জীবনী নারী

যায়নাব বিনতে রাসূলিল্লাহ এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

লেখক: ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ

অনুলিখন: মাকসুদ বিন আমাল

মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মেয়ে সায়্যিদা যায়নাব (রা.)-যিনি আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত বরণ করেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা (রা.) তাঁর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সা.)-এ বানী বর্ণনা করেছেনঃ

‘সে ছিল আমার সবচেয়ে ভালো মেয়ে। আমাকে ভালোবাসার কারণেই তাকে কষ্ট পেতে হয়েছে।’ (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৭২)

হযরত যায়নাবের (রা.) সম্মানিতা জননী উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রা.)। যিনি মুহাম্মাদ (সা.)-এর রিসালাতের প্রতি সর্বপ্রথম ঈমান আনার অনন্য গৌরবের অধিকারিণী। তাঁর মহত্ব ও মর্যাদা এত বিশাল যে বিগত উম্মাত সমূহের মধ্যে কেবল হযরত মারইয়ামের (আ) সাথে যা তুলনীয়।

ইমাম আয-জাহাবী (রহ) বলেনঃ

‘যায়নাব হলেন রাসূলুল্লাহর (সা.) মেয়ে এবং তাঁর হিযরাতকারিনী সায়্যিদাত বোনদের মধ্যে সবার বড়।’ (সিয়ারু আ’লাম আন-নুবালা ২/২৪৬)

Jainab Binte Rasulullah

আবু আমর বলেন, যায়নাব (রা.) তাঁর পিতার মেয়েদের মধ্যে সবার বড়। এ ব্যাপারে কোন মতপার্থক্য নেই। আর যারা ভিন্ন মত পোষণ করেন তারা ভুলের মধ্যে আছেন। তাদের দাবীর প্রতি গুরুত্ব প্রদানের কোন হেতু নেই। তবে মতপার্থক্য যে বিষয়ে আছে তা হলো, রাসূলুল্লাহর (সা.) ছেলে-মেয়েদের মধ্যে যায়নাব প্রথম সন্তান, না কাসিম? বংশবিদ্যা বিশারদদের একটি দলের মতে আল-কাসিম প্রথম ও যায়নাব দ্বিতীয় সন্তান। ইবনুল কালবী যায়নাবকে (রা.) প্রথম সন্তান বলেছেন। ইবনে সা‘দের মতে, যায়নাব (রা.) মেয়েদের মধ্যে সবার বড়। (তাবাকাত ৮/৩০)

ইবন হিশাম রাসূলুল্লাহর (সা.) সন্তানদের ক্রমধারা এভাবে সাজিয়েছেনঃ

‘রাসূলুল্লাহর (সা.) বড় ছেলে আল কাসিম, তারপর যথাক্রমে আত-তায়্যিব ও আত-তাহির। আর বড় মেয়ে রুকাইয়্যা, তারপর যথাক্রমে যায়নাব, উম্মু কুলছূম ও ফাতিমা।’ (আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা-১/১৯০)

পিতা মুহাম্মাদ (সা.)-এর নুবুওয়াত প্রাপ্তির দশ বছর পূর্বে হযরত যায়নাবের(রা.) জন্ম হয়। তখন হযরত রাসূলে কারীমের (সা.) বয়শ তিরিশ এবং মাতা হযরত খাদীজার (রা.) পঁয়তাল্লিশ বছর। হযরত যায়নাবের(রা.) শৈশব জীবনের তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তাঁর এ জীবনটি সম্পূর্ণ অন্ধকারেই রয়ে গেছে। তাঁর জীবন সম্পর্কে যততুকু যা জানা যায় তা তাঁর বিয়ের সময় থেকে।

রাসূলুল্লাহর (সা.) মেয়েদের মধ্যে সর্বপ্রথম হযরত যায়নাবের(রা.) বিয়ে অল্প বয়সে অনুষ্ঠিত হয়। তখনও পিতা মুহাম্মাদ (সা.) নবী হননি। (তাবাকাত ৮/৩০-৩১)

ইমাম আয-জাহাবী (রহ) এ মত গ্রহণ করতে পারেন নি। তিনি বলেনঃ

‘ইবনে সা‘দ উল্লেখ করেছেন যে, আবুল আ‘স যায়নাবকে বিয়ে করেছেন নবুওয়াতের পূর্বে। এ এক অবাস্তব কথা।’ (সিয়ারু আ’লাম আন-নুবালা ২/২৪৬)

যাই হোক স্বামী আবুল ‘আস ইবন আর-রাবী ইবন আব্দুল উযযা ছিলেন যায়নাবের খালাতো ভাই। মা হযরত খাদীজার (রা.) আপন ছোট বোন হালা বিনত খুওয়াইলিদের ছেলে। (তাবাকাত ৮/৩১)

বিয়ের সময় বাবা-মা মেয়েকে যে সকল উপহার সামগ্রী দিয়েছিলেন তাঁর মধ্যে ইয়ামনী আকীকের একটি হারও ছিল। হারটি দিয়েছিলেন মা খাদীজা (রা.)। (প্রাগুক্ত)

পিতা মুহাম্মাদ (সা.) ওহী লাভ করে নবী হলেন। মেয়ে যায়নাব (রা.) তাঁর মার সাথে মুসলমান হলেন। স্বামী আবুল ‘আস তখন ইসলাম গ্রহণ করেন নি। রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরাত করলেন। পরে হযরত যায়নাব (রা.) স্বামীকে মুশরিক অবস্থায় মক্কায় রেখে মদিনায় হিজরাত করেন।(প্রাগুক্ত ৮/৩২)

রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত যায়নাব (রা.) ও আবুল ‘আসের মধ্যের গভীর সম্পর্ক এবং ভদ্রোচিত কর্মপদ্ধতির প্রায়ই প্রশংসা করতেন। (সুনান আবু দাউদ ১/২২২)

আবুল ‘আস যেহেতু শিরকের উপর অটল ছিলেন, এ কারণে ইসলামের হুকুম অনুযায়ী উচিত ছিল, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেওয়া। কিন্তু রাসূল (সা.) মক্কায় সে সময় শক্তিহীন ছিলেন। ইসলামী শক্তি তেমন মজবুত ছিল না। তাছাড়া কাফিরদের জুলুম-অত্যাচারের প্লাবন সবেগে প্রবহমান ছিল। এদিকে ইসলামের প্রচার প্রসারের গতি ছিল মন্থর ও প্রাথমিক পর্যায়ের। এসকল কারণে তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ না ঘটানোই রাসূল (সা.) সমীচীন মনে করেন।

আবুল ‘আস যায়নাবকে (রা.) অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং সম্মানও করতেন। কিন্তু তিনি পূর্বপুরুষের ধর্ম ত্যাগ করে প্রিয়তমা স্ত্রীর নতুন দ্বীন কবুল করতে কোনভাবেই রাজি হলেন না। এ অবস্থা চলতে লাগলো। এদিকে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও কুরাইশদের মধ্যে মারাত্মক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত শুরু হয়ে গেল। কুরাইশরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করলোঃ

‘তোমাদের সর্বনাশ হোক! তোমরা মুহাম্মাদের মেয়েদের বিয়ে করে তাঁর দুশ্চিন্তা নিজেদের ঘাড়ে তুলে নিয়েছো। তোমরা যদি এ সকল মেয়েকে তাঁর কাছে ফেরত পাঠাতে তাহলে সে তোমাদের ছেড়ে তাদেরকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়তো।’ তাদের মধ্যে অনেকে এ কথা সমর্থন করে বললো- ‘এ তো অতি চমৎকার যুক্তি।’ তারা দল বেধে আবুল ‘আসের কাছে যেয়ে বললো, ‘আবুল ‘আস, তুমি তোমার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তাঁর পিতার কাছে পাঠিয়ে দাও। তাঁর পরিবর্তে তুমি যে কুরাইশ সুন্দরীকে চাও, আমরা তাকে তোমার সাথে বিয়ে দেব।’ আবুল ‘আস বললেন, ‘আল্লাহর কসম! না তা হয়না। আমার স্ত্রীকে আমি ত্যাগ করতে পারিনা। তাঁর পরিবর্তে সকল নারী আমাকে দিলেও আমার তা পসন্দ নয়।’ এ কারণে রাসূল (সা.) তাঁর আত্মীয়তাকে খুব ভালো মনে করতেন এবং প্রশংসা করতেন।(তাবারী-৩/১৩৬; ইবনে হিশাম আস-সীরাহ-১/৬৫২)

হযরত যায়নাব (রা.) স্বামী আবুল ‘আসকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। স্বামীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও ত্যাগের অবস্থা নিম্নের ঘটনা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে উঠেছেঃ

নবুওয়াতের ১৩তম বছরে রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করেন। হযরত যায়নাব (রা.) স্বামীর সাথে মক্কায় থেকে যান।(আনসাবুল আশরাফ-১/২৬৯) কুরাইশদের সাথে মদীনার মুসলমানদের সামরিক সংঘাত শুরু হলো। কুরাইশরা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বদরে সমবেত হল। নিতান্ত অনিচ্ছা সত্বেও আবুল ‘আস কুরাইশদের সাথে বদরে গেলেন। কারণ, কুরাইশদের মধ্যে তাঁর যে স্থান তাতে না যেয়ে উপায় ছিল না। বদরে কুরাইশরা শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। তাদের বেশ কিছু নেতা নিহত হয় এবং বহু সংখ্যক যুদ্ধা বন্দী হয়। আর অবশিষ্টরা পালিয়ে প্রাণ বাঁচায়। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! এই বন্দীদের মধ্যে রাসূলুল্লাহর (সা.) জামাই হযরত যায়নাবের (রা.) স্বামী আবুল ‘আসও ছিলেন। ইবন ইসহাক বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর ইবন নু‘মান (রাযিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু) তাকে বন্দী করেন। তবে আল-ওয়াকিদীর মতে হযরত খিরাশ ইবন আস-সাম্মাহর (রাযিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু) হাতে তিনি বন্দী হন। (আল-ইসাবা ফী তাময়ীযিস সাহাবা-৪/১২২)

বদরের বন্দীদের ব্যাপারে মুসলমানদের সিদ্ধান্ত হলো, মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে। বন্দীদের সামাজিক মর্যাদা এবং ধনী দরিদ্র প্রভেদ অনুযায়ী এক হাজার থেকে চার হাজার দিরহাম মুক্তিপণ নির্ধারিত হলো। বন্দীদের প্রতিনিধিরা ধার্যকৃত মুক্তিপণ নিয়ে মক্কা-মদীনা ছোটাছুটি শুরু করে দিল। নবী দুহিতা হযরত যায়নাব (রা.) স্বামী আবুল ‘আসের মুক্তিপণসহ মদীনায় লোক পাঠালেন। আল-ওয়াকিদীর মতে আবুল ‘আসের মুক্তিপণ নিয়ে মদীনায় এসেছিল তাঁর ভাই ‘আমর ইবন রাবী। হযরত যায়নাব (রা.) মুক্তিপণ দিরহামের পরিবর্তে একটি হার পাঠিয়েছিলেন। এই হারটি তাঁর জননী হযরত খাদীজা (রা.) বিয়ের সময় তাকে উপহার দিয়েছিলেন। হযরত রাসূলে কারীম (সা.) হারটি দেখেই বিমর্ষ হয়ে পড়লেন এবং নিজের বিষণ্ণ মুখটি একখানি পাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে ফেললেন। জান্নাতবাসিনী প্রিয়তমা স্ত্রী ও অতি আদরের মেয়ের স্মৃতি তাঁর মানসপটে ভেসে উঠেছিল।

কিছুক্ষণ পর হযরত রাসূলে কারীম (সা.) সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেনঃ যায়নাব তাঁর স্বামীর মুক্তিপণ হিসেবে এই হারটি পাঠিয়েছে। তোমরা ইচ্ছে করলে তাঁর বন্দীকে ছেড়ে দিতে পার এবং হারটিও তাকে ফেরত দিতে পার। সাহাবীরা বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার সন্তুষ্টির জন্য আমরা তাই করবো। সাহাবীরা রাজী হয়ে গেলেন। তারা আবুল ‘আসকে মুক্তি দিলেন, আর সেইসাথে ফেরত দিলেন তাঁর মুক্তিপণের হারটি। তবে রাসূলুল্লাহ (সা.) আবুল ‘আসের নিকট থেকে এ অঙ্গিকার নিলেন যে মক্কায় ফিরে অনতিবিলম্বে সে যায়নাবকে মদীনায় পাঠিয়ে দেবে। (ইবনে হিশাম-১/৬৫৩;তাবাকাত-৮/৩১; সিয়ারু আ’লাম আন-নুবালা ২/২৪৬)

রাসূলুল্লাহ (সা.) যায়নাবকে (রা.) নেওয়ার জন্য আবুল ‘আসের সঙ্গে হযরত যায়েদ ইবন হারিছাকে (রা.) পাঠান। তাকে ‘বাতান’ বা ‘জাজ’ নামক স্থানে অপেক্ষা করতে বলেন। যায়নাব (রা.) মক্কা থেকে সেখানে পৌঁছলে তাকে নিয়ে মদীনায় চলে আসতে বলেন। আবুল ‘আস মক্কায় পৌঁছে যায়নাবকে (রা.) মদীনায় যাওয়ার অনুমতি দান করেন।

হযরত যায়নাব (রা.) সফরের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আছেন, এমন সময় হিন্দ বিনত ‘উতবা এসে হাজির হলো। প্রস্তুতি দেখে বললোঃ মুহাম্মাদের মেয়ে, তুমি কি তোমার বাপের কাছে যাচ্ছো? যায়নাব (রা.) বললেন, এই মুহূর্তে তো তেমন উদ্দেশ্য নেই, তবে ভবিষ্যতে আল্লাহর যা ইচ্ছা হয়। হিন্দ ব্যাপারটি বুঝতে পেরে বললোঃ বোন, এটা গোপন করার কি আছে। সত্যিই তুমি যদি যাও, তাহলে পথে দরকার পড়ে এমন কিছু প্রয়োজন হলে রাখঢাক না করে বলে ফেলতে পার, আমি তোমার খিদমতের জন্য প্রস্তুত আছি।

মহিলাদের মধ্যে শত্রুতার সেই বিষাক্ত প্রভাব তখনও বিস্তার লাভ করেনি যা পুরুষদের মধ্যে ছড়িয়ে ছিল। এ কারণে হযরত যায়নাব (রা.) বলেনঃ হিন্দ যা বলেছিল, অন্তরের কথাই বলেছিল। অর্থাৎ আমার যদি কোন জিনিসের প্রয়োজন হতো, তাহলে অবশ্যই সে তা পূরণ করতো। কিন্তু সে সময়ের অবস্থা চিন্তা করে আমি অস্বীকার করি। (তাবারী-১/১২৪৭; ইবনে হিশাম-১/৬৫৩-৬৫৪)

হযরত যায়নাব (রা.) কিভাবে মক্কা থেকে মদীনায় পৌঁছেছেন সে সম্পর্কে সিরাতের গ্রন্থসমূহে নানা রকম বর্ণনা পাওয়া যায়। কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হলোঃ

ইবনে ইসহাক বলেন, সফরের প্রস্তুতি শেষ হলে যায়নাবের (রা.) স্বামীর ভাই কিনানা ইবন রাবী‘ একটি উট এনে দাড় করালো। যায়নাব উটের পিঠের হাওদায় উঠে বসলেন। আর কিনানা স্বীয় ধনুকটি কাঁধে ঝুলিয়ে তীরের বাণ্ডিলটি হাতে নিয়ে দিনে দুপুরে উট হাঁকিয়ে মক্কা থেকে বের হল। কুরাইশদের মধ্যে হৈ চৈ পড়ে গেল। তারা ধাওয়া করে মক্কার অদূরে ‘জী-তুওয়া’ উপত্যকায় তাদের দুই জনকে ধরে ফেললো। কিনানা কুরাইশদের আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে কাঁধের ধনুকটি হাতে নিয়ে তীরের বাণ্ডিলটি সামনে ছড়িয়ে দিয়ে বললোঃ তোমাদের কেউ যায়নাবের নিকটে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাঁর সিনা হবে আমার তীরের লক্ষ্যস্থল। কিনানা ছিল একজন দক্ষ তীরন্দাজ। তাঁর নিক্ষিপ্ত কোন তীর সচরাচর লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো না। তাঁর এ হুমকি শুনে আবু সুফইয়ান ইবন হারব তাঁর দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে বললোঃ

‘ভাতিজা, তুমি যে তীরটি আমাদের দিকে তাক করে রেখেছো তা একটু ফিরাও। আমরা তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাই।’ কিনানা তীরটি নামিয়ে নিয়ে বললো, কি বলতে চান, বলে ফেলুন। আবু সুফইয়ান বললোঃ

‘তোমার কাজটি ঠিক হয় নি। তুমি প্রকাশ্যে দিন দুপুরে মানুষের সামনে দিয়ে যায়নাবকে নিয়ে বের হয়েছো, আর আমরা বসে বসে তা দেখছি। গোটা আরববাসী জানে বদরে আমাদের কি দুর্দশা ঘটেছে এবং যায়নাবের বাপ আমাদের কি সর্বনাশটাই না করেছে। তুমি যদি এভাবে প্রকাশ্যে তাঁর মেয়েকে আমাদের নাকের উপর দিয়ে নিয়ে যাও তাহলে সবাই আমাদেরকে কাপুরুষ ভাববে এবং এ কাজটি আমাদের জন্য অপমান বলে বিবেচনা করবে। তুমি আজ যায়নাবকে বাড়ী ফিরিয়ে নিয়ে যাও। কিছুদিন সে স্বামীর ঘরে থাকুক। এদিকে লোকেরা যখন বলতে শুরু করবে যে, আমরা যায়নাবকে মক্কা থেকে যেতে বাধা দিয়েছি, তখন তুমি একদিন গোপনে তাকে তাঁর বাপের কাছে পৌঁছে দিও।’ (আল-বিদায়া-৩/৩৩০; ইবনে হিশাম-১/৬৫৪-৫৫)

কিনানা আবু সুফইয়ানের কথা মেনে নিয়ে যায়নাবসহ মক্কায় ফিরে এল। যখন ঘটনাটি মানুষের মধ্যে জানাজানি হয়ে গেল, তখন একদিন রাতের অন্ধকারে সে আবার যায়নাবকে নিয়ে মক্কা থেকে বের হল এবং ভাইয়ের নির্দেশ মত নির্দিষ্ট স্থানে তাকে তাঁর পিতার প্রতিনিধির হাতে তুলে দিল। যায়নাব (রা.) হযরত যায়েদ ইবন হারিছার (রা) সাথে মদিনায় পৌঁছলেন। (তাবারী-১/১২৪৯; যুরকানীঃ শারহুল মাওয়াহিব-৩/২২৩)

তাবারানী ‘উরওয়া ইবন যুবাইর হতে বর্ণনা করেছেন। এক ব্যক্তি যায়নাব বিনতে রাসূলিল্লাহকে (সা.) সাথে নিয়ে মক্কা থেকে বের হলে কুরাইশদের দুই ব্যক্তি ((সেই দুই ব্যক্তির একজন হাব্বার ইবন আল-আসওয়াদ। সে ছিল হযরত খাদীজার (রা.)চাচাতো ভাইয়ের ছেলে। তাই সম্পর্কে সে যায়নাবের মামাতো ভাই। আর দ্বিতীয়জন ছিল নাফে ইবন আবদি কায়স অথবা খালিদ ইবন আবদি কায়স। তাদের এমন অহেতুক বাড়াবাড়িমূলক আচরণের জন্য রাসূল(সা.) ভীষণ বিরক্ত হন। তাই তিনি নির্দেশ দেনঃ ‘যদি তোমরা হাব্বার ইবন আল-আসওয়াদ ও সেই ব্যক্তিটি যে তাঁর সাথে যায়নাবের দিকে এগিয়ে যায়, হাতের মুঠোয় পাও, তাহলে আগুনে পুড়িয়ে মারবে।’ কিন্তু পরদিন তিনি আবার বলেনঃ ‘আমি তোমাদেরকে বলেছিলাম, যদি তোমরা এই দুই ব্যক্তিকে ধরতে পার , আগুনে পুড়িয়ে মারবে। কিন্তু পরে আমি ভেবে দেখলাম এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য কাউকে আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়া উচিত নয়। তাই তোমরা যদি তাদেরকে ধরতে পার, হত্যা করবে।’ কিন্তু পরে তারা মুসলমান হয় এবং রাসূল(সা.) তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। (বুখারী, সিয়ারু আ’লাম আন-নুবালা ২/২৪৭, ইবন হিশাম-১/৬৫৭ )) পিছু ধাওয়া করে তাদের ধরে ফেলে। তারা যায়নাবের (রা.) সংগী লোকটিকে কাবু করে যায়নাবকে (রা.) উটের পিথ থেকে ফেলে দেয়। তিনি একটি পাথরের উপর ছিটকে পড়লে শরীর ফেতে রক্ত বের হয়ে যায়। এ অবস্থায় তারা যায়নাবকে (রা.) মক্কায় আবু সুফইয়ানের নিকট নিয়ে যায়। আবু সুফইয়ান তাকে বনী হাশিমের মেয়েদের কাছে সোপর্দ করে। পরে তিনি মদীনায় হিজরাত করেন। উটের পিঠ থেকে ফেলে দেওয়ায় তিনি যে আঘাত পান, আমরণ সেখানে ব্যথা অনুভব করতেন এবং সেই ব্যথায় শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন। এজন্য তাকে শহীদ মনে করা হতো। (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৭১)।

হযরত আয়িশা (রা.) বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহর (সা.) মেয়ে যায়নাব কিনানার সাথে মক্কা থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে বের হলো। মক্কাবাসীরা তাদের পিছু ধাওয়া করলো। হাব্বার ইবনুল আসওয়াদ সর্বপ্রথম যায়নাবকে ধরে ফেললো। সে যায়নাবের উটটি তিরবিদ্ধ করলে সে পড়ে গিয়ে আঘাত পেল। সে সন্তান সম্ভাবা ছিল। এই আঘাতে তাঁর গর্ভের সন্তানটি নষ্ট হয়ে যায়। অতঃপর বানু হাশিম ও বানু উমাইয়্যা তাকে নিয়ে বিবাদ শুরু করে দিল। অবশেষে সে হিন্দ বিনত উতবার নিকট থাকতে লাগলো। হিন্দ প্রায়ই তাকে বলতো, তোমার এ বিপদ তোমার বাবার জন্যেই হয়েছে। (ইবন হিশাম-১/৬৫৪)

একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) যায়দ ইবন হারিছাকে বললেন, তুমি কি যায়নাবকে আনতে পারবে? যায়দ রাজি হলো। হযরত রাসূলে কারীম (সা.) যায়দকে একটি আংটি দিয়ে বললেন, ‘এটা নিয়ে যাও, যায়নাবের কাছে পৌঁছাবে।’ আংটি নিয়ে যায়দ মক্কার দিকে চললো। মক্কার উপকণ্ঠে সে এক রাখালকে ছাগল চরাতে দেখলো। সে তাকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কার রাখাল? বললো, ‘আবুল’আসের’। আবার জিজ্ঞেস করলো, ছাগলগুলি কার? বললো, ‘যায়নাব বিনত মুহাম্মাদের।’ যায়দ কিছুদূর রাখালের সাথে চললো। তারপর তাকে বললো, ‘আমি যদি একটি জিনিস তোমাকে দিই, তুমি কি তা যায়নাবের কাছে পৌঁছে দিতে পারবে?’ রাখাল রাজি হলো। যায়দ তাকে আংটিটি দিল, আর রাখাল সেটি যায়নাবের হাতে পৌঁছে দিল।

যায়নাব রাখালকে জিজ্ঞেস করলো, ‘এটি তোমাকে কে দিয়েছে?’ বললো, ‘একটি লোক’। আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘তাকে কোথায় ছেড়ে এসেছো?’ বললো। অমুক স্থানে। যায়নাব চুপ থাকলো। রাতের আঁধারে যায়নাব চুপে চুপে সেখানে গেল। যায়দ তাকে বললো, ‘তুমি আমার উটের পিঠে উঠে আমার সামনে বস।’ যায়নাব বললো, না, আপনিই আমার সামনে বসুন। এভাবে যায়নাব যায়দের(রাযিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু) পিছনে বসে মদিনায় পৌঁছলেন। হযরত রাসূলে কারীম (সা.) প্রায়ই বলতেন, ‘আমার সবচেয়ে ভালো মেয়েটি আমার জন্যই কষ্ট ভোগ করেছে।’ (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৭১-৭২)

সীরাতের গ্রন্থসমূহে হযরত যায়নাবের (রা.) মক্কা থেকে মদীনা পৌঁছার ঘটনাটি একাধিক সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বর্ণিত হতে দেখা যায়।

যেহেতু তাদের দুইজনের মধ্যের সম্পর্ক অতি চমৎকার ছিল, এ কারনে হযরত যায়নাবের (রা.) মদীনায় চলে যাওয়ার পর আবুল ‘আস বেশীর ভাগ সময় খুবই বিমর্ষ থাকতেন। একবার তিনি যখন সিরিয়া সফরে ছিলেন তখন যায়নাবের (রা.) কথা স্মরণ করে নিম্নের পংক্তি দুইটি আওড়াতে থাকেনঃ

“যখন আমি ‘আরিম’নামক স্থানটি অতিক্রম করলাম তখন যায়নাবের কথা মনে হলো। বললাম, আল্লাহ তা’আলা ঐ ব্যক্তিকে সজীব রাখুন যে হারামে বসবাস করছেন। আমীন। মুহাম্মাদের (সা.) মেয়েকে আল্লাহ তা‘আলা ভালো প্রতিদান দিন। আর প্রত্যেক স্বামী সেই কথার প্রশংসা করে যা তাঁর ভালো জানা আছে।” (তাবাকাত-৮/৩২; আনসাবুল আশরাফ-১/৩৯৮)

মক্কার কুরাইশদের যে বিশেষ গুণের কথা কুরআনে ঘোষিত হয়েছে- ‘রিহলাতাশ শিতায়ি ওয়াস সাঈফ’- শীতকালে ইয়ামনের দিকে এবং গ্রীষ্মকালে শামের দিকে তাদের বাণিজ্য কাফেলা চলাচল করে- আবুল ‘আসের মধ্যেও এ গুঁটির পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল। মক্কা ও শামের মধ্যে সবসময় তাঁর বাণিজ্য কাফেলা যাতায়াত করতো। তাতে কমপক্ষে একশো উটসহ দুইশো লোক থাকতো। তাঁর ব্যবসায়িক বুদ্ধি, সততা ও আমানতদারীর জন্য মানুষ তাঁর কাছে নিজেদের পণ্যসম্ভার নিশ্চিন্তে সমর্পণ করতো। ইবন ইসহাক বলেন, ‘অর্থ-বিত্ত, আমানতদারী ও ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি মক্কার গণ্যমান্য মুষ্টিমেয় লোকদের অন্যতম ছিলেন।’ (আল-ইসাবা-৪/১২২)
স্ত্রী যায়নাব (রা.)থেকে বিচ্ছেদের পর আবুল আস মক্কায় কাটাতে লাগলেন। হিজরী ৬ষ্ঠ সনের জামাদি-উল-আওয়াল মাসে তিনি কুরাইশদের ১৭০ উটের একটি বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে সিরিয়া যান। বাণিজ্য শেষে মক্কায় ফেরার পথে কাফিলাটি যখন মদিনার কাছাকাছি স্থানে তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) খবর পেলেন। তিনি একশ সত্তর সদস্যের একটি বাহিনীসহ যায়দ ইবন হারিছাকে(রা) পাঠালেন কাফিলাটি ধরার জন্য। ‘ঈস নামক স্থানে দুইটি দল মুখোমুখি হয়। মুসলিম বাহিনী কুরাইশ কাফিলার বাণিজ্য সম্ভারসহ সকল লোককে বন্দী করে মদীনায় নিয়ে যায়। তবে আবুল ‘আসকে ধরার জন্য তাঁরা তেমন চেষ্টা চালালো না। তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেন। (আনসাবুল আশরাফ-১/৩৭৭, ৩৯৯-৪০০; তাবাকাত- ৮/৩৩, সিয়ারু আল‘লাম আন-নুবালা-২/২৪৯)

অবশ্য মূসা ইবন উকবার মতে, আবু বাসীর ও তার বাহিনী আবুল ‘আসের কাফিলার উপর আক্রমণ চালায়। উল্লেখ্য যে, এই আবু বাসীর ও আরও কিছু লোক হুদায়বিয়ার সন্ধির পর ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে সন্ধির শর্তানুযায়ী মদীনাবাসীরা তাঁদের আশ্রয় দিতে অক্ষমতা প্রকাশ করে। ফলে মক্কা থেকে পালিয়ে তাঁরা লোহিত সাগরের তীরবর্তী এলাকায় বসবাস করতে থাকেন। তাঁরা সংঘবদ্ধভাবে মক্কার বাণিজ্য কাফিলার উপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে লুটপাট করতে থাকেন। তাঁরা কুরায়শদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ান। তাঁদের ভয়ে কুরায়শদের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। অবশেষে মক্কার কুরায়শরা বাধ্য হয়ে তাদেরকে মদীনায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহকে (সা.) অনুরোধ করেন। (আল-ইসাবা-৪/১২২)

যাই হোক, আবুল ‘আস তার কাফিলার এ পরিণতি দেখে মক্কায় না গিয়ে ভীত সন্ত্রস্তভাবে রাতের অন্ধকারে চুপে চুপে মদীনায় প্রবেশ করলেন এবং সোজা যায়নাবের (রা.) কাছে পৌঁছে আশ্রয় নিলেন। যায়নাব তাকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেন। কেউ কিছুই জানলো না। (আনসাবুল আশরাফ-১/৩৭৭, ৩৯৯)

রাত কেটে গেল। হযরত রাসূলে কারীম(সা.)নামাযের জন্য মসজিদে গেলেন। তিনি মিহরাবে দাড়িয়ে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে তাকবীর তাহরীমা বেঁধেছেন। পিছনের মুক্তাদীরাও তাকবীর তাহরীমা শেষ করেছে। এমন সময় পিছনে মেয়েদের কাতার থেকে যায়নাবের (রা.) কণ্ঠস্বর ভেসে এলো- ‘ওহে জনমণ্ডলী, আমি মুহাম্মাদের (সা.) কন্যা যায়নাব। আমি আবুল ‘আসকে নিরাপত্তা দিয়েছি, আপনারাও তাকে নিরাপত্তা দিন।’

রাসূলুল্লাহ (সা.) নামায শেষ করে লোকদের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, “আমি যা শুনেছি তোমরাও কি তা শুনেছো?”

লোকেরা জবাব দিল, ‘হাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ!’ রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘যার হাতে আমার জীবন, সেই সত্তার শপথ, আমি এ ঘটনার কিছুই জানিনে। কি অবাক কাণ্ড! মুসলমানদের একজন দুর্বল সদস্যাও শত্রুকে নিরাপত্তা দেয়। সে সকল মুসলমানের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা দিয়েছে।’ (আনসাবুল আশরাফ-১/৩৯৯-৪০০; তাবাকাত- ৮/৩৩)

অতঃপর রাসূল (সা.) ঘরে গিয়ে মেয়েকে বললেন, ‘আবুল আসের থাকার সম্মানজনক ব্যবস্থা করবে। তবে জেনে রেখ তুমি আর তার জন্য হালাল নও। যতক্ষণ সে মুশরিক থাকবে। হযরত যায়নাব (রা.) পিতার কাছে আবেদন জানালেন আবুল ‘আসের কাফিলার লোকদের অর্থসম্পদসহ মুক্তিদানের জন্য।

রাসূলুল্লাহ (সা.) সেই বাহিনীর লোকদের ডাকলেন যারা আবুল ‘আসের কাফিলার উট ও লোকদের ধরে নিয়ে এসেছিল। তিনি তাদের বললেন, ‘আমার ও আবুল ‘আসের মধ্যে যে সম্পর্ক তা তোমরা জান। তোমরা তার বাণিজ্য সম্ভার আটক করেছো। তার প্রতি সদয় হয়ে তার মালামাল ফেরত দিলে আমি খুশি হবো। আর তোমরা রাজি না হলে আমার কোন আপত্তি নেই। আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে তোমরা তা ভোগ করতে পার। তোমরাই সেই মালের বেশী হকদার।’ তারা বললো, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তার সবকিছু ফেরত দিচ্ছি।’। (ইবন হিশাম-১/৬৫৮; তাবাকাত-৮/৩৩)

আবুল ‘আস চললেন তাদের সাথে মালামাল বুঝে নিতে। পথে তারা আবুল ‘আসকে বললো, শোন আবুল ‘আস, কুরায়শদের মধ্যে তুমি একজন মর্যাদাবান ব্যক্তি। তাছাড়া তুমি রাসূলুল্লাহর (সা.) চাচাতো ভাই এবং তাঁর মেয়ের স্বামী। তুমি এক কাজ কর। ইসলাম গ্রহণ করে মক্কাবাসীদের এ মালামালসহ মদীনায় থেকে যাও। বেশ আরামে থাকবে। আবুল ‘আস বললেন, তোমরা যা বলেছো তা ঠিক নয়। আমি আমার নতুন দ্বীনের জীবন শুরু করবো শঠতার মাধ্যমে? (প্রাগুক্ত)

আবুল ‘আস তাঁর কাফিলা ছাড়িয়ে নিয়ে মক্কায় পৌঁছলেন। মক্কায় প্রত্যেকের মাল বুঝিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, ‘ হে কুরায়শ গোত্রের লোকেরা! আমার কাছে তোমাদের আর কোন কিছু পাওনা আছে কি?’ তারা বললো না। আল্লাহ তোমাকে উত্তম পুরস্কার দান করুন। আমরা তোমাকে একজন চমৎকার প্রতিশ্রুতি পালনকারী রূপে পেয়েছি।

আবুল ‘আস বললেন, ‘আমি তোমাদের হক পূর্ণরূপে আদায় করেছি। এখন আমি ঘোষণা করছি- আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদ আবদুহু ও রাসূলুহু- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর একজন বান্দা ও রাসূল। মদীনায় অবস্থানকালে আমি এ ঘোষণা দিতে পারতাম। কিন্তু তা দেইনি এ জন্যে যে, তোমরা ধারনা করতে আমি তোমাদের মাল আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যেই এমন করেছি। আল্লাহ যখন তোমাদের যার যার মাল ফেরত দানের তাওফিক আমাকে দিয়েছেন এবং আমি আমার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছি, তখনই আমি ইসলামের ঘোষণা দিচ্ছি।’

এ হিজরী সপ্তম সনের মুহাররম মাসের ঘটনা। এরপর হযরত আবুল ‘আস (রা) জন্মভূমি মক্কা থেকে হিজরাত করে মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা.) খিদমতে হাজির হন। (প্রাগুক্ত)

হযরত রাসূলে কারীম (সা.) সম্মানের সাথে আবুল ‘আসক (রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু) গ্রহণ করেন এবং তাঁদের বিয়ের প্রথম ‘আকদের ভিত্তিতে স্ত্রী যায়নাবকেও (রা.) তাঁর হাতে সোপর্দ করেন। (সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৪৯; আল ইসাবা-৪/৩১২)

হযরত যায়নাব (রা.)স্বামী আবুল ‘আসকে তাঁর পৌত্তলিকতা অবস্থায় মক্কায় ছেড়ে এসেছিলেন। এ কারণে স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটেছিল বলে ধরে নেওয়া যায়। পরে আবুল ‘আস যখন ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় আসলেন তখন রাসূল (সা.) যায়নাবকে তাঁর কাছে ফিরিয়ে দিলেন। এখন প্রশ্ন হলো, প্রথম ‘আকদের ভিত্তিতে যায়নাবকে প্রত্যর্পণ করেছিলেন, না আবার নতুন ‘আকদ হয়েছিল? এ ব্যাপারে দুই রকম বর্ণনা পাওয়া যায়। হযরত ইবন ‘আব্বাস (রা)বলেনঃ

‘রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর মেয়েকে অনেক বছর পর প্রথম বিয়ের ভিত্তিতে আবুল ‘আসের নিকট ফিরিয়ে দেন এবং কোন রকম নতুন মাহর ধার্য করেন নি।’ (ইবন হিশাম-১/৬৫৮-৫৯; তিরমিযী-১১৪৩; ইবন মাজাহ-২০০৯; সিয়ারু আল‘লাম আন-নুবালা-২/২৪৯)

ইমাম শা’বী বলেনঃ

‘যায়নাব ইসলাম গ্রহণ করেন এবং হিজরাতও করেন। তারপর আবুল ‘আস ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূল (সা.) তাঁদের বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটাননি।’ (তাবাকাত-৮/৩২)

এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যে, তখনও পর্যন্ত সূরা আল-মুমতাহিনার নিম্নের আয়াতটি নাযিল হয়নিঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا جَاءَكُمُ الْمُؤْمِنَاتُ مُهَاجِرَاتٍ فَامْتَحِنُوهُنَّ ۖ اللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيمَانِهِنَّ ۖ فَإِنْ عَلِمْتُمُوهُنَّ مُؤْمِنَاتٍ فَلَا تَرْجِعُوهُنَّ إِلَى الْكُفَّارِ ۖ لَا هُنَّ حِلٌّ لَّهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلُّونَ لَهُنَّ ۖ وَآتُوهُم مَّا أَنفَقُوا ۚ وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ أَن تَنكِحُوهُنَّ إِذَا آتَيْتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ ۚ وَلَا تُمْسِكُوا بِعِصَمِ الْكَوَافِرِ وَاسْأَلُوا مَا أَنفَقْتُمْ وَلْيَسْأَلُوا مَا أَنفَقُوا ۚ ذَٰلِكُمْ حُكْمُ اللَّهِ ۖ يَحْكُمُ بَيْنَكُمْ ۚ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

“মুমিনগণ, যখন তোমাদের কাছে ঈমানদার নারীরা হিজরত করে আসে তখন তাদেরকে পরীক্ষা কর। আল্লাহ তাঁদের ঈমান সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন। যদি তোমরা জান যে তারা ঈমানদার, তবে আর তাদেরকে কাফিরদের কাছে ফেরত পাঠিও না। এরা কাফিরদের জন্যে হালাল নয় এবং কাফিররা এদের জন্যে হালাল নয়।” (সূরা আল-মুমতাহিনা-১০)

এ আয়াত ব্যক্ত করছে যে, যে নারী কোন কাফির পুরুষের স্ত্রী ছিল, এরপর সে মুসলমান হয়ে গেছে, তাঁর বিয়ে কাফিরের সাথে আপনা-আপনি বাতিল হয়ে গেছে। এখন তারা একে অপরের জন্যে হারাম।

একই ধরণের কথা হযরত কাতাদাও বলেছেন। তিনি বলেনঃ

‘এ ঘটনার পরে নাযিল হয় সূরা আল-বারায়াত।’ অতঃপর কোন স্ত্রী তাঁর স্বামীর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করলে নতুন করে ‘আকদ ছাড়া স্ত্রীর উপর স্বামীর কোন প্রকার অধিকার থাকতো না। (তাবাকাত-৮/৩২)

কিন্তু তাঁর পূর্বে মুসলিম নারীরা স্বামীর ইসলাম গ্রহণের পর নতুন ‘আকদ ছাড়াই স্বামীর কাছে ফিরে যেতেন। (আল-ইসাবা-৪/৩১২)

তবে অন্য একটি বর্ণনায় এসেছেঃ

‘নবী (সা.) নতুন বিয়ে ও নতুন মাহরের ভিত্তিতে যায়নাবকে আবুল ‘আসের নিকট প্রত্যার্পণ করেন।’ (তিরমিযী-১১৪২; তাবাকাত-৮/৩২; সিয়ারু আল‘লাম আন-নুবালা-২/২৪৮) ইমাম আহমাদ বলেনঃ এটি একটি দুর্বল হাদীছ।

সনদের দিক দিয়ে ইবন আব্বাসের (রা) বর্ণনাটি যদিও অপর বর্ণনাটির উপর প্রাধান্যযোগ্য, তবুও ফকীহরা দ্বিতীয়বার ‘আকদের বর্ণনাটির উপর আমল করেছেন। তাঁরা ইবন আব্বাসের (রা) বর্ণনাটির এরূপ ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, যেহেতু দ্বিতীয় ‘আকদের সময় মাহর ও অন্যান্য বিষয় অপরিবর্তিত ছিল, তাই তিনি প্রথম ‘আকদ বলে বর্ণনা করেছেন। অন্যথায় এ ধরণের বিচ্ছেদে দ্বিতীয়বার ‘আকদ অপরিহার্য। ইমাম সুহায়লীও এরূপ কথা বলেছেন। (ইবন হিশাম (টীকা)-১/৬৫৯)

হযরত যায়নাব (রা.) পিতা রাসূলুল্লাহ (সা.) ও স্বামী আবুল ‘আস (রা) – উভয়কে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। ভালো দামী কাপড় পরতে আগ্রহী ছিলেন। হযরত আনাস (রা) একবার তাকে একটি রেশমী চাদর গায়ে দেওয়া অবস্থায় দেখতে পান। চাদরটির পাড় ছিল হলুদ বর্ণের।(তাবাকাত-৮/৩৩-৩৪; সিয়ারু আল‘লাম আন-নুবালা-২/২৪৮)

হযরত আবু ‘আসের (রা) ঔরসে হযরত যায়নাবের (রা.) দুইটি সন্তান জন্মলাভ করে। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। ছেলে ‘আলী হিজরতের পূর্বে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে নিজের দায়িত্বে নিয়ে প্রতিপালন করতে থাকেন। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন মক্কায় প্রবেশ করেন তখন ‘আলী নানার উটের পিঠে সওয়ার ছিলেন। বালেগ হওয়ার পূর্বে পিতা আবুল ‘আসের (রা) জীবদ্দশায় ইনতিকাল করেন।(আল-আ’লাম-৩/৬৭)

কিন্তু ইবন ‘আসাকিরের একটি বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, ‘আলী ইয়ারমুক যুদ্ধ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন এবং এই যুদ্ধে শাহাদাত বরন করেন। (আল-ইসাবা-৪/৩১২) মেয়ে উমামা (রা.) দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন।

হযরত যায়নাব (রা.) স্বামী আবুল ‘আসের (রা) সাথে পুনর্মিলনের পর বেশীদিন বাঁচেননি। একবছর বা তাঁর চেয়ে কিছু বেশীদিন মদীনায় স্বামীর সাথে কাটানোর পর হিজরী অষ্টম সনের প্রথম দিকে মদীনায় ইনতিকাল করেন। (তাবাকাত-৮/৩৪; আল-আ’লাম-৩/৬৭)

তাঁর মৃত্যুর কারণ ও অবস্থা সম্পর্কে ইবন ‘আবদিল বার লিখেছেনঃ

‘হযরত যায়নাবের (রা.) মৃত্যুর কারণ হলো, যখন তাঁর পিতা রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে যাওয়ার জন্য মক্কা থেকে বের হন তখন হাব্বার ইবন আল-আসওয়াদ ও অন্য এক ব্যক্তি তাঁর উপর আক্রমণ করে। তাঁদের কেউ একজন তাকে পাথরের উপর ফেলে দেয়। এতে তাঁর গর্ভপাত ঘটে রক্ত ঝরে এবং তিনি দীর্ঘদিন পর্যন্ত রোগে ভোগতে থাকেন। অবশেষে হিজরী অষ্টম সনে ইনতিকাল করেন।’ (আল-ইসতি ‘আব (আল-ইসাবার পার্শ্বটিকা) ৪/৩১২)

হযরত উম্মু আয়মান (রা.), হযরত সাওদা (রা.), হযরত উম্মু সালামা (রা.) ও হযরত উম্মু ‘আতিয়া (রা.), হযরত যায়নাবকে (রা.) গোসল দেন। (আনসাবুল আশরাফ-১/৪০০) রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর জানাযার নামায পড়ান এবং নিজে কবরে নেমে নিজ হাতে অতি আদরের মেয়েটিকে কবরের মধ্যে রেখে দেন। তখন রাসূলুল্লাহর (সা.) চেহারা মুবারক খুবই বিমর্ষ ও মলিন দেখাচ্ছিল। তিনি তাঁর জন্য দু‘আ করেন এই বলেঃ হে আল্লাহ! যায়নাবের (রা.) সমস্যাসমূহের সমাধান করে দিন এবং তাঁর কবরের সংকীর্ণতাকে প্রশস্ততায় পরিবর্তন করে দিন। (উসুদুল গাবা-৫/৪৬৮; তাবাকাত-৮/৩৪)

হযরত উম্মু ‘আতিয়া (রা.) বলেন, আমি যায়নাব বিনতে রাসূলিল্লাহর (সা.) গোসলে শরীক ছিলাম। গোসলের নিয়ম-পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেই বলে দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, প্রথমে প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তিন অথবা পাঁচবার গোসল দিবে। তারপর কর্পূর লাগাবে। (তাবাকাত-৮/৩৩-৩৪; সিয়ারু আল‘লাম আন-নুবালা-২/২৫০) একটি বর্ণনায় সাতবার গোসল দেওয়ার কথাও এসেছে। মূলত উদ্দেশ্য ছিল তাহারাত বা পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা যদি তিনবারে অর্জিত হয়ে যায় তাহলে বেশী ধোয়ার প্রয়োজন নেই। তা না হলে পাঁচ/সাত বারও ধুতে হবে। উম্মু ‘আতিয়া (রা.) আরও বলেনঃ

আমরা যখন যায়নাবকে (রা.) গোসল দিচ্ছিলাম তখন রাসূল(সা.) আমাদেরকে বললেনঃ ‘তোমরা তাঁর ডান দিক ও ওজুর স্থানগুলি হতে গোসল আরম্ভ করবে।’ (প্রাগুক্ত)

হযরত রাসূলে কারীম (সা.) উম্মু ‘আতিয়াকে (রা.) একথাও বলেন যে, গোসল শেষ হলে তোমরা আমাকে জানাবে। সুতরাং গোসল শেষ হলে তাকে জানানো হয়। তিনি নিজের একখানি তবন (লুঙ্গি) দিয়ে বলেন, এটি কাফনের কাপড়ের মধ্যে প্রতীক হিসেবে দিয়ে দাও। (বুখারীঃ বাবু গুসলিল মায়্যিত; সিয়ারু আল‘লাম আন-নুবালা-২/২৫২) রাসূল (সা.) যায়নাবকে (রা.) তাঁর পূর্বে মৃত্যুবরণকারী ‘উছমান ইবন মাজ’উনের (রাযিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু) পাশে দাফন করার নির্দেশ দেন। (আনসাবুল আশরাফ-১/২১২)

হযরত যায়নাবের (রা.) ইনতিকালের অল্প কিছুদিন পর তাঁর স্বামী আবুল ‘আসও (রাযিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু) ইনতিকাল করেন। (উসুদুল গাবা-৫/৪৬৮) বালাজুরী বলেন, ইসলাম গ্রহণের পর তিনি রাসূলুল্লাহর (সা.) সাথে কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি এবং হিজরী ১২ সনে ইনতিকাল করেন। হযরত যুবায়ের ইবনুল ‘আওয়াম (রাযিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু) ছিলেন তাঁর মামাতো ভাই। মৃত্যুর পূর্বে তাকেই অসী বানিয়ে যান। (আনসাবুল আশরাফ-১/৪০০)

সূত্রঃ আসহাবে রাসূলের জীবনকথা, ৬নং খণ্ড

মতামত দিন