সলাত

স্বলাতে মুবাশ্‌শির (পর্ব ১৩)

রচনায় : আব্দুল হামীদ ফাইযী

আযানের জওয়াব

আযান শুরু হলে চুপ থেকে শুনে তার জওয়াব দেওয়া বিধেয় (সুন্নত)। মুআযযিন ‘আল্লাহু আকবার’ বললে, শ্রোতাও তার জবাবে ‘আল্লাহু আকবার’ বলবে। মুআযযিন ‘আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌, আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্‌’ বললে শ্রোতা বলবে, ‘অআনা, অআনা।’ অর্থাৎ আমিও সাক্ষি দিচ্ছি, আমিও। (আবূদাঊদ, সুনান ৫২৬নং)

এই সময় নিম্নের দুআও বলতে হয়:-

وَ أَنَا أَشْهَدُ أَنْ لاَّ إِلهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيْكَ لَهُ وَ (أَشْهَدُ) أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ، رَضِيْتُ بِاللهِ رَباًّ وَبِمُحَمَّدٍ (সাঃ) رَسُوْلاً وَّ بِالإِسْلاَمِ دِيْناً।

উচ্চারণ:- অআনা আশহাদু আললা ইলাহা ইল্লাল্লাহু অহদাহু লা শারীকা লাহ, অ (আশহাদু) আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু অরাসূলুহ্‌। রাযীতু বিল্লাহি রা ব্বাঁ উঅবিমুহাম্মাদিন (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামা) রাসূলাঁউঅবিল ইসলামি দীনা।

অর্থাৎ, আমিও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ সত্য উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোন অংশী নেই এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) তাঁর বান্দা ও রসূল। আল্লাহ আমার প্রতিপালক হওয়ার ব্যাপারে, মুহাম্মাদ (সাঃ) রসূল হওয়ার ব্যাপারে এবং ইসলাম আমার দ্বীন হওয়ার ব্যাপারে আমি সন্তুষ্ট।

এই দুআ পড়লে গুনাহসমূহ মাফ হয়ে যায়। (মুসলিম, সহীহ ৩৮৬, আবূদাঊদ, সুনান ৫২৫নং, তিরমিযী, সুনান, নাসাঈ, সুনান, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান)

আযানে মহানবী (সাঃ) এর নাম শুনে চোখে আঙ্গুল বুলানো বিদআত। এ ব্যাপারে বর্ণিত হাদীসটি জাল। (তাযকিরাহ্‌, ইবনে তাহের, রিসালাতুন ইলা মুআযযিন ৫৬পৃ:) অনুরুপ সেই সময় আঙ্গুলে চুমু খাওয়াও বিদআত।

মুআযযিন ‘হাইয়্যা আলাস স্বালাহ্‌’ ও ‘—ফালাহ্‌’ বললে জওয়াবে শ্রোতা বলবে,

لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِالله
উচ্চারণ:- লাহাউলা অলা ক্বু ওঅতা ইল্লা বিল্লাহ্‌।

অর্থাৎ, আল্লাহর তওফীক ছাড়া পাপকর্ম ত্যাগ করা এবং সৎকর্ম করার সাধ্য কারো নেই। (মুসলিম,  আবূদাঊদ, সুনান ৫২৭নং)

মুআযযিন ‘আসস্বলাতু খাইরুম মিনান নাউম’ বললে অনুরুপ বলে জওয়াব দিতে হবে। এর জওয়াবে অন্য কোন দুআ (যেমন ‘স্বাদাকতা অবারিরতা বা বারারতা–’ বলার হাদীস নেই। (সুবুলুস সালাম ৮৭পৃ:, তুহ্‌ফাতুল আহওয়াযী ১/৫২৫)

আযান শেষ হলে মহানবী (সাঃ) এর উপর দরুদ পাঠ করে নিম্নের দুআ পড়লে কিয়ামতে তাঁর সুপারিশ নসীব হবে;

اَللّهُمَّ رَبَّ هذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ، وَالصَّلاَةِ الْقَائِمَةِ، آتِ مُحَمَّداً الْوَسِيْلَةَ وَالْفَضِيْلَةَ وَابْعَثْهُ مَقَاماً مَّحْمُوْداً الَّذِيْ وَعَدْتَّهُ।

 “আল্লাহুম্মা রাব্বাহা-যিহিদ দা’ওয়াতিত তা-ম্মাতি অসসালা-তিল ক্বা-ইমাহ্‌, আ-তি মুহাম্মাদানিল অসীলাতা অলফাযীলাহ্‌, অবআসহু মাক্বা-মাম মাহ্‌মূদানিল্লাযী অআত্তাহ্‌।”

অর্থাৎ, হে আল্লাহ! হে এই পরিপূর্ণ আহবান ও প্রতিষ্ঠালাভকারী নামাযের প্রভু! তুমি মুহাম্মাদ (সাঃ) কে অসীলাহ্‌ (জান্নাতের সুউচ্চ স্থান) এবং মর্যাদা দান কর। আর তাঁকে সেই মাক্বামে মাহ্‌মূদ (প্রশংসিত স্থানে) প্রেরণ করো যার প্রতিশ্রুতি তুমি তাঁকে দান করেছ। (বুখারী ৬১৪নং, আবূদাঊদ, সুনান, তিরমিযী, সুনান, নাসাঈ, সুনান, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান)

প্রকাশ যে, উক্ত দুআর মাঝে ইবনে সুন্নীর বর্ণনায় ‘অদ্দারাজাতার রাফীআহ্‌’, (তদনুরুপ লোকেদের বর্ণনায় ‘সাইয়্যিদানা মুহাম্মাদান’, অরযুক্বনা শাফাআতাহু’) এবং শেষে বাইহাকীর বর্ণনায় অতিরিক্ত ‘ইন্নাকা লা তুখলিফুল মীআদ’ প্রভৃতি শুদ্ধ নয়। (ইর: ১/২৬১)

আল্লাহর রসূল (সাঃ) বলেন, “মুআযযিনকে আযান দিতে শুনলে তোমরাও ওর মতই বল। অতঃপর আমার উপর দরুদ পাঠ কর; কেননা, যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ এর বিনিময়ে তার উপর দশবার রহ্‌মত বর্ষণ করেন। অতঃপর তোমরা আমার জন্য আল্লাহর নিকট অসীলা প্রার্থনা কর; কারণ, অসীলা হল জান্নাতের এমন এক সুউচ্চ স্থান, যা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে একটি বান্দার জন্য উপযুক্ত। আর আমি আশা রাখি যে, সেই বান্দা আমিই। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার জন্য ঐ অসীলা প্রার্থনা করবে, তার জন্য আমার শাফাআত (সুপারিশ) অবধার্য হয়ে যাবে।” (মুসলিম, সহীহ প্রমুখ, মিশকাত ৬৫৭নং)

আযানের পূর্বে শুরুতে (উচ্চস্বরে বা মাইক্রোফোনে) দরুদ বা তাসবীহ পাঠ এবং অনুরুপ শেষেও দরুদ বা উক্ত দুআ (জোরে-শোরে) পাঠ বিদআত। শিখাবার উদ্দেশ্যেও আল্লাহর নবী (সাঃ) বা সলফদের কেউই এরুপ করে যান নি। (ইবনে বায, ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার ২/৯২, টীকা) যেমন আযান  ও ইকামতের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ্‌’ পড়া বিদআত। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ১/১৩২) তদ্রুপ উপরোক্ত ঐ দুআ  পড়ার সময় হাত তোলাও বিধেয় নয়। বিধেয় নয় আযান শুরু হলে মহিলাদের মাথায় কাপড় নেওয়া।

জ্ঞাতব্য যে, আযানের জওয়াব দেবে প্রত্যেক সেই ব্যক্তি যার জন্য আল্লাহর যিক্‌র করা বৈধ। অতএব পবিত্র অবস্থায়, অপবিত্র বা মাসিক অবস্থায় নারী-পুরুষ সকলের জন্যই আযানের জওয়াব দেওয়া মুস্তাহাব। অবশ্য নামায পড়া অবস্থায়, প্রস্রাব-পায়খানা করা অথবা বাথরুমে থাকা অবস্থায় এবং স্ত্রী-মিলন রত অবস্থায় আযানের উত্তর দেওয়া বৈধ নয়। এসব কাজ থেকে ফারেগ হওয়ার পর বাকী আযানের উত্তর দেওয়া বিধেয়।

যে ব্যক্তি কুরআন তেলাওয়াত বা যিক্‌র করে অথবা দারস দেয় সে ব্যক্তি তা বন্ধ রেখে আযানের জওয়াব দিয়ে পুনরায় তা ছেড়ে রাখা জায়গা থেকে শুরু করবে। (ফিকহুস সুন্নাহ্‌ ১/৮৭)

খাওয়ার সময় আযান হলে খেতে খেতেও আযানের জওয়াব দিতে এবং তারপর দুআ পড়তে কোন বাধা নেই। (ফাতাওয়া ইবনে উষাইমীন ১/৫৩২)

আযানের সময় দুআ কবুল হয়ে থাকে। (আবূদাঊদ, সুনান,হাকেম, মুস্তাদরাক, জামে ৩০৭৯ নং)

মসজিদ ছাড়া অন্য স্থানে আযান

ভয়, শত্রুতা প্রভৃতির কারণে মসজিদে যেতে বাধা থাকলে, মসজিদ বহু দূরে হলে (এবং আযান শুনতে না পেলে), সফরে কোন নির্জন প্রান্তরে থাকলে, যে জায়গায় থাকবে সেই জায়গাতেই নামাযের সময় হলে আযান-ইকামত দিয়ে নামায আদায় করতে হবে। একা হলে আযান ওয়াজেব না হলেও সুন্নত অবশ্যই বটে।

মহানবী (সাঃ) বলেন, “যখন সফরে থাকবে, তখন তোমরা আযান দিও এবং ইকামত দিও। আর তোমাদের মধ্যে যে বড় সে ইমামতি করো।” (বুখারী, মিশকাত ৬৮২নং)

তাছাড়া আল্লাহর নবী (সাঃ) এবং সাহাবাগণ সফরে থাকলে ফাঁকা মাঠে আযান দিয়ে নামায পড়েছেন। (মুসলিম, সহীহ ৬৮১নং, প্রমুখ)

মহানবী (সাঃ) বলেন, “তোমার প্রতিপালক বিস্মিত হন পর্বত চূড়ায় সেই ছাগলের রাখালকে দেখে যে নামাযের জন্য আযান দিয়ে (সেখানেই) নামায আদায় করে; আল্লাহ  আযযা অজাল্ল্‌ বলেন, “তোমরা আমার এই বান্দাকে লক্ষ্য কর, (এমন জায়গাতেও) আযান দিয়ে নামায কায়েম করছে! সে আমাকে ভয় করে। আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম এবং জান্নাতে প্রবেশ করালাম।” (আবূদাঊদ, সুনান, নাসাঈ, সুনান, সহিহ তারগিব ২৩৯ নং)

তিনি বলেন, “কোন ব্যক্তি যখন কোন বৃক্ষ-পানিহীন প্রান্তরে থাকে, অতঃপর সেখানে নামাযের সময় উপস্থিত হয়, তখন সে যেন ওযু করে। পানি না পেলে যেন তায়াম্মুম করে। অতঃপর সে যদি শুধু ইকামত দিয়ে নামায পড়ে, তাহলে তার সাথে তার সঙ্গী দুই ফিরিশ্‌তা নামায পড়েন। কিন্তু সে যদি আযান দিয়ে ও ইকামত দিয়ে নামায পড়ে, তাহলে তার পশ্চাতে আল্লাহর এত ফিরিশ্‌তা নামায পড়েন, যাদের দুই প্রান্ত নজরে আসে না!” (আব্দুর রাযযাক, মুসান্নাফ, সহিহ তারগিব ২৪১নং)

আর একদা তিনি আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহ্‌মানকে মরুভূমিতে ছাগপালে থাকাকালে নামাযের জন্য উচ্চশব্দে আযান দিতে আদেশ করেছিলেন। (বুখারী প্রমুখ, মিশকাত ৬৫৬নং)

কাযা নামাযের জন্য আযান

মসজিদে কেউ আযান না দিলে এবং শহরে বা গ্রামে থাকতে সকলের নামায কাযা হলে অথবা সফরে পুরো জামাআতের বা একাকীর নামায কাযা হলে অসময়েও আযান-ইকামত দিয়ে নামায পড়া কর্তব্য।

একদা মহানবী (সাঃ) সাহাবাসহ্‌ সফরে থাকাকালীন তাঁদের ফজরের নামায কাযা হয়ে যায়। সূর্য ওঠার পর তেজ হয়ে এলে ঐ স্থান ত্যাগ করে অন্য স্থানে গিয়ে বিলাল (রাঃ) আযান দেন। অতঃপর যথা নিয়মে ফজরের নামায আদায় করেন। (মুসলিম, সহীহ ৬৮১নং, প্রমুখ)

যেমন খন্দকের যুদ্ধের সময় একদা সকলের চার ওয়াক্তের নামায ক্বাযা হলে, এশার পর আযান দিয়ে যোহ্‌র, আসর, মাগরিব ও এশার নামায আদায় করেছিলেন। (আহমাদ, মুসনাদ প্রমুখ, ইর: ১/২৫৭)

সময় পার হলে আযান

নামাযের সময় বাকী থাকলে এবং আযানের যথা সময় পার হয়ে গেলে খুব দেরীতে হলেও আযান দিয়েই নামায পড়তে হবে। অবশ্য গ্রামে বা শহরে অন্যান্য মসজিদে আযান হয়ে থাকলে যে মসজিদে আযান দিতে খুব দেরী হয়ে গেছে সে মসজিদে আযান না দিলেও চলবে। তবে দেরী সামান্য হলে আযান দেওয়াই উত্তম। কিন্তু গ্রামে এ ছাড়া অন্য মসজিদ না থাকলে খুব দেরী হয়ে গেলেও আযান দেওয়া জরুরী। (ফতোয়া ইবনে বায, রিসালাতুন ইলা মুআযযিন ৬৭পৃ:, তুহ্‌ফাতুল ইখওয়ান, ইবনে বায ৭৭পৃ:)

খাস মহিলা মহলে মহিলাদের আযান ও ইকামত

হযরত আয়েশা (রাঃ) এর আযান ও ইকামত দেওয়ার ব্যাপারে বর্ণিত হাদীস সহীহ নয়। অবশ্য বাইহাকীতে আছে, আম্‌র বিন আবী সালামাহ্‌ বলেন, আমি সওবানকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, ‘মেয়েরা কি ইকামত দিতে পারে?’ উত্তরে তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনার কথা উল্লেখ করে বললেন, ‘মকহুল বলেছেন, যদি মহিলারা আযান-ইকামত দেয় তবে তা আফযল। আর যদি শুধু ইকামত দেয়, তবে তাও যথেষ্ট।’ সওবান বলেন, যুহ্‌রী উরওয়া হতে এবং তিনি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (আয়েশা) বলেছেন, ‘আমরা বিনা ইকামতেই নামায পড়তাম।’ (এর সনদটি হাসান।)

ইমাম বাইহাকী বলেন, ‘প্রথমোক্ত আসারের সাথে -যদি এই আসার সহীহ হয় তাহলে উভয়ের মধ্যে- পরস্পর বিরোধিতা নেই। কারণ, হতে পারে যে, জায়েয বর্ণনার উদ্দেশ্যে তিনি উভয় প্রকারের আমল (কখনো এরুপ, কখনো ঐরুপ) করেছেন। আর আল্লাহই অধিক জানেন।’

আল্লামা আলবানী বলেন, এ ব্যাপারে সঠিক অভিমত হল নবাব সিদ্দীক হাসান খানের; তিনি বলেছেন, ‘—আর প্রকাশ যে, মহিলারা আমলে পুরুষদের মতই। কারণ, মহিলারা পুরুষদের সহোদরা। পুরুষদেরকে যা করতে আদেশ হয়, সে আদেশ মহিলাদের উপরেও বর্তায়। পক্ষান্তরে তাদের পক্ষে আযান-ইকামত ওয়াজেব না হওয়ার ব্যাপারে কোন গ্রহণযোগ্য দলীল নেই। আযান না থাকার ব্যাপারে বর্ণিত হাদীসের সনদের কিছু বর্ণনাকারী পরিত্যক্ত; যাদের হাদীস দলীলযোগ্য নয়। সুতরাং মহিলাদেরকে সাধারণ এ নির্দেশ থেকে খারিজ করার মত কোন নির্ভরযোগ্য দলীল থাকলে উত্তম; নচেৎ ওরাও পুরুষদের মতই।’ (আর-রওযাতুন নাদিয়্যাহ্‌ ১/৭৯, সিলসিলাহ যায়ীফাহ, আলবানী ২/২৭১)

মতামত দিন