন হল, আল্লাহর পক্ষ হতে অবতীর্ণ ওহী, আর হাদিস তারই ব্যাখ্যা। কুরআনের কোন বিধানের উপর আমল করতে হলে হাদিস অবশ্যই জরুরি। হাদিস ছাড়া কুরআন অনুযায়ী আমল করা কোন ক্রমেই সম্ভব নয়।

এক- আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু হতে হাদিস বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,  دعوني ما تركتكم إنما أهلك[1] من كان قبلكم لكثرة سؤالهم واختلافهم على أنبيائهم فإذا نهيتكم عن شيء فاجتنبوه وإذا أمرتكم بأمر فأتوا منه ما استطعتم متفق عليه  “আমি তোমাদের যে অবস্থায় রেখে যাই তার উপর তোমরা অটুট থাক। তোমাদের পূর্বের উম্মতরা অধিক প্রশ্ন করা এবং নবীদের সাথে বিরোধ করার কারণেই ধ্বংস হয়েছে। আমি যখন তোমাদের কোন বিষয়ে নিষেধ করি, তোমরা তা হতে বিরত থাক। আর যখন তোমাদের কোন বিষয়ে নির্দেশ দেই তা যথা সম্ভব পালন করতে চেষ্টা কর”।[1]

দুই-এরবায ইবনে সারিয়া রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

عليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين عضوا عليها بالنواجذ رواه أبو داود والترمذي وقال حديث حسن صحيح

  “তোমরা আমার সূন্নাতকে আঁকড়ে ধর এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের সূন্নাতকে আঁকড়ে ধর। তার উপর তোমরা অটুট থাক। আবু দাউদ, তিরমিযি ইমাম তিরমিযি হাদিসটিকে হাসান বলে আখ্যায়িত করেন”।[2]

তিন- আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

كل أمتي يدخلون الجنة إلا من أبى ، قيل: ومن يأبى يا رسول الله؟ قال: من أطاعني دخل الجنة ومن عصاني فقد أبى رواه البخاري

“যে ব্যক্তি অস্বীকার করে, সেই ব্যক্তি ব্যতীত আমার সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে; সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! কোন ব্যক্তি অস্বীকার করে? তখন তিনি বললেন: যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে; আর যে ব্যক্তি আমার অবাধ্য, সে ব্যক্তিই অস্বীকার করে।”[3] সুতরাং যে ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবাধ্য হয় এবং তাঁর সুন্নাহ’র বিরুদ্ধাচরণ করে, সে ব্যক্তিই জান্নাতে প্রবেশ করতে অস্বীকার করে; আর আবদ্ধ হয় জাহান্নামের প্রচণ্ড হুমকির জালে।

চার- আবু রাফে রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

لا ألفين أحدكم متكئا على أريكة يأتيه الأمر من أمري مما أمرت به أو نهيت عنه فيقول لا أدري: ما وجدناه في كتاب الله اتبعناه حديث صحيح رواه الشافعي ،

“তোমাদের কাউকে কাউকে দেখা যাবে, সে হেলান দিয়ে বসে আছে, কিন্তু তার নিকট যখন আমার কোন আদেশ- যে বিষয়ে আমি আদেশ দিয়েছি বা কোন নিষেধ- যে বিষয়ে আমি নিষেধ করেছি তা পৌঁছবে তখন সে বলবে, এ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। আমরা আল্লাহর কিতাবে যা পেয়েছি তাই মানবো”।

ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশের অনুসরণ করা মানুষের উপর ফরয প্রমাণ করে রাসূলের সূন্নাত আল্লাহর পক্ষ থেকেই গৃহীত। যে ব্যক্তি রাসূলের সূন্নাতের অনুসরণ করল, সে আল্লাহর কিতাবেরই অনুসরণ করল। কারণ, আমরা এমন কোন প্রমাণ পাই নাই যাতে আল্লাহ তা’আলা তার বান্দাদের শুধু আল্লাহর কিতাবের অনুসরণের জন্য বাধ্য করেছেন। বরং সব জায়গায় আল্লাহ তা’আলা প্রথমে তার কিতাব তারপর তার নবীর সূন্নাতের অনুসরণের কথা বলেছেন।

পবিত্র কুরআনে সুন্নাতের গুরুত্ব:

১- আল্লাহ তা’আলা বলেন:

﴿ وَمَا يَنطِقُ عَنِ ٱلۡهَوَىٰٓ ٣ إِنۡ هُوَ إِلَّا وَحۡيٞ يُوحَىٰ ٤ ﴾ [النجم : ٣،  ٤] 

“আর তিনি [নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না বরং শুধুমাত্র তাকে যা ওহী করা হয় তাই বলেন”।[4]     

সুতরাং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দ্বীনী কথা, কাজ ও সম্মতি সব কিছুই ওহী ভিত্তিক। এ জন্যই আল্লাহর নির্দেশকে যেমন কোন ঈমানদার নর-নারীর উপেক্ষা করে চলার সুযোগ নেই। তেমনিভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশেরও কোন অবস্থাতেই উপেক্ষা করার কোন সুযোগ নাই।

আল্লাহ তা’আলা বলেন:

﴿ وَمَا كَانَ لِمُؤۡمِنٖ وَلَا مُؤۡمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥٓ أَمۡرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُ مِنۡ أَمۡرِهِمۡۗ وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلٗا مُّبِينٗا ٣٦ ﴾ [الاحزاب : ٣٦] 

“আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন কাজের নির্দেশ দিলে কোন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীর সে বিষয়ে কোন এখতিয়ার থাকে না, আর যে আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হয় সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টটায় পতিত হয়”।[5]

এ আয়াত ইসলামী শরীয়তে সুন্নাহর গুরুত্ব ও তাৎপর্যকে স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, আল্লাহ বা কুরআনের নির্দেশের অবস্থান এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা সুন্নাহর নির্দেশের অবস্থান পাশাপাশি। অনুরূপভাবে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করলে যেমন পথভ্রষ্ট হয়ে যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ অমান্যের পরিণতিও একই; কোন অংশে তা কম নয়। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সিদ্ধান্ত ও সমাধানকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাথা পেতে মেনে নেয়া ছাড়া ঈমানদার হওয়া কখনই সম্ভব নয়।

আল্লাহ তা’আলা বলেন:

﴿ فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا ٦٥ ﴾ [النساء : ٦٥] 

“অতঃপর তোমার রবের কসম তারা কখনও ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ফায়সালা কারী হিসাবে মেনে নেয়, অতঃপর তোমার ফায়সালার ব্যাপারে তারা তাদের অন্তরে কোন রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নিবে”।[6]

সুন্নাতের অনুসরণ ছাড়া যেমন ঈমানদার হওয়া সম্ভব নয়, ঈমানদার হওয়ার পর তেমনি আবার সুন্নাতের অনুসরণ ছাড়া পূর্ণ ইসলাম মানাও সম্ভব নয়। প্রসিদ্ধ তাবেয়ী হাসান বাসরী [রাহিমাহুল্লাহ] হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একদা সাহাবী ঈমারান বিন হুসাইন রাদিআল্লাহু আনহু কিছু ব্যক্তিসহ শিক্ষার আসরে বসেছিলেন। তাদের মধ্য হতে একজন বলে ফেললেন, আপনি আমাদেরকে কুরআন ছাড়া অন্য কিছু শোনাবেন না। তিনি [সাহাবী] বললেন: নিকটে আস, অতঃপর বললেন, তুমি কি মনে কর, যদি তোমাদেরকে শুধু কুরআনের উপরই ছেড়ে দেয়া হয়? তুমি কি যোহরের সালাত চার রাকাত, আসর চার রাকাত, মাগরিব তিন রাকাত, প্রথম দুই রাকাতে কিরাত পাঠ করতে হয় ইত্যাদি সব কুরআনে খুঁজে পাবে? অনুরূপভাবে কাবার তাওয়াফ সাত চক্কর এবং সাফা-মারওয়ার তাওয়াফ ইত্যাদি কি কুরআনে খুঁজে পাবে? অতঃপর বললেন: হে মানব সকল! তোমরা আমাদের [সাহাবীদের] নিকট হতে সুন্নাহর আলোকে ঐ সব বিস্তারিত বিধি-বিধান জেনে নাও। আল্লাহর কসম করে বলছি, তোমরা যদি সুন্নাহ্ মেনে না চল, তাহলে অবশ্যই পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে।

শুধু কুরআনুল করীমকে আঁকড়িয়ে ধরে পূর্ণ ইসলাম মানা কখনও সম্ভব নয় বরং এ নীতি মানুষকে পথভ্রষ্ট করে ইসলাম হতে বের করে দিবে এবং পরকালে জান্নাত পাওয়াও অসম্ভব হয়ে যাবে। সুতরাং পরকালে জান্নাত পেতে হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিয়ে আসা আল্লাহর বাণী আল-কুরআনুল করীম এবং তাঁর হাদিস বা সুন্নাহ্ উভয়েরই একনিষ্ঠ অনুসারী হতে হবে। হাদিসে এসেছে:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ قَالَ كُلُّ أُمَّتِي يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ إِلاَّ مَنْ أَبَى قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ وَمَنْ يَأْبَى قَالَ مَنْ أَطَاعَنِي دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ أَبَى

সাহাবী আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: আমার সকল উম্মতই জান্নাতে প্রবেশ করবে তবে যারা অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছে তারা ব্যতীত। জিজ্ঞাসা করা হল, কারা অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছে? তিনি বললেন: যে আমার অনুসরণ করে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে আমাকে অমান্য করে সেই অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছে।[7]

এ হাদিস স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ্ অনুসরণের কোন বিকল্প পথ নেই।

অতএব ইসলামী শরীয়তে সুন্নাহর গুরুত্ব ও তাৎপর্য কতটুকু তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। ইহা ছাড়াও সুন্নাহর গুরুত্ব সম্পর্কে আরও কতগুলি বিষয় তৃতীয় পরিচ্ছেদে তুলে ধরা হল।

 তথ্যসূত্রঃ 

[1] বুখারী, হাদিস:৭২৮৮, মুসলিম: 1337

[2] তিরমিযি, হাদিস: ২৬৭৬, ইবনু মাযা: ৪৭

[3] বুখারী, আস-সহীহ: ৬ / ২৬৫৫ / হাদিস নং- ৭২৮০

[4] [সূরা আন্-নাজম: ৩-৪]

[5] সূরা আহযাব, আয়াত: ৩৬

[6] সূরা নিসা: ৬৫

[7] বুখারি, হাদিস: ৭২৮০

বইঃ সুন্নাহের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা 

লেখকঃ জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের

মতামত দিন