সলাত

সলাতে মুবাশ্‌শির (পর্ব ৩৭)

রচনায় : আব্দুল হামীদ ফাইযী

তাশাহহুদের বৈঠক

দ্বিতীয় রাকআতের সকল কর্ম (শেষ সিজদাহ) শেষ করে মহানবী (সাঃ) দুই সিজদার মাঝের বৈঠকের মত বাম পা বিছিয়ে তার উপর বসে যেতেন এবং ডান পায়ের পাতাকে খাড়া করে রাখতেন। (বুখারী, আবূদাঊদ, সুনান ৭৩১নং)

তাশাহহুদের জন্য বসতে আদেশ দিয়ে নামায ভুলকারী সাহাবীকে তিনি বলেছেন, “— অতঃপর তুমি যখন নামাযের মাঝে বসবে, তখন স্থির হবে এবং বাম ঊরুকে বিছিয়ে দিয়ে তাশাহহুদ পড়বে।” (আবূদাঊদ, সুনান ৮৬০ নং, বায়হাকী)

আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন, আমার দোস্ত (সাঃ) আমাকে কুকুরের মত (দুই পায়ের রলাকে খাড়া রেখে, দুই পাছার উপর ভর করে ওহাত দু’টিকে মাটিতে রেখে) বসতে নিষেধ করেছেন। (আহমাদ, মুসনাদ ২/২৬৫, ত্বায়ালিসী, ইবনে আবী শাইবা) উক্ত প্রকার বসাকে তিনি শয়তানের বৈঠক বলে অভিহিত করেছেন। (মুসলিম, সহীহ ৪৯৮নং, আহমাদ, মুসনাদ)

তাশাহ্‌হুদে বসে তিনি ডানহাতের চেটোকে ডান ঊরু (জাং) বা হাঁটুর উপর রাখতেন, আর বামহাতের চেটোকে রাখতেন বাম জাং বা হাঁটুর উপর বিছিয়ে। (মুসলিম, সহীহ ৫৮০নং, আহমাদ, মুসনাদ) ডানহাতের কনুই-এর শেষ প্রান্ত ডান জাং-এর উপর রাখতেন। (আবূদাঊদ, সুনান ৯৫৭নং, নাসাঈ, সুনান) অর্থাৎ কনুইকে পায়ের রলার উপর না রেখে ঊরুর উপর পাঁজরে লাগিয়ে রাখতেন।

এক ব্যক্তি নামাযে বাম হাতের উপর মাটিতে ঠেস দিয়ে বসলে তিনি তাঁকে বারণ করে বলেছিলেন, “এরুপ হল ইয়াহুদীদের নামায।” (বায়হাকী,হাকেম, মুস্তাদরাক, ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ৩৮০নং) “এরুপ বসো না। কারণ, এটা তো তাদের বৈঠক, যাদেরকে আযাব দেওয়া হবে।” (আহমাদ, মুসনাদ, আবূদাঊদ, সুনান, ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ৩৮০নং) “এটা হল তাদের বৈঠক, যাদের প্রতি আল্লাহ ক্রোধান্বিত।” (আবূদাঊদ, সুনান ৯৯৩ নং, আব্দুর রাযযাক, মুসান্নাফ)

তাশাহহুদের বৈঠকে তর্জনীর ইশারা

তিনি বাম হাতের চেটোকে বাম হাঁটুর উপর বিছিয়ে দিতেন। কখনো বাম হাঁটুকে বামহাতের লোকমা বা গ্রাস বানাতেন। ডান হাতের (তর্জনী ছাড়া) সমস্ত আঙ্গুলগুলোকে বন্ধ করে নিতেন। আর তর্জনী (শাহাদতের) আঙ্গুল দ্বারা কেবলার দিকে ইশারা করতেন এবং তার উপরেই নিজ দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতেন। (মুসলিম, সহীহ ৫৭৯, ৫৮০নং, আহমাদ, মুসনাদ, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ) কখনো বা ইশারার সময় তিনি তাঁর বুড়ো আঙ্গুলকে মাঝের আঙ্গুলের উপর রাখতেন। (মুসলিম, সহীহ ৫৭৯নং, আহমাদ, মুসনাদ) আর উক্ত উভয় আঙ্গুলকে মিলিয়ে গোল বালার মত গোলাকার করে রাখতেন। (আবূদাঊদ, সুনান ৯৫৭নং, নাসাঈ, সুনান, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ, ইবনে হিব্বান, সহীহ প্রভৃতি)

কখনো বা (আরবীয়) আঙ্গুল গণনার হিসাবের ৫৩ গোনার মত করে রাখতেন। অর্থাৎ, কনিষ্ঠা, অনামিকা ও মধ্যমাকে চেটোর সাথে লাগিয়ে তর্জনীকে লম্বা ছেড়ে এবং বৃদ্ধার মাথাকে তর্জনীর গোড়াতে লাগিয়ে রাখতেন। (মুসলিম, সহীহ ৫৮০, মিশকাত ৯০৬নং)

তিনি তর্জনীকে তুলে হিলিয়ে হিলিয়ে এর মাধ্যমে দুআ করতেন। (সহিহ,নাসাঈ, সুনান ৮৫৬, ১২০৩ নং, দারেমী, সুনান, আহমাদ, মুসনাদ ৪/৩১৮, ৫/৭২) সুতরাং দুআ শেষ না করা (সালাম ফিরার পূর্ব) পর্যন্ত তর্জনী হিলানো সুন্নত। যেহেতু দুআ সালাম ফিরার পূর্বেই শেষ হয়ে থাকে। (সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ১৫৮-১৫৯ পৃ:)

তিনি বলতেন, “অবশ্যই ঐ তর্জনী শয়তানের পক্ষে লোহা অপেক্ষা অধিক কষ্টদায়ক (খোঁচার দন্ড)। (আহমাদ, মুসনাদ ২/১১৯, বাযযার, মাক্বদিসী, বায়হাকী, প্রমুখ)

ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, ‘ঐ আঙ্গুলটি শয়তানের জন্য আঘাত-দন্ড। যে এইভাবে ইশারা করে, সে (নামাযে) উদাসীন হয় না।’

হুমাইদী বলেন, মুসলিম বিন আবী মারয়্যামের নিকট এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছে যে, সে শামের এক গির্জায় নামাযরত অবস্থায় কিছু নবীর ছবি দেখেছে; তাঁদের তর্জনী আঙ্গুলটি ঐরুপ ইশারা করা অবস্থায় ছিল। (মুসনাদে হুমাইদী, আবূ য়্যা’লা, সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ১৫৮পৃ:)

 তিনি তর্জনী দ্বারা এই ইশারা ও হ্‌রকত প্রত্যেক তাশাহ্‌হুদে করতেন। তবে ঠিক কোন্‌ সময়ে হ্‌রকত করতেন বা হিলাতেন, সে বিষয়ে কোন বর্ণনা নেই। সুতরাং যেখানেই দুআ (প্রার্থনার) অর্থ পাওয়া যাবে সেখানেই তর্জনী হিলানো সুন্নত। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৩/২০২)  আর দুআর অর্থ না থাকলেও একটানা ক্রমাগত হিলিয়ে যাওয়া বিধেয় নয়।

তর্জনীর একটি মাত্র আঙ্গুল হিলিয়েই দুআ করা বিধেয়। মহানবী (সাঃ) এক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে দুই আঙ্গুল হিলিয়ে দুআ করছে। তিনি তাকে বললেন, “একটি আঙ্গুল হিলাও, একটি আঙ্গুল হিলাও।” আর এই সঙ্গে তিনি তর্জনীর প্রতি ইঙ্গিত করলেন। (ইবনে আবী শাইবা, নাসাঈ, সুনান, তিরমিযী, সুনান, বায়হাকী,হাকেম, মুস্তাদরাক, মিশকাত ৯১৩নং)

(চলবে)

মতামত দিন