তাওহীদ

তাওহীদঃ নবী-রাসুলদের দাওয়াতের মুল বিষয়বস্তু

তাওহীদঃ নবী-রাসুলদের দাওয়াতের মুল বিষয়বস্তু

লেখক: Gazi Arman Abdur Rahman

বিভিন্ন উলেমা’দের লেখা বই থেকে সঙ্কলিত

মূল বইঃ কালেমা তাইয়েবা

 

আল্লাহতালা এরশাদ করেনঃ

 

“আপনার পূর্বে আমি যে রাসূলই প্রেরণ করেছি, তাকে এ আদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং আমারই এবাদত কর” [আল-আম্বিয়াঃ ২৫]

 

“আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর এবং তাগুত থেকে দূরে থাক” [আন-নাহলঃ ৩৬]

“নিশ্চয় আমি নূহকে তার সম্প্রদায়ের প্রতি পাঠিয়েছি। সে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই” [আল-আর’আফঃ ৫৯]

 

“আদ সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছি তাদের ভাই হুদকে। সে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর। তিনি ব্যতিত তোমাদের কোন উপাস্য নেই” [আল-আর’আফঃ ৬৫]

 

“সামুদ সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছি তাদের ভাই সালেহকে। সে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর। তিনি ব্যতিত তোমাদের কোন উপাস্য নেই” [আল-আর’আফঃ ৭৩]

 

“আমি মাদইয়ানের প্রতি তাদের ভাই শোয়ায়েবকে প্রেরণ করেছি। সে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর এবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই” [আল-আর’আফঃ ৮৫]

 

এ থেকেই বোঝা যায়, যে মানুষ সৃষ্ঠির উদ্দেশ্য যেমন তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা, তেমনি নবী-রাসুল প্রেরনের উদ্দেশ্য মানুষকে তাওহীদের দাওয়াত দেয়া। এবং উপরের আয়াতগুলোতে আমরা স্পষ্টত দেখতে পাই যে নবী-রাসুলদের দাওয়াতের মুল বিষয় ছিল “তাওহীদ”…মানে, মানুষকে দাওয়াত দিতে হবে তাওহীদকে সামনে রেখে, তাওহীদই হবে দাওয়াতের মুলকথা এবং ভিত্তি, তাওহীদের দাওয়াত থাকবো সর্বাগ্রে। এজন্যই, নবী মুহাম্মদ (সাঃ) যখন মুআজ (রাঃ) কে ইয়েমেন পাঠালেন, তখন তিনি তাকে বল্লেনঃ

 

“তুমি শীঘ্রই আহলে কিতাব জাতির নিকট উপনীত হতে যাচ্ছ, অতএব যখন তুমি তাদের নিকট যাবে তাদেরকে আহবান জানাও যে তারা যেন সাক্ষ্য দেয় যে আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কোন ইলাহ নেই, এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল। যদি তারা এর দ্বারা তোমার আনুগত্য করে তবে তাদেরকে জানাও যে আল্লাহ তাদের ওপর প্রতি দিন ও রাত্রিতে পাঁচটি সালাতকে ফরজ করেছেন, অতঃপর যদি তারা এর দ্বারা তোমার আনুগত্য করে তবে তাদেরকে জানাও যে আল্লাহ তাদের ওপর সাদাকা বাধ্যতামুলক করেছেন যা তাদের ধনীদের নিকট থেকে গ্রহন করে দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দেয়া হবে, অতঃপর তারা যদি এই ব্যাপারে তোমার আনুগত্য করে তবে তাদেরকে তাদের সম্পদের সর্বোত্তম অংশ গ্রহন করার ব্যাপারে সতর্ক কর আর মজলুমের দুআকে ভয় করতে বল, কেননা নিশ্চয় এর এবং আল্লাহর মাঝে কোন পর্দা নেই” [বুখারি, মুসলিম]

 

এই হাদিস দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে দাওয়াত সুরু করতে হবে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর সাক্ষ্য এবং নবী মুহাম্মদকে (সাঃ) রাসুল হিসেবে সাক্ষ্য দেয়ার আহবান জানানোর মাধ্যমে। এরপর পর্যায়ক্রমে আসবে সালাতের প্রতি আহবান এবং যাকাতের প্রতি আহবান। এই হাদিসে দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে সঠিক ধারাবাহিকতা বলে দেয়া হয়েছে। দাওয়াতের বিষয়বস্তুকে গুরুত্বের ক্রমানুসারে সাজাতে হবে, আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল তাওহীদ এবং রিসালাতের সাক্ষ্য। কেননা, তাওহীদ ছাড়া সালাত, যাকাত, সাওম, হাজ্জ কিংবা অন্য কোন আমলই আল্লাহর নিকট গ্রহনযোগ্য নয়। কোন ব্যাক্তি যদি শিরকে লিপ্ত থাকে, তবে তাকে নামাজে নিয়ে আসলেও কোন লাভ নেই। কেননা শিরকে লিপ্ত থাকা অবস্থায় তার সালাত আল্লাহর নিকট গ্রহনযোগ্য হবে না।

 

“নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তাঁর সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক অংশীদার সাব্যস্ত করল আল্লাহর সাথে, সে যেন অপবাদ আরোপ করল” [আন-নিসাঃ ৪৮]

 

এজন্যে সর্বাগ্রে মানুষকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর সাক্ষ্য এবং এর অর্থ সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। উদাহরনস্বরূপ কেউ যদি মানুষকে শুধু সালাতের দিকে বা অন্য যে কোন আমলের দিকে আহবান জানায়, কিন্তু তাদেরকে তাওহীদ সম্পর্কে শিক্ষ্যা না দেয়, তবে নিঃসন্দেহে সে দাওয়াতের ভুল পদ্ধতি অবলম্বন করল, তার এই দাওয়াত নবী-রাসুলদের দাওয়াতি পদ্ধতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

 

“নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে। এছাড়া যাকে ইচ্ছা, ক্ষমা করেন। যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে সুদূর ভ্রান্তিতে পতিত হয়” [আন-নিসাঃ ১১৬]

 

“নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, আল্লাহ তার জন্যে অবশ্যই জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার বাসস্থান জাহান্নাম। আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই” [আল-মায়েদাঃ ৭২]

  • দাওয়াতের ক্ষেত্রে যারা নবীদের নীতি মেনে চলে না

 

 যারা কুরআন-সুন্নাহ এর মাধ্যমে বেধে দেওয়া দাওয়াতি নীতি এবং ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধের ধারাবাহিকতার বিপরীতে গিয়ে ভিন্ন পথ follow করে, তাদের এই ভুলের তাৎক্ষনিক প্রকাশ ঘটে তাদের নিজের জীবনেই। ফলে দেখা যায় ইসলামি দলের অনেক কর্মী রাষ্ট্রকে পরিবর্তনের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, অথচ তাদের নিজেদের মাঝে এবং নিজের পরিবারে যে পরিবর্তন আনা তার জন্য খুব সহজ আর বাধ্যতামুলক ছিল, তিনি সেটুকু পরিবর্তন আনার সময় বা সুযোগ পাচ্ছেন না। রাস্ট্রব্যবস্থায় বিদ্যমান অন্যায়কে পরিবর্তনের শ্লোগান দিলেও তিনি নিজের ঘরে যে অন্যায় কাজ চলছে, যা বদলে দেয়া তার সাধ্যের মধ্যে ছিল এবং তার দায়িত্ব ছিল সেটুকু করতে পারছেন না। এছাড়া তার আকীদার জ্ঞ্যাণ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য জ্ঞ্যাণের ক্ষেত্রে ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। এক্ষেত্রে অত্যন্ত সহজভাবে নবী (সাঃ) মুলনীতি ঠিক করে দিয়েছেনঃ

“লক্ষ্য কর, তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষনাবেক্ষনকারী এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের ব্যাপারে দায়িতবশীল, অতএব মানুষের ওপর যিনি আমীর রয়েছেন (যেমন রাষ্ট্রপ্রধান) তিনি রক্ষনাবেক্ষনকারী এবং তিনি তার প্রজাদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, আর ব্যাক্তি তার ঘরের লোকদের ওপর রক্ষনাবেক্ষনকারী এবং সে তাদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, এবং নারী তার স্বামীর ঘর এবং তার সন্তানের রক্ষনাবেক্ষনকারী এবং সে তাদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, এবং দাশ তার মনিবের সম্পদের রক্ষনাবেক্ষনকারী এবং সে সেটার ব্যাপারে দায়িত্বশীল, লক্ষ্য কর, তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষনাবেক্ষনকারী এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তার অধীনশদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল” [বুখারী, মুসলিম]

 

 

নবী (সাঃ) এই হাদীসে খুব সুন্দরভাবে সকলের জবাবদিহিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছেন, প্রত্যেকের ক্ষমতা ও দায়িত্বের একটা পরিধি আছে এবং সে ততটুকুর ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবেঃ রাষ্ট্রের জনগনের বিষয় জিজ্ঞাসিত হবেন রাষ্ট্রপ্রধান, আবার পরিবারের বিষয় জিজ্ঞাসিত হবেন পরিবারের প্রধান ইত্যাদি। এই হাদীস থেকে বোঝা যায় যে একজন সাধারন মুসলিম তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িতবশীল, রাষ্ট্রের ব্যাপারে নয়। এজন্য কোন কোন ইসলামী দল যে ধারনা প্রচার করে থাকে যে রাষ্ট্রে ইসলাম কায়েম করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ – এটা সঠিক নয়। কুরআন হাদিসের প্রতিটি নির্দেশের একটা নির্দিষ্ট aim বা লক্ষ্য আছে, অর্থাৎ সকল নির্দেশ সকলের জন্য নয়। কোন কোন নির্দেশ সকল ব্যাক্তির জন্য, যেমনঃ

“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তার এবাদত কর, যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তাতে আশা করা যায়, তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারবে” [আল-বাকারাঃ ২১]

 

 

আবার কোন কোন নির্দেশের বাস্তবায়ন শুধুমাত্র দায়িত্বশীলদের জন্য, সকলের জন্য নয়, যেমনঃ

 

“ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ; তাদের প্রত্যেককে একশ-ঘা করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকর করণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে” [আন-নুরঃ ২]

 

এখানে মুসলিম জনগনের সকলকে ছুটে এসে ব্যভিচারিণী নারী পুরুষকে বেত্রাঘাত করতে বলা হয়নি, বরং এই নির্দেশ বিচার-ফয়সালায় নিয়োজিত দায়িত্বশীলদের জন্য। এখন রাষ্ট্র যদি এই নির্দেশ বাস্তবায়ন না করে, তবে এর জন্য শাসকগণ দায়ী থাকবেন কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু মুসলিম জনসাধারনকে এজন্য জবাবদিহি করতে হবে না। রাষ্ট্র এই দায়িত্ব পালন না করলে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া সাধারন মুসলিম জনগনের জন্য বৈধ নয়, বরং তা হবে বিশৃঙ্খলা বা ফাসাদ, যা ইসলামে নিষিদ্ধ। 

 

তেমনি কোন কোন আয়াত প্রত্যেক পরিবারের দায়িত্যশীলদের জন্য, যেমনঃ

 

 

“হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা কর, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ। তারা আল্লাহ তাআলা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করে” [আত-তাহরীমঃ ৬]

 

 

সুতরাং কুরআন হাদিসের বিভিন্ন নির্দেশের লক্ষ্য, কে বা কারা, সেটা না বুঝতে পারা, এবং এক্ষেত্রে নিজের খেয়ালখুশীর অনুসরণ – ইসলামের নামে বিভ্রান্তির অন্যতম মুল কারনগুলোর একটি।

 

 

  • প্রচলিত বিভিন্ন দাওয়াতী পদ্ধতির মুল্যায়ন

 

যেকোন ইসলামী দলই ইসলামের দাওয়াতের ক্ষেত্রে নবী-রাসুলদের পদ্ধতির অনুসারী হতে চায় আর সেটাই কর্তব্য। আমরা দেখলাম যে নবী-রাসুলদের দাওয়াতের মূল বিষয়বস্তু ছিল তাওহীদ, তারা সবার আগে তাওহীদকে প্রতিষ্ঠা করেছেন, আর মানুষ তাওহীদের দাওয়াত গ্রহন করার পর জীবনের সবক্ষেত্রে তাওহীদকে বাস্তবায়নের জন্য পর্যায়ক্রমে এসেছে অন্যান্য খুঁটিনাটি বিধান। নবী-রাসুলদের এই দাওয়াতী পদ্ধতির সাথে আজকালকার প্রচলিত দাওয়াতী কর্মকাণ্ড গুলোর সাথে তুলোনা করলে দেখা যায় যে কেউ কেউ তাওহীদের দাওয়াতকে পুরোই উপেক্ষা করেছে, কেউ বা তাওহীদের একটি দিককে মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে এর বাকি দিকগুলোকে এবং ইসলামের সার্বিক শিক্ষাকে অবহেলা করেছে।

 

 

  • দাওয়াতকে কতগুলো নির্দিষ্ট পয়েন্টে সীমাবদ্ধ করা

 

দাওয়াতী কাজের ক্ষেত্রে কেউ কেউ দাওয়াতকে কতগুলো নির্দিষ্ট পয়েন্টে সীমাবদ্ধ করেছেন। এর মধ্যে তাওহীদের বিষয়গুলো নেই বললেই চলে। সেখানে “কালেমা” বা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর উল্ল্যেখ থাকলেও একে ব্যাখ্যা করা হয় ভুল ভাবে। বলা হয় থাকে যে  “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর অর্থ এই একীন থাকা যে এক আল্লাহর ইচ্ছাতে সব হয়, অথচ এটা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর অর্থ নয়। ফলে, আল্লাহকে সকল প্রকার এবাদতের ক্ষেত্রে এককভাবে বাছাই করার বিষয়টা অজ্ঞাত থেকে যায়।

 

 

সূত্র

মতামত দিন