জীবনী

আল্লামা ইউসুফ আলীর শেষ জীবনের মর্মন্তুদ কাহিনী

মূলঃ জাভেদ হোসেন

অনুবাদঃ আব্দুল ওয়াজেদ সালাফী

সংক্ষিপ্ত পরিচিতিঃ পবিত্র কুরআনের খ্যাতনামা ইংরেজী অনুবাদক আল্লামা আবদুল্লাহ ইউসুফ আলী (১৮৭২-১৯৫৩) বোম্বাইয়ের জনৈক ‘বোহরা‌’ ধর্মপ্রাণ ব্যবসায়ীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সর্ব প্রথমে ছেলেকে কুরআনের হাফেয করেন। ছেলে যেদিন হাফেয হওয়ার সনদ প্রাপ্ত হয়, সেদিন পিতা আড়ম্বরপূর্ণ এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন, যাতে ছেলের অন্তরে কুরআনের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য রেখাপাত করে। পরবর্তীতে অধুনিক শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হ’লেও এবং লন্ডনে দীর্ঘ দিন অতিবাহিত করলেও আব্দুল্লাহ দৈনিক কুরআন তেলাওয়াতে অভ্যস্ত ছিলেন। কুরআনের মহব্বত তাঁর অন্তরে এমনভাবে প্রোথিত হয়ে ছিল যে, সর্বদা কুরআনের বিগত ও অধুনিক যুগের তাফসীর সমূহ পড়াশুনা করতেন ও ইসলামের উপরে পান্ডিত্যপূর্ণ প্রবন্ধ সমূহ বিভিন্ন উচ্চাঙ্গের পত্রিকায় প্রকাশ করতেন। অতঃপর তিনি দেশে ফিরে আসেন ও পাকিস্তানের লাহোরে মহানগরীতে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি ইসলামিয়া কলেজের ডীন নিযুক্ত হন ও কুরআনের ইংরেজী অনুবাদ শুরু করেন।পরবর্তীতে তাঁর অনুদিত কুরআন শরীফ আমেরিকা ‘আমানা কর্পোরেশন’ প্রকাশ করে এবং আরও পরে সঊদী বাদশাহ ফাহদ উহা প্রকাশ ও বিতরণ করেন।প্রকাশ থাকে যে, তাঁর এই মূল্যবান তাফসীরের স্বত্ত্বাধিকার তিনি সংরক্ষিত রাখেন নি। ফলে বিশ্বের যে কেউ এ তাফসীর ছেপে প্রকাশ করতে পারেন। -সম্পাদক**।

আল্লামা আবদুল্লাহ ইউসুফ আলী যাঁর ইংরেজী তরজমা কুরআন মজীদ সারা বিশ্বে কোটি কোটি মানুষের মনে সাড়া জাগিয়েছিল, সেই খ্যাতি মান জ্ঞানী ও গুনী ব্যক্তির শেষ জীবনের দিন গুলি নিদারুন কষ্টে নিঃস্ব, নিঃসম্বল, দীন দুঃখীর মত কেটেছিল, শেষ জীবনের হতাশা, নিঃসঙ্গতা ও যন্ত্রনাদায়ক এক করুণ অবস্থায় পতিত হয়ে অজ্ঞাত পথিকের মত তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সেই বেদনা-বিধুর কাহিনী কুয়ালালামপুর মালয়েশিয়ার ইসলামিক বুক ট্রাষ্ট একটি বই আকারে বের করেছে।

বইটির নাম উর্দুতে ” তাসকীন কীতা লাশ” অর্থাৎ (শান্তি অন্বেষণ)। কুরআন মজীদের ইংরেজী অনুবাদক ও মুফাসসিরে আল্লামা আব্দুল্লাহ ইউসুফ আলীর জীবন কথা বইটিতে লিপিবদ্ধ। পুস্তকটি লিখেছেন জনাব এম, এ, শরীফ। পুস্তকের কিছু অংশ আমেরিকার  ‘মিনারেট’ নামক পত্রিকায় ছাপা হয়।

আব্দুল্লাহ ইউসুফ আলী প্রকৃতই বিশ্বের একজন কুরআন মজীদের শ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে সুপরিচিত অনুবাদক। তিনি অনুবাদের সঙ্গে সঙ্গে তার টীকা ও ব্যাখ্যা সুন্দরভাবে লিখেছেন। তাঁর কুরআনের তরজমার তিনটি বৈশিষ্ট্য তাঁকে বিশ্বে সবচেয়ে অধিক সুপরিচিত করেছে। প্রথমতঃ তাঁর ইংরেজী অনুবাদ ইংরেজী ভাষার উপরে আশ্চর্যজনকভাবে দক্ষতা প্রমাণ করেছে। এতে যে ব্যক্তি শুধু প্রকাশ ও বর্ণনাতে তৃপ্ত হতে চান তার জন্য কুরআন খানি একটি আকর্ষণীয় বটে। দ্বিতীয়তঃ কুরআনের আয়াতের অনুবাদ ইসলামী ইতিহাস ও সঠিক ঘটনা পঞ্জীতে পূর্ণ প্রকাশিত এবং প্রত্যেক সূরার শানে নজুল ও মৌলিক বিষয় অতি সূরার শানে নজুল ও মৌলিক বিষয় অতি সুন্দরভাবে বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে বর্ণিত তৃতীয়তঃ তিনি কুরআনের প্রকাশনা ও ছাপার স্বত্ত্ব সংরক্ষিত রাখেন নি। যার ফলে সারা বিশ্বের শত শত প্রকাশক তাঁর লিখিত তাফসীর প্রকাশ করতে ও ছাপাতে আইনতঃ কোন বাধা নিষেধের সম্মুখীন হননি।

কিন্তু দুঃখের বিষয়,  যে ব্যক্তির এত যশ ও খ্যাতি, এত সম্মান ও মর্যাদা শেষ জীবনে তাঁকেই নিংসঙ্গ ফকিরের মত লন্ডন শহরে সড়কের পাশে ছিন্ন মূল জীবন যাপন করতে হয়।

বইয়ের লেখক বলেন, আল্লামা ইউসুফ আলী কুরআনের তরজমা ও তাফসীরের মত বিরাট ও মহান দায়িত্ব শুধু একাই নিজেই বহন করেন। তিনি কোন প্রতিষ্ঠান বা কোন ব্যক্তির সাহায্য বা সহযোগিতা নেননি কিংবা পাননি। তিনি শুধু নিজের জ্ঞান সাধনায় ও দ্বীনের খেদমতের অনুপ্রেরনায় এই বিরাট অর্থ বহুল পরিকল্পনা গ্রহণ করে সম্পূর্ণ বন্ধুহীন ও সহযোগীহীন ভাবে কাজ শুরু করেন। তিনি ইচ্ছা করলে অন্যের আর্থিক সাহায্য ও সহযোগিতা লাভ করতে পারতেন। কিন্তু এত বড় কঠিন কাজ ও অর্থ বহুল প্রচেষ্টা নিজে একাকীই চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। কুরআন মজীদের তরজমা এবং তাঁর বিশ্ব নন্দিত ব্যক্তিত্বের উপর ১৯৫৪ সালে তাঁর প্রশংসা ও আলোচনা Who’s Who  ইংরেজী জার্নালে স্থান পায়। কিন্তু তিনি এই কার্য সমাধা করতে যে অসুবিধার সম্মুখীন হন তাতে তিনি একদম নিঃস্ব ও দেউলিয়া হয়ে পড়েন। তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে লন্ডনে পাকিস্থানের হাইকমিশনার তৎকালিন পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রীর নিকট একটি পত্র লিখেন। পত্রে আল্লামা আবদুল্লাহ ইউসুফ আলীর বিষয়ে উল্লেখ করা হয় যে, তাঁকে এখন ছিন্ন বস্ত্রে ও জীর্ণ পোষাকে একটি সুট কেসের উপর ট্রুাফালগার স্কোয়ারের পাশে বসে থাকতে দেখেছি। তাঁর পকেটে একটি পয়সাও নেই। তাই তাঁকে এখন লন্ডনের কাউন্টি কাউন্সিল মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের কাঙালী আশ্রমে রাখা হয়েছে এবং তাঁর সম্পর্কে আমাদের হাইকমিশন খবর পাঠিয়েছে’।

লেখক ব্যক্ত করেছেন যে, ১৯৫৩ সালের কঠিন শীতের মওসুম তাঁর স্বাস্থ ও অবস্থার এমনি অবনতি হয়ে ছিল যে, বেঁচে থাকাই দায়। ৯ ই ডিসেম্বরের খবরে জানা গেল যে, একজন অজ্ঞাত  নামা বৃদ্ধ খুবই অস্থির অবস্থায় ওয়েষ্ট মিনিষ্টারের একটি গৃহের দ্বারের সিড়িতে বসা অবস্থায় পাওয়া গেছে। পুলিশ তাঁকে ওয়েষ্ট মিনিষ্টার হাসপাতালে নিয়ে গেছে এবং পরের দিন হাসপাতাল থেকে তাঁকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে। অতঃপর ডুহোয়াইট ষ্ট্রীটে বৃদ্ধদের জন্য তৈরী লন্ডন কাউন্সিলের একটি গৃহে রাখা হয়। ১০ ই ডিসেম্বর সেই অজ্ঞাত নামা ব্যক্তি হিমের সেন্টস্টিফেন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে পৌঁছার তিন ঘন্টা পর রোগী মৃত্যুবরণ করেন।( ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্নাইলায়হে রাজেউন)।

মৃতদেহ গ্রহণ করা ও তার দাফনের জন্য কোন বন্ধু বা আত্বীয়-স্বজনকেউ হাসপাতালে আসেনি। বাধ্য হয়ে পাকিস্তান হাইকমিশনকে জানানো হয়। তখন তারা হাসপাতালে এসে লাশ নিয়ে ব্রুক ওয়ার্ড কবরস্তানের এক দিকে যেখানে মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত ছিল সেখানে দাফন করার ব্যবস্থা করে।

আল্লামা আবদুল্লাহ ইউসুফ আলীর মত খ্যাতিমান পন্ডিতের বেদনা দায়ক মৃত্যু অত্যন্ত হৃদয় বিদারক ঘটনা। ইহা একটি করুণ ও শিক্ষনীয় ব্যাপার যে, মুসলিম জাতি এমন রত্ন ও আধাঁরের প্রদীপ ব্যক্তিত্বের কোন সম্মান দিতে পারলোনা, তাঁর দারিদ্রের বিড়ম্বনাকে জাতি নীরবে দেখলো। আফসোস! শত আফসোস! (আরব নিউজ ইংরেজী)। সৌজন্যে- তরজুমান, দিল্লী।

** আত-তাহরীক সম্পাদক।

মতামত দিন