ইমাম কুরতুবী (রহঃ) এর জীবনী শেষ পর্ব

[ইমাম কুরতুবী (রহঃ)-এর রচনা সমূহ]

২. আত-তাযকিরাহ বি-আহওয়ালিল মাওতা ওয়া উমূরিল আখিরাহ : ইমাম কুরতুবী (রহঃ)-এর গ্রন্থ সমূহের মাঝে তাফসীরে কুরতুবীর পর এটি সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও বহুল পঠিত। শায়খ মুহাম্মাদ মাখলূফ (মৃঃ ১৩৬০ হিঃ) উক্ত গ্রন্থের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, كتاب ليس له مثيل فى بابه ‘এটি এমন একটি গ্রন্থ, যার তুলনীয় কোন গ্রন্থ নেই’।[1] হাজী খলীফা বলেন, هو كتاب مشهور فى مجلد ضخم ‘বৃহৎ একটি খন্ডে সংকলিত এটি একটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ’।[2] শায়খ শিহাবুদ্দীন করাফী বলেন, من أراد استيعابه، فعليه به ‘যে ব্যক্তি (ক্বিয়ামতের দিন সিঙ্গায় ফুঁৎকার দেওয়ার বিষয়ে) অবগত হতে চায়, সে যেন আত-তাযকিরাহ গ্রন্থটি অধ্যয়ন করে’।[3]

আধুনিক কয়েকজন গবেষক বলেছেন, لقد سمت مكانته بين الخاصة والعامة، وجل المؤلفات فى هذا الباب تعتمد عليه، وهو بلا منازع مؤلف فريد فى نوعه. ‘সাধারণ মানুষ ও বিশিষ্ট ব্যক্তি সবার মাঝে এ গ্রন্থটি উচ্চমর্যাদা লাভ করেছে। এ বিষয়ে রচিত অধিকাংশ গ্রন্থ এর উপর নির্ভর করে। নিঃসন্দেহে এটি একটি অনন্য গ্রন্থ’।[4]

ইমাম কুরতুবী (রহঃ)-এর যুগে মানুষ মৃত্যু ও আখিরাতকে ভুলে গিয়ে দুনিয়া নিয়ে অত্যন্ত ব্যতি-ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তদানীন্তন সময়ের মানুষদের এহেন দুনিয়ালিপ্সা দর্শনে ব্যথিত হয়ে মানুষকে পরকালমুখী করার জন্য ইমাম কুরতুবী (রহঃ) উক্ত গ্রন্থটি ৬৫৮ হিজরীর পরে রচনা করেন।[5]

এর ভূমিকায় ইমাম কুরতুবী (রহঃ) এটি রচনার উদ্দেশ্য ও বিষয়বস্ত্ত সম্পর্কে বলেন,فإني رأيتُ أنْ أَكتُبَ كِتابًا وجيزًا، يكون تَذْكِرةً لِنَفْسِي وعملاً صالحًا بعد موتي فى ذِكْرِ الموتِ، وأحْوالِ الموْتى، وذِكْرِ الحشْرِ، والنشرِ، والجنّةِ، والنّارِ، والفِتَنِ، والأشرَاطِ. ‘আমি মৃত্যু, মৃত ব্যক্তিদের অবস্থা সমূহ, পুনরুত্থান, জান্নাত, জাহান্নাম, ফিৎনা সমূহ ও ক্বিয়ামতের আলামত সমূহ সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ লেখার মনস্থ করলাম। যেটি আমার নিজের জন্য নছীহত এবং আমার মৃত্যুর পরে আমার জন্য সৎকর্ম হবে’।[6]

এতে অনুসৃত পদ্ধতি সম্পর্কে ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন,

نَقلْتُه مِن كُتبِ الأئمة، وثقات أعلام هذه الأمة حسبَ ما رويته أو رأيته، وسترى ذلك منسوبا مبينا إن شاء الله ةعالى، وسميةه: كةاب الةذكرة بأحوال الموةى وأمور الآخرة. وبوبته بابا بابا، وجعلت عقب كل باب فصلا أو فصولا نذكر فيه ما يُحتاج إليه من بيان غريب، أو فقه في حديث، أو إيضاح مشكل، لتكمُلَ فائدته، وتعظُمَ منفعته،

‘আমি ইমামদের ও এই উম্মতের নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিছদের গ্রন্থ সমূহ থেকে এ গ্রন্থটি সংকলন করেছি। যেমনটা আমি বর্ণনা করেছি বা দেখেছি। ইনশাআল্লাহ আপনি তা সুস্পষ্ট উদ্ধৃতি সহ দেখতে পাবেন। আর আমি এর নামকরণ করেছি আত-তাযকিরাহ বি-আহওয়ালিল মাওতা ওয়া উমূরিল আখিরাহ। আমি গ্রন্থটিকে কতিপয় অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেছি এবং প্রত্যেক অধ্যায়ের পরে এক বা একাধিক অনুচ্ছেদ উল্লেখ করেছি।  আমি সেখানে দুর্বোধ্য শব্দের ব্যাখ্যা, ফিক্বহুল হাদীছ বা জটিল জিনিসের ব্যাখ্যা উল্লেখ করব। যাতে এর পূর্ণাঙ্গ ও বিশাল উপকারিতা হাছিল হয়’।[7]

গ্রন্থটির গুরুত্ব বিবেচনা করে ইমাম সুয়ূত্বী (রহঃ) ‘শারহুছ ছুদূর বি-হালিল মাওতা ওয়াল কুবূর’ এবং আব্দুল ওয়াহ্হাব শা‘রানী (মৃঃ ৯৭৩) ‘মুখতাছার তাযকিরাতুল ইমাম আল-কুরতুবী’ নামে তা সংক্ষিপ্ত করেন। উভয়টিই প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বিন আলী নূরুদ্দীন সুহাইমী আযহারী (মৃঃ ১১৮৭) ‘আত-তাযকিরাতুল ফাখিরাহ ফী আহওয়ালিল আখিরাহ’ নামেও উক্ত গ্রন্থটি সংক্ষিপ্ত করেন। মিসরের দারুল কুতুব আল-মিসরিইয়াহ ও ইস্তাম্বুলের ফাতিহ গ্রন্থাগারে এর পান্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে।[8]

ড. ছাদেক বিন মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম ৩ খন্ডে এটি তাহক্বীক্ব করে পিএইচ.ডি ডিগ্রী লাভ করেছেন। রিয়াদের দারুল মিনহাজ থেকে ১৪২৫ হিজরীতে এটি প্রকাশিত হয়েছে। মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৫৩৯। এ যাবৎ প্রকাশিত সংস্করণ সমূহের মাঝে এটি সবচেয়ে উপকারী ও গবেষণালব্ধ।

৩. আত-তিযকার ফী ফাযলিল আযকার :

ঐতিহাসিক ইবনু ফারহূন গ্রন্থটি সম্পর্কে বলেছেন,وضعه على طريقة التبيان للنووى لكن هذا أتم منه، وأكثر علما، ‘ইমাম নববীর আত-তিবয়ান ফী আদাবি হামালাতিল কুরআন গ্রন্থের আদলে তিনি এটি রচনা করেছেন। কিন্তু এটি তার চেয়ে বেশী পূর্ণাঙ্গ ও জ্ঞানগর্ভ’।[9]

তাফসীরে কুরতুবীর পর ইমাম কুরতুবী (রহঃ) এটি রচনা করেন বলে প্রতিভাত হয়। গ্রন্থটির বিষয়বস্ত্ত সম্পর্কে ইমাম কুরতুবী নিজেই বলেছেন,

فرأيت أن أكتب فى ذلك كتابا وجيزا على فضل القرآن وقارئه، ومستمعه، والعامل به، وحرمته، وحرمة القرآن، وكيفية تلاوته، والبكاء عنده، وفضل من قرأه معربا، وذم من قرأه رياء وعجبا، إلى غير ذلك مما تضمنه الكتاب، حسبما هو مبين في أبواب،

‘আমি এ বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ লেখার মনস্থ করলাম। কুরআন,  কুরআনের পাঠক, এর শ্রবণকারী ও তার উপর আমলকারীর ফযীলত ও মর্যাদা, কুরআনের মর্যাদা, তেলাওয়াতের পদ্ধতি, কুরআন তেলাওয়াতকালে ক্রন্দন, বিশুদ্ধভাবে কুরআন তেলাওয়াকারীর ফযীলত, লোক দেখানো ও দম্ভভরে পাঠকারীর নিন্দা প্রভৃতি। যা বিভিন্ন অধ্যায়ে সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হবে’।[10]

গ্রন্থটি রচনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইমাম কুরতুবী বলেন,فاستخرت الله سبحانه فى ذلك، وسألته التيسير علىَّ فى ذلك، فيسر لي تخريج أربعين بابا فى فضل كتابه العزيز وقارئه ومستمعه والعامل به. ‘আমি গ্রন্থটি রচনার ব্যাপারে আল্লাহর নিকট ইস্তেখারা করলাম এবং তিনি যেন তা রচনা আমার জন্য সহজ করে দেন সেই তাওফীক চাইলাম। তিনি তার প্রিয় কিতাবের ফযীলত এবং এর পাঠক, শ্রোতা ও এর উপর আমলকারীর ফযীলত সম্পর্কে ৪০টি অধ্যায় রচনা করা আমার জন্য সহজ করে দিলেন’।[11] বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে এর একাধিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।

৪. আল-আসনা ফী শারহি আসমাইল্লাহিল হুসনা ও ছিফাতিহিল উলয়া :

এ গ্রন্থে ইমাম কুরতুবী (রহঃ) আল্লাহর গুণবাচক নাম সমূহ ও গুণাবলী সম্পর্কে সবিস্তারে আলোচনা করেছেন। গবেষক তারেক আহমাদ মুহাম্মাদ এটি দুই খন্ডে তাহক্বীক্ব ও তাখরীজ করেছেন। ১৪১৬/১৯৯৫ সালে সর্বপ্রথম এই গ্রন্থটি মিসরের তানতার দারুছ ছাহাবাহ লিত-তুরাছ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ৮২৭।

উক্ত গ্রন্থের ১ম খন্ডের বিষয়বস্ত্ত সম্পর্কে ইমাম কুরতুবী নিজেই বলেছেন,وَذَكَرْنَا مِنَ الْأَسْمَاءِ مَا اجْتُمِعَ عَلَيْهِ وَمَا اخْتُلِفَ فِيهِ مِمَّا وَقَفْنَا عَلَيْهِ فِي كُتُبِ أَئِمَّتِنَا مَا يُنَيِّفُ عَلَى مِائَتَي اسْمٍ. ‘আমরা আমাদের ইমামদের কিতাব সমূহ থেকে অবগত হয়ে আল্লাহর দুই শতাধিক নাম উল্লেখ করেছি। এর মধ্যে কিছু নামের ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করা হয়েছে আর কিছু নামের ব্যাপারে মতভেদ করা হয়েছে’।[12]

আর ২য় খন্ডের বিষয়বস্ত্ত সম্পর্কে ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন,

فلما ذكرنا ما وقفنا عليه من أسماء الله الحسنى، رأيت أن أضيف إليها ما لم أذكره من الآى والأحاديث التى جاء فيها من ذكر الصفات ما لم يتقدم له ذكر على جهة الاختصار والتقريب ردا على المجسمة وأصحاب التشبيه،

‘আমরা যখন আমাদের অবগতি অনুযায়ী আল্লাহর সুন্দর নাম সমূহ উল্লেখ করলাম, তখন আল্লাহর গুণাবলী সংক্রান্ত (কায়াবাদী) আয়াত ও হাদীছ সমূহ যা ইতিপূর্বে সংক্ষিপ্ততার কারণে উল্লেখ করিনি তা উল্লেখ করা পসন্দ করলাম। মুজাস্সিমাহ ও সাদৃশ্যবাদীদের খন্ডনে আমি এগুলি উল্লেখ করেছি’।[13] উক্ত গ্রন্থে তিনি কুরআন মাখলূক কি-না এ বিষয়ে আক্বীদা বর্ণনা করে বলেন,مذهب أهل السنة والجماعة أن القرآن كلام الله منزل غير مخلوق، منه بدأ وإليه يعود، ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের মতে নিশ্চয়ই কুরআন আল্লাহর অবতীর্ণ কালাম বা বাণী, যা সৃষ্ট নয়। তাঁর নিকট থেকেই এর সূচনা হয়েছে এবং তার নিকটেই তা ফিরে যাবে’।[14]

গ্রন্থটি ৭৩১ হিজরীর রজব মাসে রচিত।[15] হাজী খলীফা এই গ্রন্থটি সম্পর্কে বলেছেন, وهذا الشرح كبير ومفيد ‘এই শরাহটি বড় ও উপকারী’।[16]

৫. কামউল হিরছ বিয-যুহদ ওয়াল কানা‘আহ ওয়া রাদ্দু যুল্লিস সুওয়াল বিল-কাসবি ওয়াছ ছিনা‘আহ : ঐতিহাসিক  ইবনু  ফারহূন গ্রন্থটি সম্পর্কে বলেন,لم أقف على تأليف أحسن منه فى بابه، ‘এ বিষয়ে এর চেয়ে ভাল কোন গ্রন্থের কথা আমি জানি না’।[17]

গ্রন্থটি রচনার কারণ ও অনুসৃত পদ্ধতি সম্পর্কে ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন,فرأيت أن أجمع فى ذلك كتابا يكون جامعا، مهذبا، كتابا مقربا، يزيد على معانيها، ويربى على ما فيها، جعلته أربعين بابا، كل باب الحديث والحديثين والثلاثة، ثم عقبت ذلك بالتفسير والتبيان، ليكمل فائدته، ويعظم منفعته، ‘আমি এ সম্পর্কে একটি সারগর্ভ, পরিমার্জিত ও সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ সংকলনের ইচ্ছা পোষণ করলাম। যেটি এ বিষয়ে রচিত পূর্ববর্তী গ্রন্থ সমূহের চেয়ে বেশী তাৎপর্যপূর্ণ ও সমৃদ্ধ হবে। আমি এ গ্রন্থটিকে ৪০টি অধ্যায়ে বিভক্ত করেছি। প্রত্যেকটি অধ্যায়ে একটি, দু’টি বা তিনটি হাদীছ রয়েছে। অতঃপর আমি সেগুলি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছি। যাতে এর পূর্ণাঙ্গ ও বিশাল উপকারিতা হাছিল হয়’।[18]

২১৪ পৃষ্ঠার উক্ত গ্রন্থে ইমাম কুরতুবী (রহঃ) দুনিয়ার প্রতি আগ্রহী হওয়ার অসুখের তিনটি চিকিৎসার কথা উল্লেখ করেছেন। ১. দুনিয়াতে আশা কম করা। ২. অল্পে তুষ্ট থাকা। ৩. দুনিয়াবিমুখতা।[19]

৬. আল-ই‘লাম বিমা ফী দ্বীনিছ নাছারা মিনাল মাফাসিদ ওয়াল আওহাম ওয়া ইযহারু মাহাসিনি দ্বীনিল ইসলাম : এ গ্রন্থটিকে ইমাম কুরতুবী (রহঃ)-এর দিকে নিসবত করা হয়েছে। জনৈক খ্রিস্টানের تثليث الوحدانية في معرفة الله শীর্ষক গ্রন্থের জবাবে তিনি এটি রচনা করেন।[20]

তবে এটি আদৌ ইমাম কুরতুবী রচিত কি-না তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। বরং এটাই সঠিক যে, এটি আল-মুফহিম শারহু ছহীহ মুসলিম গ্রন্থের লেখক ইমাম কুরতুবী (রহঃ)-এর শিক্ষক আবুল আববাস আল-কুরতুবী রচিত। আধুনিক গবেষক ড. আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন রুমাইয়ান ও হাসান ওয়ায়েল ইসমাঈল হাজ্জী এমনটিই প্রমাণ করেছেন।[21]

এছাড়া তাঁর আরো অনেক গ্রন্থ এখনো অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। আর কিছু মহাকালের করাল গ্রাসে হারিয়ে গেছে। এজন্য প্রাচীন জীবনীকারগণ তাঁর রচনা সমূহ সম্পর্কে বলেছেন,وله تآليف وتعاليق مفيدة غير هذه، ‘এগুলি ছাড়া তাঁর আরো অনেক উপকারী গ্রন্থ ও টীকা রয়েছে’।[22] ঐতিহাসিক ছাফাদী বলেন, وأشياء تدل على إمامته وكثرة اطلاعه ‘তাঁর আরো কিছু গ্রন্থ রয়েছে। যা তার ইমামত ও অধিক অধ্যবসায়ের প্রমাণ বহন করে’।[23]

মনীষীদের দৃষ্টিতে ইমাম কুরতুবী (রহঃ) :

১. ঐতিহাসিক ইবনু ফারহূন বলেছেন, كَانَ من عباد الله الصَّالِحين وَالْعُلَمَاء العارفين الورعين الزاهدين فِي الدُّنْيَا المشغولين بِمَا يعنيهم من أُمُور الْآخِرَة، أوقاته معمورة مَا بَين توجه وَعبادَة وتصنيف- ‘তিনি আল্লাহর সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি মুত্তাক্বী ও দুনিয়াবিমুখ একজন বিদগ্ধ আলেম ছিলেন। পরকালে কল্যাণ বয়ে আনবে এমন কর্মে নিয়োজিতদের মধ্যে তিনি অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ, ইবাদত-বন্দেগী ও গ্রন্থ রচনায় তাঁর সময় কাটত’।[24]

২. হাফেয শামসুদ্দীন যাহাবী বলেন,إمام متفنن متبحر فى العلم، ‘তিনি অভিজ্ঞ ও বিশাল পান্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন’।[25] তিনি আরো বলেন,رحل وكتب وسمع، وكان يقظا فهما حسن الحفظ مليح النظم حسن المذاكرة ثقة حافظا، ‘তিনি জ্ঞানার্জনের জন্য সফর করেছেন, ইলম লিপিবদ্ধ আকারে সংরক্ষণ করেছেন এবং আলেমদের মজলিসে হাযির হয়ে ইলম হাছিল করেছেন। তিনি প্রত্যুৎপন্নমতি, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, প্রবল স্মৃতিশক্তির অধিকারী, ভাল কবি, ভাল শিক্ষক, নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী এবং হাফেয (ইলম সংরক্ষণকারী) ছিলেন’।[26]

৩. ইবনু শাকির আল-কুতুবী বলেন, كان شيخا فاضلا ‘তিনি একজন সম্মানিত শায়খ ছিলেন’।[27]

৪. ইবনুল ইমাদ হাম্বলী বলেন,وكان إماما علما، من الغوَّاصين على معانى الحديث، حسن التصنيف، جيد النقل، ‘তিনি ইমাম, শীর্ষস্থানীয় আলেম, হাদীছের মর্মার্থ সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের অধিকারী, সুলেখক এবং বর্ণনা ও সংকলনে অভিজ্ঞ ছিলেন’।[28]

৫. হাফেয আহমাদ দুময়াতী (মৃঃ ৭৪৯ হিঃ) বলেন,وكان من العلماء العاملين ومن الأئمة المعتمدين، ‘তিনি আলেম বা-আমল এবং নির্ভরযোগ্য ইমামদের অন্যতম ছিলেন’।[29]

৬. الموسوعة العربية العالمية তে বলা হয়েছে, فقيه مفسر عالم باللغة، … كان القرطبى عالما كبيرا منقطعا إلى العلم منصرفا عن الدنيا، فترك ثروة علمية تقدر بثلاثة عشر كتابا ما بين مطبوع ومخطوط، ‘ইমাম কুরতুবী ফক্বীহ, মুফাস্সির ও ভাষাবিজ্ঞানী। তিনি একজন বড় আলেম, নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্ঞান সাধনাকারী এবং দুনিয়াবিমুখ ছিলেন। তিনি মুদ্রিত-অমুদ্রিত ১৩টি ইলমী সম্পদ (গ্রন্থ) রেখে গেছেন’।[30]

৭. আল-বায়ান ফী উলূমিল কুরআন গ্রন্থে বলা হয়েছে, وهو من العلماء العاملين، الزاهدين فى الدنيا، المتصفين بالخلال الحميدة والصفات المجيدة، العارفين بالله ثم فى مختلف فنون العلم والمعرفة، ‘তিনি আমলকারী আলেম, দুনিয়াবিমুখ, উত্তম ও প্রশংসনীয় গুণের অধিকারী, আল্লাহওয়ালা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পারদর্শীদের অন্যতম ছিলেন’।[31]

৮. Tafsir : Its Growth and Development in Muslim Spain  গ্রন্থে  বলা  হয়েছে,  He  was  one  of

those Spanish exegetes whose thoughts and works enriched the repository of tafsir literature tremendously. ‘তিনি ঐ সকল আন্দালুসীয় মুফাস্সিরদের একজন ছিলেন, যাদের চিন্তা ও কর্ম তাফসীর শাস্ত্রের ভান্ডারকে ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ করেছে’।[32]

উপসংহার :

পরিশেষে বলা যায়, ইমাম কুরতুবী (রহঃ) ইসলামী জ্ঞান জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি একজন খ্যাতিমান মুফাস্সির, ফক্বীহ, ভাষাতাত্ত্বিক ও মুজতাহিদ আলেম ছিলেন। তিনি সর্বদা জ্ঞান-সাগরে ডুব দিয়ে অসাধারণ সব গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। যা মুসলিম উম্মাহর জন্য অমূল্য সম্পদ। তাঁর রচিত তাফসীরে কুরতুবী তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে গেছে। গবেষকগণ এটাকে  ‘ফিক্বহী বিশ্বকোষ’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। কুরআন মাজীদের আহকাম সংক্রান্ত আয়াত সমূহের ব্যাখ্যা জানার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তাফসীর। সেজন্য বিদ্বানগণ এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। গবেষকগণ এর নানা দিক নিয়ে গবেষণা করে চলেছেন। ফলে প্রতিনিয়ত আমাদের সামনে জ্ঞানের নিত্য-নতুন দ্বার উদঘাটিত হচ্ছে।

[1]. ঐ, শাজারাতুন নূর  আয-যাকিইয়াহ, তাখরীজ ও তা‘লীক : আব্দুল মাজীদ খিয়ালী (বৈরূত : দারুল কুতুব আল-ইলমিইয়াহ, ১ম প্রকাশ, ১৪২৪/২০০৩), ১ম খন্ড, পৃঃ ২৮২, জীবনী ক্রমিক ৬৯৮।

[2]. কাশফুয যুনূন ১/৩৯০, বাবুত তা দ্র.।

[3]. শিহাবুদ্দীন কারাফী, আল-ইসতিগনা ফী আহকামিল ইসতিছনা, তাহকীক : ড. ত্বহা মুহসিন (বাগদাদ : মাতবা‘আতুল ইরশাদ, ১৪০২/১৯৮), পৃঃ ৪৪০।

[4]. আব্দুল্লাহ খালেদ ও অন্যান্য, কিতাব আত-তাযকিরাহ বি-আহওয়ালিল মাওতা ও উমূরিল আখিরাহ’ লিল ইমাম আল-কুরতুবী : দিরাসাতুন তা‘রীফিয়াহ ওয়াছফিয়াহ, মাজাল্লাহ আল-ইসলাম ফী আ-সিয়া, বর্ষ ১৩, খন্ড ২, ডিসেম্বর’১৬, পৃঃ ১৪১।

[5]. আল-ইমাম আল-কুরতুবী, পৃঃ ৩৮-৩৯; মাজাল্লাহ আল-ইসলাম ফী আ-সিয়া, প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৪০।

[6]. আত-তাযকিরাহ ১/১০৯-১১০।

[7]. ঐ ১/১১০।

[8]. আল-ইমাম আল-কুরতুবী, পৃঃ ১৩৩; আত-তাযকিরাহ ১/৬৮-৬৯।

[9]. আদ-দীবাজ আল-মুযাহ্হাব ২/৩০৯।

[10]. ইমাম কুরতুবী, আত-তিযকার ফী ফাযলিল আযকার (দামেশক : দারুল বায়ান, ১৪০৭/১৯৮৭), পৃঃ ১৩-১৪।

[11]. ঐ, পৃঃ ১৫।

[12]. তাফসীরে কুরতুবী, আ‘রাফ ১৮০ আয়াতের ব্যাখ্যা দ্র.।

[13]. আল-আসনা ২/৩।

[14]. ঐ ২/১৮৭।

[15]. ঐ ২/২০৩।

[16]. কাশফুয যুনূন ২/১৫।

[17]. আদ-দীবাজ ২/৩০৯।

[18]. ইমাম কুরতুবী, কামউল হিরছ বিয-যুহদ ওয়াল কানা‘আহ ওয়া রাদ্দু যুল্লিস সুওয়াল বিল কাসবি ওয়াছ ছিনা‘আহ, তাহকীক্ব: মাজদী ফাতহী আস-সাইয়িদ (তানতা : দারুছ ছাহাবাহ লিত-তুরাছ, ১ম প্রকাশ, ১৪০৯ হিঃ/১৯৮৯ খ্রি.), পৃঃ ১৫।

[19]. ঐ, পৃঃ ৬।

[20]. কুরতুবী, আল-ই‘লাম বিমা ফী দ্বীনিছ নাছারা মিনাল মাফাসিদ ওয়াল আওহাম ওয়া ইযহারু মাহাসিনি দ্বীনিল ইসলাম, তাহকীক্ব : ড. আহমাদ হিজাযী আস-সাকা (মিসর : দারুত তুরাছিল আরাবী, তাবি), পৃঃ ৬, ২৬৩।

[21]. আরাউল কুরতুবী ওয়াল মাযিরী আল-ই‘তিকাদিয়াহ মিন খিলালি শারহাইহিমা লি-ছহীহ মুসলিম (দারু ইবনিল জাওযী, ১ম প্রকাশ, ১৪২৭ হিঃ), ১/১০৯-১১০; মানহাজুল ইমাম আবিল আববাস আল-কুরতুবী ফি কিতাবিহী আল-ই‘লাম…, এম.এ থিসিস, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, গাযা, ফিলিস্তীন, ১৪৩৯/২০১৮, পৃঃ ৩১-৩৪।

[22]. আদ-দীবাজ ২/৩০৯।

[23]. আল-ওয়াফী বিল অফায়াত ২/৮৭।

[24]. আদ-দীবাজ আল-মুযাহ্হাব ২/৩০৮

[25]. তারীখুল ইসলাম ৫০/৭৫।

[26]. নাফহুত তীব ২/২১১।

[27]. উয়ূনুত তারীখ ২১/২৭।

[28]. শাযারাতুয যাহাব ৭/৫৮৫।

[29]. আয-যায়ল ওয়াত তাকমিলাহ ৫/৪৯৫, হাশিয়া দ্র.।

[30]. আল-মাওসূ‘আতুল আরাবিইয়াহ আল-আলামিইয়াহ ১৮/১৬৩।

[31]. আল-বায়ান ফী উলূমিল কুরআন, পৃঃ ৩৭৭।

[32]Dr. Muhammad Ruhul Amin, Tafsir : Its Growth and Development in Muslim Spain (Dhaka : University Grants Commission, 2006), P. 150.

প্রথম পর্ব           ২য় পর্ব        ৩য় পর্ব           শেষ পর্ব

SOURCE

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
slot online skybet88 skybet88 skybet88 mix parlay skybet88 rtp slot slot bonus new member skybet88 mix parlay slot gacor slot shopeepay mix parlay skybet88 slot bonus new member