স্বলাতে মুবাশ্‌শির (পর্ব ৭)

রচনায় : আব্দুল হামীদ ফাইযী আল-মাদানী

নামাযীর লেবাস

আল্লাহ তাআলা বলেন,

“হে মানব জাতি! তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকার ও বেশভূষার জন্য আমি তোমাদেরকে লেবাস দিয়েছি। পরন্তু ‘তাকওয়া’র লেবাসই সর্বোৎকৃষ্ট  (কুরআন মাজীদ ৭/২৬)

“হে আদম সন্তানগণ! প্রত্যেক নামাযের সময় তোমরা সুন্দর পরিচ্ছদ পরিধান কর। পানাহার কর, কিন্তু অপচয় করো না। তিনি অপব্যয়ীদের পছন্দ করেন না।” (কুরআন মাজীদ ৭/৩১)

শরীয়তের সভ্য-দৃষ্টিতে সাধারণভাবে লেবাসের কতকগুলি শর্ত ও আদব রয়েছে; যা পালন করতে মুসলিম বাধ্য।

মহিলাদের লেবাসের শর্তাবলী নিম্নরুপ:-

১। লেবাস যেন দেহের সর্বাঙ্গকে ঢেকে রাখে। দেহের কোন অঙ্গ বা সৌন্দর্য যেন কোন বেগানা (যার সাথে কোনও সময়ে বিবাহ্‌ বৈধ এমন) পুরুষের সামনে প্রকাশ না পায়। কেন না মহানবী (সাঃ) বলেন, “মেয়ে মানুষের সবটাই লজ্জাস্থান (গোপনীয়)। আর সে যখন বের হয়, তখন শয়তান তাকে পুরুষের দৃষ্টিতে পরিশোভিতা করে তোলে।” (তিরমিযী, সুনান, মিশকাত ৩১০৯ নং)

মহান আল্লাহ বলেন, “হে নবী! তুমি তোমার পত্নীগণকে, কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলে দাও, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের (চেহারার) উপর টেনে নেয়—।” (কুরআন মাজীদ ৩৩/৫৯)

হযরত উম্মে সালামাহ্‌ (রাঃ) বলেন, ‘উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হলে (মদীনার) আনসারদের মহিলারা যখন বের হল, তখন তাদের মাথায় (কালো) চাদর (বা মোটা উড়না) দেখে মনে হচ্ছিল যেন ওদের মাথায় কালো কাকের ঝাঁক বসে আছে!’ (আবূদাঊদ, সুনান ৪১০১ নং)

আল্লাহ তাআলার আদেশ, মুমিন মেয়েরা যেন তাদের ঘাড় ও বুককে মাথার কাপড় দ্বারা ঢেকে নেয়—। (কুরআন মাজীদ ২৪/৩১)

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘পূর্বের মুহাজির মহিলাদের প্রতি আল্লাহ রহ্‌ম করেন। উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হলে তারা তাদের পরিধেয় কাপড়সমূহের মধ্যে সবচেয়ে মোটা কাপড়টিকে ফেড়ে মাথার উড়না বানিয়ে মাথা (ঘাড়-গলা-বুক) ঢেকেছিল।’ (আবূদাঊদ, হা/৪১০২)

সাহাবাদের মহিলাগণ যখন পথে চলতেন, তখন তাঁদের নিম্নাঙ্গের কাপড়ের শেষ প্রান্ত মাটির উপর ছেঁচড়ে যেত। নাপাক জায়গাতে চলার সময়েও তাদের কেউই পায়ের পাতা বের করতেন না। (মিশকাত ৫০৪, ৫১২, ৪৩৩৫ নং)

সুতরাং মাথা ও পায়ের মধ্যবর্তী কোন অঙ্গ যে প্রকাশ করাই যাবে না, তা অনুমেয়।

২। যে লেবাস মহিলা পরিধান করবে সেটাই যেন (বেগানা পুরুষের সামনে) সৌন্দর্যময় ও দৃষ্টি-আকর্ষী না হয়। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেন, “সাধারণত: যা প্রকাশ হয়ে থাকে তা ছাড়া তারা যেন তাদের অন্যান্য সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।” (কুরআন মাজীদ ২৪/৩১)

৩। লেবাস যেন এমন পাতলা না হয়, যাতে কাপড়ের উপর থেকেও ভিতরের চামড়া নজরে আসে। নচেৎ ঢাকা থাকলেও খোলার পর্যায়ভুক্ত। এ ব্যাপারে এক হাদীসে আল্লাহর রসূল (সাঃ) হযরত আসমা (রাঃ) কে সতর্ক করেছিলেন। (আবূদাঊদ, সুনান, মিশকাত ৪৩৭২ নং)

একদা হাফসা বিন্তে আব্দুর রহ্‌মান পাতলা ওড়না পরে হযরত আয়েশা (রাঃ) এর নিকট গেলে তিনি তার উড়নাকে ছিঁড়ে ফেলে দিলেন এবং তাকে একটি মোটা ওড়না পরতে দিলেন। (মালেক, মুঅত্তা, মিশকাত ৪৩৭৫ নং)

মহানবী (সাঃ) বলেন, “দুই শ্রেণীর মানুষ দোযখবাসী; যাদেরকে আমি (এখনো) দেখিনি। —(এদের মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ সেই) মহিলাদল, যারা কাপড় পরেও উলঙ্গ থাকবে, অপর পুরুষকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করবে এবং নিজেও তার দিকে আকৃষ্ট হবে, যাদের মাথা (চুলের খোঁপা) হিলে থাকা উটের কুঁজের মত হবে। তারা বেহেশ্তে প্রবেশ করবে না। আর তার সুগন্ধও পাবে না; অথচ তার সুগন্ধ এত এত দূরবর্তী স্থান থেকেও পাওয়া যাবে।” (আহমাদ, মুসনাদ, মুসলিম,  সহীহ জামে ৩৭৯৯ নং)

৪। পোশাক যেন এমন আঁট- সাঁট (টাইট ফিট) না হয়, যাতে দেহের উঁচু-নিচু ব্যক্ত হয়। কারণ এমন ঢাকাও খোলার পর্যায়ভুক্ত এবং দৃষ্টি-আকর্ষী ।

৫। যেন সুগন্ধিত না হয়। মহানবী (সাঃ) বলেন, “সেন্ট বিলাবার উদ্দেশ্যে কোন মহিলা যদি তা ব্যবহার করে পুরুষদের সামনে যায়, তবে সে বেশ্যা মেয়ে।” (আবূদাঊদ, সুনান, তিরমিযী, সুনান, মিশকাত ১০৬৫ নং)

সেন্ট ব্যবহার করে মহিলা মসজিদেও যেতে পারে না। একদা চাশতের সময় আবূ হুরাইরা (রাঃ) মসজিদ থেকে বের হলেন। দেখলেন, একটি মহিলা মসজিদ প্রবেশে উদ্যত। তার দেহ্‌ বা লেবাস থেকে উৎকৃষ্ট  সুগন্ধির সুবাস ছড়াচ্ছিল। আবূ হুরাইরা মহিলাটির উদ্দেশে বললেন, ‘আলাইকিস সালাম।’ মহিলাটি সালামের উত্তর দিল। তিনি তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘কোথায় যাবে তুমি?’ সে বলল, ‘মসজিদে।’ বললেন, ‘কি জন্য এমন সুন্দর সুগন্ধি মেখেছ তুমি?’ বলল, ‘মসজিদের জন্য।’ বললেন, ‘আল্লাহর কসম?’ বলল, ‘আল্লাহর কসম।’ পুনরায় বললেন, ‘আল্লাহর কসম?’ বলল, ‘আল্লাহর কসম।’ তখন তিনি বললেন, ‘তবে শোন, আমাকে আমার প্রিয়তম আবুল কাসেম (সাঃ) বলেছেন যে, “সেই মহিলার কোন নামায কবুল হয় না,  যে তার স্বামী ছাড়া অন্য কারোর জন্য সুগন্ধি ব্যবহার করে; যতক্ষণ না সে নাপাকীর গোসল করার মত গোসল করে নেয়।” অতএব তুমি ফিরে যাও, গোসল করে সুগন্ধি ধুয়ে ফেল। তারপর ফিরে এসে নামায পড়ো।’ (আবূদাঊদ, সুনান, নাসাঈ, সুনান, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান, বায়হাকী, সিলসিলাহ সহীহাহ, আলবানী ১০৩১ নং)

৬। লেবাস যেন কোন কাফের মহিলার অনুকৃত না হয়। প্রিয় নবী (সাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন (লেবাসে- পোশাকে, চাল-চলনে অনুকরণ) করবে সে তাদেরই দলভুক্ত।” (আবূদাঊদ, সুনান, মিশকাত ৪৩৪৭ নং)

৭। তা যেন পুরুষদের লেবাসের অনুরুপ না হয়। মহানবী (সাঃ) সেই নারীদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন, যারা পুরুষদের বেশ ধারণ করে এবং সেই পুরুষদেরকেও অভিশাপ দিয়েছেন, যারা নারীদের বেশ ধারণ করে।” (আবূদাঊদ, সুনান ৪০৯৭, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান ১৯০৪ নং)

তিনি সেই পুরুষকে অভিশাপ দিয়েছেন, যে মহিলার মত লেবাস পরে এবং সেই মহিলাকেও অভিশাপ দিয়েছেন, যে পুরুষের মত লেবাস পরে। (আবূদাঊদ, সুনান ৪০৯৮, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান ১৯০৩ নং)

৮। লেবাস যেন জাঁকজমকপূর্ণ প্রসিদ্ধিজনক না হয়। কারণ, বিরল ধরনের লেবাস পরলে সাধারণত: পরিধানকারীর মনে গর্ব সৃষ্টি হয় এবং দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাই মহানবী (সাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি দুনিয়াতে প্রসিদ্ধিজনক লেবাস পরবে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতে লাঞ্ছনার লেবাস পরাবেন।” (আহমাদ, মুসনাদ, আবূদাঊদ, সুনান, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান, মিশকাত ৪৩৪৬ নং)

“যে ব্যক্তি জাঁকজমকপূর্ণ লেবাস পরবে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতে অনুরুপ লেবাস পরিয়ে তা অগ্নিদগ্ধ করবেন।” (আবূদাঊদ, সুনান, বায়হাকী, সহীহ জামে ৬৫২৬ নং)

আর পুরুষদের লেবাসের শর্তাবলী নিম্নরুপ:-

১। লেবাস যেন নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ অবশ্যই আবৃত রাখে। যেহেতু ঐটুকু অঙ্গ পুরুষের লজ্জাস্থান। (সহীহ জামে ৫৫৮৩ নং)

২। এমন পাতলা না হয়, যাতে ভিতরের চামড়া নজরে আসে।

৩। এমন আঁট-সাট না হয়, যাতে দেহের উঁচু-নিচু ব্যক্ত হয়।

৪। কাফেরদের লেবাসের অনুকৃত না হয়।

৫। মহিলাদের লেবাসের অনুরুপ না হয়।

৬। জাঁকজমকপূর্ণ প্রসিদ্ধিজনক না হয়।

৭। গাঢ় হ্‌লুদ বা জাফরানী রঙের যেন না হয়। আম্‌র বিন আস (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রসূল (সাঃ) একদা আমার গায়ে দু’টি জাফরানী রঙের কাপড় দেখে বললেন, “এগুলো কাফেরদের কাপড়। সুতরাং তুমি তা পরো না।” (মুসলিম,  মিশকাত ৪৩২৭ নং)

৮। লেবাস যেন রেশমী কাপড়ের না হয়। মহানবী (সাঃ) বলেন, “সোনা ও রেশম আমার উম্মতের মহিলাদের জন্য হালাল এবং পুরুষদের জন্য হারাম করা হয়েছে।” (তিরমিযী, সুনান, নাসাঈ, সুনান, মিশকাত ৪৩৪১ নং) “দুনিয়ায় রেশম-বস্তু তারাই পরবে, যাদের পরকালে কোন অংশ নেই।” (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ৪৩২০ নং)

হযরত উমার (রাঃ) বলেন, রসূল (সাঃ) রেশমের কাপড় পরতে নিষেধ করেছেন। তবে দুই, তিন অথবা চার আঙ্গুল পরিমাণ (অন্য কাপড়ের সঙ্গে জুড়ে) ব্যবহার করতে অনুমতি দিয়েছেন। (মুসলিম,  মিশকাত ৪৩২৪ নং) তদনুরুপ কোন চর্মরোগ প্রভৃতিতে উপকারী হলে তা ব্যবহারে অনুমতি আছে। (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ৪৩২৬ নং)

৯। পরিহিত লেবাস (পায়জামা, প্যান্ট, লুঙ্গি, কামীস প্রভৃতি) যেন পায়ের গাঁটের নিচে না যায়। মহানবী (সাঃ) বলেন, “গাঁটের নিচের অংশ লুঙ্গি জাহান্নামে।” (বুখারী, মিশকাত ৪৩১৪ নং) “মু’মিনের লুঙ্গি পায়ের অর্ধেক রলা পর্যন্ত। এই (অর্ধেক রলা) থেকে গাঁট পর্যন্ত অংশের যে কোনও জায়গায় হলে ক্ষতি নেই। কিন্তু এর নিচের অংশ দোযখে যাবে।” এরুপ ৩ বার বলে তিনি পুনরায় বললেন, “আর কিয়ামতের দিন আল্লাহ সেই ব্যক্তির প্রতি তাকিয়েও দেখবেন না, যে অহংকারের সাথে নিজের লুঙ্গি (গাঁটের নিচে) ছেঁচড়ে নিয়ে বেড়ায়।”(আবূদাঊদ, সুনান,ইবনে মাজাহ্‌, সুনান,মিশকাত ৪৩৩১)

আল্লাহর রসূল (সাঃ) এর সবচেয়ে বেশী পছন্দনীয় লেবাস ছিল কামীস (ফুল-হাতা প্রায় গাঁটের উপর পর্যন্ত লম্বা জামা বিশেষ)। (আবূদাঊদ, সুনান, তিরমিযী, সুনান, মিশকাত ৪৩২৮ নং)  যেমন তিনি চেক-কাটা চাদর পরতে ভালোবাসতেন। (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ৪৩০৪ নং)

তিনি মাথায় ব্যবহার করতেন পাগড়ী। (তিরমিযী, সুনান, সহীহ জামে ৪৬৭৬ নং) তিনি কালো রঙের পাগড়ীও বাঁধতেন। (আবূদাঊদ, সুনান, ৪০৭৭, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান ৩৫৮৪ নং)

আল্লাহর রসূল (সাঃ) ও সাহাবা তথা সলফদের যুগে টুপীও প্রচলিত ছিল। (বুখারী, ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার ১/৫৮৭, ৩/৮৬, মুসলিম, সহীহ ৯২৫, আবূদাঊদ, সুনান ৬৯১ নং)

যেমন সে যুগে শেলোয়ার বা পায়জামাও পরিচিত ছিল। মহানবী (সাঃ) ও পায়জামা খরিদ করেছিলেন। (ইবনে মাজাহ্‌, সুনান ২২২০, ২২২১ নং) তিনি ইহ্‌রাম বাঁধা অবস্থায় হাজীদেরকে পায়জামা পরতে নিষেধ করেছেন। (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ২৬৭৮ নং) অবশ্য লুঙ্গি না পাওয়া গেলে পায়জামা পরতে অনুমতি দিয়েছেন। (ঐ ২৬৭৯ নং)

ইবনে আব্বাস (রাঃ) যখন লুঙ্গি পরতেন, তখন লুঙ্গির সামনের দিকের নিচের অংশ পায়ের পাতার উপর ঝুলিয়ে দিতেন এবং পেছন দিকটা (গাঁটের) উপরে তুলে নিতেন। এরুপ পরার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, ‘আমি আল্লাহর রসূল (সাঃ) কে এরুপ পরতে দেখেছি।’ (আবূদাঊদ, সুনান, মিশকাত ৪৩৭০ নং)

তাঁর নিকট পোশাকের সবচেয়ে পছন্দনীয় রঙ ছিল সাদা। তিনি বলেন, “তোমরা সাদা কাপড় পরিধান কর। কারণ সাদা রঙের কাপড় বেশী পবিত্র থাকে। আর ঐ রঙের কাপড়েই তোমাদের মাইয়্যেতকে কাফনাও।” (আহমাদ, মুসনাদ, তিরমিযী, সুনান, নাসাঈ, সুনান, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান, মিশকাত ৪৩৩৭ নং)

এ ছাড়া সবুজ রঙের কাপড়ও তিনি ব্যবহার করতেন। (আবূদাঊদ, সুনান ৪০৬৫ নং) এবং লাল রঙেরও লেবাস পরিধান করতেন। (আবূদাঊদ, সুনান ৪০৭২, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান ৩৫৯৯, ৩৬০০ নং)

মুহাদ্দিস আলবানী হাফেযাহুল্লাহ্‌ বলেন, ‘লাল রঙের কাপড় ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কোন হাদীস সহীহ নয়।’ (মিশকাতের টীকা ২/১২৪৭)

লেবাসে-পোশাকে সাদা-সিধে থাকা ঈমানের পরিচায়ক। (আবূদাঊদ, সুনান, মিশকাত ৪৩৪৫ নং) মহানবী (সাঃ) বলেন, “সামথ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি বিনয় সহকারে সৌন্দর্যময় কাপড় পরা ত্যাগ করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামতে সৃষ্টির সামনে ডেকে এখতিয়ার দেবেন; ঈমানের লেবাসের মধ্যে তার যেটা ইচ্ছা সেটাই পরতে পারবে। (তিরমিযী, সুনান,হাকেম, মুস্তাদরাক, সহীহ জামে ৬১৪৫ নং)

তবে সুন্দর লেবাস পরা যে নিষিদ্ধ তা নয়। কারণ, “আল্লাহ সুন্দর। তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। বান্দাকে তিনি যে নেয়ামত দান করেছেন তার চিহ্ন (তার দেহে) দেখতে পছন্দ করেন। আর তিনি দারিদ্র ও (লোকচক্ষে) দরিদ্র সাজাকে ঘৃণা করেন।” (বায়হাকী, সহীহ জামে ১৭৪২ নং)

প্রিয় রসূল (সাঃ) বলেন, “যার অন্তরে অণূ পরিমাণও অহংকার থাকবে, সে জান্নাত প্রবেশ করবে না।” বলা হল, ‘লোকে তো চায় যে, তার পোশাকটা সুন্দর হোক, তার জুতোটা সুন্দর হোক। (তাহলে সেটাও কি ঐ পর্যায়ে পড়বে?)’ তিনি বললেন, “আল্লাহ সুন্দর। তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। অহংকার তো ‘হ্‌ক’ (ন্যায় ও সত্য) প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে ঘৃণা করার নাম।” (মুসলিম,  সহীহ জামে ৭৬৭৪ নং)

তিনি আরো বলেন, “উত্তম আদর্শ, উত্তম বেশভূষা এবং মিতাচারিতা নবুওতের ২৫ অংশের অন্যতম অংশ।” (আহমাদ, মুসনাদ, আবূদাঊদ, সুনান, সহীহ জামে ১৯৯৩ নং)

আল্লাহর রসূল (সাঃ) এক ব্যক্তির মাথায় আলুথালু চুল দেখে বললেন, “এর কি এমন কিছুও নেই, যার দ্বারা মাথার এলোমেলো চুলগুলোকে সোজা করে (আঁচড়ে) নেয়?!” আর এক ব্যক্তির পরনে ময়লা কাপড় দেখে বললেন, “এর কি এমন কিছুও নেই, যার দ্বারা ময়লা কাপড়কে পরিষ্কার করে নেয়?!” (আবূদাঊদ, সুনান, নাসাঈ, সুনান, আহমাদ, মুসনাদ, মিশকাত ৪৩৫১ নং)

আবুল আহওয়াস বলেন, একদা আমি আল্লাহর রসূল (সাঃ) এর নিকট এলাম। আমার পরনে ছিল নেহাতই নিম্নমানের কাপড়। তিনি তা দেখে আমাকে বললেন, “তোমার কি মাল-ধন আছে?” আমি বললাম, ‘জী হ্যাঁ।’ বললেন, “কোন্‌ শ্রেণীর মাল আছে?” আমি বললাম, ‘সকল শ্রেণীরই মাল আমার নিকট মজুদ। আল্লাহ আমাকে উট, গরু, ছাগল, ভেঁড়া, ঘোড়া ও ক্রীতদাস দান করেছেন।’ তিনি বললেন, “আল্লাহ যখন তোমাকে এত মাল দান করেছেন, তখন আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত ও অনুগ্রহ তোমার বেশ-ভূষায় প্রকাশ পাওয়া উচিত।” (আহমাদ, মুসনাদ, নাসাঈ, সুনান, মিশকাত ৪৩৫২ নং)

মহানবী (সাঃ) বলেছেন, “তোমরা খাও, পান কর, দান কর, পরিধান কর, তবে তাতে যেন অপচয় ও অহংকার না থাকে।” (বুখারী, আহমাদ ৬৬৯৫, নাসাঈ ২৫৫৯নং)

নামাযের ভিতরে বিশেষ লেবাস

একটাই কাপড়ে পুরুষের নামায শুদ্ধ, তবে তাতে কাঁধ ঢাকতে হবে। (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ৭৫৪-৭৫৬ নং) আর খেয়াল রাখতে হবে, যেন শরমগাহ্‌ প্রকাশ না পেয়ে যায়। (ঐ মিশকাত ৪৩১৫ নং) তওয়াফে কুদূম (হজ্জ ও উমরায় সর্বপ্রথম তওয়াফ) ছাড়া অন্য সময় ইহ্‌রাম অবস্থায় ডান কাঁধ বের করে রাখা বিধেয় নয়। বলা বাহুল্য নামাযের সময় উভয় কাঁধ ঢাকা জরুরী।

এক ব্যক্তি হযরত উমার (রাঃ) কে এক কাপড়ে নামায পড়ার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, ‘আল্লাহ আধিক্য দান করলে তোমরাও অধিক ব্যবহার কর।’ অর্থাৎ বেশী কাপড় থাকলে বেশী ব্যবহার করাই উত্তম। (বুখারী ৩৬৫ নং)

দরবার আল্লাহর। তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। তাই নামাযীর উচিত, যথাসাধ্য সৌন্দর্য অবলম্বন করে তাঁর দরবারে হাজির হওয়া। মহানবী (সাঃ) বলেন, “তোমাদের কেউ যখন নামায পড়ে, তখন তাকে দু’টি কাপড় পরা উচিত। কারণ, আল্লাহ অধিকতম হ্‌কদার যে, তাঁর জন্য সাজসজ্জা গ্রহণ করা হবে।” (সহীহ জামে ৬৫২ নং)

পক্ষান্তরে নামাযের জন্য এমন নকশাদার কাপড় হওয়া উচিত নয়, যাতে নামাযীর মন বা একাগ্রতা চুরি করে নেয়। একদা মহানবী (সাঃ) নকশাদার কোন কাপড়ে নামায পড়ার পর বললেন, “এটি ফেরৎ দিয়ে ‘আম্বাজানী’ (নকশাবিহীন) কাপড় নিয়ে এস। কারণ, এটি আমাকে আমার নামায থেকে উদাস করে ফেলেছিল।” (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ৭৫৭ নং)

নামাযীর নামাযের এমন লেবাস হওয়া উচিত নয়, যাতে কোন (বিচরণশীল) প্রাণীর ছবি থাকে। কারণ, এতেও নামাযীর মনোযোগ ছিনিয়ে নেয়। হযরত আয়েশা (রাঃ) এর কক্ষের এক প্রান্তে একটি ছবিযুক্ত রঙিন পর্দা টাঙ্গানো ছিল। একদা মহানবী (সাঃ) বললেন, “তোমার এই পর্দা আমাদের নিকট থেকে সরিয়ে নাও। কারণ, ওর ছবিগুলো আমার নামাযে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে।” (বুখারী ৩৭৪ নং)

তিনি বলেন, “যে ঘরে কুকুর অথবা ছবি (বা মূর্তি) থাকে, সে ঘরে ফিরিশ্‌তা প্রবেশ করেন না।” (ইবনে মাজাহ্‌, সুনান, আহমাদ, মুসনাদ, তিরমিযী, সুনান, ইবনে হিব্বান, সহীহ, সহীহ জামে ১৯৬১, ১৯৬৩ নং)

অতএব নামাযের বাইরেও এ ধরনের ছবিযুক্ত লেবাস মুসলিমের জন্য বৈধ নয়। কারণ, ইসলাম ছবি ও মূর্তির ঘোর বিরোধী।

যে কাপড়ে অমুসলিমদের কোন ধর্মীয় প্রতীক (যেমন ক্রুশ, শঙ্খ প্রভৃতি) থাকে, সে কাপড় (ও অলঙ্কার) ব্যবহার বৈধ নয়। মা আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘নবী (সাঃ) বাড়িতে কোন জিনিসে ক্রুশ দেখলেই তা কেটে ফেলতেন।’ (আহমাদ, মুসনাদ, আবূদাঊদ, সুনান ৪১৫১ নং)

জুতো পবিত্র হলে, তা পায়ে রেখেই নামায পড়া বৈধ। মহানবী (সাঃ) বলেন, “তোমরা ইয়াহুদীদের বিপরীত কর। (এবং জুতো ও মোজা পায়ে নামায পড়।) কারণ, ওরা ওদের জুতো ও মোজা পায়ে রেখে নামায পড়ে না।” (আবূদাঊদ, সুনান, মিশকাত ৭৬৫নং)

আল্লাহর রসূল (সাঃ) নিষেধ করেছেন, যেন কেউ বাম হাতে না খায়, কেউ যেন এক পায়ে জুতো রেখে না চলে, কেউ যেন এমনভাবে একটি মাত্র কাপড় দ্বারা নিজেকে জড়িয়ে না নেয়, যাতে তার হাত বের করার পথ থাকে না এবং কেউ যেন একটাই কাপড় পরে, পাছার উপর ভর করে, পায়ের রলা ও হাঁটু দু’টিকে খাড়া করে পেটে লাগিয়ে, হাত দু’টিকে পায়ে জড়িয়ে, লজ্জাস্থান খুলে না বসে। (মুসলিম,  মিশকাত ৪৩১৫ নং)

লুঙ্গির ভিতরে কিছু না পরে থাকলে এবং অনুরুপ বসলেও লজ্জাস্থান প্রকাশ পাওয়ার ভয় থাকে। যেমন মহিলাদের শাড়ি-সায়াতেও ঐ একই অবস্থা হতে পারে। অতএব ঐ সব কাপড়ে ঐরুপ বসা বৈধ নয়।

মহানবী (সাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি নামাযে তার লুঙ্গিকে অহংকারের সাথে গাঁটের নিচে ঝুলিয়ে রাখে, তার এ কাজ হালাল নয় এবং আল্লাহর নিকট তার কোন সম্মান নেই।” (আবূদাঊদ, সুনান, সহীহ জামে ৬০১২ নং)

প্রকাশ যে, গাঁটের নিচে কাপড় ঝুলিয়ে নামায পড়লে নামায কবুল হয় না -এ ব্যাপারে বর্ণিত হাদীসটি সহীহ নয়। (যয়ীফ আবূদাঊদ, সুনান ১২৪, ৮৮৪ নং)

নাপাকীর সন্দেহ না থাকলে প্রয়োজনে মহিলাদের শাল, চাদর, বা শাড়ি গায়ে দিয়ে পুরুষরা নামায পড়তে পারে।

প্রয়োজনে একই কাপড়ের অর্ধেকটা (ঋতুমতী হলেও) স্ত্রীর গায়ে এবং পুরুষ তার অর্ধেকটা গায়ে দিয়ে নামায পড়তে পারে। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘আল্লাহর রসূল (সাঃ) রাত্রে নামায পড়তেন। আমি মাসিক অবস্থায় তাঁর পাশে থাকতাম। আর আমার একটি কাপড় আমার গায়ে এবং কিছু তাঁর গায়ে থাকত।’ (আবূদাঊদ, সুনান ৩৭০ নং)

যে কাপড় পরে থাকা অবস্থায় মেয়েদের মাসিক হয়, সেই কাপড়ে মাসিক লেগে থাকার সন্দেহ্‌ না থাকলে পবিত্রতার গোসলের পর না ধুয়েও ঐ কাপড়েই তাদের নামায পড়া বৈধ। মাসিক লাগলেও যে স্থানে লেগেছে কেবল সেই স্থান ধুয়ে খুনের দাগ না গেলেও তাতেই নামায পড়া বৈধ ও শুদ্ধ হবে। (আবূদাঊদ, সুনান ৩৬৫নং)

কেবল দুধ পান করে এমন শিশুপুত্র যদি কাপড়ে পেশাব করে দেয়, তাহলে তার উপর পানির ছিটা মেরে এবং না ধুয়ে তাতেই নামায হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে যদি শিশুকন্যার পেশাব হয় অথবা দুধ ছাড়া অন্য খাবারও খায় এমন শিশু হয়, তাহলে তার পেশাব কাপড় থেকে ধুয়ে ফেলতে হবে। নচেৎ নামায হবে না। (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ৪৯৭, ৫০২, আবূদাঊদ, সুনান ৩৭৭-৩৭৯ নং)

কাপড়ের পেশাব রোদে শুকিয়ে গেলেও তাতে নামায হয় না। কাপড় থেকে পেশাব পানি দিয়ে ধোয়া জরুরী। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ্‌, সঊদী উলামা-কমিটি ১/১৯৮)

যে কাপড় পরে স্বামী-স্ত্রীর মিলন হয় সেই কাপড়েও নামায শুদ্ধ। অবশ্য নাপাকী লাগলে বা লাগার সন্দেহ্‌ হলে নয়। (আবূদাঊদ, সুনান ৩৬৬নং)

টাইট-ফিট প্যান্ট ও শার্ট এবং চুস্ত পায়জামা ও খাটো পাঞ্জাবী পরে নামায মাকরুহ। টাইট হওয়ার কারণে নামাযে একাগ্রতা ভঙ্গ হয়। তাছাড়া কাপড়ের উপর থেকে (বিশেষ করে পিছন থেকে) শরমগাহের উঁচু-নীচু অংশ ও আকার বোঝা যায়। (মাজাল্লাতুল বুহূসিল ইসলামিয়্যাহ্‌ ১৫/৭৫)

মহিলাদের লেবাসে চুল, পেট, পিঠ,হাতের কব্জির উপরি ভাগের অঙ্গ (কনুই, বাহু প্রভৃতি) বের হয়ে থাকলে নামায হয় না। কেবল চেহারা ও কব্জি পর্যন্তহাত বের হয়ে থাকবে। পায়ের পাতাও ঢেকে নেওয়া কর্তব্য। (মাজাল্লাতুল বুহূসিল ইসলামিয়্যাহ্‌ ১৬/১৩৮, ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ্‌, সঊদী উলামা-কমিটি ১/২৮৮, কিদারেমী, সুনান ৯৪পৃ:)  অবশ্য সামনে কোন বেগানা পুরুষ থাকলে চেহারাও ঢেকে নিতে হবে।

ঘর অন্ধকার হলেও বা একা থাকলেও নামায পড়তে পড়তে ঢাকা ফরয এমন কোন অঙ্গ প্রকাশ পেয়ে গেলে নামায বাতিল হয়ে যাবে। সেই নামায পুনরায় ফিরিয়ে পড়তে হবে। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ্‌, সঊদী উলামা-কমিটি ১/২৮৫)

প্রিয় নবী (সাঃ) বলেন, “কোন সাবালিকা মেয়ের মাথায় চাদর ছাড়া তার নামায কবুল হয় না।” (আবূদাঊদ, সুনান, তিরমিযী, সুনান, মিশকাত ৭৬২নং)

পুরুষের দেহের ঊর্ধ্বাংশের কাপড় (চাদর বা গামছা) সংকীর্ণ হলে মাথা ঢাকতে গিয়ে যেন পেট-পিঠ বাহির না হয়ে যায়। প্রকাশ যে, নামাযে পুরুষের জন্য মাথা ঢাকা জরুরী নয়। সৌন্দর্যের জন্য টুপী, পাগড়ী বা মাথার রুমাল মাথায় ব্যবহার করা উত্তম। আর এ কথা বিদিত যে, আল্লাহর নবী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাগণ কখনো কখনো এক কাপড়েও নামায পড়েছেন। তাছাড়া কতক সলফ সুতরার জন্য কিছু না পেলে মাথার টুপী খুলে সামনে রেখে সুতরা বানাতেন। (আবূদাঊদ, সুনান ৬৯১নং)

প্রকাশ যে, পরিশ্রম ও মেহনতের কাজের ঘর্ম সিক্ত, কাদা বা ধুলোমাখা দুর্গন্ধময় লেবাসে মহান বাদশা আল্লাহর দরবার মসজিদে আসা উচিত নয়। কারণ, তাতে আল্লাহর উপস্থিত ফিরিশ্‌তা তথা মুসল্লীগণ কষ্ট পাবেন। আর এই জন্যই তো কাঁচা পিঁয়াজ-রসুন খেয়ে মসজিদে আসতে নিষেধ করা হয়েছে।

ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, “যা ইচ্ছা তাই খাও এবং যেমন ইচ্ছা তেমনিই পর, তবে তাতে যেন দু’টি জিনিস না থাকে; অপচয় ও অহংকার।” (বুখারী, মিশকাত ৪৩৮০নং)

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
kiw kow kan