সিয়াম

মহিমান্বিত ‘লাইলাতুল ক্বদর’ কি একই রাত্রিতে অতিবাহিত হয়

 মহিমান্বিত ‘লাইলাতুল ক্বদর’ কি একই রাত্রিতে অর্থাৎ শুধুমাত্র ২৭-তম রাত্রিতে অতিবাহিত হয়?

রচনায় :- ফরিদ দেওয়ান****

লাইলাতুল ক্বদর পবিত্র মাহে রমযানের একটি মহিমান্বিত রাত। এই রাতে কুরআন নাযিল হয়েছিলো। এই রাত উদযাপনের ব্যাপারে ইসলামে তাগিদ দেয়া হয়েছে। এই রাতটি রমযান মাসের শেষ দশকে বিদ্যমান। হাদীসে শেষ দশকের বিজোড় রাতে বিদ্যমান বলে নির্দেশনা এসেছে। অথচ আমাদের সমাজে শুধুমাত্র ২৭শে রমযানকে মহা ধূমধামে উদযাপন করা হয়। একটি হাদীসকে বিবেচনা করে এই বিষয়টি সৃষ্টি হয়েছে। অথচ এই মহিমান্বিত রাত প্রতিবছর পরিবর্তিত হয়। আমরা অন্যান্য হাদীসগুলোকে বিবেচনায় আনলে স্পষ্ট বুঝতে পারবো ইনশাআল্লাহ। এ বিষয়েই এই পোস্টের অবতারণা ।

এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন,

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ ۚ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ ۖ وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ ۗ يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ وَلِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

“রমযান মাস হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হিদায়াত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোযা রাখবে।”

অন্যত্র আল্লাহ তা’আলা বলেন,

إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ.وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ.لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ.تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمْرٍ.سَلَامٌ هِيَ حَتَّىٰ مَطْلَعِ الْفَجْرِ 

“নিশ্চয় আমি একে (আল-কোরআন) নাযিল করছি ‘লাইলাতুল ক্বদরে’। আপনি কি জানেন, ‘লাইলাতুল কদর’ কি? ‘লাইলাতুল ক্বদর’ হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফিরিশতা ও রূহ (জিবরাইল) তাদের রবের অনুমতিক্রমে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করেন। শান্তিময় সেই রাত, ফজরের সূচনা পর্যন্ত।”

আবূ হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। নাবী (স.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি লাইলাতুল ক্বদরে ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রাত জেগে ইবাদত করে, তার পিছনের সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করা হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমানসহ সওয়াবের আশায় রমাযানে সিয়াম পালন করবে, তারও অতীতের সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করা হবে।”

উপরের দুটি কোরআনের আয়াত ও একটি হাদীস থেকে আমরা লাইলাতুল ক্বদরের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে জানতে পারলাম। কিন্তু অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ এ রাতটি রমাযান মাসের কত-তম রাত্রি? আমাদের দেশে তো প্রতিবছরই শুধুমাত্র ২৭-তম রজনীকে লাইলাতুল ক্বদর হিসেবে পালন করা হয় এবং সকল প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে ঘোষণা দেয়া হয় যে, ২৭-তম রাত্রি হচ্ছে মহিমান্বিত লাইলাতুল ক্বদর! রসূল (স.) এর হাদীস কি বলে যে, প্রতিবছরই শুধুমাত্র ২৭-তম রজনীতে লাইলাতুল ক্বদর অতিক্রান্ত হয়? চলুন, আমরা প্রসিদ্ধ ৬ টি হাদীসগ্রন্থ থেকে তা জানার চেষ্টা করি :-

*** সহীহুল বুখারী থেকেঃ

পর্ব (৩২): লাইলাতুল ক্বদরের ফজিলত (হা/২০১৫-২০২৪ = ১০ টি হাদীস)

১. লাইলাতুল ক্বদর শেষ দশকের বিজোড় রাতেঃ

ক. আয়িশাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রমাযানের শেষ দশক আসত, তখন নাবী (স.) তার লুঙ্গি কষে নিতেন (বেশি বেশি ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন) এবং রাত জেগে থাকতেন ও পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন।

খ. আয়িশাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (স.) রমাযানের শেষ দশকে ই’তিকাফ করতেন এবং বলতেনঃ তোমরা রমাযানের শেষ দশকে লাইলাতুল ক্বদর অনুসন্ধান কর।

গ. আয়িশাহ (রা.) হতে বর্ণিত। রসূল (স.) বলেছেনঃ তোমরা রমাযানের শেষ দশকের বিজোড় রাতে লাইলাতুল ক্বদর অনুসন্ধান কর।

ঘ. ইবনু আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূল (স.) বলেছেনঃ তা (লাইলাতুল ক্বদর) শেষ দশকে, তা অতিবাহিত হয় নবম রাতে অথবা অবশিষ্ট সপ্তম রাতে।

ঙ. ইবনু আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী (স.) বলেছেনঃ তোমরা তা (লাইলাতুল ক্বদর) রমাযানের শেষ দশকে অনুসন্ধান কর। লাইলাতুল ক্বদর (শেষ দিক হতে গণনায়) নবম, সপ্তম বা পঞ্চম রাতে অবশিষ্ট থাকে।

চ. উবাদা ইবনু সামিত (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নাবী (স.) আমাদেরকে লাইলাতুল ক্বদর (নির্দিষ্ট তারিখ) অবহিত করার জন্য বের হয়েছিলেন। তখন দু’জন মুসলমান ঝগড়া করছিল। তা দেখে তিনি (স.) বলেনঃ আমি তোমাদেরকে লাইলাতুল ক্বদরের সংবাদ দেওয়ার জন্য বের হয়েছিলাম, তখন অমুক অমুক ঝগড়া করছিল, ফলে তার (নির্দিষ্ট তারিখের) পরিচয় হারিয়ে যায়। সম্ভবতঃ এর মধ্যে (তারিখ অনির্দিষ্ট হওয়ার কারণে) তোমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তোমরা নবম, সপ্তম ও পঞ্চম রাতে তা তালাশ কর।

২. লাইলাতুল ক্বদর শেষ দশকের বিজোড় রাতে এবং তা ২১-তম রজনীঃ

ক. আবূ সা’ঈদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নাবী (স.) এর সঙ্গে রমাযানের মধ্যম দশকে ই’তিকাফ করি। তিনি বিশ তারিখের সকালে বের হয়ে আমাদেরকে সম্বোধন করে বললেন, আমাকে লাইলাতুল ক্বদর (এর সঠিক তারিখ) দেখানো হয়েছিল, পরে আমাকে তা ভূলিয়ে দেয়া হয়েছে। তোমরা শেষ দশকের বিজোড় রাতে তার সন্ধান কর। আমি দেখতে পেয়েছি যে, আমি (ঐ রাতে) কাদা-পানিতে সিজদা করছি। অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহর রসূল (স.) এর সঙ্গে ই’তিকাফ করেছে সে যেন ফিরে আসে (মাসজিদ হতে বের হয়ে না যায়)। আমরা সকলে ফিরে আসলাম (থেকে গেলাম)। আমরা আকাশে হাল্কা মেঘ খন্ডও দেখতে পাইনি। পরে মেঘ দেখা দিল ও এমন জোরে বৃষ্টি শুরু হলো যে, খেজুরের শাখায় তৈরী মাসজিদের ছাদ দিয়ে পানি ঝরতে লাগল। সলাত শুরু করা হলে আমি আল্লাহর রসূল (স.) কে কাদা-পানিতে সিজদা করতে দেখলাম। পরে তার কপালে আমি কাদার চিহ্ন দেখতে পাই।১০

শিক্ষাঃ

* রসূল (স.) কে প্রথমে লাইলাতুল ক্বদরের সঠিক তারিখ দেখানো হয়েছিল এবং পরে তা ভূলিয়ে দেওয়া হয়ছিল।

* অতঃপর রসূল (স.) শেষ দশকের বিজোড় রাতে লাইলাতুল ক্বদরকে সন্ধান করতে বলেছেন।

* রসূল (স.) কে স্বপ্নে দেখানো লক্ষণ অনুযায়ী প্রমাণ হয় যে, ঐ রমাযান মাসে লাইলাতুল ক্বদর ছিল ২০-তম দিবাগত রাত্রি অর্থাৎ ২১-তম রজনী যা ২০১৮ নং হাদীস থেকে প্রমাণিত হয়।

খ. আবূ সা’ঈদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (স.) রমাযানের মাঝের দশকে ই’তিকাফ করেন। বিশ তারিখ অতীত হওয়ার সন্ধায় এবং একুশ তারিখের শুরুতে তিনি (স.) এবং তার সঙ্গে যারা ই’তিকাফ করেছিলেন সকলেই নিজ নিজ বাড়িতে প্রস্থান করেন এবং তিনি (স.) যে মাসে ই’তিকাফ করেন ঐ মাসের যে রাতে ফিরে যান সে রাতে লোকদের সামনে ভাষণ দেন। আর তাতে মাশাআল্লাহ, তাদেরকে বহু নির্দেশ দান করেন। অতঃপর বলেন যে, আমি এই দশকে ই’তিকাফ করেছিলাম। এরপর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, শেষ দশকে ই’তিকাফ করব। যে আমার সঙ্গে ই’তিকাফ করেছিল, সে যেন তার ই’তিকাফস্থলে ফিরে যায়। আমাকে সে রাত দেখানো হয়েছিল, পরে তা ভূলিয়ে দেয়া হয়েছে। রসূল (স.) বলেনঃ “শেষ দশকে ঐ রাত তালাশ কর এবং প্রত্যেক বিজোড় রাতে তা তালাশ কর। আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, ঐ রাতে আমি কাদা-পানিতে সিজদা করছি। ঐ রাতে আকাশে প্রচুর মেঘের সঞ্চার হয় এবং বৃষ্টি হয়। মাসজিদে আল্লাহর রসূল (স.) এর সলাতের স্থানেও বৃষ্টির পানি পড়তে থাকে। এটা ছিল ২১ তারিখের রাত। যখন তিনি ফজরের সলাত শেষে ফিরে বসেন তখন আমি তার দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই যে, তার মুখমন্ডল কাদা-মাখা।১১

৩. লাইলাতুল ক্বদর শেষ সাত রাতের বিজোড় রাত গুলোতেঃ

ক. আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) হতে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, নাবী (স.) এর কতিপয় সহাবীকে স্বপ্নের মাধ্যমে রমাযানের শেষের সাত রাত্রে লাইলাইতুল ক্বদর দেখানো হয়। (এ শুনে) আল্লাহর রসূল (স.) বললেনঃ আমাকেও তোমাদের স্বপ্নের অনুরুপ দেখানো হয়েছে। অতএব, যে ব্যক্তি এর সন্ধান প্রত্যাশী, সে যেন শেষ সাত রাতে সন্ধান করে।১২

*** সহীহ মুসলিম থেকেঃ

অধ্যায় (৪০): লাইলাতুল ক্বদর-এর ফজিলত, এর অনুসন্ধানে উৎসাহ প্রদান, তা কখন হবে তার বর্ণনা এবং তার অনুসন্ধানের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক সময় (হা/২৬৫১-২৬৬৮ = ১৮ টি হাদীস)

১. লাইলাতুল ক্বদর শেষ দশকের কিংবা শেষ সাত রাতের বিজোড় রাত গুলোতেঃ

ক. আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) হতে বর্ণিত যে, …….শেষ সাত রাতে সন্ধান করে।১৩

খ. সালিম (রহ.) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি (পিতা) বলেন, এক ব্যক্তি (রমাযানের) ২৭-তম রাতে লাইলাতুল ক্বদর দেখতে পেল। নাবী (স.) বললেন, আমাকেও তোমাদের মতো স্বপ্ন দেখানো হয়েছে যে, তা রমাযানের শেষ দশকে নিহিত রয়েছে। অতএব এর বিজোড় রাতগুলোতে তা অনুসন্ধান কর।১৪

গ. সালিম ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তার পিতা [আব্দুল্লাহ (রা.)] বলেছেন, আমি রসূল (স.) কে ক্বদর সম্পর্কে বলতে শুনেছি, তোমাদের কতিপয় লোককে দেখানো হল যে, তা রমাযানের প্রথম সাতদিনের মধ্যে, আবার কতিপয় লোককে দেখানো হয়েছে যে, তা শেষ সাতদিনের মধ্যে। অতএব (রমাযানের) শেষ দশকের মধ্যে তা অন্বেষণ কর।১৫

ঘ. উক্ববাহ ইবনু হুরায়স (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু উমর (রা.) কে বলতে শুনেছি যে, তিনি (স.) বলেনঃ তোমরা (রমাযানের) শেষ দশ দিনে ক্বদরের রাত সন্ধান কর। তোমাদের কেউ যদি দুর্বল অথবা অপারগ হয়ে পড়ে, তবে সে যেন শেষের সাত রাতে অলসতা না করে।১৬

ঙ. জাবালাহ (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু উমর (রা.) কে বলতে শুনেছি যে, তিনি (স.) বলেনঃ যে ব্যক্তি ক্বদরের রাত অনুসন্ধান করতে চায়, সে যেন (রমাযানের) শেষ দশকে তা অনুসন্ধান করে।১৭

চ. ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূল (স.) বলেছেনঃ তোমরা (রমাযানের) শেষ দশকে ক্বদরের রাত অনুসন্ধান কর অথবা তিনি (স.) বলেছেন, শেষের সাত রাতে।১৮

ছ. আবূ হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। রসূল (স.) বলেনঃ আমাকে স্বপ্নে ক্বদরের রাত দেখানো হয়েছিল। অতঃপর আমার পরিবারের কেউ আমাকে ঘুম থেকে জাগানোর ফলে আমাকে তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। সুতরাং তোমরা তা শেষ দশকে অন্বেষণ কর।১৯

জ. আবূ সা’ঈদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নাবী (স.) এর সঙ্গে রমাযানের মধ্যম দশকে ই’তিকাফ করি। তিনি বিশ তারিখের সকালে বের হয়ে ….. আমি (ঐ রাতে) কাদা-পানিতে সিজদা করছি। …… আমরা আকাশে হাল্কা মেঘ খন্ডও দেখতে পাইনি। পরে মেঘ দেখা দিল ও এমন জোরে বৃষ্টি শুরু হলো যে, খেজুরের শাখায় তৈরী মাসজিদের ছাদ দিয়ে পানি ঝরতে লাগল। এটা ছিল ২১ তারিখের রাত। যখন তিনি ফজরের সলাত শেষে ফিরে বসেন তখন আমি তার দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই যে, তার মুখমন্ডল কাদা-মাখা।২০

ঝ. আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূল (স.) ক্বদরের রাত অন্বেষণের উদ্দেশ্যে তা (লাইলাতুল ক্বদর) তার কাছে সুস্পষ্ট হবার পূর্বে রমাযানের মাঝের দশদিন ই’তিকাফ করলেন। দশদিন অতিবাহিত হবার পর তিনি (স.) তাবু তুলে ফেলার নির্দেশ দিলেন। অতএব তা গুটিয়ে ফেলা হল। অতঃপর তিনি (স.) জানতে পারলেন যে, তা শেষ দশদিনের মধ্যে আছে। তাই তিনি পুনরায় তাবু খাটানোর নির্দেশ দিলেন। তা খাটানো হল। এরপর তিনি লোকদের নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, হে লোক সকল! আমাকে ক্বদরের রাত সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছিল এবং আমি তোমাদের তা জানানোর জন্য বের হয়ে এলাম। কিন্তু দুই ব্যক্তি পরষ্পর ঝগড়া করতে করতে উপস্থিত হল এবং এবং তাদের সাথে ছিল শয়তান। তাই আমি তা ভুলে গেছি। অতএব তোমরা তা রমাযান মাসের শেষ দশদিনে অন্বেষণ কর। তোমরা তা নবম, সপ্তম ও পঞ্চম রাতে অন্বেষণ কর। রাবী বলেন, আমি বললাম, হে আবূ সা’ঈদ! আপনি সংখ্যা সম্পর্কে আমাদের তুলনায় অধিক জ্ঞানী। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমরাই এ বিষয়ে তোমাদের চেয়ে অধিক হক্বদার। আমি (রাবী) বললাম, নবম, সপ্তম ও পঞ্চম সংখ্যাগুলো কি? তিনি বললেন, একুশ রাত অতিবাহিত হওয়ার পর বাইশ তারিখ আসে, নবম বলে এখানে সেই ২২ তারিখ রাতকে বুঝানো হয়েছে। তেইশ রাত অতিবাহিত হওয়ার পর যে রাত আসে, সপ্তম বলে সে রাতকে বুঝানো হয়েছে। আর পঁচিশ রাত অতিবাহিত হবার পর যে রাত আসে অর্থাৎ ২৬ রাতকেই পঞ্চম বলে বুঝানো হয়েছে।২১

টিকাঃ এখানে শেষের দিক থেকে গণনা করা হয়েছে। যখন একুশটি রাত অতিবাহিত হয়ে যায় তখন রমাযানের আর নয়টি রাত অবশিষ্ট থাকে। যখন তেইশ রাত অতিবাহিত হয়ে যায়-সাত রাত অবশিষ্ট থাকে এবং যখন পঁচিশটি রাত শেষ হয়ে যায় তখন রমাযানের আর পাঁচটি রাত অবশিষ্ট থাকে।

ঞ. আয়িশাহ (রা.) হতে বর্ণিত। রসূল (স.) বলেছেনঃ তোমরা রমাযানের শেষ দশকের বিজোড় রাতে লাইলাতুল ক্বদর অনুসন্ধান কর।২২

২. লাইলাতুল ক্বদর শেষ দশকের বিজোড় রাতে এবং তা ২৩-তম রজনীঃ

ক. আব্দুল্লাহ ইবনু উনায়স (রা.) থেকে বর্ণিত। রসূল (স.) বলেন, আমাকে ক্বদরের রাত দেখানো হয়েছিল। অতঃপর তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। আমাকে ঐ রাতের ভোর সম্পর্কে স্বপ্নে আরও দেখানো হয়েছে যে, আমি পানি ও কাদার মধ্যে সিজদা করছি। রাবী বলেন, অতএব ২৩-তম রাতে বৃষ্টি হল এবং রসূল (স.) আমাদের সাথে (ফজরের) সলাত আদায় করে যখন ফিরলেন, তখন তার কপাল ও নাকের ডগায় কাদা ও পানির চিহ্ন দেখতে পেলাম।২৩

৩. লাইলাতুল ক্বদর শেষ দশকের বিজোড় রাতে এবং তা ২৭-তম রজনীঃ

ক. যির ইবনু হুবাইশ (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উবাই ইবনু কা’ব (রা.) কে বললাম, আপনার ভাই আব্দুল্লাহ ইবনু মাস’উদ (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি গোটা বছর রাত জাগরণ করে-সে ক্বদরের রাতের সন্ধান পাবে। তিনি (উবাই) বললেন, আল্লাহ তাকে রহম করুন, এর দ্বারা তিনি একথা বুঝাতে চাচ্ছেন যে, লোকেরা যেন কেবল একটি রাতের উপর ভরসা করে না থাকে। অথচ তিনি অবশ্যই জানেন যে, তা রমাযান মাসের শেষ দশ দিনের মধ্যে এবং ২৭-তম রজনী। অতঃপর তিনি দৃঢ় শপথ করে বললেন, তা ২৭-তম রজনী। আমি (যির) বললাম, হে আবুল মুনযির! আপনি কিসের ভিত্তিতে তা বলছেন? তিনি বললেন, বিভিন্ন আলামত ও নিদর্শনের ভিত্তিতে-যে সম্পর্কে রসূল (স.) আমাদের অবহিত করেছেন। যেমন, সেদিন সূর্য উদয় হবে কিন্তু তাতে আলোকরশ্নি/কিরণ থাকবে না।২৪

খ. উবাই ইবনু কা’ব (রা.) ক্বদরের রাত সম্পর্কে বলেন, আল্লাহর শপথ! ক্বদরের রাত সম্পর্কে আমি খুব ভাল করেই জানি। শুবাহ বলেন, আমার জানামতে তা হচ্ছে সে রাত যে রাতে জেগে ইবাদত করার জন্য রসূল (স.) আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, আর তা হচ্ছে ২৭-তম রজনী।২৫

মুসলিম শরীফের এ দুটি হাদীস থেকে যা বুঝা যায়, তা হলঃ ২৭-তম রজনীতেও লাইলাতুল ক্বদর অতিবাহিত হতে পারে, যদি রসূল (স.) কর্তৃক উল্লেখিত আলামত সমূহ প্রদর্শিত হয়।

*** সূনান আবূ দাঊদ থেকেঃ

অধ্যায়ঃ রমাযান মাস; অনুচ্ছেদঃ ৩১৯-৩২৪ (হা/১৩৭৮-১৩৮৭ = ১০ টি হাদীস)

১. লাইলাতুল ক্বদর শেষ দশকের কিংবা শেষ সাত রাতের বিজোড় রাত গুলোতেঃ

ক. ইবনু আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী (স.) বলেছেনঃ তোমরা তা (লাইলাতুল ক্বদর) রমাযানের শেষ দশকে অনুসন্ধান কর। লাইলাতুল ক্বদর (শেষ দিক হতে গণনায়) নবম, সপ্তম বা পঞ্চম রাতে অবশিষ্ট থাকে।২৬

খ. আবূ সা’ঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমরা রমাযানের শেষ দশকে লাইলাতুল ক্বদর অন্বেষণ কর এবং তা অন্বেষণ কর নয়, সাত ও পাঁচের মধ্যে। আবূ নাদরাহ বলেন, আমি বললাম, হে আবূ সা’ঈদ! গণনার ব্যাপারে আপনারা আমাদের চেয়ে অধিক জ্ঞাত। তিনি বললেন, তাতো বটেই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, নয়, সাত ও পাঁচ কি? তিনি বললেন, নয় হচ্ছে রমাযানের ২১ তারিখের রাত, সাত হলো ২৩ তারিখের রাত এবং পাঁচ হলো ২৫ তারিখের রাত।২৭

গ. ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূল (স.) বলেছেনঃ তোমরা (রমাযানের) শেষ দশকে ক্বদরের রাত অনুসন্ধান কর অথবা তিনি (স.) বলেছেন, শেষের সাত রাতে।২৮

২. লাইলাতুল ক্বদর শেষ দশকের বিজোড় রাতে এবং তা ২১-তম রজনীঃ

ক. আবূ সা’ঈদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নাবী (স.) এর সঙ্গে রমাযানের মধ্যম দশকে ই’তিকাফ করি। তিনি বিশ তারিখের সকালে বের হয়ে ….. আমি (ঐ রাতে) কাদা-পানিতে সিজদা করছি। …… আমরা আকাশে হাল্কা মেঘ খন্ডও দেখতে পাইনি। পরে মেঘ দেখা দিল ও এমন জোরে বৃষ্টি শুরু হলো যে, খেজুরের শাখায় তৈরী মাসজিদের ছাদ দিয়ে পানি ঝরতে লাগল। এটা ছিল ২১ তারিখের রাত। যখন তিনি ফজরের সলাত শেষে ফিরে বসেন তখন আমি তার দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই যে, তার মুখমন্ডল কাদা-মাখা।২৯

৩. লাইলাতুল ক্বদর শেষ দশকের বিজোড় রাতে এবং তা ২৩-তম রজনীঃ

ক. দামরাহ ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু উনাইস (রহ.) তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন [উনাইস (রা.)], একবার আমি বনু সালমাহ’র মাজলিসে উপস্থিত হই এবং সেখানে আমিই ছিলাম বয়সে ছোট। তারা বললেন, আমাদের মাঝে রসূল (স.) কে ক্বদরের রাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার মত কেউ আছে কি? ঘটনাটি রমাযানের ২১ তারিখ সকাল বেলায়। বর্ণনাকারী বলেন, তখন আমি এ উদ্দেশ্যে বের হই এবং মাগরিবের সলাতে রসূল (স.) এর সাক্ষাত লাভ করি। আমি তার (স.) ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। তিনি (স.) আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমাকে ভিতরে প্রবেশ করতে বললে আমি প্রবেশ করি। এ সময় তার (স.) রাতের খাবার আনা হল। খাবার কম থাকায় আমি সামান্য খেয়েছি। তিনি (স.) খাওয়া শেষ করে বললেন, আমার জুতা দাও। এরপর তিনি (স.) উঠলে আমিও তার সাথে উঠি। তিনি (স.) জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কোন প্রয়োজন আছে কি? আমি বললাম, হ্যাঁ, বনু সালমাহ’র লোকেরা আপনার নিকট লাইলাতুল ক্বদর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য আমাকে পাঠিয়েছে। তিনি (স.) বললেনঃ আজ কত তারিখ? আমি বললাম, বাইশ। তিনি (স.) বললেনঃ তা আজ রাতেই। তিনি (স.) ২৩ তারিখের রাতের দিকে ইঙ্গিত করেন।৩০

খ. ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু উনাইস আল-জুহানী (রহ.) হতে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল (স.)! আমার একটি খামার রয়েছে, আমি ওখানেই অবস্থান করি এবং আল্লাহর প্রশংসা যে, আমি ওখানেই সলাত আদায় করি। কাজেই আমাকে এমন একটি নির্দেশ দিন, যে রাতে আমি এ মাসজিদে (ইবাদতের উদ্দেশ্যে) অবস্থান করব। তিনি (স.) বললেনঃ ২৩ তারিখের রাতে অবস্থান করো।৩১

৪. লাইলাতুল ক্বদর শেষ দশকের বিজোড় রাতে এবং তা ২৭-তম রজনীঃ

ক. যির ইবনু হুবাইশ (রহ.) থেকে বর্ণিত। …….তা রমাযান মাসের শেষ দশ দিনের মধ্যে এবং ২৭-তম রজনী। ….আমি (যির) বললাম, হে আবুল মুনযির! আপনি কিসের ভিত্তিতে তা বলছেন? তিনি বললেন, বিভিন্ন আলামত ও নিদর্শনের ভিত্তিতে-যে সম্পর্কে রসূল (স.) আমাদের অবহিত করেছেন। যেমন, সেদিন সূর্য উদয় হবে কিন্তু তাতে আলোকরশ্নি/কিরণ থাকবে না।৩২

খ. মু’য়াবিয়াহ ইবনু আবূ সুফিয়ান (রা.) সূত্রে বর্ণিত। নাবী (স.) লাইলাতুল ক্বদর সম্পর্কে বলেছেনঃ লাইলাতুল ক্বদর ২৭-তম রজনীতে।৩৩

দুটি দুর্বল হাদীসঃ

ক. লাইলাতুল ক্বদর ১৭, ২১ ও ২৩ তারিখের রাতে।৩৪

খ. লাইলাতুল ক্বদর রমাযানের প্রতি রাতেই।৩৫

*** জামি আত্-তিরমিযী থেকেঃ

অধ্যায় (৬): রোযা; অনুচ্ছেদঃ ৭২-৭৩ (হা/৭৯২-৭৯৬ = ৫ টি হাদীস)

১. লাইলাতুল ক্বদর শেষ দশকে এবং তা বিজোড় রাতে

ক. আলী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রমাযানের শেষ দশদিন নাবী (স.) তার পরিবারের সদস্যদেরকে (ইবাদতে মগ্ন থাকার জন্য) ঘুম থেকে উঠাতেন।৩৬

খ. আয়িশাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রমাযানের শেষ দশদিন রসূল (স.) এত বেশি সাধনা (ইবাদত) করতেন যে, অন্য কোন সময়ে এরকম সাধনা করতেন না।৩৭

গ. আয়িশাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রমাযান মাসের শেষ দশদিন রসূল (স.) মাসজিদে থাকতেন (ই’তিকাফ করতেন)। তিনি (স.) বলতেনঃ মাসের শেষের দশদিন তোমরা ক্বদরের রাতকে খোঁজ কর।৩৮

ঘ. আব্দুর রহমান (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, লাইলাতুল ক্বদর প্রসঙ্গে একবার আবূ বাকরা (রা.) এর কাছে আলোচনা হল। তিনি বলেন, রসূল (স.) এর একটি বাণী শোনার কারণে আমি রমাযান মাসের শেষ দশদিন ব্যতীত অন্য কোন রাত্রে লাইলাতুল ক্বদরকে খোঁজ করি না। আমি তাকে বলতে শুনেছিঃ তোমরা ক্বদরের রাত খোঁজ কর রমাযানের ৯ দিন বাকী থাকতে বা ৭ দিন বাকী থাকতে বা ৫ দিন বাকী থাকতে বা ৩ দিন বাকী থাকতে বা এর শেষ রাত্রে।৩৯

২. লাইলাতুল ক্বদর শেষ দশকের বিজোড় রাতে এবং তা ২৭-তম রজনীঃ

ক. যির ইবনু হুবাইশ (রহ.) থেকে বর্ণিত। …….তা রমাযান মাসের শেষ দশ দিনের মধ্যে এবং ২৭-তম রজনী। ….আমি (যির) বললাম, হে আবুল মুনযির! আপনি কিসের ভিত্তিতে তা বলছেন? তিনি বললেন, বিভিন্ন আলামত ও নিদর্শনের ভিত্তিতে-যে সম্পর্কে রসূল (স.) আমাদের অবহিত করেছেন। যেমন, সেদিন সূর্য উদয় হবে কিন্তু তাতে আলোকরশ্নি/কিরণ থাকবে না।৪০

*** সূনান ইবনু মাজাহ্ থেকে :

অধ্যায়: সিয়াম; অনুচ্ছেদঃ লাইলাতুল ক্বদর প্রসঙ্গে এবং রমাযান মাসের শেষ দশকের ফজিলত (হা/১৭৬৬-১৭৬৮ = ৩ টি হাদীস)

১. লাইলাতুল ক্বদর শেষ দশকে এবং তা বিজোড় রাতেঃ

ক. আবূ সা’ঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রসূল (স.) এর সঙ্গে রমাযানের মধ্যম দশকে ই’তিকাফ করেছিলাম। তিনি (স.) বললেন, আমাকে লাইলাতুল ক্বদর দেখানো হয়েছিল, পরে তা আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। কজেই তোমরা রমাযানের শেষ দশকের বিজোড় রাতসমূহে তা অনুসন্ধান করবে।৪১

খ. আয়িশাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রমাযানের শেষ দশদিন রসূল (স.) এত বেশি সাধনা (ইবাদত) করতেন যে, অন্য কোন সময়ে এরকম সাধনা করতেন না।৪২

গ. আয়িশাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রমাযানের শেষ দশক আসত, তখন নাবী (স.) তার লুঙ্গি কষে নিতেন (বেশি বেশি ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন) এবং রাত জেগে থাকতেন ও পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন।৪৩

*** মুয়াত্তা ইমাম মালিক  হতে :

অধ্যায় ১৯: ই’তিকাফ; পরিচ্ছেদ ৬: লাইলাতুল ক্বদর-এর বর্ণনা (রেওয়ায়ত ৯-১৪ = ৬ টি হাদীস)

১. লাইলাতুল ক্বদর শেষ দশকের বিজোড় রাতেঃ

ক. উরওয়াহ ইবনু যুবায়র (রহ.) হতে বর্ণিত। রসূল (স.) বলেছেনঃ রমাযানের শেষ দশদিনে তোমরা লাইলাতুল ক্বদরের সন্ধান কর।৪৪

খ. আনাস ইবনু মালিক (রা.) বলেন, রসূল (স.) বের হয়ে আমাদের নিকট আসলেন, অতঃপর বললেনঃ আমাকে অবশ্য এই রাত্রিটি (লাইলাতুল ক্বদর) দেখানো হয়েছে, হঠাৎ দুইজন লোক বিতর্কে লিপ্ত হইল, ফলে উহা (আমার স্মৃতি হতে) তুলে নেওয়া হয়। অতঃপর তোমরা উহাকে তালাশ কর নবম, সপ্তম ও পঞ্চম রাতে।৪৫

২. লাইলাতুল ক্বদর রমাযানের শেষ সাত রাতেঃ

ক. আব্দুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) হতে বর্ণিত- তোমরা রমাযানের শেষের সাতদিনে লাইলাতুল ক্বদরের অনুসন্ধান কর।৪৬

খ. মালিক (রহ.) বলেন, তার নিকট রেওয়ায়ত পৌঁছিয়েছে যে, নাবী (স.) এর সহাবীদের মধ্যে কিছু লোককে লাইলাতুল ক্বদর স্বপ্নে দেখানো হয় শেষের সাত রাত্রে। তারপর রসূল (স.) বললেনঃ আমি মনে করি তোমাদের স্বপ্ন (শেষের সাতদিনের ব্যাপারে) পরষ্পর মুয়াফিক (সামঞ্জস্যপূর্ণ) হয়েছে। অতঃপর যে উহাকে (লাইলাতুল ক্বদর) তালাশ করে, সে যেন শেষের সাতদিনে উহাকে তালাশ করে।৪৭

৩. লাইলাতুল ক্বদর শেষ দশকের বিজোড় রাতে এবং তা ২১-তম রজনীঃ

ক. আবূ সা’ঈদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নাবী (স.) এর সঙ্গে রমাযানের মধ্যম দশকে ই’তিকাফ করি। তিনি বিশ তারিখের সকালে বের হয়ে আমাদেরকে সম্বোধন করে বললেন, আমাকে লাইলাতুল ক্বদর (এর সঠিক তারিখ) দেখানো হয়েছিল, পরে আমাকে তা ভূলিয়ে দেয়া হয়েছে। তোমরা শেষ দশকের বিজোড় রাতে তার সন্ধান কর। ……পরে মেঘ দেখা দিল ও এমন জোরে বৃষ্টি শুরু হলো যে, খেজুরের শাখায় তৈরী মাসজিদের ছাদ দিয়ে পানি ঝরতে লাগল। সলাত শুরু করা হলে আমি আল্লাহর রসূল (স.) কে কাদা-পানিতে সিজদা করতে দেখলাম। পরে তার কপালে আমি কাদার চিহ্ন দেখতে পাই।৪৮

৪. লাইলাতুল ক্বদর শেষ দশকের বিজোড় রাতে এবং তা ২৩-তম রজনীঃ

ক. ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু উনাইস আল-জুহানী (রহ.) হতে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল (স.)! আমার একটি খামার রয়েছে, আমি ওখানেই অবস্থান করি এবং আল্লাহর প্রশংসা যে, আমি ওখানেই সলাত আদায় করি। কাজেই আমাকে এমন একটি নির্দেশ দিন, যে রাতে আমি এ মাসজিদে (ইবাদতের উদ্দেশ্যে) অবস্থান করব। তিনি (স.) বললেনঃ ২৩ তারিখের রাতে অবস্থান করো।৪৯

শিক্ষাঃ

আল্লাহ তা’আলা আল-কুরআনে সূরা ক্বদরে ঘোষণা করেছেন যে, লাইলাতুল ক্বদর হাজার মাসের (ইবাদতের) চেয়েও উত্তম। অন্যদিকে উপরে উল্লেখিত ৬ টি হাদীসগ্রন্থের ৫২ টি হাদীস থেকে জানা যায় যে, লাইলাতুল ক্বদর শেষ দশ দিনের যেকোন বিজোড় রাত্রিতে হয়ে থাকে। বিভিন্ন সহীহ হাদীসে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখে লাইলাতুল ক্বদর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখিত আছে। হাদীসে এ কথাও উল্লেখিত আছে যে, কোন একটি নির্দিষ্ট বিজোড় রাত্রিতেই তা হয়না (অর্থাৎ কোন বছর ২৫ তারিখে হল, আবার কোন বছর ২১ তারিখে হল এভাবে)।

সুতরাং, আমাদের দেশে যে, সরকারী ও বেসরকারীভাবে জাঁকজমকের সঙ্গে ২৭ তারিখের রাতকে লাইরাতুল ক্বদরের রাত হিসেবে পালন করা হয়, তা কিসের ভিত্তিতে? এভাবে মাত্র একটি রাত্রিকে লাইলাতুল ক্বদর সাব্যস্ত করার কোনই হাদীস নেই এবং তা নিঃসন্দেহে বিদ’আত। আর বিদ’আতকারীর পরিণাম কি আপনারা জানেন না? বিদ’আতকারী সম্পর্কে রসূল (স.) বলেছেনঃ যে কেউ দ্বীনের ব্যাপারে বিদ’আত উদ্ভাবণ করে কিংবা কোন বিদ’আতীকে আশ্রয় দিবে তার উপর আল্লাহ তা’আলা, ফিরিশতা ও সকল মানুষের লা’নত। তার কোন ফরজ কিংবা নফল ইবাদত গৃহীত হবে না।৫০

সুতরাং, লাইলাতুল ক্বদরের সওয়াব পেতে হলে ৫ টি বিজোড় রাতেই তা তালাশ করতে হবে।

হে আল্লাহ! আপনি আমাদের সকলকে সকল প্রকার ভ্রষ্টতা ও গোমরাহী পরিত্যাগ করে আপনার নাযিলকৃত কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী আ’মল করার তাওফিক দান করুন। -আমিন

****প্রভাষক, নোবিপ্রবি, নোয়াখালী

তথ্যপঞ্জীঃ

সূরা বাকারাহ (২:১৮৫)

সূরা কদর (৯৭:১-৫)

সহীহুল বুখারী (হা/৩৫, ১৯০১, ২০১৪: তাওহীদ প্রকাশনী)

সহীহ বুখারী (হা/২০২৪: তাওহীদ প্রকাশনী)

সহীহ বুখারী (হা/২০১৯, ২০২০: তাওহীদ প্রকাশনী)

সহীহ বুখারী (হা/২০১৭: তাওহীদ প্রকাশনী)

সহীহ বুখারী (হা/২০২২: তাওহীদ প্রকাশনী)

সহীহ বুখারী (হা/২০২১: তাওহীদ প্রকাশনী)

সহীহ বুখারী (হা/২০২৩: তাওহীদ প্রকাশনী)

১০সহীহ বুখারী (হা/২০১৬: তাওহীদ প্রকাশনী)

১১সহীহ বুখারী (হা/২০১৮: তাওহীদ প্রকাশনী)

১২সহীহ বুখারী (হা/২০১৫: তাওহীদ প্রকাশনী)

১৩সহীহ মুসলিম (হা/২৬৫১, ২৬৫২: হাদীস লাইব্রেরী) ও সহীহ বুখারী (হা/২০১৫: তাওহীদ প্রকাশনী)

১৪সহীহ মুসলিম (হা/২৬৫৩: হাদীস লাইব্রেরী)

১৫সহীহ মুসলিম (হা/২৬৫৪: হাদীস লাইব্রেরী)

১৬সহীহ মুসলিম (হা/২৬৫৫: হাদীস লাইব্রেরী)

১৭সহীহ মুসলিম (হা/২৬৫৬: হাদীস লাইব্রেরী)

১৮সহীহ মুসলিম (হা/২৬৫৭: হাদীস লাইব্রেরী)

১৯সহীহ মুসলিম (হা/২৬৫৮: হাদীস লাইব্রেরী)

২০সহীহ মুসলিম (হা/২৬৫৯, ২৬৬০, ২৬৬১, ২৬৬২, ২৬৬৩: হাদীস লাইব্রেরী)

ও সহীহ বুখারী (হা/২০১৬, ২০১৮: তাওহীদ প্রকাশনী)

২১সহীহ মুসলিম (হা/২৬৬৪: হাদীস লাইব্রেরী)

২২সহীহ মুসলিম (হা/২৬৬৬: হাদীস লাইব্রেরী) ও সহীহ বুখারী (হা/২০১৭: তাওহীদ প্রকাশনী)

২৩সহীহ মুসলিম (হা/২৬৬৫: হাদীস লাইব্রেরী)

২৪সহীহ মুসলিম (হা/২৬৬৭: হাদীস লাইব্রেরী)

২৫সহীহ মুসলিম (হা/২৬৬৮: হাদীস লাইব্রেরী)

২৬সূনান আবূ দাঊদ (হা/১৩৮১: সহীহ; আলবানী একাডেমী) ও সহীহ বুখারী (হা/২০২১: তাওহীদ প্রকাশনী)

২৭সূনান আবূ দাঊদ (হা/১৩৮৩: সহীহ; আলবানী একাডেমী)

২৮সূনান আবূ দাঊদ (হা/১৩৮৫: সহীহ; আলবানী একাডেমী) ও সহীহ মুসলিম (হা/২৬৫৭: হাদীস লাইব্রেরী)

২৯সূনান আবূ দাঊদ (হা/১৩৮২: সহীহ; আলবানী একাডেমী) ও সহীহ বুখারী (হা/২০১৬, ২০১৮: তাওহীদ প্রকাশনী)

৩০সূনান আবূ দাঊদ (হা/১৩৭৯: হাসান সহীহ; আলবানী একাডেমী)

৩১সূনান আবূ দাঊদ (হা/১৩৮০: হাসান সহীহ; আলবানী একাডেমী)

৩২সূনান আবূ দাঊদ (হা/১৩৭৮: সহীহ; আলবানী একাডেমী) ও সহীহ মুসলিম (হা/২৬৬৭: হাদীস লাইব্রেরী)

৩৩সূনান আবূ দাঊদ (হা/১৩৭৮: সহীহ; আলবানী একাডেমী)

৩৪সূনান আবূ দাঊদ (হা/১৩৮৪: দুর্বল; আলবানী একাডেমী)

৩৫সূনান আবূ দাঊদ (হা/১৩৮৭: দুর্বল; আলবানী একাডেমী)

৩৬আত্-তিরমিযী (হা/৭৯৫: সহীহ; হুসাইন আল মাদানী প্রকাশনী)

৩৭আত্-তিরমিযী (হা/৭৯৬: সহীহ; হুসাইন আল মাদানী প্রকাশনী)

৩৮আত্-তিরমিযী (হা/৭৯২: সহীহ; হুসাইন আল মাদানী প্রকাশনী)

৩৯আত্-তিরমিযী (হা/৭৯৪: সহীহ; হুসাইন আল মাদানী প্রকাশনী)

৪০আত্-তিরমিযী (হা/৭৯৩: সহীহ; হুসাইন আল মাদানী প্রকাশনী) ও সহীহ মুসলিম (হা/২৬৬৭: হাদীস লাইব্রেরী)

৪১সূনান ইবনু মাজাহ্ (হা/১৭৬৬: ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

৪২সূনান ইবনু মাজাহ্ (হা/১৭৬৭: ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ও আত্-তিরমিযী (হা/৭৯৬: সহীহ; হুসাইন আল মাদানী প্রকাশনী)

৪৩সূনান ইবনু মাজাহ্ (হা/১৭৬৮: ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ও সহীহ বুখারী (হা/২০২৪: তাওহীদ প্রকাশনী)

৪৪মুয়াত্তা ইমাম মালিক (রেওয়ায়ত/১০: ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

৪৫মুয়াত্তা ইমাম মালিক (রেওয়ায়ত/১৩: ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

৪৬মুয়াত্তা ইমাম মালিক (রেওয়ায়ত/১১: ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

৪৭মুয়াত্তা ইমাম মালিক (রেওয়ায়ত/১৪: ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

৪৮মুয়াত্তা ইমাম মালিক (রেওয়ায়ত/০৯: ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ও সহীহ বুখারী (হা/২০১৬: তাওহীদ প্রকাশনী)

৪৯মুয়াত্তা ইমাম মালিক (রেওয়ায়ত/১২: ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ও সূনান আবূ দাঊদ (হা/১৩৮০: হাসান সহীহ; আলবানী একাডেমী)

৫০সহীহুল বুখারী (হা/৩১৭৯: তাওহীদ প্রকাশনী)

মতামত দিন

কমেন্ট