সলাতে মুবাশ্‌শির (পর্ব ২৬)

রচনায় : আব্দুল হামীদ ফাইযী

পাঁচ-ওয়াক্ত নামাযে সুন্নতী ক্বিরাআত

সূরা ফাতিহার পর নামাযী তার নিজের মুখস্থ ও সহ্‌জ মত অন্য যে কোন একটি সূরা পাঠ করতে পারে। অবশ্য কতকগুলি বিশিষ্ট সূরা মহানবী (সাঃ) বিশেষ নামাযে পাঠ করতেন বলে অনুরুপ পাঠ করাকে সুন্নতী ক্বিরাআত বলে। এ সকল নামায ও সূরার বিস্তারিত বিবরণ জানার পূর্বে কুরআন মাজীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কয়েকটি পরিভাষা জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

কুরআন মাজীদকে ৭ ভাগে বিভক্ত করলে শেষ ভাগে যে সব সূরা পড়ে তার সমষ্টিকে ‘মুফাস্‌স্বাল’ বলা হয়। ‘ফাস্ৱল’ মানে পরিচ্ছেদ। এই অংশে সূরা ও পরিচ্ছেদের সংখ্যা অধিক বলে একে ‘মুফাস্‌স্বাল’ বা পরিচ্ছেদ-বহুল অংশ বলা হয়ে থাকে। সঠিক অভিমত অনুসারে এই অংশের প্রথম সূরা হল সূরা ক্বাফ।

এই মুফাস্‌স্বাল আবার ৩ ভাগে বিভক্ত; সূরা ক্বাফ থেকে সূরা মুরসালাত পর্যন্ত অংশকে ‘ত্বিওয়ালে মুফাস্‌স্বাল’ (দীর্ঘ পরিচ্ছেদ-বহুল অংশ), সূরা নাবা থেকে সূরা লাইল পর্যন্ত অংশকে ‘আউসাত্বে মুফাস্‌স্বাল’ (মাঝারি পরিচ্ছেদ-বহুল অংশ), আর সূরা য্বুহা থেকে শেষ সূরা (নাস) পর্যন্ত অংশকে ‘ক্বিসারে মুফাস্‌স্বাল’ (ছোট পরিচ্ছেদ-বহুল অংশ) বলা হয়।(আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৩/১০৫)

ফজরের নামাযে সুন্নতী ক্বিরাআত

নবী মুবাশ্‌শির (সাঃ) ফজরের নামাযে ‘ত্বিওয়ালে মুফাস্‌স্বাল’ পাঠ করতেন। যেহেতু এই সময়টি হল পরিবেশ শান্ত এবং ঘুম পূর্ণ করার পর মনে স্ফূর্তি থাকার ফলে মনোযোগ সহকারে কুরআন তিলাওয়াতের সময়। তাছাড়া মহান আল্লাহ বলেন,

أقِمِ الصَّلاَةَ لِدُلُوْكِ الشَّمْسِ إِلىَ غَسَقِ اللَّيْلِ وَقُرْآنِ الْفَجْرِ إِنَّ قُرْآنَ الْفَجْرِ كَانَ مَشْهُوْداً

অর্থাৎ, সূর্য ঢলে যাওয়ার পর হতে রাতের ঘন অন্ধকার পর্যন্ত তুমি নামায কায়েম কর; আর বিশেষ করে ফজরের কুরআন (নামায কায়েম কর)। কারণ, ফজরের কুরআন (নামাযে ফিরিশ্‌তা) উপস্থিত হয়ে থাকে। (কুরআন মাজীদ ১৭/৭৮)

এখানে ফজরের কুরআন বলে ফজরের নামাযকে বুঝিয়ে এই কথার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, উক্ত নামাযে কুরআন অধিক সময় ধরে পড়া হবে। আর তার গুরুত্ব এত বেশী যে, তাতে ফিরিশ্‌তা উপস্থিত হয়ে থাকেন।

তিনি উক্ত নামাযে কখনো কখনো সূরা ওয়া-ক্বিআহ বা অনুরুপ সূরা পাঠ করতেন। (আহমাদ, মুসনাদ, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ,হাকেম, মুস্তাদরাক, সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ১০৯পৃ:)

বিদায়ী হজ্জের এক ফজরের নামাযে তিনি সূরা তূর পাঠ করেছেন। (বুখারী ১৬১৯ নং)

কখনো বা তিনি সূরা ক্বাফ বা অনুরুপ সূরা প্রথম রাকআতে পাঠ করতেন। (মুসলিম,  তিরমিযী, সুনান, মিশকাত ৮৩৫ নং)

কখনো কখনো সূরা তাকবীর (ইযাশ্‌ শামসু কুউবিরাত) পাঠ করতেন। (মুসলিম,  আবূদাঊদ, সুনান, মিশকাত ৮৩৬ নং)

একদা ফজরে তিনি সূরা যিলযালকে উভয় রাকআতেই পাঠ করেন। বর্ণনাকারী সাহাবী বলেন, ‘কিন্তু জানি না যে, তিনি তা ভুলে পড়ে ফেলেছেন, নাকি ইচ্ছা করেই পড়েছেন।’ (আবূদাঊদ, সুনান, বায়হাকী, মিশকাত ৮৬২ নং) সাধারণত: যা বুঝা যায় তা এই যে, মহানবী (সাঃ) ঐরুপ বৈধতা বর্ণনার উদ্দেশ্যেই ইচ্ছা করেই (একই সূরা উভয় রাকআতে পাঠ) করেছেন। (সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ১১০পৃ:)

একদা এক সফরে তিনি ফজরের প্রথম রাকআতে সূরা ফালাক্ব ও দ্বিতীয় রাকআতে সূরা নাস পাঠ করেছেন। (আবূদাঊদ, সুনান ১৪৬২, নাসাঈ, সুনান, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ, ইবনে আবী শাইবা,হাকেম, মুস্তাদরাক ১/৫৬৭, আহমাদ, মুসনাদ ৪/১৪৯, ১৫০, ১৫৩, মিশকাত ৮৪৮ নং)

উক্ববাহ্‌ বিন আমের (রাঃ) কে তিনি বলেছেন, “তোমার নামাযে সূরা ফালাক্ব ও নাস পাঠ কর। (উভয় সূরায় রয়েছে বিভিন্ন অনিষ্টকর বিষয় থেকে আশ্রয় প্রার্থনা।) কারণ এই দুই (প্রার্থনার) মত কোন প্রার্থনা দ্বারা কোন প্রার্থনাকারী আশ্রয় প্রার্থনা করে নি।” (আবূদাঊদ, সুনান, ১৪৬৩, আহমাদ, মুসনাদ, সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ১১০পৃ:)

আবার কখনো কখনো এ সবের চেয়ে লম্বা সূরাও পাঠ করতেন। এই নামাযে তিনি এক রাকআতে অথবা উভয় রাকআতে ৬০ থেকে ১০০ আয়াত মত পাঠ করতেন। (বুখারী ৭৭১ নং, মুসলিম, সহীহ)

কখনো তিনি সূরা রুম পাঠ করতেন। (আহমাদ, মুসনাদ, নাসাঈ, সুনান, বাযযার) কখনো পাঠ করতেন সূরা ইয়াসীন। (আহমাদ, মুসনাদ, সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ১১০পৃ:)

একদা মক্কায় ফজরের নামাযে তিনি সূরা মু’মিনূন শুরু করলেন, অতঃপর মূসা ওহারুন অথবা ঈসা (আঃ) এর বর্ণনা এলে (অর্থাৎ উক্ত সূরার ৪৫ অথবা ৫০ আয়াত পাঠের পর) তাঁকে কাশিতে ধরলে তিনি রুকূতে চলে যান। (বুখারী, বিনা সনদে, ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার ২/২৯৮, মুসলিম,  মিশকাত ৮৩৭নং)

আবার কখনো কখনো তিনি সূরা স্বা-ফফাত পাঠ করে ইমামতি করতেন। (আহমাদ, মুসনাদ, আবূ য়্যা’লা, মাক্বদেসী, সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ১১১পৃ:)

জুমআর দিন ফজরে তিনি প্রথম রাকআতে সূরা সাজদাহ এবং দ্বিতীয় রাকআতে সূরা দাহ্‌র পাঠ করতেন। (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ৮৩৮ নং)

হযরত উসমান (রাঃ) ফজরের নামাযে অধিকাংশ সময়ে সূরা ইউসুফ ও সূরা হজ্জ ধীরে ধীরে পাঠ করতেন। অবশ্য তিনি ফজর উদয় হওয়ার সাথে সাথেই নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। (মালেক, মুঅত্তা ৩৫, মিশকাত ৮৬৪ নং)

যোহরের নামাযে সুন্নতী ক্বিরাআত

যোহরের (প্রথমকার) উভয় রাকআতে ৩০ আয়াত মত অথবা সূরা সাজদাহ পাঠ করার মত সময় কুরআন পাঠ করতেন।(আহমাদ, মুসনাদ, মুসলিম,  মিশকাত ৮২৯ নং)

কখনো তিনি সূরা ত্বা-রিক্ব, বুরুজ, লাইল বা অনুরুপ কোন সূরা পাঠ করতেন। (আবূদাঊদ, সুনান ৮০৫, ৮০৬, তিরমিযী, সুনান, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ)  আবার কখনো কখনো পড়তেন সূরা ‘ইযাস সামা-উন শা ক্বা ত’ বা অনুরুপ কোন সূরা। (ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ ৫১১নং)

সাহাবাগণ (রাঃ) আল্লাহর রসূল (সাঃ) এর দাড়ি হিলা দেখে তাঁর ক্বিরাআত পড়া বুঝতে পারতেন। (বুখারী ৭৬০, আবূদাঊদ, সুনান ৮০১ নং)

কখনো কখনো তিনি মুক্তাদীগণকে আয়াত (একটু শব্দ করে পড়ে) শুনিয়ে দিতেন। (বুখারী,মুসলিম, সহীহ ৮২৮)

কখনো কখনো সাহাবাগণ (রাঃ) তাঁর নিকট হতে যোহরের নামাযে সূরা আ’লা ও গাশিয়াহ্‌র সুর শুনতে পেতেন। (ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ ৫১২নং)

কখনো কখনো তিনি যোহরের ক্বিরাআত এত লম্বা করতেন যে, নামায শুরু হওয়ার পর কেউ কেউ বাকী’ [মহানবী (সাঃ) এর আমলে মদীনার পূর্বে এবং বর্তমানে মসজিদে নববীর পূর্ব দিকে অনতি দূরে অবস্থিত খালি জায়গা। বর্তমানে কবরস্থান] গিয়ে পায়খানা ফিরে এসে নিজের বাড়িতে ওযু করে যখন মসজিদে আসত, তখনও দেখত মহানবী (সাঃ) প্রথম রাকআতেই আছেন। (মুসলিম, সহীহ ৪৫৪ নং, বুখারী জুযউল ক্বিরাআহ্‌)

এ ব্যাপারে সাহাবাগণের ধারণা এই ছিল যে, তিনি সকলকে প্রথম রাকআত পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এত লম্বা ক্বিরাআত পড়তেন। (আবূদাঊদ, সুনান ৮০০ নং, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ)

(চলবে)

মতামত দিন

2 কমেন্ট