মুসলিম গৃহে প্রবেশাধিকারঃ দো‘আ ও পর্দা

রচনায়: যহর বিন উসমান***

মহান আল্লাহ বলেন,

لَّيْسَ عَلَى الْأَعْمَىٰ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْأَعْرَجِ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْمَرِيضِ حَرَجٌ وَلَا عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ أَن تَأْكُلُوا مِن بُيُوتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ آبَائِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أُمَّهَاتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ إِخْوَانِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أَخَوَاتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أَعْمَامِكُمْ أَوْ بُيُوتِ عَمَّاتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أَخْوَالِكُمْ أَوْ بُيُوتِ خَالَاتِكُمْ أَوْ مَا مَلَكْتُم مَّفَاتِحَهُ أَوْ صَدِيقِكُمْ

‘……..যখন তোমরা তোমাদের গৃহে প্রবেশ করবে, তখন তোমাদের পরিবারবর্গের প্রতি সালাম প্রদান করবে, যা আল্লাহর পক্ষ হ’তে কল্যাণময় ও পবিত্র দো‘আ ।এইভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নির্দেশ বিশদময় বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা বুঝতে পার’ (সূরা নূরঃ ৬১)

বিশিষ্ট সাহাবী জাবির (রাঃ) বলেন, ‘যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করবে, তখন আল্লাহর শিখানো বরকতময় উত্তম সালাম করবে। আমি তো পরীক্ষা করে দেখেছি যে, এটা সরাসরি বরকত বটে’। ইবনু তাউস (রহঃ) বলেন, তোমাদের যে কেউ বাড়ীতে প্রবেশ করে, সে যেন বাড়ীর লোকদেরকে সালাম দেয়’।

সাহাবী আনাস (রাঃ) বলেন, ‘নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে পাচঁটি অভ্যাসের অছিয়ত করেছেন। তন্মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে, ‘যখন তুমি তোমার বাড়ীতে প্রবেশ করবে, তখন তোমার পরিবারের লোকদের সালাম দিবে। আর তোমার পরিবারের কল্যাণ বৃদ্ধি পাবে। আর তোমার পূর্ববর্তী দ্বীনদার লোকদের এই নীতিই ছিল। হাদীসটি হাফিয আবুবকর আল-বাযযার (রহঃ) বর্ণনা করেছেন।

পৃথিবীর সকল মানুষ শান্তি চায়।বিশেষ করে যারা খাঁটি মুসলিম তারা নিজেদের শান্তি কামনার পাশাপাশি অন্য সকল মুসলিম ভাইয়ের জন্যও শান্তি চান।তবে সেই শান্তি চাওয়ার তরীকা বা পদ্ধতি যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তরীকায় না হয়, তাহ’লে সে শান্তিকে শান্তি বলা যায় না।আমাদের মুসলিম সমাজের অনেক ভাই দাবী করে থাকেন যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তো নিষেধ করেননি? আমরা সবাই মিলে আল্লাহ্‌র নিকট বাড়তি শান্তি চাইব তাতে দোষ কি?

সম্মানিত পাঠক! মহান আল্লাহ্‌র নিকট ঈমানদার ব্যক্তি মাত্রই মহাসম্মানিত এবং অফুরন্ত শান্তি পাওয়ার অধিকারী।যদিও পবিত্র কালামের অন্যত্র বলা হয়েছে যে,

لَهُمْ قُلُوبٌ لَّا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَّا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَّا يَسْمَعُونَ بِهَا ۚ أُولَٰئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ

‘যারা চোখ থাকতেও দেখতে পায় না, কান থাকতেও শোনে না, অন্তর থাকতেও বুঝতে পারে না, তারা চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট’ ( আ‘রাফ ১৭৯)।

তারা দাবীর বেলায় মুসলিম হ’লেও তাদের গৃহে প্রবেশের রীতি-নীতি ইসলাম সম্মত নয়।

আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমি তাশাহ্‌হুদ তো আল্লাহ্‌র কিতাব হ’তেই গ্রহণ করেছি। আল্লাহ বলেন,

‘যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করবে, তখন তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম করবে। তা আল্লাহ্‌র নিকট হ’তে কল্যাণময় ও পবিত্র’ ।

কেন মহান আল্লাহ ঈমানদার ব্যক্তিদের গৃহে প্রবেশকালে সালাম দ্বারা অনুমতির আদেশ দিলেন, তা অবশ্যই ভেবে দেখা আবশ্যক। প্রবন্ধের শুরুতেই বলেছি যে, মানুষ মাত্রই শান্তি ও কল্যাণকামী। পৃথিবীতে মানুষ যে যত শান্তি আর আরাম-আয়েশের মধ্যে বসবাস করুক না কেন, আল্লাহ্‌র দেওয়া সুখ শান্তিই হচ্ছে প্রকৃত শান্তি। এজন্য মহান আল্লাহ মুমিনদের গৃহগুলিকে এক একটি শান্তির ভাণ্ডার বানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আমরা অধিকাংশ মানুষ তা অনুভব করতে পারি না। তাহ’লে আসুন! আমরা শান্তির নিয়মগুলি শিখে নিয়ে তা অর্জনে সচেষ্ট হই। যেমন- আপনি যখন আপনার গৃহে প্রবেশ করবেন। এখানে জেনে রাখা ভাল যে, সালাম অর্থ শান্তি বা কল্যাণ । তাহ‘লে আপনার সালামে আপনার বাড়ীর সকল সদস্যদের কল্যাণ কামনা করলেন। জবাবে আপনার পরিবারের সদস্যগণ, যেমন পিতা-মাতা, ভাই-বোন, দাদা-দাদী, স্ত্রী-কন্যা, চাকর-চাকরানী সবাই মিলে বলল, আপনার উপরও শান্তি বর্ষিত হউক! এবার বলুন তো দেখি, আপনি কি পরিমাণ শান্তির অধিকারী হ‘লেন?

আপনি কল্যাণের জন্য বা শান্তির আশায় মসজিদের ইমাম, খানকার পীর, ওয়ায-মাহফিলের বক্তার নিকট দো‘আ চান, তাদের দো‘আ আর আপনার পরিবারের আপনজনদের দো‘আর ওযন কি সমান হতে পারে? আপনি কি একটিবার চিন্তা করার অবকাশ পেয়েছেন যে, আপন গৃহে প্রবেশে সালামের জবাবে আপনার পিতা-মাতা যখন বলবে, হে আল্লাহ! আমার প্রাণের ধন, নয়নের মণি, বাছাধন সারাদিন রৌদ্রে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে আমাদের জন্য রূযী-রোযগার নিয়ে বাড়ি ফিরেছে; তারপর গৃহে প্রবেশের পূর্বেই আমাদেরকে সালাম দিয়ে বলছে, আপনাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হউক।জবাবে পিতা-মাতা কি বলতে পারে না, হে বাছাধন! তোমার প্রতিও শান্তি বর্ষিত হউক? একশ’ বার পারে, লক্ষ-কোটিবার পারে।তবে কেন আপনি অন্যের দো‘আ আর শান্তি কামনার জন্য ব্যস্ত? কেন আপনি বলছেন যে, মৌলভী ছাহেব দো‘আ না করলে তার চাকরী হবে থাকবে না? কেন আপনি গায়ের জোরে বলছেন, কে বলেছে দো‘আ করা যাবে না? রাসূল না করুক, আমরা করব, আমরাতো শান্তিই চাই, অন্য কিছুতো চাচ্ছি না? আমি বলব, আপনি নির্বোধ।আপনি শান্তি চাওয়ার পদ্ধতি জানেন না, আপনি শান্তি চাওয়ার স্থান চিনতে ভুল করছেন।একটি বার খোলামন নিয়ে আপনার গৃহের প্রতি তাকান, সেখানে মহান আল্লাহ শান্তির খনি তৈরী করে রেখেছেন।শুধু একবার নয়, দিনে-রাতে পঞ্চাশ বার, একশ’ বার আপনি সালাম দিয়ে গৃহে প্রবেশ করুন।

আপনার আদরের ছোট্ট বাচ্চাকে সালামের জওয়াব শিখিয়ে দিন, সেও উত্তরে বলবে, ওয়া আলাইকুমুস সালাম। আব্বু ! আপনার প্রতিও শান্তি বর্ষিত হউক !

তাহ‘লে কেন আপনি ভণ্ডপীরের দরগায় গিয়ে বলছেন, বাবা আমার জন্য দো‘আ করুন? আপনার গুরুজন পিতা-মাতার চেয়েও কি পীর-ফকীররা বেশী দামী হয়ে গেল? হে বিবেকবান মুসলিম ভাই সকল! একটু জ্ঞান করে ঝগড়া-ঝাটি না করে শান্তির জন্য দো‘আ নেওয়ার সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করুন।

আপনি যখন স্ত্রীকে সালাম গিয়ে গৃহে প্রবেশ করবেন, তখন আপনার প্রাণপ্রিয়া স্ত্রী আপনার জন্য দো‘আ না করে থাকতে পারবে? মনে করুন ! আপনার বাড়ীতে দশ বছর কিংবা বিশ বছর যাবৎ চাকর-চাকরানী কাজ করছে, তারা আপনার একান্ত অনুগত। আপনি গৃহে আগমনকালে আল্লাহ্‌র নির্দেশমত সালাম দিলেন।তারা বুঝল যে, আমার মনিব আমার উপর শান্তি কামনা করেছে। অতএব তারা খুশি হয়ে একথা আল্লাহ্‌র দরবারে বলতে পারে, হে দয়াময় আল্লাহ ! আমার মনিব আমাকে দীর্ঘদিন যাবৎ আমাকে তার বাড়ীতে স্থান দিয়েছেন,আমাকে কাপড়-চোপড়, খাদ্য- পানি, টাকা-কড়ি দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।তিনি কাজ না দিলে আমাকে পথে পথে ফিরতে হ’ত। অতএব আল্লাহ আপনি তাঁর উপর শান্তি বর্ষণ করুন!

শুধু কি তাই? আপনি মনিব হয়ে যখন চাকর-চাকরানীকে সালাম দিবেন, তখন তাদের মনে কি সম্মান-শ্রদ্ধা ও ভালবাসা গভীর হ‘তে পারে না? অবশ্যই পারে। আপনি কি একজন মহৎ মানুষে পরিণত হ‘তে পারেন না? আপনার মনের মধ্যে কোন কুটিলতা বা অহমিকা নেই, এটা কি আপনার পরিবারের সদস্যগণ ভাবতে পারে না? কেন পারবে না, আপনি তো আল্লাহ্‌র নির্দেশ মোতাবেক কাজ করছেন।

আপনি হয়ত ভাবতে পারেন যে, যারা কুরআন হাদীস জানেন, সেসব আলেমদের বাড়ীতেই সালামের প্রচলন নেই, তাহ‘লে আমরা কি করব? আমি বলব, আপনি খাঁটি ঈমানদার বান্দা হ‘তে পারবেন না। কারণ আপনি সমাজের অন্ধ অনুসারী বৈ কিছু নন। এদেশের অধিকাংশ আলেম কুরআন হাদীস জানে কিন্তু মানেন না। অতএব তাদের অনুসরণ করলে আপনার জান্নাত লাভ বাধাগ্রস্থ হবে।

সম্মানিত পাঠক! যারা অন্যের নিকট দো‘আর আবেদন করেন, আর যারা শবেবরাতের রাতকে কল্যাণ বা পূণ্যের রাত ভেবে দো‘আর পিছনে ছুটছেন তারা প্রকৃত কল্যাণ সম্পর্কে আজও গোলকধাঁধায় পড়ে আছেন।

এতক্ষণ আমরা নিজ নিজ গৃহের একটি কল্যাণের বিষয় জানলাম। এবার অন্য মুসলিম ভাই-এর গৃহে প্রবেশ করতে গেলে কোন নিয়ম- পদ্ধতিতে প্রবেশ করব এবং কিভাবে তার কল্যাণ কামনা করব এর পদ্ধতি পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ থেকে জানার চেষ্টা করব ইন শা আল্লাহ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّىٰ تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَىٰ أَهْلِهَا ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ

হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্যের গৃহে গৃহবাসীদের অনুমতি ব্যতীত এবং তাদের সালাম না করে প্রবেশ করো না। এটা তোমাদের জন্য উত্তম, যাতে তোমরা তা স্মরণ রাখ। (সূরা নূর ২৭)।

এ প্রসঙ্গে মুকাতিল ইবনু হাইয়ান (রাঃ) বলেন, জাহেলী যুগে সালামের কোন প্রচলন ছিল না। তখন তারা একে অপরের বাড়ীতে প্রবেশকালে সালাম দ্বারা অনুমতি গ্রহণ করত না। তারা সরাসরি অন্যের বাড়ীতে প্রবেশ করে বলতঃ আমি এসেছি। এর ফলে বাড়ীর লোকদের ভীষণ অসুবিধা হ‘ত। আল্লাহ তা‘আলা এই কুপ্রথাগুলি দূর করে সুন্দর আদব-কায়দা শিক্ষা দিয়েছেন। আর এ কারণেই মহান আল্লাহ বলেন, এটাই তোমাদের জন্য উত্তম । এতে বাড়ীতে আগমনকারী ও বাড়ীর লোক উভয়ের জন্যই শান্তি ও কল্যাণ রয়েছে। এগুলি তোমাদের জন্য উপদেশ ।

বর্তমান মুসলিম সমাজের দিকে তাকালে উক্ত জাহেলিয়াতের কথা মনে পড়ে। সাধারণ মানুষের কথা না হয় একটু দূরেই রাখলাম।কিন্তু যারা আলেমে দ্বীন তাদের মধ্যে কি আল্লাহ্‌র বিধান। পুরোপুরি ক্বায়েম আছে? আমার বিশ্বাস শতকরা পাঁচ জন আলেম খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে যারা শরঈ বিধান পুরোপুরি মেনে চলেন। তাহ‘লে কিসের দাবীরে তারা আলেম? সাধারণ মুসলমানগণ তাদের অনুসরণ করলে তারা গোমরাহ হবে না কেন?

রাস্তাঘাটে চলাচলের সময়, বন্ধু-বান্ধবের সাথে দেখা- সাক্ষাতের সময়, চেয়ারম্যান-মেম্বারকে দেখলে, অফিসের বস বা উস্তাদকে দেখলে অনেকেই সালাম দেন। এখন সেই সালাম বিনিময়টা যদি আন্তরিক ভালবাসার উপর হয়ে থাকে তাহ‘লে ভাল। কিন্তু যদি ভয়-ভীতি কিংবা লৌকিকতা বা অন্য কোন কারণে হয় তাহ‘লে সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ হবে।

অফিস-আদালতে বসকে দেখলে যদি সালাম দিতে হয় তবে নিজ বাড়ীতে যেখানে মহান আল্লাহ কল্যাণের খনি বানিয়ে দিলেন, মহান আল্লাহ আদেশ করলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সালাম ব্যতীত বাড়ীতে প্রবেশ করতে নিষেধ করলেন, তবুও আমরা পবিত্র আদর্শের কথা স্মরণ করলাম না। আর লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে আলেমদের নিকট গিয়ে বলেছি হুযূর দো‘আ করেন না কেন? মুনাজাত করেন না কেন? নিষেধ কোথায়, দেখাতে পারবেন? ইত্যাদি মন্তব্য। আল্লাহ আমাদের হেদায়াত করুন।

যেসব মুসলিম পরিবারে সালাম দ্বারা গৃহে প্রবেশের নিয়ম-নীতি চালু আছে আমি বলব তাদের পরিবারের মহিলাগণ পর্দার দাবী করতে পারে। আর যেসব পরিবারে চালু নেই তাদের পরিবারের সদস্যগণ যত বড় নামী-দামী আলেম হঊক না কেন, তাদের মহিলাগণ বাড়ির বাহিরে চলাফেরার সময় যত পর্দার পোষাক পরে ঘোরাফিরা করুক না কেন প্রকৃত অর্থে তাদের কাছে শারঈ পর্দা আশা করা যায় না। আমার এ দাবী যে বাস্তব সত্য তার প্রমাণ তুলে ধরে আমার প্রবন্ধের ইতি টানব ইন শা আল্লাহ। যেসব মহিলাগণ শুধু বাহিরে চলাফেরার জন্য বোরক্বা পরিধান করেন, কিন্তু নিজ বাড়িতে মুহরিম ও গায়ের মুহরিম পুরুষের মাঝে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ মোতাবেক পর্দা করেন না, তাকে কি করে পর্দা বলা যায়? যেমন নিজ বাড়ীতে দেবর- ভাবী, শালিকা-দুলাভাই, মামী-ভাগিনা, চাচাতো ভাই, মামাতো ভাই, খালাতো ভাই, ফুফাতো ভাই ইত্যাদি।যত গায়ের মুহরিম ব্যক্তি আছেন তাদের সামনে আপনজন ভেবে খোলামেলা চলাফেরা করা হয়, এটা অনুচিত।

সুধী পাঠক! এই মন মানসিকতার মহিলাদেরকে আপনি কোন আইনে পর্দানশীলা মহিলা বলবেন? আর যেসব পরিবারের মহিলাগণ বাহিরে ও নিজ বাড়ীতে পর্দার আইন মানতে আগ্রহী তাদের বাড়ীতে প্রবেশের পূর্বে সালাম দিয়ে প্রবেশ করলেই পর্দানশীলা নারীগণ পর্দা রক্ষা করত সক্ষম হবেন। যেমন- একজন গায়রে মুহরিম পুরুষ বা বেগানা পুরুষ যদি বিনা সালামে বাড়ীতে প্রবেশ করে, তাহ’লে ঐ বাড়ীর পর্দানশীলা মহিলা কিভাবে বুঝতে পারবে যে, আমাকে পর্দার আড়ালে যেতে হবে বা পর্দার পোষাক পরতে হবে? আর ঐ বাড়ীতে সালামা প্রথয়া চালু থাকলে যে কোন লোক আসলে বাড়ীর মহিলাগণ সালাম শুনে চিনে নিতে পারবে যে, আগন্তুক ব্যক্তি মুহরিম না কি গায়রে মুহরিম। অতএব প্রয়োজনে সে পর্দার ব্যবস্থা নিবে।কিন্তু যদি সালাম না দিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করে তবে কি করে ঐ মহিলা পর্দা রক্ষা করবে? এখন আপনি যদি বলেন যে, বাড়িতে প্রবেশের পূর্বে গলা বা খেকড় দিয়ে বা যেকোন সংকেত ধ্বনি দিলে মহিলাগণ আড়ালে যেতে পারবে। এ প্রসঙ্গে সত্য কথা হচ্ছে, বাড়ির মহিলাগণ সতর্ক হ’লেও আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তরীকা বহির্ভূত কাজ করলেন।যেহেতু আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, বাড়ীতে প্রবেশের নিয়ম বা অনুমতির বিধান হ’ল সালাম, যা আল্লাহর পক্ষ হ’তে নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়াও গলা খেকড় প্রসঙ্গে যে বর্ণনা পাওয়া যায় তা ছহীহ হাদীস মোতাবেক নয়।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে, সালাম দ্বারা অনুমতি প্রার্থনার সময়সীমা কতদূর? এ সম্পর্কে কাতাদা (রাঃ) বলেন, তিনবার অনুমতি প্রার্থনা এজন্য নির্ধারণ হয়েছে যে, প্রথমবার বাড়ীর লোকেরা জানতে পারবে যে, এ ব্যক্তি অমুক, কাজেই তারা নিজেদের সামলিয়ে নিবে ও সতর্ক হয়ে যাবে। আর তৃতীয় বারে ইচ্ছা হ’লে তাকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দিবে, না হ’লে ফিরে যেতে বলবে ।

অন্য এক সহীহ হাদীছে বর্ণিত আছে যে, একদা আবু মূসা আশ’আরী (রাঃ) ওমর (রাঃ)–এর বাড়ীতে তিনবার অনুমতির প্রার্থনা করেন।যখন কেউ তাঁর ডাকে সাড়া দিলেন না, তখন তিনি ফিরে আসলেন ।

এখানে আরও স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, বাড়ীতে প্রবেশের জন্য অনুমতি প্রার্থনাকারীকে দরজার সামনে দাঁড়ানো চলবে না; বরং তাকে ডানে কিংবা বামে একটু সরে দাঁড়াতে হবে। কেননা সুনানে আবীদাঊদে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন কারো বাড়ীতে যেতেন তখন তিনি তার বাড়ীর দরজার ঠিক সামনে দাঁড়াতেন না; বরং একটূ এদিক-সেদিক সরে দাঁড়াতেন। আর উচ্চৈঃস্বরে সালাম বলতেন। কারণ তখন দরজার উপর পর্দা লটকানোর কোন ব্যবস্থা ছিল না। বুখারী ও মুসলিমের অন্য একটি হাদীছে বর্ণিত আছে, কেউ যদি তোমার বাড়ীতে তোমার অনুমতি ছাড়াই উঁকি মারতে শুরু করে এবং তুমি তাকে কংকর (পাথর) মেরে দাও আর এর ফলে তার চক্ষু বিদীর্ণ হয়ে যায়, তাতে তোমার কোন অপরাধ হবে না ।

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পক্ষ থেকে ঐরূপ কঠোর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও যারা অন্যের বাড়ীতে প্রবেশকালে সালাম দ্বারা অনুমতি গ্রহণ করে না কিংবা নিজের আত্নীয়, পাড়ার লোক, ইত্যাদি দোহাই দিয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিধান পাশ কেটে যায়, তারা আদৌ মুসলিম কি-না তা ভেবে দেখার বিষয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীছ মোতাবেক মুসলিম পরিবারের গৃহে প্রবেশাধিকার, দো’আ ও পর্দা রক্ষার নিয়ম-নীতি মেনে চলার তাওফীক দান করুন-আমীন !!

*শিক্ষক, আউলিয়াপুকুর ফাযিল মাদরাসা, চিরিরবন্দর, দিনাজপুর ।

তথ্যসূত্র :

১. তাফসীর ইবনে কাছীর, ১৫শ খণ্ড, ২০৬ পৃঃ, অনুবাদ ডক্টর মুহাম্মাদ মুজীবুর রহমান ।

২. তাফসীর ইবনে কাছীর ১৫শ খণ্ড, ২০৭ পৃঃ ।

৩. তাফসীর ইবনে কাছীর, ১৫ শ খণ্ড, ১৩৮ পৃঃ ।

৪. তাফসীর ইবনে কাছীর, ১৫শ খণ্ড, পৃঃ ১৩৮ ।

৫. ইবনে কাছীর, ঐ ১৩৮ পৃঃ ।

৬. তাফসীর ইবনে কাছীর, ১৫শ খণ্ড, পৃঃ ১৩৪ ।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button