সলাত

স্বলাতে মুবাশ্‌শির (পর্ব ১০)

রচনায় : আব্দুল হামীদ ফাইযী আল-মাদানী

নামাযের সময় নির্দিষ্টীকরণের পশ্চাতে হিকমত

মহান আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে এমন প্রকৃতি ও প্রবৃত্তি দান করেছেন, যাতে রুযী অনুসন্ধানের মাধ্যমে তাকে জীবনধারণ করতে হবে। আর তার জন্য প্রয়োজন পরিশ্রমের। পরিশ্রম দেহ্‌-মনে ক্লান্তি, ব্যস্ততা ও শৈথিল্য আনে। ফলে পরিশ্রমে ছিন্ন হয় আল্লাহ ও বান্দার মাঝে বিশেষ যোগসূত্র। তাই তো যথাসময়ে সেই যোগসূত্র -একটানা নয় বরং মাঝে মাঝে কায়েম করে বান্দাকে আল্লাহ-মুখো করে রাখার উদ্দেশ্যে নামাযের ওয়াক্তের এই বিশেষ সময়াবলী নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

পক্ষান্তরে পরিশ্রম ও উপার্জনের জন্যও উদ্যম জরুরী। বিশেষ করে ফজরের সময়ে এমন কিছু অনুশীলনের দরকার, যার মাঝে নিদ্রার জড়তা ও আলস্য কেটে গিয়ে মনে স্ফূর্তি ফিরে আসে এবং যার ফলে এই বর্কতের সময়ে মানুষ নিজ নিজ কাজে মনোযোগী হতে পারে। তাই তো ফজরের নামাযের মাধ্যমে বান্দা তার নিদ্রা অবস্থায় নিরাপত্তা লাভের উপর আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করে এবং আল্লাহর নিকট তওফীক ও সাহায্য কামনার মধ্য দিয়ে শুরু করে তার প্রাত্যহিক কর্মজীবন।

পরিশ্রম ও ব্যস্ততার মাঝে ঠিক দিন দুপুরে মানুষ পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ে একটু বিরতির সাথে বিশ্রাম নিয়ে থাকে। এই বিশ্রামের সময় সে তার নিজ কর্মের উপর তাওফীক লাভের শুকরিয়া জ্ঞাপন করে আল্লাহর নিকট। অতঃপর আসরের সময় উপস্থিত হলে পুনরায় বান্দা তার বাকী দিনের কর্ম সম্পন্ন করার মানসে আল্লাহর সাহায্য কামনা করে। মাগরেবের সময় হলে বান্দা নিজ গৃহে ফিরে কর্ম সম্পাদন করার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনপূর্বক মাগরেবের নামায পড়ে। অতঃপর সময় আসে বিশ্রাম ও আরামের। এই সময় বান্দা প্রাত্যহিক কর্ম সেরে সারা দিনে আল্লাহর তরফ থেকে অবতীর্ণ অনুগ্রহের  উপর শুক্‌র জানিয়ে এশার নামায পড়ে। আর এইভাবে সে প্রত্যহ্‌ কর্ম ও ইবাদতের মধ্য দিয়ে নিজের কাল যাপন করে থাকে। কোন সময় আত্মবি স্মৃ ত হয়ে পাপের প্রতিঢলে পড়লে নামায তাকে বাধা দেয়। আল্লাহর আযাব ভীষণ কঠিন এবং তাঁর অনুগ্রহ অনন্ত-অসীম -এ কথা প্রত্যহ্‌ পাঁপ-পাঁচ বার বান্দাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। (মাজমূউস স্বালাওয়াতি ফিল-ইসলাম, ড: শওকত উলাইয়ান ৯১-৯২পৃ:)

যে যে সময়ে নামায নিষিদ্ধ

দিবারাত্রে পাঁচটি সময়ে নামায পড়া নিষিদ্ধ; মহানবী (সাঃ) বলেন,
(১) “আসরের নামাযের পর সূর্য না ডোবা পর্যন্ত আর কোন নামায নেই এবং
(২) ফজরের নামাযের পর সূর্য না ওঠা পর্যন্ত আর কোন নামায নেই।” (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ১০৪১ নং)

উক্ববা বিন আমের (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রসূল (সাঃ) আমাদেরকে তিন সময়ে নামায পড়তে এবং মুর্দা দাফন করতে নিষেধ করতেন;

(৩) ঠিক সূর্য উদয় হওয়ার পর থেকে একটু উঁচু না হওয়া পর্যন্ত,
(৪) সূর্য ঠিক মাথার উপর আসার পর থেকে একটু ঢলে না যাওয়া পর্যন্ত এবং
(৫) সূর্য ডোবার কাছাকাছি হওয়া থেকে ডুবে না যাওয়া পর্যন্ত। (মুসলিম,  আহমাদ, মুসনাদ, আবূদাঊদ, সুনান, নাসাঈ, সুনান, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান, মিশকাত ১০৪০ নং) যেহেতু এই সময়গুলিতে সাধারণত: কাফেররা সূর্যের পূজা করে থাকে তাই। (মুসলিম,  মিশকাত ১০৪২ নং)

নামায নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে এটি হল সাধারণ নির্দেশ। কিন্তু অন্যান্য হাদীস দ্বারা কিছু সময়ে কিছু নামাযকে ব্যতিক্রম করা হয়েছে। যেমন:-

১। ফরয নামায বাকী থাকলে তা আদায় করার সুযোগ হওয়া মাত্র যে কোন সময়ে সত্বর পড়ে নেওয়া জরুরী। মহানবী (সাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি সূর্য ডোবার পূর্বে আসরের এবং সূর্য ওঠার পূর্বে ফজরের এক রাকআত নামায পেয়ে যায়, সে (যথাসময়ে) নামায পেয়ে যায়।” (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ৬০১নং)

তিনি আরো বলেন, “যে ব্যক্তি সূর্য ডোবার পূর্বে আসরের এক রাকআত নামায পায়, সে যেন (সূর্য ডুবে গেলেও) তার বাকী রাকআত নামায সম্পন্ন করে নেয়। আর যে ব্যক্তি সূর্য ওঠার পূর্বে ফজরের এক রাকআত নামায পায়, সে যেন (সূর্য উঠে গেলেও) তার বাকী রাকআত নামায সম্পন্ন করে নেয়।” (বুখারী, মিশকাত ৬০২নং)

২। অনুরুপ কোন ফরয নামায পড়তে ভুলে গিয়ে থাকলে তা স্মরণ হওয়া মাত্র সত্বর যে কোন সময়ে অথবা ঘুমিয়ে গিয়ে থাকলে জাগার পর উঠে সত্বর যে কোন সময়ে আদায় করা জরুরী। মহানবী (সাঃ) বলেন, “কেউ ঘুমিয়ে গেলে তা তার শৈথিল্য নয়। শৈথিল্য তো জাগ্রত অবস্থাতেই হয়ে থাকে। সুতরাং যখন কেউকোন নামায পড়তে ভুলে যাবে অথবা ঘুমিয়ে যাবে, তখন তার উচিত, তা স্মরণ (বা জাগ্রত) হওয়া মাত্র পড়ে নেওয়া। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমাকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে তুমি নামায কায়েম কর।” (মুসলিম,  মিশকাত  ৬০৪নং, কুরআন মাজীদ ২০/১৪)

৩। দিন-দুপুরে মসজিদে জুমুআহ পড়তে এসে ইচ্ছামত নফল নামায পড়া বিধেয়। এ নামাযও নিষেধের আওতাভুক্ত নয়। (মিশকাত ১০৪৬নং)

৪। ফজরের ফরয নামাযের পূর্বে দু’ রাকআত সুন্নত পড়তে সময় না পেলে ফরযের পর তা পড়া যায়। আল্লাহর রসূল (সাঃ) একদা এক ব্যক্তিকে দেখলেন ফজরের ফরয নামাযের পর দু’ রাক্‌আত নামায পড়ল। তিনি তাকে বললেন, “ফজরের নামায তো দু’ রাকআত মাত্র!” লোকটি বলল, ‘আমি ফরযের পূর্বে দু’ রাকআত পড়তে পাই নি, এখন সেটা পড়ে নিলাম।’ এ কথা শুনে তিনি নীরব থাকলেন। (অর্থাৎ, মৌনসম্মতি জানালেন।) (আবূদাঊদ, সুনান, তিরমিযী, সুনান, মিশকাত ১০৪৪)

৫। কারণ-সাপেক্ষ যাবতীয় নামায যথার্থ কারণ উপস্থিত হওয়া মাত্র যে কোন সময়েই পড়া যায়। যেমন :-

ক- কা’বা শরীফের তওয়াফের পর দু’ রাকআত নামায। তওয়াফ শেষ হওয়ার পরেই যে কোন সময়ে ঐ নামায পড়া যায়। মহানবী (সাঃ) বলেন, “হে আব্দে মানাফের বংশধর! দিবারাত্রের যে কোন সময়ে কেউএ গৃহের তওয়াফ করে নামায পড়লে তাকে তোমরা বাধা দিও না।” (আবূদাঊদ, সুনান, তিরমিযী, সুনান, নাসাঈ, সুনান, মিশকাত ১০৪৫ নং)

খ- তাহিয়্যাতুল মাসজিদ (মসজিদ-সেলামী) দু’ রাকআত নামায। যে কোনও সময়ে মসজিদ প্রবেশ করে বসার ইচ্ছা করলে বসার পূর্বে এই নামায পড়তে হয়। মহানবী (সাঃ) বলেন,

“তোমাদের কেউ মসজিদ প্রবেশ করলে সে যেন দু’ রাকআত নামায পড়ার পূর্বে না বসে।”

(বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ৭০৪নং)

গ- সূর্য বা চন্দ্র গ্রহণের নামায। মহানবী (সাঃ) বলেন, “সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম। কারো জন্ম বা মৃত্যুর কারণে তাতে গ্রহণ লাগে না। সুতরাং গ্রহণ লাগা দেখলে তোমরা আল্লাহর নিকট দুআ কর, তকবীর পড়, নামায পড় এবং সদকাহ্‌ কর।” (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ১৪৮৩ নং)

ঘ- জানাযার নামায। আসর ও ফজর নামাযের পরও জানাযার নামায পড়া যাবে। অবশ্য শেষোক্ত তিন সময়ে এই নামায বৈধ নয়। যেমন পূর্বোক্ত হাদীসে এ কথা বর্ণিত হয়েছে। (আজামে ১৩০-১৩১ পৃ:)

সুতরাং সাধারণ নফল নামায উক্ত সময়গুলিতে নিষিদ্ধ। তবে আসরের পর সূর্য হলুদবর্ণ না হওয়া পর্যন্ত নিষিদ্ধ নয়। (সিলসিলাহ সহীহাহ, আলবানী ২৫৪৯ নং)

ওয়াক্ত-বিষয়ক আরো কিছু মাসায়েল

১। যে ব্যক্তি ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পূর্বে এক রাকআত নামায পেয়ে নেবে সে ওয়াক্ত পেয়ে যাবে। অর্থাৎ, তার নামায যথা সময়ে আদায় হয়েছে এবং কাযা হয়নি বলে গণ্য হবে। (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ৬০১নং) বিধায় যে ব্যক্তি এক রাকআতের চেয়ে কম নামায পাবে, সে সময় পাবে না; অর্থাৎ তার নামায যথাসময়ে আদায় হবে না এবং তা কাযা বলে গণ্য হবে। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে বিনা ওজরে শেষ সময়ে নামায পড়া বৈধ নয়।

তদনুরুপ যদি কোন ব্যক্তি এক রাকআত নামায পড়ার মত সময়ের পূর্বেই মুসলমান হয় অথবা কোন মহিলা অনুরুপ সময়ে মাসিক থেকে পবিত্রা হয় তবে ঐ ওয়াক্তের নামায তাদের জন্য কাযা করা ওয়াজেব।

যেমন কোন ব্যক্তি যদি সূর্য ওঠার পূর্বে এমন সময়ে ইসলাম গ্রহণ করে, যে সময়ের মধ্যে মাত্র এক রাকআত ফজরের নামায পড়লেই সূর্য উঠে যাবে, তাহলে ঐ ব্যক্তির জন্য ফজরের ঐ নামায ফরয এবং তাকে কাযা পড়তে হয়। অনুরুপ যদি কোন পাগল জ্ঞান ফিরে পায় অথবা কোন মহিলার মাসিক বন্ধ হয়, তাহলে তাদের জন্যও ঐ ফজরের নামায ফরয।

ঠিক তদ্রুপই যদি কোন মহিলা মাগরেবের নামায না পড়ে থাকে এবং এতটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর তার মাসিক শুরু হয়ে যায়, যার মধ্যে এক রাকআত নামায পড়া যেত, তাহলে ঐ মহিলার জন্য ঐ মাগরেবের নামায ফরয। মাসিক থেকে পাক হওয়ার পরে তাকে ঐ নামায কাযা পড়তে হবে। (রাসাইল ফিকহিয়্যাহ, ইবনে উসাইমীন ২৩-২৪পৃ:)

২। এশার নামায অর্ধরাত্রি পর্যন্ত দেরী করে পড়া আফযল হলেও আওয়াল অক্তে জামাআত হলে জামাআতের সাথে আওয়াল অক্তেই পড়া আফযল। কারণ, জামাআতে নামায পড়া ওয়াজেব।

৩। ফজরের আযান হলে ২ রাকআত সুন্নাতে রাতেবাহ্‌ ছাড়া ফরয পর্যন্ত আর অন্য কোন নামায নেই। মহানবী (সাঃ) বলেন, “তোমাদের মধ্যে উপস্থিত ব্যক্তি অনুপস্থিত ব্যক্তিকে যেন পৌঁছে দেয় যে, ফজরের (আযানের) পর দু’ রাকআত (সুন্নত) ছাড়া আর কোন (নফল) নামায পড়ো না।” (আহমাদ, মুসনাদ, আবূদাঊদ, সুনান ১২৭৮ নং)

৪। জামাআত খাড়া হলে ফরয নামায ছাড়া কোন প্রকারের নফল ও সুন্নত (অনুরুপ পৃথক ফরয) নামায পড়া বৈধ নয়। (মুসলিম, সহীহ প্রমুখ, মিশকাত ১০৫৮ নং)

৫। পৃথিবীর যে স্থানে দিন বা রাত্রি অস্বাভাবিক লম্বা (যেমন ৬ মাস রাত, ৬ মাস দিন) হয়, সে স্থানে ২৪ ঘন্টা হিসাব করে রাত-দিন ধরে হিসাব মত পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়তে হবে। যে স্থানে দিন বা রাত অস্বাভাবিক ছোট সেখানেও আন্দাজ করে সকল নামায আদায় করা জরুরী। যেমন দাজ্জাল এলে দিন ১ বছর, ১ মাস ও ১ সপ্তাহ্‌ পরিমাণ লম্বা হলে, স্বাভাবিক দিন অনুমান ও হিসাব করে নামায পড়তে বলা হয়েছে। (মুসলিম, সহীহ ২১৩৭ নং)

মতামত দিন