ইবাদাত কবূলের পূর্ব শর্ত

সুন্দর এই বিস্তীর্ণ যমীন মহান আল্লাহ তা’আলার অসংখ্য সৃষ্টির একটি। এই যমীনে সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য মানুষ, জীব-জন্তু, গাছ-পালা, নদ-নদীসহ আমাদের জানা-অজানা আরো কত কি। এসব কিছু সৃষ্টির পিছনে রয়েছে আল্লাহ তা’আলার একটি চিরস্থায়ী পরিকল্পনা। আর তা হ’ল মানুষ ও জিন জাতি দুনিয়ার সমস্ত নিয়ামাত উপভোগ করবে এবং শুধু আল্লাহ তা’আলার ইবাদত করবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই ইবাদতের বিনিময়ে তাদেরকে জান্নাত দান করবেন। আর তাঁর ইবাদত না করলে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। এটা হ’ল মহান আল্লাহর উদ্দেশ্য। আল্লাহ মানুষ ও জিন সৃষ্টির উদ্দেশ্য প্রসংঙ্গে বলেন,

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

‘আমার ইবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতিকে সৃষ্টি করেছি’ (আয-যারিয়াত :৫৬)।

এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা’আলার মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য হ’ল, তাঁর ইবাদত করা।

এছাড়া তিনি অসংখ্য আয়াতের মাধ্যমে আমাদেরকে ইবাদতের নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেন,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

‘হে মানব জাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ইবাদত কর। যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তাতে আশা করা যায় তোমরা পরহেযগারী (তাকওয়া) অর্জন করতে পারবে’ (বাক্বারাহ  :২১)।

অন্যত্র আল্লাহ বলেন,

وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا

‘উপাসনা কর আল্লাহর, শরীক করোনা তাঁর সাথে অপর কাউকে’ (নিসা :৩৬)।

মানুষ যখনই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের এই নির্দেশ থেকে দূরে সরে গিয়েছে, তখন আল্লাহ তা’আলা মানুষকে সঠিক পথে আনার জন্য তথা ইবাদতে মনোনিবেশ করার জন্য যুগে যুগে  নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন। যেমন- আল্লাহর বানী

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ ۖ فَمِنْهُم مَّنْ هَدَى اللَّهُ وَمِنْهُم مَّنْ حَقَّتْ عَلَيْهِ الضَّلَالَةُ ۚ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ

‘আমি প্রত্যেক উম্মতের নিকটেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং ত্বাগূতকে পরিহার কর। অতঃপর তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যককে আল্লাহ হেদায়াত করেছেন এবং কিছু সংখ্যকের জন্য বিপথগামীতা অবধারিত হয়ে গেছে। সুতরাং তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর এবং দেখ মিথ্যারোপকারীদের কিরূপ পরিণতি হয়েছে’ (নাহল :৩৬)।

উপরোক্ত আয়াতগুলি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইবাদত করা আমাদের একান্ত কর্তব্য।

এক্ষণে ইবাদত কাকে বলে, সে বিষয়ে আলোক পাত করা যাক। কারণ অনেকেই মনে করেন মসজিদ হ’ল কেবল ইবাদতের স্থান। যখন মসজিদে যাব তখনি আল্লাহর ইবাদত হিসাবে সালাত আদায় করব। আর যখন মাসজিদ থেকে বের হব, তখন আর আল্লাহর ইবাদত করতে হবে না। তখন সূদ, ঘুষ সবই জায়েয। রাজনীতির নামে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র করা যাবে। আমাদের এই ধরনের বিশ্বাস কেবলমাত্র ইবাদতের সংঙ্গা না জানার কারণেই।

ইবাদতের সংজ্ঞাঃ

ইবাদতের সংজ্ঞায় শায়খুল ইসলাম ইমাম আহমাদ ইবনে তায়মিয়া (রহঃ) বলেন,

‘ইবাদত হ’ল আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত এমন কিছু গোপন ও প্রকাশ্য কথা ও কাজের সমষ্টি, যা তিনি পসন্দ করেন’।১

ইবনে কাছীর (রহঃ) বলেন,

‘ইবাদত হ’ল ভাল কাজের অনুসরণ ও মন্দ কাজ বর্জন।২

উপরোক্ত সংজ্ঞা গুলি থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইবাদত হ’ল একটি ব্যাপক কথা, যা মুমিনের সকল কথা ও কাজকে ঘিরে রেখেছে। রান্নাঘর থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল পর্যন্ত সকলক্ষেত্রে একমাত্র ওয়াহী-র অনুসরণ করা ও অন্যগুলি বর্জন করার নাম হ’ল ইবাদত।

ইবাদত কবূলের শর্তঃ

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে ইবাদতের নির্দেশ দিয়েছেন এবং আমরা যে ইবাদত করি এটি আল্লাহর নিকট কবূল হওয়ার জন্য কতগুলি শর্ত রয়েছে। যে শর্তগুলি একত্রিত নাহ’লে ইবাদত কবূল হবে না। ইবাদত কবূলের শর্ত প্রধানত ২টি। যথাঃ-

১. সকল ইবাদাত একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে হ’তে হবে, অন্য কোন কিছুকে শরীক করা যাবেনা বা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য ব্যতীত অন্য কোন পার্থিব লাভ-ক্ষতি বা সুনামের উদ্দেশ্য যেন না হয় এবং এর প্রতিদান যেন একমাত্র আল্লাহর নিকট কামনা করা হয়। কোন সৃষ্টির নিকটে নয়। পার্থিব কোন সম্মান, মর্যাদা বা স্বার্থ ও সুনাম লাভের উদ্দেশ্যে নয়; বরং নিঃস্বার্থভাবে একমাত্র আল্লাহর নির্দেশ পালন ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করতে হবে।

‘ইখলাস’ সম্বন্ধে আল্লাহ তা’আলা বলেন,

فَمَن كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا

‘যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে ও তাঁর প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে’ ( কাহফ ১১০)।

এই আয়াতে আল্লাহর ইবাদাতকারীকে শিরক মুক্ত হয়ে খালেসভাবে নেক আমলের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। অন্য আয়াতে নবীকে ও উম্মতদের লক্ষ্য করে আল্লাহ বলেন,

اللَّهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَابًا مُّتَشَابِهًا مَّثَانِيَ تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَىٰ ذِكْرِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ هُدَى اللَّهِ يَهْدِي بِهِ مَن يَشَاءُ

‘আমি আপনার প্রতি এ কিতাব যথার্থরূপে নাযিল করেছি। অতএব আপনি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদত করুন। জেনে রাখুন নিষ্ঠাপূর্ণ ইবাদত আল্লাহর নিমিত্ত’ (যুমার ২৩)।

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,

وَلَا تَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ ۘ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۚ كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ ۚ لَهُ الْحُكْمُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ

‘তুমি আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহকে ডেকোনা, তিনি ছাড়া অন্য কোন মা’বূদ নেই। আল্লাহর সত্তা ব্যতীত সব কিছুধ্বংসশীল। বিধান তাঁরই এবং তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে’ (ক্বাছাছ ৮৮)।

ইবাদত তথা নেক আমল যত বড় বা ছোট হউক না কেন যদি তাতে ইখলাস না থাকে, তাহ’লে সে নেক আমল পরকালে কোন কাজেতো আসবেই না; বরং তা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। নিম্নের হাদীছ তার সুস্পষ্ট প্রমাণঃ

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে ব্যক্তিকে বিচারের জন্য আনা হবে, সে হবে একজন (ধর্মযুদ্ধে শাহাদতবরণকারী) শহীদ। তাকে আল্লাহর এজলাসে উপস্থিত করা হবে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা তাকে  (দুনিয়াতে প্রদত্ত) নিয়ামাত সমূহের কথা প্রথমে স্মরণ করিয়েদিবেন।  সেও তা স্মরণ করবে। এরপর আল্লাহ তা’আলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, এসব নে’মতের বিনিময়ে দুনিয়াতে তুমি কি আমল করেছ? উত্তরে সে বলবে, আমি তোমার সন্তুষ্টির জন্য (কাফেরদের সাথে) লড়াই করেছি। এমনকি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি এই উদ্দেশ্যে লড়াই করেছ, যেন তোমাকে বীর-বাহাদুর বলা হয়। আর (তোমার অভিপ্রায় অনুসারে) তোমাকে দুনিয়ায় তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তার ব্যাপারে আদেশ দেওয়া হবে। তখন তাকে উপুড় করে টানা-হেঁচড়া করতে করতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর সেই ব্যক্তিকে বিচারের জন্য উপস্থিত করা হবে, যে নিজে দ্বীনি ইলম শিক্ষা করেছে এবং অপরকেও শিক্ষা দিয়েছে। পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন করেছে (এবং অপরকেও শিক্ষা দিয়েছে) তাকে আল্লাহ পাকের দরবারে হাযির করা হবে। প্রথমে তাকে নিয়ামাত সমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন এবং সেও উহা স্মরণ করবে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা জিজ্ঞেস করবেন, এই সমস্ত নে’মতের শুকরিয়া জ্ঞাপনের জন্য তুমি কি আমল করেছ? উত্তরে সে বলবে, আমি স্বয়ং নিজে ইলম শিক্ষা করেছি এবং অপরকেও শিক্ষা দিয়েছি। তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। আমার সন্তুষ্টির জন্য নয়, বরং তুমি এজন্য ইলম শিক্ষা করেছ, যেন তোমাকে ক্বারী বলা হয়। আর (তোমার অভিপ্রায় অনুযায়ী) তোমাকে বিদ্বান ও ক্বারী বলাও হয়েছে। অতঃপর (ফেরেশতাদেরকে) তার সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হ’লে তাকে উপুড় করে টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর এমন এক ব্যক্তিকে বিচারের জন্য আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হবে, যাকে আল্লাহ তা’আলা বিপুল ধন-সম্পদ দান করে বিত্তবান করেছিলেন। তাকে আল্লাহ তা’আলা প্রথমে প্রদত্ত নিয়ামাত সমূহের কথা অকপটে স্বীকার করবে। অতঃপর তাকে জিজ্ঞেস করবেন, এই সমস্ত নে’মতের শুকরিয়ায় তুমি কি আমল করেছ? উত্তরে সেবলবে, যে সমস্ত ক্ষেত্রে ধন-সম্পদ ব্যয় করলে তুমি সন্তুষ্ট হবে এমন একটি পথও আমি হাতছাড়া করিনি। তোমার সন্তুষ্টির জন্য উহার সবক’টিতেই আমি ধন-সম্পদ ব্যয় করেছি। আল্লাহতা’আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। আমার সন্তুষ্টির জন্য নয়; বরং তুমি এই উদ্দেশ্যে তা করেছিলে, যাতে তোমাকে বলা হয় যে, সে একজন দানবীর। সুতরাং (তোমার অভিপ্রায় অনুসারে দুনিয়াতে) তোমাকে দানবীর বলা হয়েছে। অতঃপর (ফেরেশতাদেরকে) তার সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হবে এবং নির্দেশ মোতাবেক তাকে উপুড় করে টানতেটান তে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে’।৩

এমনি ভাবে সালাত ইসলামের দ্বিতীয় ভিত্তি। এই সালাত কে প্রতিষ্টা করার জন্য আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে প্রায় ৮২ বার নির্দেশ দিয়েছেন। আর ক্বিয়ামতের দিন ছালাতের হিসাব সর্বপ্রথম হবে। এই সালাতেও যদি ইখলাছ (একনিষ্ঠতা) না থাকে, লোক দেখানো উদ্দেশ্য থাকে তাহ’লে সালাত ঐ মুছল্লীকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন,

فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ. الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ. .الَّذِينَ هُمْ يُرَاءُونَ

‘অতঃপর দুর্ভোগ সেসব মুছল্লীর জন্য, যারা তাদের সালাত সম্বন্ধে উদাসীন। যারা তা লোক দেখানোর জন্য আদায় করে’ (মাঊন ৪-৬)।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা প্রতীয়মান হয় যে, নেক আমল ছোট হোক আর বড় হোক ইখলাছ না থাকলে, সেটা আল্লাহর দরবারে কবূল হবে না; বরং শিরকে রূপান্তরিত হবে। আর শিরক হ’ল ইখলাছের বিপরীত। নিম্নে শিরক সমন্ধে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব। কারণ মূল বিষয়টিকে ভালভাবে বুঝতে হ’লে, বিপরীত বিষয়টি জানা আবশ্যক।

শিরকের পরিচয়ঃ

‘শিরক’ হ’ল প্রতিপালন, আইন, বিধান ও ইবাদত-বন্দেগীর ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অন্য কোন জিনিসকে অংশীদার স্থাপন করা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উলূহিয়্যাহ বা দাসত্বের ব্যাপারে অংশীদার সাবাস্ত করা এভাবে যে, আল্লাহর সাথে অন্যকে আহবান করা অথবা বিভিন্ন প্রকার ইবাদতে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা, যেমন যবেহ করা, নযর বা মানত মানা, ভয় করা, আশা করা এবং ভালবাসা ইত্যাদি।৪

আর এই শিরক সবচেয়ে বড় পাপ। যে ব্যক্তি শিরকের সাথে নেক আমল করল, তার নেক আমল আল্লাহর কাছে কোন কাজে আসবে না। আর সে হবে জাহান্নামী। যেমন আল্লাহ বলেন,

وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ

‘আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে, যদি আল্লাহর শরীক স্থির করেন, তবে আপনার কর্ম নিস্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্থদের একজন হবেন’ (যুমার ৬৫)।

ذَٰلِكَ هُدَى اللَّهِ يَهْدِي بِهِ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ ۚ وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُم مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ

‘যদি তারা শিরক করত, তবে তাদের সৎ আমল সমূহ ধ্বংস হয়ে যেত’ (আন’আম ৮৮)।

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,

إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ ۖ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ

‌’নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হবে জাহান্নাম। সীমালংঘনকারী দের কোন সাহায্যকারী নেই’ (মায়েদাহ ৭২)।

জাহেলী যুগেও আরবরা আল্লাহর ইবাদত করত। তারা আল্লাহকে বিশ্বাস করত, মুখে স্বীকার করত, হাজ্জ করত, কা’বা ঘরের খেদমত করত। যেমন আল্লাহ বলেন,

وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ ۚ قُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ ۚ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ

‘তুমি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, নভোমণ্ডলী ও ভূমণ্ডল কে সৃষ্টি করেছেন? তারা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ। বল, প্রশংসা আল্লাহরই, কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানেনা’ (লুকমান ২৫)।

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,

قُلْ مَن يَرْزُقُكُم مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَمَّن يَمْلِكُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَمَن يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ الْأَمْرَ ۚ فَسَيَقُولُونَ اللَّهُ ۚ فَقُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ

‘তুমি জিজ্ঞেস কর, কে রুযী দান করে তোমাদেরকে আসমান থেকে ও যমীন থেকে, কিংবা কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক? তাছাড়া কে জীবিত কে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন এবং কেই বা মৃত্যুকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন? কে করেন কর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থাপনা? তখন তারা বলে উঠবে আল্লাহ। তখন তুমি বল তারপরেও তোমরা ভয় করছনা’! (ইউনুস ৩১)।

এ বিষয়ে আরো অনেক আয়াত রয়েছে, সেগুলি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ইসলাম পূর্ব আরবের লোকেরা আল্লাহর কিছু কিছু ইবাদত করত। তারা ইবাদত করত ঠিক, কিন্তু ইবাদতের মধ্যে ইখলাছ ছিলনা বরং শিরক ছিল। যেমন তারা হাজ্জ করত এবং হাজ্জের সময় বলতঃ

‘হে আল্লাহ আমরা আপনার দরবারে হাযির আছি। আপনার কোন ‌অংশীদার নাই শুধু এক অংশীদার রয়েছে। তবে তার মালিক ও আপনিই এবং সে যত গুলি মালিক একমাত্র আপনিই সে সকলের মালিক’।৫

সুতরাং ভেবে দেখা দরকার আমরা মুসলমান হয়ে যদি শিরক যুক্ত ইবাদত করে থাকি তাহ’লে ইসলাম পূর্ব যুগের লোকদের তথা আবু জাহল, আবু তালিব, আবু লাহাব ও আব্দুল্লাহ বিন উবাই- এর মাঝে এবং আমাদের মাঝে কোন পার্থক্য থাকল কি?

২. ইবাদত তথা নেক আমল কবূলের ২য় শর্ত হ’ল, শরী’আতে স্বীকৃত ইবাদত সমূহ পালন করতে হবে রাসূল (ছাঃ) -এর সুন্নাত ও তরীকা অনুযায়ী। কুরআন ও হাদীছে বর্ণিত পদ্ধতিতে যদি ইবাদত সমূহ পালন করা হয়, তা আল্লাহর নৈকট্য হাছিল ও সান্নিধ্য লাভের ওসীলা হবে, নচেৎ নয়। আর এ তরীকার মধ্যে কিছু হ্রাস করল ও বৃদ্ধি করণ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ কারণ মহান আল্লাহ ইসলামকে রাসূল (সাঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বেই পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। অতএব তাতে সংযোজন ও বিয়োজনের কোন সুযোগ বা প্রয়োজন নেই। আল্লাহ বলেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসাবে পসন্দ করলাম’ (মায়েদাহ  ৩)।

এই পরিপূর্ণ দ্বীনকে একটি পানিতে পরিপূর্ণ গ্লাসের সাথে তুলনা করা চলে। পরিপূর্ণ গ্লাসে যেমন অন্য কোন জিনিস রাখা যাবেনা, অনুরূপভাবে এই পরিপূর্ণ দ্বীনেও অন্য কিছু আনা যাবে না। পরিপূর্ণ গ্লাসে যদি অন্য কোন জিনিস রাখা হয়, তা যতই মূল্যবান জিনিস হোক না কেন, গ্লাস থেকে সেই পরিমাণ পানি পড়ে যাবে। অনুরূপভাবে এই পরিপূর্ণ দ্বীনে যদি কোন নতুন জিনিস ঢুকানো হয়, তা যতই মূল্যবান হোক না কেন, আসল দ্বীন থেকে অনুরূপ পরিমাণ দ্বীনী বিধান উঠে ‌যাবে। যেমনটি বলেছেন, তাবেঈ বিদ্বান হাসসান বিন আত্বিইয়াহ-

‘কোন সম্প্রদায় যখন তাদের দ্বীনের মধ্যে কোন বিদ’আত চালু করে, তখন অতটুকু পরিমাণ সুন্নাত সেখান থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়। অতঃপর ঐ সুন্নাত তাদের নিকট ক্বিয়ামত পর্যন্ত আর ফিরে আসেনা’।৬

আর এই কারণে কুরআন ও হাদীসের বহু জায়গায় রাসূল (সাঃ) -এর অনুসরণ করতে আদেশ করা হয়েছে এবং ধর্মের নামে নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন,

‘তোমাদের মধ্য যারা আল্লাহ ও আখিরাতের  প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূল (সাঃ)-এর মধ্যে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ’ (আহযাব ২১)।

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,

‘রাসূল তোমাদের যা আদেশ দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহক ভয়কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা’ (হাশর ৭)।

অন্যত্র আল্লাহ বলেন,

‘বলুন!  যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসতে চাও, তবে আমার অনুসরণ কর। তাহ’লে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন, তোমাদের পাপ মার্জনা করবেন। আর আল্লাহ হ’লেন ক্ষমাকারী ও দয়ালু। বলুন, আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর। বস্তুতঃযদি তারা বিমুখতা অবলম্বন করে, তাহ’লে আল্লাহ কাফিরদের কে ভালবাসেন না’ (আলে ইমরান আয়াত নং ৩১-৩২)।

উপরোক্ত আয়াত গুলি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহকে ভালবাসতে হ’লে, জান্নাত পেতে হ’লে রাসূল (সাঃ) যা নিয়ে এসেছেন তা আঁকড়ে ধরতে হবে। আর রাসূল (ছাঃ) যা করেন নি, যে কাজ থেকে নিষেধ করেছেন, তা থেকে দূরে থাকতে হবে। অনুরূপ ভাবে বহু হাদীছে রাসূল (সাঃ)-এর সুন্নাত ও তরীকা অনুসরণের নির্দেশ প্রদান করেছেন। যেমন রাসূল (সাঃ) বলেন, ‘আমার পর তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে, তারা অচিরেই অনেক মতভেদ দেখবে, তখন তোমরা আমার সুন্নাতকে এবং সৎ পথ প্রাপ্ত-খোলাফায়ে রাশীদীনের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরে থাকবে। সাবধান! তোমরা (দ্বীনের ব্যাপারে) নতুন উদ্ভাবিত বিষয় থেকে সতর্ক থাকবে। নতুন কিছু উদ্ভাবনই বিদ’আত এবং প্রত্যেক বিদ’আতই গোমরাহী, আর প্রত্যেক গোমরাহী জাহান্নামী’।৭

অন্য হাদীছে রাসূল (সাঃ) বলেন, ‘আমি তোমাদের মাঝে দু’টি জিনিস রেখে গেলাম। যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা সে দু’টি জিনিস আঁকড়ে ধরে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পথভ্রষ্ট হবেনা। এর একটি হ’ল কিতাবুল্লাহ (আল-কুরআন), অপরটি হচ্ছে, তাঁর রাসূলের সুন্নাত (আল-হাদীছ)’।৮

অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি এমন কাজ করল, যেখানে আমার নির্দেশ নেই সেটি প্রত্যাখ্যাত-পরিত্যাজ্য’।৯

উপরোক্ত হাদীছ গুলি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ইবাদত তথা নেক আমল কবূলের জন্য ইখলাসের পাশাপাশি রাসূল (ছাঃ)-এর অনুসরণ থাকতে হবে।  যদি কোন আমলে ইখলাছ থাকে, কিন্তু রাসূল (সাঃ)-এর অনুসরণ না থাকে, তাহ’লে সেটা নেক আমল না হয়ে বিদ’আতে পরিণত হবে।

বিদ’আতের সংজ্ঞাঃ

‘বিদ’আত’-এর আভিধানিক অর্থ হ’ল, নতুন সৃষ্টি যা ইতিপূর্বে ছিলনা। শরী’আতের পরিভাষায় বিদ’আত বলা হয়,

আল্লাহর নৈকট্য হাছিলের উদ্দেশ্যে ধর্মের নামে নতুন কোন প্রথা চালু করা, যা শরী’আতের কোন ছহীহ দলীলের উপরে ভিত্তিশীল নয়’।১০

আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী বলেন, ‘বিদ’আত হচ্ছে দ্বীন ইসলামের মধ্যে এমন কোন নতুন কর্ম বা রসম রেওয়াজ প্রবর্তন করা, যা রাসূল (সাঃ)-এর যামানায় ছিলনা’।১১

ইমাম নববী বলেন, ‘এমন সব কাজ করা বিদ’আত, যারা কোন পূর্বদৃষ্টান্ত নেই’।১২

কোন আমল যদি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর অনুসরণে না হয়ে বিদ’আত হয়, তাহ’লে সেটা আল্লাহর দরবারে কবূল হবেনা; বরং এটা হবে আমলকারীর জন্য জাহান্নামে যাওয়ার কারণ। যেমন-

জাবির (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনিবলেন, একদা রাসূল (সাঃ) কিছু আলোচনার পর বলেন, ‘সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম বানী হ’ল আল্লাহর কিতাব (আল-কুরআন), আর সর্বোত্তম পথ হ’ল, মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর পথ। আর নিকৃষ্টতম হ’ল, দ্বীনের মধ্যে নতুন সৃষ্টি। আর প্রত্যেক নতুন সৃষ্টিই ভ্রষ্টতা। আর প্রত্যেক ভ্রষ্টতাই জাহান্নামী’।১৩

অন্য হাদীছে রাসূল (সাঃ) বলেন, ‘আমি তোমাদের পূর্বেই হাউজে কাউছারে পৌঁছে যাব। যে ব্যক্তি আমার নিকট গমন করবে, সে পানি পান করবে। আর যে একবার পানি পান করবে, সে কখনোই আর তৃষ্ণার্ত হবে না। এই সময় আমার নিকটে উপস্থিত হবে বহুসংখ্যক লোক, যাদের আমি চিনব এবং তারাও আমাকে চিনবে। কিন্তু আমার ও তাদের মাঝে পর্দা করে দেওয়া হবে। তখন আমি বলব, এরা আমার লোক। তখন বলা হবে যে, আপনি জানেন না, আপনার মৃত্যুর পরে এরা কত বিদ’আত সৃষ্টিকরে ছিল। এ কথা শুনে আমি বলব, দূর হও, দূর হও। যারা আমার পর আমার দ্বীনকে বিকৃত করেছে।১৪

পরিশেষে বলা যায় যে, জান্নাতে যাওয়ার জন্য যেমন নেক আমলের প্রয়োজন। তেমনি নেকআমলও হ’তে হবে ইখলাছের সাথে ও রাসূল (সাঃ)-এর নিয়ম-নীতি সুন্নাত অনুযায়ী। এর বিপরীত যতই সুন্দর নেক আমল হউক না কেন, তার পরিণাম হবে জাহান্নাম। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে সঠিকভাবে নেক আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন!

তথ্যসূত্র :

১. ফাত্হুল মাজীদ শারহ কিতাবুদ তাওহীদ, (কুয়েত : জমঈয়াতু এহইয়াউত তুরছ আল-ইসলামী, ১৯৯৬), পৃ: ১৭।

২. ঐ, পৃ: ১৮

৩. মুসলিম, আলবানী, মিশকাত ‘কিতাবুল ইলম’, হা/২০৫।

৪. ড: সালেহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান, কিতাবুদ তাওহীদ বঙ্গানুবাদ: (ঢাকা : মসজিদ ও কল্যাণমুখী প্রকল্প বাস্তবায়ন বিভাব), ১ম প্রকাশ ২০০১), পৃ: ৬।

৫. তাফসীরে ইবনে কাছীর, অনুবাদক : ড: মুজীবুর রহমান (ঢাকা : তাফসীর পাবলিকেশন্স কমিটি, ১৯৯৭ ইং), ১৬তম খন্ড, পৃ: ২৯৮।

৬. দারেমী, মিশকাত হা/১৮৮, সনদ সহীহ।

৭. তিরমিযী ৪/১৪৯, ইবনু মাজাহ ১/১৬।

৮. হাকেম, মুয়াত্তা ২/৮৯৯।

৯. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৪০।

১০. মীলাদ প্রসঙ্গ, পৃ: ৩

১১. মাওলানা আবদুর রহীম, সুন্নাত ও বিদআত, পৃ: ৭। গৃহীত : মিরক্বাত ১ম খন্ড, পৃ:২১৬।

১২. সুন্নাত ও বিদআত, পৃ:৭

১৩. মুসলিম, মিশকাত হা/১৪১, “কিতাব ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা” অনুচ্ছেদ।

১৪. মুত্তাফাক্ব আলাইহি, মিশকাত হা/৫৫৭১ ‘হাউজ ও শাফায়াত’ অনুচ্ছেদ ।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
slot gacor skybet88 slot online skybet88 skybet88 skybet88 slot gacor skybet88 skybet88 slot bonus new member skybet88 slot shopeepay skybet88 skybet88 skybet88 slot shopeepay slot gacor skybet88 demo slot skybet88 skybet88 skybet88 skybet88 skybet88 skybet88 mgs88 mgs88