আমরা রমাযান মাসকে কি দিয়ে স্বাগত জানাব?

রমাযান এমন একটি মাস, যার রয়েছে এত এত বৈশিষ্ট্য, এত এত মাহাত্ম্য। এই মাসকে আমরা কি দিয়ে বরণ করব? কোন্ জিনিস দিয়ে তাকে ‘খোশ আমদেদ‘ জানাব?

এই পবিত্র মাসকে স্বাগত জানাতে দুই রকম দুই শ্রেণীর মানুষ রয়েছে;

প্রথম প্রকার মানুষ হল তারা; যারা এ মাস নিয়ে খুশী হয়, এর আগমনে আনন্দবোধ করে। তার কারণ, তারা এ মাসে রোযা রাখতে অভ্যাসী। এ মাসের সকল কষ্ট বরণ করতে প্রয়াসী। কারণ, তারা জানে যে, ইহকালের সুখ-সম্ভোগ বর্জন করলে, তা পরকালে পাওয়া যায়। কারণ, তারা উপলব্ধি করে যে, এ মাস হল আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের এবং তাঁর নৈকট্যদাতা আমলে প্রতিযোগিতা করার বিশাল মৌসম। তারা জানে যে, আল্লাহ আযযা অজাল্ল্ এ মাসে যে সওয়াব বান্দাকে প্রদান করবেন, তা আর অন্য কোন মাসে করবেন না। সুতরাং প্রিয় যেমন তার প্রবাসী প্রিয়তম বা তদপেক্ষা প্রিয়তর কিছুর আগমনে আনন্দ পায়, ঠিক তারই মত রমাযানের আগমনে তাদের আনন্দিত হওয়াতে আশ্চর্যের কিছু নয়। এই হল প্রথম শ্রেণীর মানুষ।

দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ হল তারা, যারা এই পবিত্র মাসকে ভারী মনে করে, রোযার কষ্টকে বড় মনে করে। সুতরাং যখনই এ মাসের আগমন ঘটে, তখনই সে মনে করে তার ঘরে যেন এক অবাঞ্ছিত মেহেমান এল। ফলে শুরু থেকেই সে তার ঘণ্টা, দিন ও রাত গুনতে থাকে। অধৈর্য হয়ে তার বিদায় মুহূর্তের অপেক্ষা করতে থাকে। এক একটা দিন পার হতেই তার আনন্দ হয়। পরিশেষে যখন ঈদ আসার সময় হয়, তখন এই মাস অতিবাহিত হওয়া নিকটবর্তী জেনে ব্যাক্তি খুশী হয়!

এই শ্রেণীর মানুষরা এই মহতিপূর্ণ মাসকে এই জন্য ভারী মনে করে এবং তাড়াতাড়ি অতিবাহিত হওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে যে, তারা তাদের অবৈধ ভোগ-বিলাসে মত্ত হওয়া ছাড়াও পানাহার ও যৌনাচার ইত্যাদি সুখ-সম্ভোগে অধিকাধিক অভ্যাসী থাকে। আর সেই ভোগ-বিলাস ব্যবহার করার পথে এই মাস তাদের জন্য বাধা ও অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এ মাস তাদের সুখ-উপভোগের প্রতিবন্ধক হিসাবে আগমন করে। যার ফলে তারা এই মাসকে প্রচন্ড ভারী বোধ করে থাকে।

আরো একটা কারণ এই যে, তারা এমন এক সম্প্রদায়, যারা আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে বড় অমনোযোগী। এমন কি তাদের মধ্যে অনেকে ফরয ও ওয়াজেব আমলেও ঔদাস্য প্রদর্শন করে থাকে; যেমন তারা নামায পড়ে না। অতঃপর এই মাস প্রবেশ করলে কোন কোন আমল তারা করতে শুরু করে দেয়। কিন্তু আসলে তারা ঐ আমলে অভ্যাসী নয়। যার ফলে রমাযান মাসটিকেই ভারী মনে করে থাকে।[1]

বলা বাহুল্য, আল্লাহর নেক বান্দার জন্য উচিৎ, এই পবিত্র মাসকে সত্য ও খাঁটি তওবা দিয়ে; পাপ বর্জন করে এবং পুনরায় সে পাপ না করার পাক্কা সংকল্প নিয়ে খোশ-আমদেদ জানানো।

এই মাসকে আমরা স্বাগত জানাব, সর্বপ্রকার মন্দ কাজ থেকে বিরত হয়ে; মিথ্যাবাদিতা, গীবত, অশ্লীলতা, গান-বাজনা প্রভৃতি বর্জন করে।

এই মাসকে আমরা স্বাগত জানাব, কুরআন তেলাঅত, দুআ ও যিক্রের মাধ্যমে। আর কোন গাফলতির মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানাব না।

একজন নেককার বলেছেন, ‘আয়ু তো সবল্প। সুতরাং গাফলতি দিয়ে তাকে আরো অল্প করে দিও না।’[2]

এই মাসকে আমরা স্বাগত জানাব, অকৃত্রিম ও সুদৃঢ় সংকল্প, সুউচ্চ হিম্মত ও মনোবল দ্বারা, তার দিনগুলিকে সুবর্ণ সুযোগরূপে নেক কাজে ব্যবহার করার মাধ্যমে এবং তার পবিত্র সময়গুলিকে অযথা ব্যয় না করার মাধ্যমে।

এই মাসকে আমরা স্বাগত জানাব, আগ্রহ, স্ফূর্তি, উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে, নির্মল হৃদয়ে সুসংবাদ গ্রহণের সাথে এবং বেশী বেশী করে আমল ও ইবাদত করার প্রস্ত্ততি নিয়ে। সকল প্রকার আলস্য কাটিয়ে, অতিনিদ্রার অতি পরিহার করে এবং তার আগমনে বিরক্তিবোধ প্রদর্শন না করে।

আর এই মাসকে আমরা স্বাগত জানাব না, খেল-তামাশার মাধ্যমে; পার্ক, ময়দান বা রাস্তার ধারে বসে হাওয়া খেয়ে রাত্রি জাগরণ করে, অথবা তাস, কেরাম বা অন্য কোন খেলা খেলে, অথবা টিভি, সিডি, ভিডিও, রেডিও বা অন্য কোন যন্ত্রের মাধ্যমে নোংরা ছবি দেখে ও গান-বাজনা শুনে, অথবা গাড়ি নিয়ে ফূর্তিবাজি করে, নাটক-যাত্রা বা ফি¬ম্ দেখে।

ভাই মুসলিম! এই পবিত্র মাসকে; এর দিন ও রাত্রির প্রতিটি মুহূর্তকে আপনার এক একটি সুবর্ণ সুযোগরূপে জ্ঞান করা উচিৎ। সুতরাং পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করতে, কল্যাণের ভান্ডার পরিপূর্ণ করতে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে কোন প্রকারের অবজ্ঞা প্রদর্শন করা উচিৎ নয়। অভিজ্ঞ ও জ্ঞানী মানুষ কল্যাণের মৌসমসমূহকে হেলায় হারাতে চায় না। বরং সুযোগের সদ্ব্যবহার করে এবং মহান প্রতিপালকের করুণা লাভের সকল কাজ করার চেষ্টায় থাকে। বিদায় দিনের জন্য পথের সম্বল সাথে করে নেয়। আর কে জানে ভাইজান! হয়তো বা এই বছরের মৃত মানুষদের রেজিষ্টারে আপনার নামটিও লিখা আছে! সুতরাং জলদি করুন, শীঘ্র করুন। এখনও সময় আছে, রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, আমল শুরু করে দিন।[3]

প্রকাশ থাকে যে, রমাযান মাস আগত হওয়ার সময় এক অপরকে মোবারকবাদ জানানো দোষাবহ নয়। যেহেতু মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) সাহাবাগণকে রমাযান মাস আগমনের সুসংবাদ দিতেন এবং তার প্রতি যত্ন নিতে অনুপ্রাণিত করতেন।[4]

বইঃ রমাযানের ফাযায়েল ও রোযার মাসায়েল

লেখকঃ শাইখ আব্দুল হামীদ ফাইযী

ফুটনোটঃ[1] (দুরুসু রামাযান অকাফাত লিস্-সায়েমীন, সালমান বিন ফাহদ আল-আওদাহ ৬-৮পৃঃ)

[2] (তাওজীহাতুন অফাওয়াএদ লিসসা-য়েমীনা অসসায়েমাত ৬৫পৃঃ)

[3] (দুরুসু রামাযান অকাফাত লিস্-সায়েমীন ১০৮পৃঃ)

[4] (সাবঊনা মাসআলাহ ফিস্-সিয়াম ১১নং)

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button
slot gacor skybet88 slot online skybet88 skybet88 skybet88 slot gacor skybet88 skybet88 slot bonus new member skybet88 slot shopeepay skybet88 skybet88 skybet88 slot shopeepay slot gacor skybet88 demo slot skybet88 skybet88 skybet88 skybet88 skybet88 skybet88