মোহাম্মদ বিন কাসিম এর জীবনী

রচনায়: মোহাম্মদ নাসির আলী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

প্রায় সাড়ে বারো শ’ বছর আগের এক গল্প বলছি—গল্পের নাম শনেই যেনো মনে করো না এটা বানানো গল্প। আমরা মুসলমানরা প্রথম কি করে এ দেশে এলাম, কোথা থেকে এলাম, খাঁটি ইতিহাসের পাতা থেকে নেওয়া এ গল্প তারই সত্যি কাহিনী।

সে সময়ে একদিন আরব সাগরের তীরে গিয়ে দাঁড়ালে তোমরা দেখতে পেতে, সমুদ্দুরের বুকে জাহাজের এক বহর পাল তুলে এগিয়ে চলছে সিন্ধুর উপকল ঘেঁষে উত্তর-পশ্চিম দিকে। আর তাদের গন্তব্যস্থান। আরবের বসরা বন্দরে গিয়ে ভিড়বে এসব জাহাজ। মককায় হজের মৌসম তখন ঘনিয়ে এসেছে। যেমন করেই হোক, হজের আগেই গিয়ে পৌছাতে হবে তাদের।

কোথা থেকে এলো পাল তোলা এতো জাহাজ ? কাদের জাহাজ এগুলি ?

মানচিত্র খুলে দেখতে পাবে, দূরে ভারতের ঠিক দক্ষিণ দিকে প্রায় তার গা ঘেঁষে সমুদ্দুরের বুকে ভাসছে নারকেলের খুলির মতো সিংহল দ্বীপ! সে দ্বীপ থেকেই এসেছে এ জাহাজ। জাহাজের আরোহীরা সব আরবের অধিবাসী। ছেলে বুড়ো, স্ত্রী, পুরুষ সবই রয়েছে আরোহীদের ভেতর। এক সময় জাহাজ নিয়ে সওদাগরী করতে এসেছিলো তারা এ দেশে। অনেক কাল থেকেই আরবের লোকেরা জাহাজ নিয়ে সওদাগরী করতে যায় দূর-দূরান্তে। ভারতের পশ্চিম উপকলে সিন্ধু দেশ, সেখান থেকে দক্ষিণে এগিয়ে গেলেই সিংহল। তারা ভাবে, এসব তাদের বাড়ীর কাছে। এর চেয়েও অনেক দুরে কূল-কিনারাহীন ভারত মহাসাগরের বুকে রয়েছে লাক্ষাদ্বীপ, তারপরে মালদ্বীপ। সেখানেও সওদা নিয়ে গেছে আরব সওদাগরেরা—তাদের জাহাজ বোঝাই করে। পুব দিকে গেছে। ইন্দোচীন-চীন অবধি। আবার জাহাজ বোঝাই সওদা নিয়েই একদিন ফিরে এসেছে। উত্তাল সমুদ্দুরের বুকেও তাদের চিত্ত ছিলো ভয়ভাবনাহীন। সে কালে তারাই ছিলো দক্ষ নাবিক। তাদের নৌবহর অহরহ ঘুরে বেড়িয়েছে আরব সাগরে, ভারত মহাসাগরে, লোহিত সাগরে এমন কি ভূমধ্যসাগর অবধি। সেকালে তারাই চাল রেখেছিলো পাশ্চাত্যের সঙ্গে প্রাচ্যের আর দূর প্রাচ্যের বাণিজ্য।

এমনি করে সওদাগরী করতে এসে কেউ কেউ দেশে ফিরে গেছে, কেউ কেউ রয়ে গেছে যেখানে গেছে সেখানে। সেখানেই ঘরবাড়ী করে বসবাস করতে শুরু করেছে। সেই জন্যই আজ আমরা দেখতে পাই, ভারতের পশ্চিম উপকূলের মুসলমান বাসিন্দাদের অনেকেই আরবদের বংশধর! সিংহলেও তাই। আর লাক্ষাদ্বীপ ও মালদ্বীপের তো কথাই নেই। সেখানকার প্রায় সবারই পূর্বপুরুষেরা ছিলেন আরবের অধিবাসী।

হ্যাঁ, বলছিলাম আরব সাগরের বুকে সেদিন কতগলি জাহাজ পাল তুলে এগিয়ে চলেছিলো সিন্ধুর উপকূল ঘেঁষে। এসেছে তারা সিংহল থেকে বসরা। সিংহল-প্রবাসী আরবের সওদাগরেরা জাহাজ বোঝাই করে প্রতি বছরই এ সময় একবার করে আরবে যায়। হজের পরে আবার ফিরে আসে।

তাদের ওই জাহাজগুলিতে বোঝাই বহুমূল্য সওদাপত্র। সবই যে তাই, তা নয়। মূল্যবান উপহার সামগ্রীও আছে। সেগুলি খলীফাকে উপহার দিয়েছেন সিংহলের রাজা। প্রতি বছরই হজের সময় আরবী সওদাগরদের সঙ্গে তিনি খলীফাকে উপহার পাঠান। এবারও তাই পাঠিয়েছেন। হজের আগে দামী সে সব উপহারের জিনিস দামিশকে খলীফার কাছে পৌঁছানো চাই। এ জন্যই নাবিকদের এতো ব্যস্ততা, তাড়াতাড়ি জাহাজ চালিয়ে যাবার তোড়জোড় তাদের এতো বেশী।

কিন্তু মানুষ যা ভাবে, সব সময়ে তা’ না-ও হতে পারে। এক জাহাজের বুড়ো কাপ্তান লক্ষ্য করে দেখলেন আকাশের এক কোণে মেঘ করেছে। মেঘের লক্ষণ বেশী ভালো নয়। আকাশের ওকোণে মেঘ জমলে ঝড় হয়, জীবনভর তিনি দেখে এসেছেন। তাড়াতাড়ি বিপদের ঝাণ্ডা তুলে সঙ্কেত পাঠানো হলো জাহাজে জাহাজে, হুশিয়ার হবার সঙ্কেত। মেঘের ওপরে মেঘ জমতে লাগলো। দেখতে দেখতে আকাশের কোণটা প্রায় ছেয়ে গেল ঝড়ো মেঘে। একটু পরে সত্যই ঝড় এলো। প্রথমে তেমন কিছু ঝড় নয়। ও-রকম ঝড়কে আরবের নাবিকেরা কমই গ্রাহ্য করে। ওর চেয়ে বেশী ঝড়ের ভেতর তারা নির্ভয়ে জাহাজ চালিয়ে যায়। তা’ নইলে তাদের সাহসের খ্যাতি আজ অবধি টিকে রইলো কি করে ?

ঝড় কিন্তু বেড়েই চললো। এদিকে দিন শেষ হয়ে সন্ধ্যাও ঘনিয়ে এলো। সন্ধ্যা যতোই এগিয়ে আসে ঝড়ের দাপট ততোই বাড়ে। দেখতে দেখতে সমদ্র গর্জন করতে লাগলো। সমুদ্দুরের সারা বুক ছেয়ে গেলো আকাশ-ছোঁয়া ঢেউয়ে। সাপের মতো ফণা তুলে ফোঁস ফোঁস করে তারা এগিয়ে আসে একটার পর আরেকটা। জাহাজ দুলতে লাগলো টলমল। করে। আরোহী নারী ও শিশুরা কোলাহল করে উঠলো জীবনের ভয়ে। কয়েকটা জাহাজের পাল ছিঁড়ে গেলো। মাস্তুলও গেলো ভেঙে। আর। এগিয়ে যাবার চেষ্টা করা যায় না। সে রকম চেষ্টা নিরাপদ নয়।

সন্ধ্যা হয়েছে অনেকক্ষণ। কোনোদিকে কিছুই নজরে আসে না। ডান দিকে অনেক দূরে আকাশের তারার মতো জ্বলছে কতগুলি বাতি। ঝড় কমেনি কিন্তু বৃষ্টি কমেছে। বৃষ্টি কমেছে বলেই বাতিগুলি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। নিশ্চয়ই এটা কোন বন্দর হবে। ঝড়ের সময় যে কোনো বন্দরে জাহাজ লাগালেই চলে।

অবশেষে জাহাজ চলতে লাগলো সেই বাতিগুলি লক্ষ্য করে। বন্দর হোক, লোকালয় তো বটে! তা’ না হলে বাতি জলবে কেননা!

আসলে সেটা বন্দরই ছিলো। সিন্ধুর উপকূল দেবল বন্দর। হিন্দুদের বিখ্যাত তীর্থস্থান। হোক হিন্দুদের তীর্থস্থান, বিপন্নের আশ্রয় নিশ্চয় মিলবে। তীর্থভূমিতে বিপন্নের সমাদর আরো বেশী হবে।

ঝড়ে তাড়ানো সেই জাহাজের বহর অবশেষে দেবল বন্দরের পাশে গিয়ে নোঙর করলো। আরোহীরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো ; নাবিকরা বিশ্রামের অবকাশ পেলো; কিন্তু বিপদ নাকি কখনও একলা আসে না। এক বিপদ থেকে রেহাই পেয়ে তারা সহসা আরেক বিপদের মুখে এসে। পড়লো। রাত্রে সিন্ধুর জলদস্যুরা দল বেঁধে এসে আরবদের জাহাজ আক্রমণ করলো। হাতিয়ার ছাড়া মানুষ, জলদস্যুর সঙ্গে কতোক্ষণ লড়াই করতে পারে? তার উপর সঙ্গে রয়েছে নারী ও শিশু। দেখতে দেখতে দস্যুরা জাহাজের সমস্ত মালামাল লুটপাট করে নিতে লাগলো। কেউ কোনো দিক থেকে এগিয়ে এলো না তাদের সাহায্য করতে।

শুধু মালামাল লুট করে রেহাই দিলে ক্ষতি ছিলো না! নির্মম জলদস্যুরা কয়েকজন নারী ও শিশুকে অবধি বন্দী করে নিয়ে গেল। ভয়ে চীৎকার করে উঠলো এক নারী,–বাঁচাও আমাদের, বাঁচাও হাজ্জায! তুমি কি শুনতে পাচ্ছো না হাজ্জায ?

অসহায় নারীর চীৎকার শুনে একজন ডাকাত অট্টহাসি হেসে উঠলো। বললো—কোথায় তোমার হাজ্জায? হাজ্জায রয়েছে অনেক দূরে, সমুদ্দুরের ওপারে। আরব সাগর পার হয়ে তোমার এ চীৎকার হাজ্জাযের কানে পৌঁছাবে কি ?

সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন বলে উঠলো, যদি তোমার চীৎকার পৌঁছেও, তবু আমরা থাকবো তাঁর নাগালের বাইরে।

এই বলে তারা তাকে টেনে নিয়ে গেল। অসহায় নারীর আকুল কান্নায় দস্যুর মনে একটু দয়ার উদ্রেক হলো না।

এ ঘটনা যেখানে ঘটে সেখান থেকে হাজ্জায-বিন-ইউসুফ সত্যই দূরে ছিলেন। তিনি ছিলেন তখন আরবের পুর্বাঞ্চলের শাসনকর্তা। দুরে থাকলেও একদিন কিন্তু সেই অসহায় নারীর করুণ কান্না আরব সাগরের ওপারে তাঁর কানে গিয়ে সত্যই পৌঁছালো। কোনক্রমে যারা দস্যুর কবল থেকে রক্ষা পেয়েছিলো তারাই গিয়ে সমস্ত খুলে বললো হাজ্জায-বিন-ইউসুফকে। দস্যুর হাতে পড়ে এক অসহায় নারী কিভাবে তাঁর নাম করে চীৎকার করে উঠেছিলো তাও তিনি শুনলেন। শুনে তখখুনি বলে উঠলেন,–দস্যুর কবল থেকে অসহায় নারী ও মাসুম শিশুদের মুক্তির জন্য কিছু একটা উপায় আমাদের করতেই হবে। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে যাতে আর এমন অত্যাচার না হতে পারে তারও বিহিত করতে হবে। জলদস্যু নিপাত না হলে আমাদের সওদাগরী জাহাজ দেশ বিদেশে চলবে কি করে?

সিন্ধুতে তখন রাজত্ব করতেন এক হিন্দু রাজা, নাম তাঁর দাহির। দেবল বন্দরও ছিলো তাঁর এলাকায়। তাঁর এলাকার মধ্যেই এ ঘটনা ঘটেছে। কাজেই দস্যুদের এ দুষ্কার্যের জন্য আইনতঃ তিনিই দায়ী। তাঁরই কাছে প্রতিকার চাইতে হবে। তিনি প্রতিকার করেন তো ভালোই, তা’ নইলে প্রতিকারের ব্যবস্থা আমাদের করতে হবে। কঠোর হাতে এর প্রতিকার করবো।

হাজ্জায-বিন ইউসুফ যা করবেন বলে ভেবেচিন্তে একবার ঠিক করতেন, কাজেও তা করে ছাড়তেন। তিনি রাজা দাহিরের কাছে এক পত্র পাঠালেন। তিনি লিখলেন,—সিন্ধুর শাসনভার আপনার উপর। কাজেই দস্যু-দমনের দায়িত্বও আপনার। শুধু দস্যু দমন নয় অবিলম্বে বন্দী শিশুদের মুক্তির ব্যবস্থা আপনাকে করতে হবে এবং লুণ্ঠিত মালপত্রের ক্ষতিপূরণও করতে হবে। আশা করি অচিরেই এসব করে আপনি আপনার কর্তব্য করবেন।

দাহির কিন্তু হাজ্জাযের সে পত্রের বিশেষ গুরুত্ব দিলেন না। তিনি ভাবছিলেন, এতো দুর থেকে এসে হাজ্জায কি আর করবেন। তাঁর দেশ থেকে এখানে আসতে হলে পার হতে হবে বিশাল এক মরুভূমি ; তারপরে তেমনি বিশাল সমুদ্র। তাই তিনি স্পষ্টই লিখে দিলেন, দস্যুদের ব্যাপারে আমি কিছুই করতে পারবো না। আপনি এসে তাদের যা খুশি করতে পারেন।

রাজা দাহির যে এরকম জবাব দেবেন হাজ্জায তাহ’ আগেই ভেবেছিলেন। কারণ, রাজা যে লোক ভাল নন তা’ তিনি জানতেন। খলীফা হজরত উমরের (রাঃ) আমলে মুসলমানরা ইরান দখল করে। সে সময়ে মেকরান বলে ইরানের একটা অংশ মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। তখন মেকরানকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করেছিলেন সিন্ধুর রাজা। অবশেষে হাজ্জায শাসনকর্তা হয়ে কঠোর হস্তে মেকরানের বিদ্রোহ দমন করেন। তখন কিছু সংখ্যক বিদ্রোহী প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যায় সিন্ধুর রাজা দাহিরের কাছে। দাহির তাদের উপর খুব দয়ালু হয়ে ওঠেন। তা সত্ত্বেও হাজ্জায রাজা দাহিরের বিরুদ্ধে কিছুই তখন করেননি। তার ফলে দাহির খুব সাহসী হয়ে ওঠেন।

রাজা দাহির মনে করেছিলেন তাঁর পত্র পেয়ে হাজ্জায চুপ করবেন। কিন্তু হাজ্জায ভাবছিলেন, দাহিরকে উচিত শিক্ষা দিতেই হবে। তাছাড়া সিন্ধুর দস্যুদের দমন করতে হবে। তা না করতে পারলে আরবের সওদাগরী জাহাজ আর কখনও পূর্বাঞ্চলে যেতে পারবে না। আরবের সওদাগর বজায় রাখতে হলে সমুদ্দুরের পথ নিরাপদ রাখতেই হবে।

এই ভেবে তিনি সিন্ধু অভিযানের অনুমতির জন্য চিঠি লিখলেন খলীফার কাছে। তখন খলীআ ছিলেন ওলীদ। ওলীদ ভেবে দেখলেন, অভিযান করতে বহু টাকা খরচ হবে। তবু ইসলামের ইজ্জত তাঁকে রক্ষা করতেই হবে। কাজেই তিনি দেবলের জলদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযানের অনুমতি দিলেন।

প্রথম একদল ফৌজ পাঠানো হলো উবায়দুল্লাহর অধীনে। রাজা দাহির জানতেন, দস্যু-দমনের উদ্দেশ্যেই আরব সেনার এ অভিযান, দেশ আক্রমণের জন্য নয়। তবু তিনি আরব সেনা বিতাড়িত করবার জন্য নিজের একদল সৈন্য পাঠালেন। আরব-সেনাপতি উবায়দুল্লাহ এ জন্য তৈরী ছিলেন না। দেশের রাজা দস্যু দমনে বাধা দিবেন একথা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি। অনেক আরব-সৈন্যসহ তিনি যুদ্ধে শহীদ হলেন।

কিন্তু হাজ্জায পিছ-পা হবার লোক নন। তিনি আরেক দল সৈন্য পাঠালেন বুদাইলের অধীনে। বুদাইল ছিলেন নির্ভীক সেনানায়ক। হিন্দু সৈন্যের সঙ্গে তিনি অসীম বিক্রমে যুদ্ধ চালাতে লাগলেন। এমন সময় সহসা এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটলো। ভারতীয় সেনার হাতীগুলি দেখে আরবী-ঘোড়গুলি চঞ্চল হয়ে উঠলো। তাদের বশে রাখা তখন এক মুশকিলের ব্যাপার। এমন কি বুদাইলের নিজের ঘোড়াই তাঁকে মাটিতে ফেলে দিলো। ফলে, তিনিও হিন্দুদের হাতে শহীদ হলেন ; সৈন্যরা আরবে ফিরে এলো।

করাচী-পৃথিবীর অন্যতম প্রসিদ্ধ শহর ও বন্দর। যখনকার কথা তোমাদের বলছি তখন কিন্তু করাচী বলতে কিছুই সেখানে ছিলো না। যেখানে আজ করাচী সেখানে ছিলো ধূ ধূ মরভূমি, তারপরে অকুল সমুদ্দুর। বর্তমান করাচী থেকে পয়ত্রিশ মাইল পূর্বে ছিলো দেবল বন্দর। দেবলই সেকালের সিন্ধুর একমাত্র বন্দর। আজ করাচী হয়েছে কিন্তু দেবল নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এক ভূমিকম্পের ফলে। হয়তো মাটি খুড়লে মহেঞ্জোদাড়োর মতো একদিন বেরিয়ে পড়বে দেবল কোথায় ছিলো দেবলে কি কি ছিলো।

বন্দর হিসাবে দেবল বিখ্যাত তো ছিলোই তাছাড়াও বিখ্যাত ছিলো একটা মন্দিরের জন্য। দেবলের এ মন্দিরকে তখনকার একটি দুর্গ বললেও চলে। মন্দিরের চূড়ায় সর্বক্ষণ উড়তো একটি লাল নিশান। সমুদ্দুরে অনেক দূরে থাকতেই এ লাল নিশান নাবিকদের চোখে পড়তো। কারণ মন্দিরের চূড়াটা ছিলো কম করে চল্লিশ গজ উঁচু।

শহরের মধ্যিখানে ছিলো মন্দিরটা। মন্দিরের ভেতরে ছিলো হিন্দুদের অসংখ্য দেব-দেবীর মূর্তি। এ সব দেব-দেবীর পূজা ও দেখাশুনার জন্য রাখা হয়েছিল সাত শ’ ব্রাহ্মণ নারী-পুরুষ। তারা মন্দিরেই বাস করতো আর দেব-দেবীদের সেবা করতো। মন্দিরের চারপাশ ঘিরে ছিলো শহরের সব দোকানপাট। শহর ঘিরে ছিলো পাথরের শহরের তৈরী সুদৃঢ় প্রাচীর।

এক একে দু’বার সিন্ধু আক্রমণ করে আরবদের দু’বারই হারতে হলো রাজা দাহিরের সৈন্যদের কাছে। হাজ্জায দেখলেন প্রথমে ব্যাপারটা যেমন সহজ মনে হয়েছিলো, আসলে তেমন সহজ নয়। তৃতীয়বার সিন্ধু অভিযান করলে পাকাপোক্ত হয়েই করতে হবে। শুধু অভিযানই নয়, সিন্ধু জয় করে ফিরে আসতে হবে। এ জন্য চাই বিপুল সংখ্যক সৈন্য আর একজন দক্ষ সেনানায়ক। কাকে পাঠানো যায় এ কঠিন কাজের ভার দিয়ে তিনি তাই ভাবতে লাগলেন।

ভাবতে ভাবতে মনে পড়লো মোহাম্মদ-বিন-কাসেমের কথা। ইমাদ উদ্দিন মোহাম্মদ-বিন কাসেম হাজ্জাযের ভাইপো। শুধু ভাইপো নয়–জামাতাও; কিন্তু তখন তাঁর বয়েস ছিলো কতো শুনবে ?-মোটে সতেরো বছর। এ বয়েসেই তিনি ছিলেন তখন ইরানের ‘রায়ী’ নামক জায়গার শাসনকর্তা। ছেলেবেলা থেকেই মানুষকে বশে রাখবার, তাদের ওপর নেতৃত্ব করার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিলো মোহাম্মদ-বিন-কাসেমের। সে জন্য অতো অল্প বয়েসেই তাঁকে ‘রায়ী’র শাসনভার দেওয়া হয়েছিলো। আজ তাই সিন্ধু আক্রমণ করতে গিয়ে মোহাম্মদ-বিন-কাসেমের ডাক পড়লো। তাঁকে ছাড়া আর কোনো উপযুক্ত সেনানায়ক হাজ্জায খুঁজে পেলেন না। কেউ কেউ অবশ্যি বললেন, এতো বড়ো কঠিন কাজ একজন বালক সেনাপতি সমাধা করতে পারবেন কি করে ?

হাজ্জায তখন বললেন, ইসলামের ইতিহাসে বালক সেনাপতির নজির আরো আছে। উসামা-বিন-জায়েদের কথা তোমরা ভুলে গেলে কি করে ? তিনিও কি বয়েসে বালক ছিলেন না ?

অবশেষে কেউ আর আপত্তি করলো না। মোহাম্মদ-বিন-কাসিম ‘রায়ী’র শাসনভার অপরের উপর দিয়ে চলে এলেন সিরাজ নগরে। সেখান থেকেই যুদ্ধযাত্রার আয়োজন চলতে লাগলো। সে বারের আয়োজন আগের দু’বারের মতো নয়। খলীফার সেরা সৈন্যরা সব এগিয়ে এলো সিন্ধু অভিযানের নামে। সিরিয়া থেকে দু’হাজার বাছাই করা ঘোড়া আনা হলো, উটও আনা হলো অনেক। তিন হাজার উটের পিঠে চাপানো হলো সৈন্যদের মোটবহর আর রসদ। মানুষের যা কিছু প্রয়োজন হতে পারে সবই রয়েছে সেই মোট-বহরের ভেতরে। আরব-সৈন্যরা সিরকা বা ভিনিগার খেতে খুব ভালোবাসে। সিন্ধু দেশে সিরকা পাওয়া যাবে না। হাজ্জায সেই সিরকা অবধি সঙ্গে দিতে ভুললেন না। সিরকায় কার্পাস তুলো ভিজিয়ে সেই তুলো শুকিয়ে নেওয়া হলো। পরে সে তুলোই আবার গরম পানিতে ভিজালে টাটকা সিরকা পাওয়া যাবে। এক কথায়, সৈন্যদের টুকিটাকি যা-কিছু দরকার হতে পারে সবই দেয়া হলো সঙ্গে।

সব আয়োজন সমাধা হলো। ঠিক হলো, গোলন্দাজ সৈন্যরা যাবে জাহাজে। বুঝতেই পারছো, তখনও লোহার কামান আবিষ্কার হয়নি। কাঠের তৈরী এক রকম কামান ছিলো আরবদের। একটি কামানও বেছে নেওয়া হলো সিদ্ধ অভিযানের জন্য। সে কামান যে সে কামান নয়। কামানটি ছিলো এতো বড়ো যে পাঁচশ লোক খাটে তার পেছনে। লোহার কামান যেমন ছিলো না, বারুদও ছিলো না। তোমরা হয়তো ভাবছো, বারুদ ছিলো না, তাহলে এসব কামান দিয়ে কি করতে তারা ? বড়ো বড়ো পাথরের খণ্ড শত্রুদের উপর ছুড়ে মারা হতো কাঠের কামানের সাহায্যে।.

মোহাম্মদ-বিন-কাসেম নিজে যাত্রা করলেন হাঁটা পথে। মেকরানে এসে পৌঁছাতে আগের দু’বারের অভিযানের ফেরত লোকরাও এসে যোগ দিলো তাঁর সঙ্গে। আরব সৈন্যরা সীমান্ত পার হয়ে সিন্ধু দেশে গিয়ে ঢুকলো। তখনো দাহিরের সৈন্যদের সাথে দেখা নেই। আরব-সৈন্য তখন এগিয়ে যেতে লাগলো দেবলের দিকে।

দেবলের মন্দির সাত শ’ পূজারী ছাড়া আরও প্রায় হাজার তিনেক ব্রাহ্মণ ছিলো শহরে। নেড়ামাথা সে সব ব্রাহ্মণরাও মন্দিরের দেখাশুনা করতো। তা’ছাড়া নগর রক্ষার জন্য ছিলো চার হাজার রাজপুতের এক সেনাবাহিনী।

মোহাম্মদ-বিন-কাসেম এসে একদিন হানা দিলেন সেই দেবলে। সিন্ধুর উপকূল সহসা সেদিন সরগরম হয়ে উঠলো আরব-সৈন্যের আগমনে। গোলন্দাজ সৈন্যরা পৌছে গেছে আগেই। নৌ-যুদ্ধ কাকে বলে দাহিরের সৈন্যরা তা’ জানে না।

কাজেই আরবের গোলন্দাজ নৌ-বাহিনীর আক্রমণ রাজপুত বীরদের পক্ষে মারাত্মক হয়ে উঠলো। ভয় পেয়ে তারা শহরের ভেতরে ঢুকে প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দিলো। শুধু তাই নয়, অনেকে গিয়ে আশ্রয় নিলো মন্দিরের ভেতর। তাদের বিশ্বাস ছিলো মন্দির রক্ষা করতে মন্দিরের দেবতারাই যথেষ্ট। দেবতার অলৌকিক প্রভাবেই মন্দির থাকবে। মন্দির নিরাপদ থাকলে তাদের আর ভয় কিসের?

মোহাম্মদ-বিন-কাসেম তখন শহরের চারদিক ঘেরাও করে ফেললেন তাঁর সৈন্য দিয়ে। একদিন দু’দিন করে সাতদিন অবধি চললো এমনি অবরোধ। সময় সময় দু’দশ জন হিন্দু সেনা উঁকি ঝুঁকি দেয় প্রাচীরের ফাঁক দিয়ে। তাদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়। আসলে সৈন্য লুকিয়ে থাকে ভেতরে। কিন্তু এ যুদ্ধে যুদ্ধই নয়। এ রকম যুদ্ধের জন্য তৈরী হয়ে আরব-সৈন্য সিন্ধ অভিযান করেনি।

মন্দিরের ভেতর তখন কি হচ্ছে বাইরে জানবার উপায় নেই। মোহাম্মদ-বিন-কাসেম চাইছিলেন যতো শিগগীর সম্ভব মন্দির অধিকার করতে। কিন্তু হিন্দু সৈন্য মন্দিরের দরজা এঁটে চুপচাপ বসে থাকলে তা সম্ভব কি করে হবে?

মোহাম্মদ-বিন-কাসেমের ভাগ্যি বলতে হবে। এক ব্রাহ্মণ এলো একদিন মন্দির থেকে বের হয়ে। মন্দিরের ভেতরে নিরানন্দ বন্দী জীবন তার আর সহ্য হচ্ছিলো না। তাকে ধরে এনে হাজির করা হলো মোহাম্মদ-বিন-কাসেমের কাছে। তিনি কিন্তু তাকে কোনো রকম শাস্তি দিলেন না বরং তার সঙ্গে সদয় ব্যবহার করলেন। মন্দিরের ভেতর কি হচ্ছে তাই জানবার চেষ্টা করলেন। কথায় কথায় সেই ব্রাহ্মণ বললো,-মন্দিরের ভেতর আছে মন্তর পড়া একটি রক্ষা কবচ। যতোদিন আপনারা সেই রক্ষা কবচের কিছু একটা অনিষ্ট না করতে পারবেন ততোদিন মন্দিরের কিছুই করতে পারবেন না। ওই যে দেখছেন লাল নিশান উড়ছে মন্দিরের চূড়ায়, ওই নিশানের গোড়ায় রাখা আছে সেই কবচ। কার সাধ্যি রক্ষা কবচ না সরিয়ে মন্দিরের অনিষ্ট করবে ?

ব্রাহ্মণের কথা শুনে বালক মুসলিম সেনাপতি প্রথমে হাসলেন মনে মনে। অবশেষে কিন্তু ব্রাহ্মণের সেই হাসির কথায় তার উপকার হলে যথেষ্ট। মোহাম্মদ-বিন কাসেম ভাবলেন, মানুষের মনোবল অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে পারে। ব্রাহ্মণের এ সরল বিশ্বাস কুসংস্কার ছাড়া কিছুই নয়। হয়তো এ কুসংস্কারই তাদের মনোবল ষোগাচ্ছে। মন্দিরের চড়াটা কোনো রকমে ভাঙতে পারলে হিন্দুদের সেই মনোবল যাবে কমে। তখন তারা উপায়ন্তর না দেখে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হবে।

গোলন্দাজদের দলপতি ছিলেন জারিয়া। তখখুনি ডাকা হলো তাঁকে। হুকুম হলো, মন্দিরের চূড়া লক্ষ্য করে কামান ছুঁড়তে। কামান ছুঁড়ে প্রথমে চূড়াটা ভেঙে ফেলতে হবে।

জারিয়া তাঁর কামান নিয়ে তৈরীই ছিলেন-শুধু হুকুমের ছিলো অপেক্ষা। একবার, দু’বার তিনবারের বার পাথরের ঘা খেয়ে মন্দিরের চূঁড়া ভেঙ্গে মাটিতে পড়লো। সেই সঙ্গে ধূলায় লুটিয়ে পড়লো তাদের এতো দিনের সেই নিশান। কবচও আর রক্ষা করা গেল না।

ব্যাপার দেখে শহরের সবাই তো অবাক। প্রথমেই মন্দিরের রক্ষা কবচ নষ্ট হবে একথা তারা স্বপ্নেও ভাবেনি। নিজের চোখ কানকে তারা যেনো বিশ্বাস করতে পারছিলো না। মন্দিরের দেবতাও অবশেষে হার মানলো বিদেশী বিধর্মীর কাছে ? এখন তাহলে ভরসা কিসের ? কিসের ভরসায় তারা মন্দিরে বন্দী হয়ে থাকবে ? রাজপতিরা তখন ঝাঁপিয়ে পড়লো আরব সৈন্যদের ওপর।

এদিকে সেনাপতি মোহাম্মদ-বিন-কাসেম হকুম দিলেন দেওয়ালে মই লাগাও। মই লাগিয়ে সব ঢুকে পড়ো শহরের ভেতর। তখন সত্যিকার যুদ্ধ আরম্ভ হলো দু’দলে। তিন দিন তুমুল যুদ্ধের পর দাহিরের সৈন্যরা পরাজয় স্বীকার করলো। এতো দিনে দেবল এলো মুসলমানদের অধীনে। দেবলের গর্ব খর্ব হলো এতো দিনে।

মোহাম্মদ-বিন-কাসেম তখন দাহিরের সৈন্যদের যা খুশী করতে পারতেন। মন্দির আর শহর ভেঙে চুরমার করেও দিতে পারতেন ; কিন্তু তিনি সে সব কিছু করলেন না। ভাবলেন, তরবারি দিয়ে মানুষের মন জয় করা যায় না। মন জয় করা কঠিন। কাজেই অবশেষে সেই কঠিন। কাজই বেছে নিলেন মোহাম্মদ বিন কাসেম। তিনি নিজের দলের কাউকে মন্দিরে ঢুকতে দিলেন না। মন্দিরের পূজারীরা যেমন ছিলো তেমনি রইল। এমনকি শহরের হিন্দু শাসনকর্তাও কাজে বহাল রইলেন।

দেবল ছেড়ে যাবার আগে মোহাম্মদ-বিন-কাসেম শুধু একটি কাজ করলেন। ‘শহরে মুসলমানদের বাসের জন্য পথক একটা অঞ্চল তৈরী করে দিলেন। সে অঞ্চলে একটা মসজিদও তৈরী করা হলো। এটাই হলো ভারতের মাটিতে প্রথম মসজিদ।

আরবরা কিন্তু বরাবরই তাই করেছে। যে দেশ তারা জয় করেছে সে দেশেই প্রথমে তৈরী করেছে একটা মুসলমান বস্তি। বস্তিতে একটা মসজিদ। তারপর সেখান থেকে ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্বভাব, সুবিচার ও শান্তির বাণী ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। সারা দেশের মানুষের মন তারা জয় করে নিয়েছে সহজ ভালবাসা দিয়ে।

দেবল জয় করা হলো। দেবল জয়ের পর সেই আরব বন্দীদেরও মুক্ত করা হলো। কিন্তু দেবল জয় করাই সব কিছু নয়। রাজা দাহির কোথায় ? তখনও দাহির রয়েছেন বাকি। তাঁকেও যে উচিত শিক্ষা দিতে হবে।

দেবল বন্দরের পতন হয়েছে শুনে রাজা দাহির উঠলেন একেবারে ক্ষেপে। তিনি মোহাম্মদ-বিন-কাসেমকে লিখলেন,–দেবল জয় করেছো বলে ভেবো না সব কিছু জয় করা হয়েছে। শিগগীর সিন্ধু দেশ ছেড়ে চলে যাও, নইলে তোমাকেও প্রাণ হারাতে হবে আগের সেনাপতিদের মতো। আমার সৈন্যদের মোকাবিলা করতে এসে তুমি কেনো এ তরণ বয়সে প্রাণ হারাবে?

জবাবে মোহাম্মদ-বিন কাসেম লিখলেন,–তুমি গর্ব করে হাতী ঘোড়ার, তোমার সৈন্যদের। আমরা ভরসা করি একমাত্র আল্লাহর ওপর। একমাত্র তিনিই আমাদের জয়ী করবেন, আমাদের মান ইজ্জত বজায় রাখবেন। আমরা যুদ্ধ করতে এসেছি কাজ ফেলে প্রাণ নিয়ে পালাতে আসিনি। শেষ অবধি আমরা যুদ্ধ করবো। তাতে প্রাণ গেলেও ক্ষতি নেই ; মুসলমান আমরা-প্রাণের ভয় করিনি।

চিঠির জবাব দিয়েই মোহাম্মদ-বিন-কাসেম সিন্ধুর অভ্যন্তরে চললেন। সেখানে থেকে পঁচাত্তর মাইল পূর্ব-উত্তর কোণে ছিলো নিরুন দূর্গ। এখন যেখানে সিন্ধুর হায়দ্রাবাদ শহর সেখানে ছিলো এ দূর্গ। দুর্গ রক্ষার ভার ছিলো দাহিরের ছেলে জয়সিংহের ওপর। মুসলিম সেনাপতির চিঠি পেয়ে দাহির বুঝতে পারলেন, হুমকিতে মুসলমানদের তাড়ানো এবার সহজ হবে না। তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হলে শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। তিনি পুত্র জয়সিংহকে লিখলেন নিরুন ছেড়ে তাঁর সঙ্গে এসে যোগ দিতে। একজন পুরোহিতের ওপর দূর্গের ভার দিয়ে জয়সিংহ চলে গেলেন পিতার কাছে।

আরবদের সৈন্যবল কম হলেও বিক্রমে তারা যে কম নয় নিরুনের পুরোহিত তা জানতেন। তাছাড়া মুসলমানদের ব্যবহার ভালো তাও তিনি শুনেছিলেন। কাজেই বৃথা শক্তির পরীক্ষা না করে তিনি আত্মসমর্পণ করলেন। নিরুন দূর্গ সহজেই মুসলমানদের অধিকারে এলো। নিরুনে কিছু বিশ্রাম করে মোহাম্মদ-বিন-কাসেম পুনরায় চললেন সেহওয়ান শহরের দিকে। আট মাইল দূরে ছিল সে শহর। শহরের শাসনকর্তা ছিলেন দাহিরের আত্মীয়। সেহওয়ানের অধিবাসীরা বাঝরাকে পরামর্শ দিলো আত্মসমর্পণ করতে। কিন্তু বাঝরা তা কানে তুললেন না। তিনি চাইলেন যুদ্ধ করতে। অবশেষে শহরের লোকদের সমর্থন না পেয়ে তিনি প্রাণ নিয়ে পালাতে বাধ্য হলেন। পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিলেন কুম্ভ নদীর পারে রাজা কাকার কাছে। বাঝরা ছিলেন অত্যাচারী শাসক। এজন্য সে শহরের লোকেরা তাঁকে আদৌ পছন্দ করত না। কাজেই তাঁর হাত থেকে রেহাই পেয়ে সেহওয়ানবাসী হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। মোহাম্মদ-বিন-কাসেমকে তারা জয়ধ্বনি তুলে সমাদরে গ্রহণ করলো। কাজেই মোহাম্মদ-বিন-কাসেমও শুধুমাত্র জিজিয়া কর আদায়ের ওয়াদা করিয়ে তাদের সমস্ত অধিকার ছেড়ে দিলেন। তারা যেমনটি ছিলো তেমনি রইলো ; বরং আগের চেয়েও সুখে স্বচ্ছন্দ, তাঁরা বসবাস করতে লাগলো।

এমনি করে তরল সেনাপতি মোহাম্মদ-বিন-কাসেম দেশের পর দেশ জয় করে চলেছেন। শুধু দেশই তিনি জয় করলেন না, দেশের সঙ্গে মানুষের মনও জয় করলেন। তাঁর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো দেশের নানা দিকে। তিনি সেহওয়ানে থাকতেই বিভিন্ন শহরের লোকেরা দলে দলে এসে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করতে লাগলো। অনেক জায়গার মন্দিরের পুরোহিত পূজারীরাও এলো বশ্যতা স্বীকার করতে। এর কারণ, দাহির ছিলেন অত্যাচারী রাজা। তাঁর অন্যায় অত্যাচারে প্রজারা ছিলো অস্থির। পক্ষান্তরে তার মোহাম্মদ বিন কাসেমের দয়ার কথাও শুনেছিলো। তারা জানতে শুধু জিজিয়া কর দিলেই স্বচ্ছন্দে ধর্ম কর্ম বজায় রেখে দেশে বসবাস করা যায়। মোহাম্মদ-বিন-কাসেম বঝতে পারলেন, অত্যাচারী দাহিরকে প্রজারা কেউ ভালোবাসে না, বরং ঘৃণার চোখে দেখে।

তখন মোহাম্মদ-বিন-কাসেম বুদ্ধি করে সিন্ধুর লোকদেরই ভর্তি করাতে লাগলেন সেনাদলে। দরকার হলে তারাই যুদ্ধ করবে দাহিরের বিরুদ্ধ। মোহাম্মদ দাকফি নামে আরবের একজন রাজকর্মচারী এমন করে চার হাজার ভারতীয় ভর্তি করে ফেললেন সেনাদলে। শত্রুর প্রতি মুসলমানদের দয়া, তাদের সহৃদয় ব্যবহার ও সহনশীলতা দেখে হিন্দুরা অবাক হয়ে গেলো।

এদিকে হাজ্জায নিজে কিন্তু এসব পছন্দ করতেন না। তিনি প্রতিমা পূজার নাম শুনতে পারতেন না। প্রতিমা-পূজা উঠে যাক এই ছিলো তাঁর ইচ্ছা। পরে অবশ্য তিনি বুঝতে পারলেন, মোহাম্মদ-বিন-কাসেমের নীতিই উত্তম। অবশেষে এ নীতির বলেই মোহাম্মদ-বিন-কাসেম সিন্ধুর অধিকাংশ দেশ জয় করলেন। একমাত্র দেবল ছাড়া কোথাও তাঁকে তরবারির ব্যবহার করতে হলো না। ফলে রাজা দাহিরকে বশে আনার পথও অনেকটা সহজ ও সুগম হলো।

একমাত্র জাঠদের নগর সিসাম ছাড়া সিন্ধুর পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় সবটাই এখন মোহাম্মদ-বিন-কাসেমের অধীনে। অবশেষে নামমাত্র যুদ্ধের পরে সিসামের জাঠ-রাজা কাকাও বশ্যতা স্বীকার করলেন, তিনি স্বেচ্ছায় এসে যোগ দিলেন মুসলমানদের সঙ্গে।

এবার হাজ্জায হুকুম করলেন নিরুনে ফিরে আসতে। নিরুনে এসে সিন্ধুনদ পার হতে। সিন্ধুনদ পার হয়ে ব্রাহ্মণাবাদে আক্রমণ করতে হবে এবার। ব্রাহ্মণাবাদে তখন দাহির আর জয়সিংহ যুদ্ধের আয়োজনে ব্যস্ত। সেখানে গেলে পিতা-পুত্র উভয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের সম্ভাবনা।

হাজ্জাযের হকুম পেয়ে মোহাম্মদ-বিন-কাসেম ফিরে এলেন নিরুনে। এসে তিনিও যুদ্ধের আয়োজন করতে লাগলেন। এ সময়ে কয়েকটা অসুবিধা দেখা দিলো। সিন্ধুনদ পার হতে হলে অনেক নৌকার দরকার ; কিন্তু সে নৌকা কোথায়? তাছাড়া, অনেক দিন কাঁচা শাক-সব্জী না খেয়ে আরব সৈন্যদের মধ্যে দেখা দিল স্কার্ভী রোগ। শুধু তাই নয়, এ দেশের আবহাওয়া অসহ্য হওয়ায় আরবদের কতকগলি ঘোড়াও এ সময় মরে গেলো।

অসুবিধা দেখে মোহাম্মদ-বিন-কাসেম কিন্তু পিছ-পা হলেন না। তিনি অনেকগুলি নৌকা তৈরীর হকুম দিলেন। এদিকে হাজ্জায খবর পেয়ে দু’হাজার ঘোড়া পাঠালেন আর সৈন্যদের জন্য পাঠালেন প্রচুর সিরকা। সিরকা খেলে স্কার্ভী রোগ সারে বলে আরবরা বিশ্বাস করতো। পরে যে কারণেই হোক আরব সৈন্যদের স্বাস্থ্য ফিরে এলো। ততদিনে নৌকাও অনেকগুলি তৈরী হয়ে গেলো। এবার অভিযানের পালা।

সাত শ’ বারো খ্রীস্টাব্দের জুন মাসে একদিন আরব-সৈন্য এসে সিন্ধুনদের পারে জমা হলো—নদী পার হয়ে ওপারে যাবার জন্য। ওপারে যাবার আগে মোহাম্মদ-বিন-কাসেম কয়েকজন দূত পাঠালেন রাজা দাহিরের কাছে। হিন্দু রাজা দাহির সিন্ধুর এপারে এসে যুদ্ধ করতে চান কিনা তাই জানবার জন্য পাঠানো হলো দূত। তিনি এপারে না এলে আরব-সৈন্যদের ওপারে যাবার সুযোগ যাতে রাজা দেন, তাও বলে পাঠানো হলো।

দূতদের ভেতরে একজন ছিলো দেবলের ব্রাহ্মণ। দেবলের যুদ্ধের পর সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছে।

খবর পেয়ে রাজা মুসলিম দতদের দরবারে ডেকে পাঠালেন। তারা সরাসরি দরবারে ঢুকে নিজেদের রীতি অনুযায়ী রাজাকে অভিবাদন জানালো।

হিন্দুরাজা দাহিরের নিয়ম ছিলো, দরবারে কেউ গেলে রাজাকে অভিবাদন করতে হবে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে। রাজা দাহির তাঁর দরবারে আজ প্রথম দেখলেন সেই চিরকেলে নিয়মের ব্যতিক্রম। তিনি মনে মনে ভয়ানক রেগে গেলেন। বিশেষ করে রাগলেন সেই ব্রাহ্মণের ওপর। রেগে বলে উঠলেন, রাজসভার চিরকালের রীতি তুমি ভুললে কি করে ? জানো এর কি শাস্তি, মূর্খ ব্রাহ্মণ ?

নও মুসলিম জবাব দিলো, আপনি শুনে খুশী হবেন কিনা জানি না, আমি এখন মুসলমান, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি, আমি এক আল্লাহ, ছাড়া আর কারো কাছেই এখন মাথা নোয়াতে পারি না।

রাজা মনে করেছিলেন, লোকটা এখখনি তাঁর কাছে ক্ষমা চাইবে কিন্তু ক্ষমা না চেয়ে সে যা বললো তাতে রাজা আরও চটে গেলেন। চটে গিয়ে বললেন, জেনে রেখো ব্রাহ্মণ, তুমি দূত না হলে এতোক্ষণে তোমার কাটা মাথা ধূলায় গড়াগড়ি দিতো।

লোকটা তখন আবার বললো, দুত না হলে নয় রাজা, মুসলমান না হয়ে আর কেউ হলে আপনি তার মাথা কাটতে পারতেন। মুসলমান এসে কখখনো তার মাথা মাটিতে ঠেকিয়ে আপনাকে অভিবাদন করবে না।

দাহির এ কথার কোনই জবাব দিতে পারলেন না। ভেতরে ভেতরে তিনি শুধু রাগে ফুলতে লাগলেন। তারপর ভাবতে লাগলেন মোহাম্মদ-বিন-কাসেমকে কি খবর তিনি পাঠাবেন। মন্ত্রীদের মত চাওয়া হলো। তাঁরা এ ব্যাপারে একমত হতে পারলেন না। একদল বললেন,-আরবদের নদীর এপারে কিছুতেই আসতে দেবেন না রাজা! তারা এসে নদীর পূর্ব পারে একবার পা ফেললে আর কোনোদিন সম্ভব হবে না তাদের তাড়ানো।

আরেক দল বললেন,–নদী পার হয়ে আসুক আরবরা। এপারে আসা মানেই হবে সেধে এসে ফাঁদে পা দেওয়া। আমাদের সৈন্যরা সামনে থেকে তাদের পথ বন্ধ করে দাঁড়াবে আর পিছনে থাকবে নদী। তখন হয় তারা নদীতে ডুববে অথবা তরবারির আঘাতে মরবে।

রাজা দু’তরফের মতামতই চিন্তা করে দেখলেন। অবশেষে মনস্থির করে বললেন, তোমাদের সেনাপতিকে গিয়ে বললো, আমরা নদী পার হয়ে ওপারে যেতে রাজী নই, তাছাড়া তাদেরও এপারে আসতে দিতে রাজী নই।

বোঝা গেলে, রাজ্য কোনো প্রস্তাবই মানতে রাজী নন!

আরব-সৈন্য সিন্ধুদেশে পৌছাবার পর থেকেই দাহির ব্যস্ত ছিলেন তাদের তাড়াবার আয়োজনে। মোহাম্মদ-বিন-কাসেম যখন শহরের পর শহর জয় করতে লাগলেন দাহির তখন সৈন্যসংখ্যা বাড়াবার কাজে উঠে পড়ে লাগলেন। তাঁর সৈন্যবলের কাছে আরবরা ছিলো নগণ্য। তবু দাহিরের ভয় হতে লাগলো আরবরা এরই মধ্যে সব জায়গায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বলে। দাহিরের শাসনে খুব কম লোকই সুখী ছিলো। এ কারণে মুসলমানরা তাদের স্বাভাবিক উদারতা নিয়ে যেখানেই গেছে সেখানেই অসংখ্য লোকের সমর্থন পেয়েছে।

সেই ভয়েই দাহিরকে বিপুলসংখ্যক সৈন্য সংগ্রহ করতে হলো, সেই সঙ্গে সংগ্রহ করতে হলো বহু হাতী ও ঘোড়া। তখন দাহিরের ঘোড়ার সংখ্যা দাঁড়ালো পঞ্চাশ হাজার। কাজেই বুঝতে পারছো তাঁর সৈন্যসংখ্যা ছিলো কতো বিপুল আর হাতীই বা ছিলো কতো। আয়োজন সমাধা হলে রাজা দাহির ব্রাহ্মণাবাদ ছেড়ে রওয়ার দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন।

নৌকা ছাড়া সিন্ধুনদ কি করে পার হবেন মোহাম্মদ-বিন-কাসেমের তাই ছিলো ভাবনার বিষয়। তার পরে নৌকা তৈরী হলো। এবার নৌকা বোঝাই হয়ে দলে দলে ওপারে যাওয়ার পালা। ঠিক সে সময় নৌকা দিয়ে সেতু তৈরীর চমৎকার এক পরামর্শ দিয়ে পাঠালো হাজ্জায। তাঁর পরামর্শ মতো একটা নৌকার গায়ে আরেকটা বেধে এপার থেকে ওপার অবধি একটা সেতু তৈরী হয়ে গেলো। সেই সেতুতে প্রথম গিয়ে ওপারে উঠলো গোলন্দাজ বাহিনী।

আগে থেকেই দাহিরের সৈন্যরা ওপারে দাঁড়িয়ে ছিলো তৈরী হয়ে। আরব-সৈন্য পারের কাছাকাছি যেতেই তারা সহসা তাদের আক্রমণ করলো। এজন্য আরবের সৈন্য তৈরী হয়েছিলো। তারা অনায়াসে হিন্দু সৈন্যদের সরিয়ে পারে গিয়ে উঠলো। কিছুক্ষণ পরে হিন্দু সৈন্যদের একজনকেও খুঁজে পাওয়া গেলো না সিন্ধু নদের তীরে।

সিন্ধু তীর ছেড়ে একটু দুরেই ছিলো রাওয়ার। সেখানে রাজা দাহিরের শিবির। মোহাম্মদ-বিন-কাসেম সসৈন্যে সেই রাওয়ারে গিয়ে হাজির হলেন। তখন দেখা গেলো, হিন্দসৈন্য হবে আরব সৈন্যের পাঁচগুণ। তার ওপর আরব সৈন্য এসেছে বিদেশে যুদ্ধ করতে! তবু হিন্দু সৈন্যদের মনে কেমন একটা অজানা ভয়। কয়েক দিন অবধি দু’দল সৈন্যের কেউ কাউকে আক্রমণ করলো না-সামনা-সামনি দাঁড়িয়ে রইলো। দাহির দেখলেন, যত দিন যাবে সৈন্যদের মনোবল ততোই কমে আসবে। দেশের লোকও মনে করবে, এতোদিন ধরে যশ্বের আয়োজন করেও তিনি যুদ্ধ করতে সাহস করছেন না। কাজেই আর দেরী নয়।

সাত শ’ বারো খৃষ্টাব্দের বিশ-এ জুন। রাজা দাহির তাঁর হাতীর পিঠে চড়ে আরব-সৈন্যদের আক্রমণ করতে উদ্যত হলেন। মোহাম্মদ-বিন-কাসেম জানতেন, এখখনি শুরু হবে প্রকৃত যুদ্ধ। তিনি যুদ্ধে নিহত হলে কে এরপর সেনানায়ক হবেন তা আগেই তিনি ঠিক করে রাখলেন। সামান্য পদাতিক থেকে সেনাপতি অবধি সবাই প্রাণপণ যুদ্ধের জন্য তৈরী। একমাত্র আল্লাহর ওপর তাদের নির্ভর।

দাহির ভাবছিলেন, সৈন্য-সংখ্যার বলেই তিনি আরবদের ধংস করতে পারবেন। তাছাড়া তাঁর রয়েছে অগণন হাতী। গত দু’বারে হাতীর সাহায্যেই তাঁর সৈন্যরা মরুবাসী আরবদের অনায়াসে তাড়িয়েছে। হাতী তারা দেখেনি, হাতীর যুদ্ধে তার অভ্যস্ত নয়।

এদিকে গত যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আরবরাও ভুলতে পারেনি। হাতীর কবল থেকেই রেহাই পাবার উপায় তারা বের করেছে। কেরোসিন তেলের সঙ্গে আরও কি সব মিশিয়ে তারা এক রকম রাসায়নিক দ্রব্য তৈরী করেছে। তাতে তুলো ভিজিয়ে সেই ভেজা তুলো বেঁধে দেওয়া হলো তারের মাথায় তারপর তীরের মাথায় আগুন লাগিয়ে আরবরা ছুড়তে লাগলো রাজা দাহিরের হাতী লক্ষ্য করে।

ভারী এক মজার ব্যাপার ঘটলো তাতে। কয়েকবার চেষ্টার পরেই জ্বলন্ত একটা তীর গিয়ে বিঁধলো দাহিরের হাওদায়। দেখতে দেখতে আগুন ছড়িয়ে পড়লো হাতীর সারা গায়ে হাতী তখন পালাতে পারলে বাঁচে। প্রাণপণ শক্তিতে সে ছুটতে লাগলো নদী লক্ষ্য করে। এদিকে আরবরা অন্য হাতীর দিকে মনোযোগ দিলো। এমনি করে আরও একটা হাতীর গায়ে আগুন লেগে গেলো। তখন পাগলা হাতীর ছুটাছুটি শরণ হলো লড়াইয়ের ময়দানে। হিন্দু-সৈন্যদের হাতীদের বড়াই মুহূর্তে ঘুচে গেলো।

রাজা দাহিরের হাতী ততোক্ষণে নদীতে গিয়ে নেমেছে। দু’তিন জন মাহুত মিলে অতি কষ্টে সে হাতী ফিরিয়ে নিয়ে এলো। আবার শুরু হলো যুদ্ধ। দাহির সত্যিই এবার বেপরোয়া হয়ে উঠলেন। তাঁর দেখাদেখি সৈন্যরাও সাহস ফিরে পেলো। যুদ্ধ ভয়াবহ আকার ধারণ করলো। আরবদের বরাবরই সতর্ক দৃষ্টি ছিলো রাজা দাহিরের দিকে। সহসা একটা তীর তাঁর গায়ে বিধলো। তিনি পড়ে গেলেন হাওদার ওপর থেকে পড়েই উঠলেন একটা ঘোড়ার পিঠে। আবার আগের মতোই যুদ্ধ আরম্ভ হলো। এদিকে সন্ধ্যা তখন ঘনিয়ে এসেছে, সূর্য ডবতে বসেছে। ঠিক এমনি সময়ে একজন আরব তার তরবারির আঘাতে এক হিন্দু ঘোড়সওয়ারকে কেটে দু’টুকরা করে ফেললো। সে তখন বুঝতে পারেনি কাকে সে কেটেছে। কিন্তু হিন্দু সৈন্যরা দেখতে পেলো রাজা দাহিরকেই সে কেটেছে সাধারণ কোনো সৈনিককে নয়। তাই দেখে হিন্দু-সৈন্য যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালাতে আরম্ভ করলো। তাদের একদল পালিয়ে গেলো রাজধানী আরোরের দিকে। দাহিরের ছেলে জয়সিংহের সঙ্গে বাকি সবাই গেলো ব্রাহ্মণবাদে। বহু হিন্দকে সেখানেই বন্দী করা হলো। পরের দিন ভোরে তাদেরকে দিয়ে সনাক্ত করানো হলো রাজা দাহিরের ল্যশ।

বিজয়ী মোহাম্মদ-বিন-কাসেম রাওয়ারে গিয়ে প্রবেশ করলেন। তিনি যাবার বহু আগেই দাহিরের মৃত্যুর সংবাদ পৌছেছে সেখানে। সে দুঃসংবাদ পেয়ে রাণী রাণীবাঈ আত্মাহুতি দিয়েছেন জ্বলন্ত চিতায়। রাণীর ধারণা হয়েছিলো, আরবরা এলে তাকে জোর করে ইসলাম ধর্ম মেনে নিতে বাধ্য করবে; কিন্তু যে আরবদের জন্য এ ভাবনা, রাণীর আত্মাহুতির এ সংবাদে তাদের বিজয়ের আনন্দ আর রইলো না। মোহাম্মদ বিন-কাসেম সবাইকে ডেকে অভয় দিলেন। সবার সঙ্গে সদয় ব্যবহার করতে লাগলেন।

এমনি করে মোহাম্মদ-বিন-কাসেম প্রায় সমুদয় সিন্ধু উপত্যকা জয় করে ফেললেন। এখন তিনি সিন্ধু বাসিন্দাদের যা খুশী করতে পারেন, যে শাস্তি খুশী দিতে পারেন; কিন্তু বিজিত শত্রুর প্রতি নির্দয় ব্যবহার মসলমানের নীতি নয়। এ সময়ে হাজ্জাযও লিখে পাঠালেন,—সৈন্যদের সুখ সুবিধার ব্যবস্হা করে যা কিছু থাকে তার সবই ব্যয় করবে দেশবাসীর কল্যাণে। মনে রেখো, দেশবাসী, বিশেষ করে ব্যবসায়ী, কারিগর, মজুর যে দৈশে সুখী নয়, সে দেশও সুখী নয়। তাদের সুখের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। শুধু মাটির দেশ নয়, দেশের মানুষের মনও তোমাকে জয় করে আসতে হবে। আরেকবার লিখলেন,কখনও ওয়াদার খেলাফ করো না। তা’ হলেই লোকে তোমাকে বিশ্বাস করবে। যারা তোমার বশ্যতা স্বীকার করছে তাদের ওপর সদয় থাকবে, তাদের মন জয় করতে চেষ্টা করবে।

মোহাম্মদ-বিন-কাসেম এ সব উপদেশের একটিও অমান্য করেনি। রাওয়ারে যুদ্ধে হেরে হিন্দু-সৈন্যরা এলো ব্রাহ্মণাবাদে। এখন যেখানে সির হায়দ্রাবাদ সেখানেই ছিলো ব্রাহ্মণাবাদ। শাহজাদপুর তহশিল নামে এখন যে জায়গা, সেখানে গেলে আজও তোমরা অতীতের ব্রাহ্মণাবাদের অনেক চিহ্ন দেখতে পাবে। সেই ব্রাহ্মণাবাদে দাহিরের ছেলে জয়সিংহের সঙ্গে যুদ্ধ হলো আরব-সৈন্যদের ; কিন্তু আরব সৈন্যদের কাছে হিন্দু-সৈন্য টিকতে পারবে কেনো ? তারা শহরে ঢুকে প্রধান প্রবেশ দ্বার বন্ধ করে দিলো। মোহাম্মদ-বিন-কাসেম তখন শহর অবরোধের হকুম দিলেন। বেগতিক দেখে এক রাত্রে জয়সিংহ গেলেন পালিয়ে। কম করেও আট হাজার হিন্দু সৈন্যের প্রাণ হারালো এ যুদ্ধে। শেষ পর্যন্ত আরব-সৈন্য ব্রাহ্মণ্যবাদও দখল করলো। দাহিরের ছোটো রাণী লাদী আর দই রাজকুমারী সুর্যদেবী ও পরিমল দেবী মোহাম্মদ-বিন-কাসেমের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। মোহাম্মদ-বিন-কাসেমও তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা দিতে এতোটুকু কসুর করলেন না।

এরপর আরোর জয়ের পালা। আরোর ছিলো দাহিরের রাজধানী। এখানকার ভার ছিলো দাহিরের অপর ছেলে ফাফির ওপর। ফাফিরের বিশ্বাস, তাঁর পিতা দাহির তখনো বেঁচে আছেন এবং হিন্দুস্থান গেছেন সৈন্য সংগ্রহ করতে। তারপর তাঁর ভুল একদিন ভাঙলো। তিনি বুঝতে পারলেন, রাজা দাহির রাওয়ারের যুদ্ধে সত্যিই প্রাণ হারিয়েছেন। তখন উপায়ান্তর না দেখে এক রাত্রে তিনিও বড়ো ভাই জয়সিংহের মতো পালিয়ে গেলেন। আরবরা অনায়াসে আরোর দখল করে ফেললো।

অন্যান্য শহরের মতো আরোরেও ছিলো একটা মন্দির। মন্দিরের ভেতর কি আছে মোহাম্মদ-বিন-কাসেম একদিন তা দেখতে চাইলেন। সে কথা গেলো প্রধান পুরোহিতের কানে। তিনি সমাদর করে তাঁকে মন্দির দেখাতে ভেতরে নিয়ে গেলেন।

মন্দিরে সেদিন এক মজার ব্যাপার ঘটলো। মন্দিরের মধ্যিখানে পাথরের একটা মূর্তি। মুর্তিটাকে রাখা হয়েছে ঘোড়ায় চড়িয়ে। সারা গায়ে তার ঝলমল করছে সোনার গহনা। মূর্তির সামনে ধর্ণা দিয়ে উপুড় হয়ে পড়ে অসংখ্য ভক্ত। তাই দেখে মোহাম্মদ-বিন-কাসেমের ভয়ানক দুঃখ হলো। পাথরকে মানুষ দেবতা মনে করে এভাবে ভক্তি করতে পারে, তা না দেখে কেউ বিশ্বাস করতে পারে না। মানুষগুলির জন্য দুঃখ হলেও তাদের সরল বিশ্বাসে তিনি আঘাত দিলেন না। তখন একটা তামাসা করবার ইচ্ছে হলো তাঁর। পুরোহিত যখন অন্যদিকে চেয়ে ছিলেন তখন মূর্তির ডান হাতের একটা গহনা তিনি খুলে লুকিয়ে ফেললেন। পুরোহিত কিছুই জানতে পারলেন না। গহনাটা লুকিয়ে তিনি পুরোহিতকে বললেন,—মূর্তির এ হাতটায় গহনা নেই কেনো, নিশ্চয়ই এটা কেউ চুরি করে নিয়েছে ? অবাক হয়ে পুরোহিত দেখলেন, সত্যিই ডান হাতের হীরকখচিত মূল্যবান গহনাখানা নেই। নিশ্চয়ই কেউ চুরি করে নিয়েছে। মন্দিরে যারা আসে তাদেরই এ কাজ। তিনি কোন জবাব দিতে না পেরে দাঁড়িয়ে রইলেন মাথা নিচু করে। মোহাম্মদ-বিন-কাসেম তখন গহনাটা বার করে মূর্তির গায়ে পরিয়ে দিতে দিতে বললেন, পাথরের মূর্তি কখনো দেবতা হয় না। মূর্তি মানুষের ভালোও করতে পারে না, মন্দও করতে পারে না। এমনকি নিজের জিনিসও যে সে রক্ষা করতে পারে না, তা তোমার নিজের চোখেই দেখলে।

সবাই দেখলো, সত্যিই তাই। পাথরের মূর্তির কোনো ক্ষমতাই নেই।

মোহাম্মদ-বিন-কাসেম এ শহরেও মুসলমানদের বাসের জন্য একটা মহল্লা ঠিক করে দিলেন। আগের মতো সেখানেও একটা মসজিদ তৈরী হলো।

আরোর জয়ের পর মোহাম্মদ-বিন-কাসেম এলেন শুক্কুর। শুক্কুর জয় হলো বিনাযুদ্ধে।

পাঞ্জাবের একটা অংশ ছিলো দাহিরের রাজ্যের অন্তর্গত। এবারে মোহাম্মদ-বিন-কাসেম চললেন পাঞ্জাব দখল করতে। পশ্চিম পাঞ্জাবের মূলতান আজও একটি প্রসিদ্ধ শহর। মোহাম্মদ-বিন-কাসেম প্রথম সেখানেই যাবেন। মুলতান যেতে যেতে পথে তিনি একটি দূর্গ পেলেন। কাকসা নামে দাহিরের এক ভাই লুকিয়ে ছিলেন এই দুর্গে। তাঁর সঙ্গে মুসলিম সেনাপতি এতো ভালো ব্যবহার করলেন যে, তিনি শিগগীরই মোহাম্মদ-বিন-কাসেমের একজন বিশ্বাসী বন্ধু হয়ে উঠলেন। সত্যি বলতে গেলে, তখন থেকে কাকসাই হলেন মোহাম্মদ বিন কাসেমের উজির। পরে যেসব যুদ্ধ হয়েছে তার সবই হয়েছে কাকসার পরামর্শে।

মুলতানের পথে রাবি নদীর তীরে সিকা দূর্গ। সতেরো দিন অবরোধের পরে মোহাম্মদ-বিন-কাসেম সিকা দূর্গ অধিকার করেন। যুদ্ধে দুশোর ওপর আরব সৈন্য শহীদ হয়।।

সিকা থেকে আরব-সৈন্য এবার মুলতান পৌঁছালো। মোহাম্মদ বিন-কাসেম মুলতানের শাসনকর্তাকে বলে পাঠালেন,-আমরা সিন্ধুর সবটা জয় করেছি। তুমিও যদি আমাদের বশ্যতা মেনে নাও তবে ভালো ব্যবহার পাবে। তা না হলে যুদ্ধ হবে। যুদ্ধ হলে তোমার ও তোমার লোকেদের কষ্টের অবধি থাকবে না। আশা করি ইচ্ছে করে তোমরা সে কষ্টের পথ বেছে নেবে না।

মুলতানের হিন্দু শাসনকর্তা কিন্তু সে কথায় কান দিলেন না ; বরং তিনি জবাব দিলেন,–দেশ রক্ষা করবার মতো শক্তি আমার আছে। তখন আরম্ভ হলো যুদ্ধ। কয়েক সপ্তাহ অবধি যুদ্ধ চললো, হিন্দুদের পরাজিত করা গেলো না। এদিকে আরব সৈন্যের রসদ এলো ফরিয়ে ঠিক এমনি সময়ে এক রাত্রে একজন হিন্দু এলো দুর্গ থেকে পালিয়ে। পালিয়ে এসে মোহাম্মদ-বিন-কাসেমের সঙ্গে দেখা করে বললো-মুলতানের শাসনকর্তাকে সহজে কি করে বশে আনতে পারবেন তা’ আমি বলে দিতে পারি। কাছেই যে খালটা দেখছেন সেখান থেকে পানি সরবরাহ হয় শহরে। পানি সরবরাহ বন্ধ করতে পারলেই মুলতানে হাহাকার লাগবে, শাসনকর্তা নতি স্বীকার করতে বাধ্য হবেন।

মোহাম্মদ-বিন-কাসেম দেখলেন, চমৎকার পরামর্শ দিয়েছে লোকটা। তিনি তখন খালের মুখ সত্যিই বন্ধ করে দিলেন। দু’দিন না যেতেই মুলতানও আরব-সৈন্যের দখলে এসে গেলো।

দেশের সবচেয়ে সেরা মন্দির ছিলো মুলতানে। দুর দুরান্তের হিন্দুরা আসতো সেখানে পূজা দিতে। পূজা দিতে এসে তারা অনেক টাকাপয়সা আর গহনাপত্র দিয়ে যেতো তাদের দেবতাকে। এমনি করে অনেক দিনের অনেক ধনরত্ন জমা হয়েছিলো এ মন্দিরে।

তাছাড়া মন্দিরের প্রধান দেবতার মূর্তিটাও তৈরী সোনা দিয়ে। একজন ব্রাহ্মণ মোহাম্মদ-বিন-কাসেমকে গোপনে খবর দিলো দেবতার মূর্তির নীচেই মেঝেয় পোতা রয়েছে অনেক ধনরত্ন। বহুকাল থেকে সে সব জমা হয়ে আসছে।

পরে দেখা গেলো, ব্রাহ্মণ সত্যি কথাই বলেছে। মেঝে খুঁড়ে অনেক ধনরত্ন মণিমুক্তা সেখানে পাওয়া গেলো। সব ধনরত্নের পাঁচ ভাগের একভাগ পাঠানো হলো হাজ্জাযের কাছে। বাকি সবই ভাগ করে দেওয়া হলো আরব-সৈন্যদের ভেতর। আগের দিনে তাই ছিলো চলতি নিয়ম। যুদ্ধ জয় করে যা কিছু জিনিস পাওয়া যেতো তার ভাগ সৈন্যদেরও দেওয়া হতো। শুধু মুলতান থেকে মোহাম্মদ-বিন-কাসেম নিজের ভাগে কতো পেলেন শুনলে তোমরা অবাক হবে। তিনি পেলেন বারো লাখ দেরহাম। তখন হিসাব করে দেখা গেলো সিন্ধু-অভিযান আরবদের মোট খরচ হয়েছে। দু’লাখ দেরহাম। কাজেই দেশ জয় করা তো হলোই উপরন্তু দাহিরকে হত্যা করা হলো এবং নগদ লাভ হলো ছ’লাখ দেরহাম। মোহাম্মদ-বিনকাসেম এজন্য আল্লাহর কাছে অশেষ শুকরগোজারী করলেন।

মুলতান জয় করবার পরে মোহাম্মদ-বিন-কাসেমের ইচ্ছে হলো আরও এগিয়ে যেতে। এগিয়ে গিয়ে হিন্দুস্থানের আরও দেশ জয় করবেন, এই হলো তাঁর মনের বাসনা।

তখন মুলতানের পতন দেখে উদয়পুরের রাজা ভয়ানক ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। মুলতান আরবের মুসলমানদের হাতে গিয়ে পড়বে, তিনি কোনদিন সে রকম আশঙ্কা করেননি। তিনি তাই নিজের ছেলে হরচন্দ্রের অধীনে বিরাট এক দল সৈন্য পাঠালেন আরবদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে।

মোহাম্মদ-বিন-কাসেম খবর পেয়ে সেদিকেই এগিয়ে গেলেন প্রথমে। সে যুদ্ধে উদয়পুরের রাজা এভাবে পরাজিত হলেন যে বহুদিন অবধি তাঁর আর যুদ্ধ করবার ক্ষমতা রইলো না। ফলে দক্ষিণ দিক হতে আক্রান্ত হবার আর কোনোই ভয় রইলো না এবং পূব দিকে এগিয়ে যাবার পথও সুগম হলো।

কিন্তু মানুষ যা ভাবে সব সময় তা হয় না। মোহাম্মদ-বিন-কাসেম যখন পূর্ব পাঞ্জাব অভিযানের জন্য তৈরী হয়েছেন ঠিক তখন এলো এক নিদারুণ সংবাদ–হাজ্জায ইন্তেকাল করেছেন।

হাজ্জায শুধু যে মোহাম্মদ-বিন-কাসেমের নিকট-আত্মীয় ছিলেন তা নয়, তিনি ছিলেন তাঁর পরম হিতার্থী। তিনিই তাঁকে সিন্ধু অভিযানের সুযোগ দিয়েছিলেন। তাঁর উপদেশমতো চলেই তিনি আজ সারা সিন্ধু দেশ জয় করেছেন-ইসলামের পতাকা উড়িয়েছেন হিন্দুস্থানে। এক কথায়, হাজ্জাযের উৎসাহেই সিন্ধু বিজয় সম্ভব হয়েছে, মোহাম্মদ-বিন-কাসেম নিজের বীরত্ব প্রকাশের সুযোগ পেয়েছে। তাই হাজ্জাযের মৃত্যু সংবাদে মোহাম্মদ-বিন-কাসেম স্বভাবতঃই মুষড়ে পড়লেন।

শুধু তিনিই নন আরব-সৈন্যদের সবাই তখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবছিলো। কিছুদিন পরে তাদের সে ভাবনা সত্যি হয়ে দেখা দিলো। খলীফা ওলীদ হুকুম করলেন, হিন্দুস্থানের দিকে আর এগিয়ে যাবার দরকার নেই।

মোহাম্মদ-বিন-কাসেমের হিন্দুস্থান বিজয়ের স্বপ্ন আর সফল হলো না। মানুষের জীবন চিরকাল একভাবে কাটে না। আলোর পরে যেমন আঁধার আসে, দিনের পরে রাত, তেমন মানুষের জীবনেও সুখের পরে দুঃখ আসে, দুঃখের পরে সুখ। মোহাম্মদ-বিন-কাসেমের জীবন এতোদিন সুখেই কেটেছে কিন্তু এবার বোধ হয় দুখের দিন ঘনিয়ে আসছে।

এরপর তরুণ বীর মোহাম্মদ-বিন-কাসেমের জীবনে এমন কয়েকটি ঘটনা ঘটলো যার জন্য তিনি মোটেই তৈরী ছিলেন না। খলীফা ওলীদ সাতশ পনেরো খ্রীস্টাব্দে ইন্তেকাল করলেন। এবার খলীফা হলেন তাঁর ছোট ভাই সুলায়মান। তিনি ছিলেন খলীফা ওলীদের ঘোর বিরোধী। তার অবশ্যি কারণও ছিলো।

ওলীদ ও সুলায়মানের পিতা ছিলেন আবদুল মালেক। মৃত্যুর পূর্বে তিনি ওসিয়ত করে যান ; তাঁর মৃত্যুর পরে খলীফা হবেন ওলীদ এবং ওলীদের পরে হবেন সুলায়মান।

পিতার মৃত্যুর পরে ওলীদ খলীফা হলেন। খলীফা হয়েই তিনি পিতার আদেশ রদ করতে চেষ্টা করেন। আদেশ রদ করে ভাইয়ের বদলে ছেলেকে খলীফা করবেন, এই ছিলো তাঁর একান্ত বাসনা। এ কাজে হাজ্জায তাঁকে সাহায্য করেছিলেন।

এ কারণে বড়ো ভাই ওলীদের প্রতি একটুও শ্রদ্ধা ছিলো না সুলায়মানের মনে। হাজ্জাযকে তিনি ভালো চোখে দেখতেন না। তাই খলীফা হবার আগে থেকেই তিনি প্রতিশোধ গ্রহণের চেষ্টায় ছিলেন। এবার সেই সুযোগ এলো।

সেই সুযোগ নিতে গিয়ে খলীফা ওলীদ যা কিছু করে গেছেন, সুলায়মান ভালো মন্দ বিচার না করে তারই বিরোধিতা করতে লাগলেন। ওলীদের সময় যাঁরা ছিলেন জাঁদরেল সেনানায়ক, দেশ-দেশান্তরে যাঁরা ইসলামের বিজয় পতাকা উড়িয়েছেন তাঁদের সবাইকে তিনি বরখাশত করে দিলেন। এমনি করে নিজের আক্রোশ মিটাতে গিয়ে তিনি ইসলামের ও মুসলমানের ঘোর ক্ষতি সাধন করলেন।

একদিন বরখাশতের হুকুম মোহাম্মদ-বিন-কাসেমের কাছেও এলো। সিন্ধু বিজয়ী মোহাম্মদ-বিন-কাসেমকে বরখাশত করে তাঁর জায়গায় অন্য লোক পাঠানো হলো।

হাজ্জায ছিলেন ওলীদের ডান হাত। সুলায়মান তা জানতেন। তিনি খলীফা হবার আগেই হাজ্জায ইন্তেকাল করেন বলে তাঁকে সাজা দৈওয়া সম্ভব হলো না; কিন্তু হাজ্জাযের আত্মীয়েরা কেউ খলীফা সুলায়মানের হাত থেকে রেহাই পেলেন না। তিনি দারণ সেনানায়ক মোহাম্মদ বিন কাসেমকে বরখাশত করেই খুশী হতে পারলেন না, তাঁকে বন্দী করে অবিলম্বে ইরাকে পাঠাতে হকুম করলেন।

খলীফার এ নিষ্ঠুর আদেশ যখন মোহাম্মদ-বিন-কাসেমের হাতে পৌঁছালো তখন তিনি সিন্ধুর সর্বময় কর্তা। আরব সৈন্যরা তাঁকে যেমন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে তেমনি ভালোবাসে সিন্ধুর প্রতিটি বাসিন্দা। ইচ্ছা করলেই তিনি খলীফার অন্যায় আদেশ অনায়াসে অমান্য করতে পারতেন। আদেশ অমান্য করে সিন্ধুর সুলতান হয়ে বহাল তবিয়তে দিন কাটাতে পারতেন ; কিন্তু তিনি তা করলেন না। ইসলাম তাঁকে সে শিক্ষা দেয়নি। তিনি জানতেন, প্রত্যেক মুসলমানকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আদেশ মানতে হবে, আর মানতে হবে নেতার আদেশ। ইসলামের সেই শিক্ষার কথা মনে করে হাসি মুখেই তিনি খলীফার আদেশ মেনে নিলেন। বিজয়ী বীরের বেশে যিনি দেশে ফিরে যাবেন, দেশময় সাড়া পড়ে যাবে যাঁর অভ্যর্থনার আয়োজনে, তিনি আজ ফিরে চললেন সামান্য কয়েদীর বেশে।

নিজের ভাইয়ের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রোশের বশে খলীফা সুলায়মান শুধু যে একজন তরুণ বীরের ভবিষ্যৎ চিরতরে নষ্ট করলেন তা নয়, ইসলামেরও অপূরণীয় ক্ষতি করলেন। মাত্র সতের বছর বয়সে সুদূর জন্মভূমি ছেড়ে এসে যিনি অনায়াসে জয় করলেন বিশাল একটা দেশ, সুযোগ পেলে হয়তো জীবনে তিনি আরও অনেক কিছু করতেন, অনেক দেশে বয়ে নিয়ে যেতেন ইসলামের জয় পতাকা। মাত্র তিনটি বছর তিনি সারাটা সিন্ধু জয় করেই ক্ষান্ত হলেন না। সঙ্গে সঙ্গে সেখানে সুন্দর শাসন ব্যবস্হা চালু করলেন। প্রথম যেদিন তিনি এসে সিন্ধুর বুকে পা ফেললেন সেদিন দেখেছিলেন, সেখানে মানষ শুধু দেশের রাজা ও ব্রাহ্মণেরা। মানুষ নামে আর যারা আছে বংশানুক্রমে তারা মানষেরই অধিকার থেকে বঞ্চিত। দেশে ধন-সম্পদের অন্ত নেই কিন্তু তার সমস্তই গিয়ে জমা হয় রাজার ভাণ্ডারে আর পূজারী ব্রাহ্মণের মন্দিরে। মোহাম্মদ-বিন-কাসেম এসে প্রথমে তাদের শিখালেন মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই। সকল নাগরিকের সমান অধিকার। ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্ত্ব তাদের চমক লাগিয়ে দিলো। এমনি করে তিনি শব্দে দেশ জয় করলেন না, অগণিত নিপীড়িত মানষের অন্তরও সে সঙ্গে জয় করে ফেললেন।

সেই মোহাম্মদ-বিন-কাসেম আজ স্বদেশে ফিরে চলেছেন সাধারণ বন্দীর বেশে। তখন আরবের পূর্বাঞ্চলের শাসনকর্তা ছিলেন সালেহ। কোনো এক অপরাধের জন্য সালেহর ভাইয়ের প্রাণদণ্ড হয় হাজ্জাযের আদেশে। সে জন্য সালেহ ছিলেন হাজ্জাযের ঘোর শত্রু। তাই বন্দী মোহাম্মদ-বিন-কাসেম ইরাকে এসে পা দিতেই সালেহ তাঁকে ওয়াসিতের কারাগারে বন্দী করলেন। তাঁর একমাত্র অপরাধ, তিনি ছিলেন হাজ্জাযের আত্মীয়, একজন প্রিয়পাত্র।

তোমরা শুনে নিশ্চয় দুঃখিত হবে, মোহাম্মদ-বিন-কাসেম তারপরে আর কোনদিনই সেই কারা-প্রাচীরের বাইরে মুক্ত আলো বাতাসে আসবার সংযোগ পাননি। আরো দুঃখের বিষয় কতোদিন তিনি সেই অন্ধকার কারাগারে বেঁচেছিলেন তাও আজ অবধি কেউ বলতে পারে না! আজ শুধু বেঁচে আছে তাঁর নাম ইতিহাসের সোনালী পাতায় ; বজায় আছে তাঁর অক্ষয় কীর্তি !

সূত্র : মোহাম্মদ বিন কাসিম বই থেকে সংগৃহীত। প্রকাশনায়: ইসলামিক ফাউন্ডেশন। 

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

২টি মন্তব্য

  1. এই পোস্টগুলো ইসলামের ইতিহাস জানার জন্য বেশ সহায়ক হবে। ধন্যবাদ আপনাকে। The Arabian Peninsula was largely arid and volcanic, making agriculture difficult except in oases or riparian areas. আরো পড়ার জন্য ক্লিক করুন https://worldisindoors.blogspot.com/2022/09/Biography%20of%20Muhammad%20PBUH.html

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
kiw kow kan