নারী

হিজাব কি আমার চয়েস?

১.
তখন মাত্র উপলব্ধি করতে পেরেছি হিজাব করতেই হবে। মাথায় ওড়না কোনমতে দিয়ে না, চুল ঢেকে। শুরু করলাম ওড়না আর পিন দিয়ে হিজাব করা। আমার মনে আছে ল্যাবে কাজ করতে করতে হঠাৎ দম আটকে আসতো।

এক দৌড়ে কমনরুমে গিয়ে ওড়না এদিক ওদিক ঘুরিয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে হিজাব করার চেষ্টা করতাম, যাতে ওড়না গলায় না লাগে, আবার চুলও ঢাকা থাকে। তিনঘন্টার ল্যাবে ওড়না ঘুরতে ঘুরতে কোথা থেকে কোথায় যেত, মনে হত দম আটকে আসছে। তবু পিন খুলে ফেলতাম না, কারণ আমি জেনেছি হিজাব করতেই হবে।

এটা আমার চয়েস হলে এত কষ্টের দরকার ছিল না। চয়েস পালটে নিতাম।

২.
একসময় জানলাম আমার হিজাব ঠিকমত হচ্ছে না। সিদ্ধান্ত নিলাম বোরকা পড়বো। বোরকা পড়ার আগে খুব সম্ভবত আমার জীবনের সবচেয়ে কম বাজেট ছিল জামা কাপড়ে। ঈদে জামা গিফট পাই। ভার্সিটিতে অনেক জবরজং জামা পরার চল তখন তেমন একটা ছিল না। মাঝে মাঝে দুই একটা ড্রেস নিজেও বানাতাম, কিন্তু খরচ মিনিমাম রাখতাম। এক হাজারের উপরে একটা জামার পেছনে খরচ করলে আমার পক্ষে সে জামা পরা সম্ভব হত কি না সন্দেহ।

আমি খুব সিম্পল হ্যান ত্যান এমন কিছু বোঝাতে চাচ্ছি না। বিষয় হচ্ছে এই জামা কাপড়ের বিষয়ে আমার ঔদাসীন্য কাজ করত, এর পেছনে এত খরচের যৌক্তকতা খুঁজে পেতাম না। এখনও তাই।

সেই আমি যখন বোরকা পড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, জানতে পারলাম এক হাজারের মধ্যে কোনো বোরকা নেই। বোরকার স্পন্সর আমার বোনই করতো। কিন্তু আমার প্রথম প্রথম ভীষণ অস্বস্তি লাগত পর্দা করতে এত টাকা খরচ?

এখনও বলতে দ্বিধা নেই যে আমার চয়েস নিউমার্কেটের ফুটপাথের কুর্তি। কিন্তু বোরকা পড়তেই হবে তাই পড়ি। পোশাকের পেছনে এত খরচ আমার চয়েস না। চয়েস হলে পালটে নিতাম।

৩.
যখন নিকাব ধরি, মনে হত নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। একটু পরই মরে যাব। নিজেকে বোঝাতাম এমন একটা সময় আসবে, যখন আমি নিকাব ছাড়া বাইরে যাওয়া কল্পনাই করতে পারব না। ঐ সময় আসার আগ পর্যন্ত নিকাব পড়তে নিজের সাথে রীতিমত যুদ্ধ করেছি। কারণ, নিকাবকে আমার চয়েস হিসেবে নেই নি, ফরয হিসেবে নিয়েছি (ইখতিলাফ আছে জানি, সেটা ভিন্ন আলোচনা)।

৪.
একটা সময় ছিল যখন পিচ্চি কাজিন আমার কোলে কোলে ঘুরেছে। ওর সাথে খেলেছি, ওর হাতে নিয়মিত মার খেয়েছি (যেকোনো পিচ্চির মারামারির সহজ টার্গেট ছিলাম আমি)।

পর্দা শুরু করার পর, একদম হাতের সামনে চোখের সামনে বড় হওয়া কাজিন যখন বাসায় আসে তখন একবার বোরকা চাপিয়ে সালাম দিয়ে নিজের রুমে চলে আসি। খুব কষ্ট লাগে, হাহাকার লাগে এই পিচ্চিই না আমাদের সাথে হেসে খেলে বড় হল? এখন ওর সামনে পর্দা করা লাগে। হিজাবকে আমি চয়েস কীভাবে বলি? যদি চয়েস হত, চয়েস পালটে নিতাম না?

একটা প্রবাদ আছে, ইনফেরিয়রিটি কম্পেক্স ইজ দ্য ফাদার অব সুপেরিয়রিটি কম্পলেক্স। আমি সবসময় বলি মানুষ হিজাব নিয়ে আক্রমণ করে হীনম্মন্যতা থেকে। আমরা যখন জবাব দিতে যাব, তখন খেয়াল রাখতে হবে আমরাও যেন সেই একই হীনম্মন্যতায় ভুগে নিজেকে সুপেরিয়র প্রমাণের চেষ্টা না করি।

সচেতনভাবে হোক আর অবচেতনভাবেই হোক, হিজাব আমার চয়েস এটাতে একধরণের সুপেরিয়রিটি প্রকাশ পায়।

তাছাড়া আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যেমন খুশি ড্রেস আপ করা ইসলাম বিদ্বেষীদের চয়েস। কিন্তু ওরা বোরকা পড়তে ইচ্ছা করলেও পড়বে না। পড়লে ইসলাম বিদ্বেষী তকমাটা আর থাকে না। এই এংগেলে চিন্তা করলে ওদের স্বাধীনতা নেই, ইসলাম বিদ্বেষের কাছে ওরা বাঁধা পড়ে গেছে। মনমতো বোরকাটাও পড়তে পারে না। যে অসীম স্বাধীনতার কথা বলে, সেটার অস্তিত্ব নেই বাস্তবে। তাই ওদের সাথে চয়েসের তর্কে যাওয়া অর্থহীন।

যেমন খুশি ড্রেস আপ করা ওদের চয়েস না, বোরকা পড়াও আমাদের চয়েস না।

যদি চয়েস হত, কবেই পালটে নিতাম!

………………………………

হিজাব কি আমার চয়েস?
উম্ম মারঈয়াম

#রৌদ্রময়ী_ফিরেআসারগল্প
#উম্মমারঈয়াম

মতামত দিন