সিয়াম

ক্বিয়ামে রামাযান ও ই’তেকাফ

রচনায় :- মুহাম্মাদ হারূণ আযীযী নদভী**

রামাযানের রজনীতে ক্বিয়ামের ফযীলতঃ

এ ব্যাপারে দু’টি হাদীছ বর্ণিত আছে। যেমন- আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ক্বিয়ামে রামাযান (তারাবীহ)-এর জন্য উৎসাহিত করতেন। কিন্তু দৃঢ়ভাবে কোন আদেশ দিতেন না। অতঃপর বলতেনঃ ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ছওয়াবের আশায় রামাযানে ক্বিয়াম করবে (তারাবীহর ছালাত পড়বে) তার পূর্বের সমস্ত পাপ মোচন করে দেওয়া হবে’। তারপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ইন্তেকাল করলেন অথচ তারাবীহ্‌র বিষয়টি সেরূপই ছিল। অতঃপর আবুবকর (রাঃ)-এর খিলাফতকালেও সেরূপই ছিল এবং ওমর (রাঃ)-এর খিলাফতের শুরুতেও অবস্থা একই রকম ছিল’। [ইমাম মুসলিম প্রভৃতি, ইরওয়াউল গালীল, ৪/১৪পৃঃ, হা/৯০৬; সহীহ আবুদাঊদ, হা/১২৪১]

দ্বিতীয়টিঃ আমর ইবনু মুররা আল-জুহানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট ‘কুযা’আ’ গোত্রের একটি লোক এসে বলল, হে আল্লাহ্‌র রাসূল (ছাঃ)! যদি আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন মা’বূদ নেই, আর আপনি আল্লাহ্‌র রাসূল এবং পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করি, রামাযান মাসে ছিয়াম পালন করি, আর রামাযানে ক্বিয়াম করি এবং যাকাত আদায় করি, তাহ’লে আপনি কি বললেন? তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, ‘যে ব্যক্তি এরূপ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে সে ছিদ্দীক্ব এবং শহীদগণের মর্যাদায় ভূষিত হবে’। [ইবনু হিব্বান সনদ ছহীহ, ছহীহ ইবনে খুযায়মা ৩/৩৪০ পৃঃ, হা/২২৬২; ছহীহ আত-তারগীব ১/৪১৯পৃঃ, হা/৯৯৩]

জামা’আতের সাথে তারাবীহ আদায় করাঃ

তারাবীহ ছালাত জামা’আতের সাথে আদায় করা উত্তম। নবী করীম (ছাঃ) নিজেও জামা’আতের সাথে আদায় করেছেন এবং তার ফযীলতও বর্ণনা করেছেন। যেমন আবু যার (রাঃ) বলেন,

‘আমরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছিয়াম রেখেছি। তিনি আমাদেরকে তারাবীহর ছালাত পড়ালেন না। অবশেষে রামাযানের সাত দিন বাকী থাকতে তিনি আমাদের নিয়ে ছালাতে দাঁড়ালেন। এতে রাতের এক-তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হয়ে গেল। ষষ্ঠ রাতে তিনি আমাদের নিয়ে ছালাত পড়লেন না, তিনি পঞ্চম রাতে আবার আমাদের নিয়ে ছালাত পড়লেন, এতে অর্ধেক রাত অতিবাহিত হয়ে গেল। আমরা তাঁকে বললাম, হে আল্লাহ্‌র রাসূল (ছাঃ)! আমাদের অবশিষ্ট রাতটিও যদি ছালাত আদায় করে অতিবাহিত করে দিতেন। তিনি বলেন, কেউ যদি ইমামের সাথে ছালাত আদায় করে, তার জন্য সারা রাত ছালাত আদায়ের ছওয়াব লেখা হয়। এরপর তিনি মাসের তিন রাত অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত আমাদের নিয়ে আর ছালাত আদায় করেননি। অতঃপর তৃতীয় (২৭শে) রাত থাকতে আবার তিনি আমাদের নিয়ে ছালাত আদায় করলেন। এই রাতে তিনি তাঁর পরিজন ও স্ত্রীগণকে এবং অন্যান্যদের ডেকে উঠালেন। এত দীর্ঘক্ষণ ছালাত আদায় করলেন যে, আমাদের মনে সাহরীর সময় চলে যাওয়ার আশংকা হ’ল। (রাবী বলেন) আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ফালাহ’ কি? তিনি বললেন, সাহরী খাওয়া। তারপর বাকী রাতগুলিতে তিনি আমাদেরকে নিয়ে আর ছালাত আদায় করেননি’। [ছহীহ আবুদাঊদ হা/১২৪৫; সনদ ছহীহ, ইরওয়াউল গালীল, হা/৪৪৭]

তারাবীহ্‌র ছালাতে নিয়মিত জামা’আত না করার কারণঃ

নবী করীম (ছাঃ) রামাযান মাসের অন্যান্য রাতে ছাহাবীগণকে নিয়ে জামা’আতের সাথে তারাবীহ্‌র ছালাত আদায় না করার কারণ হ’ল, ফরয হয়ে যাওয়ার ভয়। কেননা যদি ফরয হয়ে যায়, তখন উম্মত তা আদায় করতে অক্ষম হয়ে পড়বে।

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মধ্য রাতে বেরিয়ে মসজিদে ছালাত আদায় করলেন, তখন একদল লোক তাঁর সঙ্গে ছালাত আদায় করল এবং সকালে লোকেরা এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করল। ফলে তাদের চাইতে অনেক বেশী লোক সমবেত হ’ল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) দ্বিতীয় রাতে বের হ’লেন এবং লোকেরা তাঁর সঙ্গে ছালাত আদায় করল। এ দিন সকালেও লোকেরা বিষয়টি আলোচনা করতে থাকল। এতে তৃতীয় রাতে মসজিদে লোক সংখ্যা আরো বেশী হ’ল। তখন নবী (ছাঃ) বের হয়ে এলেন, লোকেরা তাঁর সঙ্গে ছালাত আদায় করল। চতুর্থ রাতে মসজিদে লোকদের স্থান সংকুলান হ’ল না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) (স্বীয় হুজুরা থেকে) বের হ’লেন না। তখন তাদের মধ্যে কিছু লোক বলতে লাগল, ছালাত! ছালাত! রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তখনও বের হ’লেন না। অবশেষে ফজরের ছালাতের জন্য বের হ’লেন। ফজরের ছালাত আদায় করার পরে লোকদের দিকে ফিরে তিনি বললেন, আজ রাতে তোমাদের অবস্থা আমার কাছে গোপন থাকেনি। তবে আমার আশংকা হয়েছিল যে, রাতের (তারাবীহ) ছালাত তোমাদের উপর ফরয হয়ে যাবে, আর তোমরা তা পালনে অক্ষম হবে’। [মুসলিম (আরবী-বাংলা) ১৬৫৪]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ইন্তেকালের পর সেই ভয় আর নেই। কেননা আল্লাহ তা’আলা শরী’আতকে পূর্ণ করে দিয়েছেন। অতএব যে কারণে ক্বিয়ামে রামাযানে জামা’আত নিয়মিত করা হয়নি, সে কারণ যেহেতু নেই, সেহেতু পূর্বের বিধানই বলবৎ থাকবে। অর্থাৎ ক্বিয়ামে রামাযানের জামা’আত করা যাবে। এ কারণেই ওমর (রাঃ) তা পুনরায় চালু করেন। [বুখারী (আরবী-বাংলা) ১৮৬৮]

রামাযানে মহিলাদের জামা’আতঃ

মহিলাদের জন্য জামা’আতে উপস্থিত হওয়া জায়েয। উল্লিখিত আবু যার (রাঃ) বর্ণিত হাদীছ দ্বারা তা প্রমাণিত হয়। বরং তাদের বিশেষ একজন ইমাম নির্ধারণ করে দেওয়াও জায়েয। ওমর (রাঃ) থেকে প্রমাণিত আছে যে, তিনি যখন লোকজনকে ক্বিয়ামে রামাযানের জন্য সমবেত করলেন, তখন পুরুষদের জন্য উবাই ইবনু কা’ব (রাঃ)-কে এবং মহিলাদের জন্য সুলায়মান ইবনু আবু খায়ছামা (রাঃ)-কে নিযুক্ত করলেন।

আরফাজা ছাক্বাফী বলেন, ‘আলী ইবনু আবী ত্বালেব (রাঃ) লোকজনকে রামাযান মাসে ক্বিয়াম করার (তারাবীহ পড়ার) আদেশ দিতেন এবং পুরুষদের জন্য একজন আর মহিলাদের জন্য একজন ইমাম নিযুক্ত করতেন। আমি ছিলাম মহিলাদের ইমাম’। [বায়হাক্বী ২/৪৯৪, ইমাম আব্দুর রাযযাক ‘মুছান্নাফ’ (৪/২৫৮, হা/৮৭২২। ইবনে নছর, ‘ক্বিয়ামে রামাযান’ পৃঃ ৯৩]

শায়খ আলবানী (রহঃ) বলেন, আমার মতে এর স্থান হ’ল মসজিদ, যদি মসজিদ অনেক বড় ও প্রশস্ত হয়। যাতে একে অপরের জন্য বিরক্তির কারণ না হয়।

ক্বিয়ামে রামাযানের রাক’আত সংখ্যাঃ

তারাবীহ ছালাতের রাক’আত সংখ্যা হ’ল এগার। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কখনো এগার রাক’আতের বেশী ‘ক্বিয়ামুল লায়ল’ তথা তারাবীহর ছালাত আদায় করেননি। আয়েশা ছিদ্দীক্বা (রাঃ)-এর কাছে জিজ্ঞেস করা হ’ল, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রামাযান মাসে কিভাবে ছালাত আদায় করতেন? উত্তরে তিনি বললেন,

‘রামাযানে এবং রামাযান ব্যতীত অন্য সময় এগার রাক’আতের বেশী তিনি ছালাত পড়তেন না। (প্রথমত) তিনি চার রাক’আত পড়তেন। এ চার রাক’আতের সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্বন্ধে তুমি কোন প্রশ্ন করো না। তারপর আরো চার রাক’আত পড়তেন। এর সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করো না। এরপর পড়তেন আরও তিন রাক’আত’। [বুখারী (আরবী-বাংলা) ২/২৭৯, হা/১৮৭০; ছালাতুত্ তারাবীহ, পৃঃ ২০, ২১; ছহীহ আবুদাঊদ হা/১২১২]

তারাবীহ ছালাতে ক্বিরাআতঃ

রামাযান ও অন্য মাসে রাত্রিকালীন ছালাতের ক্বিরাআতের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কোন বিশেষ সীমা-রেখা নির্ধারণ করে যাননি, যাতে কম-বেশীর অবকাশ থাকেনা। বরং রাতের ছালাতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ক্বিরাআত বিভিন্ন রকমের ছিল। কখনো অনেক লম্বা আবার কখনো সংক্ষিপ্ত, কখনো প্রত্যেক রাক’আতে মুয্‌যাম্মিল, অর্থাৎ বিশ আয়াতের মত পড়তেন, আবার কখনো পঞ্চাশ আয়াতের মত পড়তেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলতেন,

‘যে ব্যক্তি রাত্রে একশ’ আয়াত পড়ে ছালাত আদায় করবে, তাকে গাফেলদের মধ্যে গণ্য করা হবে না’। অন্যত্র তিনি বলেছেন,

‘যে ব্যক্তি দুইশত আয়াত পাঠ করে রাত্রের ছালাত আদায় করবে, তাকে আল্লাহ্‌র অনুগত এবং মুখলিছদের মধ্যে গণ্য করা হবে’। [ছিফাতুছ ছালাত ১১৭-১২২ পৃঃ সনদ ছহীহ]

ছহীহ সনদে বর্ণিত আছে যে, যখন ওমর (রাঃ) উবাই ইবনু কা’ব (রাঃ)-কে লোকজন নিয়ে এগার রাক’আত ছালাত পড়ার আদেশ দিলেন, তখন উবাই শত আয়াত বিশিষ্ট সূরা সমূহ পড়তেন, এমনকি ক্বিয়াম দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে মুক্তাদীগণ লাঠির উপর ভর দিয়ে দাঁড়াতেন এবং ফজরের শুরু শুরু অবস্থায় ছালাত থেকে ফিরতেন। [মুওয়াত্ত্বা মালেক, ছালাতুত তারাবীহ, পৃঃ ৫২]

ক্বিয়ামে রামাযানের সময়ঃ

রাত্রির ছালাতের সময় এশার ছালাতের পর থেকে ফজর পর্যন্ত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

‘যে ব্যক্তি শেষ রাতে জাগার ব্যাপারে আশংকাবোধ করবে, সে বিতর পড়ে ঘুমাবে। আর যে ব্যক্তি জাগার ব্যাপারে নিশ্চিত, সে রাতের শেষ ভাগে পড়বে’। [মুসলিম, সিলসিলা ছাহীহা হা/২৬১০; মুসলিম (আরবী-বাংলা), ৩/৮৪ পৃঃ, হা/১৬৩৭]

শেষ রাতে একা ছালাত পড়ার চেয়ে প্রথম রাতে জামা’আতের সাথে পড়া উত্তম। কারণ জামা’আতের সাথে ছালাত আদায় করলে সারা রাত্রি ইবাদত করার ছওয়াব হয়। তা পূর্বে উল্লিখিত আব্দুর রহমান ইবনু আবদুল ক্বারীর হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। [বুখারী, ছালাতুত তারাবীহ, পৃঃ ৪৮; বুখারী ২/২৭৭ পৃঃ হা/১৮৬৮]

বিতরের তিন রাক’আতে ক্বিরাআতঃ

বিতরের তিন রাক’আতের প্রথম রাক’আতে ‘সূরা আ’লা’, দ্বিতীয় রাক’আতে ‘কাফিরুন’ এবং তৃতীয় রাক’আতে ‘ইখলাছ’ পড়া সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কখনো শেষ রাক’আতে ইখলাছের সাথে ‘ফালাক্ব’ এবং ‘নাস’কে যুক্ত করতেন। [নাসাঈ, আহমদ সনদ ছহীহ]

লায়লাতুল ক্বদরঃ

রামাযানের রাত সমূহের মধ্যে অতি উত্তম রাত হ’ল লায়লাতুল ক্বদর। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

‘যে ব্যক্তি ঈমান ও ইখলাছের সাথে লায়লাতুল ক্বদরে ক্বিয়াম করবে তার পূর্বের পাপ সমূহ ক্ষমা করা হবে’। [বুখারী ও মুসলিম, মুসনাদ আহমাদ, ৫/৩১৮ পৃঃ]

ই’তেকাফঃ

রামাযান মাস এবং বছরের অন্য দিনেও ই’তেকাফ করা যায়। এর মূল দলীল হ’ল আল্লাহ্‌র বাণী,

وَلَا تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ

‘যখন তোমরা মসজিদে ই’তেকাফ অবস্থায় থাক’। (সূরা বাকারাহ, আয়াত নং-১৮৭ )

এছাড়া ই’তেকাফ সম্পর্কে অনেক ছহীহ হাদীছ বর্ণিত রয়েছে।

নবী করীম (ছাঃ) একদা শাওয়ালের শেষ দশ দিন ই’তেকাফ করেছেন। [বুখারী, মুসলিম, ইবনু খুযায়মা, ছহীহ আবু দাঊদ ২১২৭] একদা ওমর (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আমি জাহেলী যুগে মসজিদে হারামে এক রাত ই’তেকাফ করার মানত করেছিলাম, তা কি পুরা করতে হবে? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, মানত পূর্ণ কর’। [বুখারী, মুসলিম, ইবনু খুযায়মা ছহীহ আবু দাঊদ ২১৩৬, ২১৩৭]

তবে রামাযান মাসে ই’তেকাফ করার তাকীদ রয়েছে অনেক বেশী। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রত্যেক রামাযানে দশ দিন ই’তেকাফ করতেন। [বুখারী, ইবনু খুযায়মা ২১২৬, ২১৩০]

সবচেয়ে বেশী ফযীলত ও মর্যাদার ই’তেকাফ হ’ল, রামাযানের শেষ দশ দিনের ই’তেকাফ। কেননা নবী করীম (ছাঃ) জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রামাযানের শেষ দশ দিন ই’তেকাফ করেছেন’। [বুখারী, মুসলিম, ইবনে খুযায়মা ২২২৩ ইরওয়াউল গালীল’ হা/৯৬৬; ছহীহ আবুদাঊদ হা/২১২৫]

ই’তেকাফের শর্ত সমূহঃ

মসজিদ ব্যতীত অন্য কোথাও ই’তেকাফ বৈধ নয়। আল্লাহ পাক বলেন,

وَلَا تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ ۗ تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَقْرَبُوهَا

‘যতক্ষণ তোমরা ই’তেকাফ অবস্থায় মসজিদে অবস্থান কর, ততক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রীদের সাথে মিশো না’। [অর্থাৎ স্ত্রী সহবাস করো না] (সূরা বাকারাহ ১৮৭)।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, ‘মুবাশারাত’, মুলামাসাত এবং ‘মাছ’ সবকটি শব্দের উদ্দেশ্য হ’ল স্ত্রী সহবাস। কিন্তু আল্লাহ তা’আলা যা ইচ্ছা ইঙ্গিতে বলে থাকেন, দ্রঃ বায়হাক্বী ৪/৩২১ পৃঃ, সনদ ছহীহ, বাক্বারাহ ১৮৭;

ইমাম বুখারী উক্ত আয়াত দ্বারা আমরা যা বলেছি তার প্রমাণ পেশ করেছেন। হাফেয ইবনে হাজার বলেছেন, ‘আয়াত দ্বারা প্রমাণ পেশ করা যায় এভাবে যে, যদি মসজিদ ব্যতীত অন্য জায়গায় ছহীহ হ’ত, তাহ’লে স্ত্রী সহবাস হারাম হওয়াকে মসজিদের সাথে বিশেষ করত না, কারণ সর্বসম্মতিক্রমে স্ত্রী সহবাস হ’ল, ই’তেকাফ বিনষ্টকারী। তাই মসজিদ উল্লেখ করা একথাই বুঝায় যে, মসজিদ ব্যতীত ই’তেকাফ হবে না।

আয়েশা (রাঃ) বলেন, ই’তেকাফকারীর জন্য সুন্নাত হ’ল, সে যেন কোন অসুস্থকে দেখতে না যায়, জানাযায় শরীক না হয়, স্ত্রীকে স্পর্শ না করে, তার সাথে সহবাস না করে এবং ই’তেকাফের স্থান থেকে মানবীয় প্রয়োজন ব্যতীত বের না হয়। ছিয়াম ছাড়া ই’তেকাফ হয় না। আর জামে মসজিদ ব্যতীত অন্য জায়গায় ই’তেকাফ হয় না’। [বায়হাক্বী ছহীহ সনদে এবং আবু দাঊদ হাসান সনদে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন ]

ইমাম ইবনুল কাইয়িম ‘যাদুল মা’আদ’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে বর্ণিত নেই যে, তিনি ছিয়াম ব্যতীত ই’তেকাফ করেছেন। বরং আয়েশা (রাঃ) বলেছেন, ছিয়াম ব্যতীত ই’তেকাফ’ হবে না। আল্লাহ তা’আলা স্বয়ং ই’তেকাফকে ছিয়ামের সাথে বর্ণনা করেছেন। আর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)ও ছিয়ামের সাথেই ই’তেকাফ করেছেন। অতএব, ছাওম ই’তেকাফের জন্য শর্ত। এটাই হ’ল জমহূরে সালাফী ও আল্লামা ইবনে তায়মিয়ার অভিমত। এ কথার উপর ভিত্তি করে বলা যেতে পারে যে, যে ছালাতে আসবে, তার জন্য সে মসজিদে থাকাকালীন ই’তেকাফের নিয়ত করা বৈধ হবে না। শায়খ ইবনু তাইমিয়াও তাই বলেছেন। ]

ই’তেকাফকারীর জন্য যা বৈধঃ

ই’তেকাফকারী নিজের প্রয়োজন পূরণের জন্য মসজিদ থেকে বের হ’তে পারবে।

মহিলাদের জন্য ই’তেকাফরত তার স্বামীর সাথে সাক্ষাতের জন্য মসজিদে গমন জায়েয এবং স্ত্রীকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য মসজিদের দরজা পর্যন্ত আসাও স্বামীর জন্য বৈধ।

ছাফিয়া (রাঃ) বলেন, ‘নবী করীম (ছাঃ) রামাযানের শেষ দশ তারিখে মসজিদে ই’তেকাফরত ছিলেন। আমি রাত্রে তাঁকে দেখতে গেলাম, তখন তাঁর কাছে তাঁর স্ত্রীগণ ছিলেন। পরে তাঁরা চলে গেলেন, আমি কিছুক্ষণ কথাবার্তা বললাম। পরে আমি চলে যাওয়ার জন্য দাঁড়ালাম, তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তুমি তাড়াতাড়ি করো না, আমিও তোমার সাথে যাব। তারপর আমাকে পৌঁছানোর জন্য তিনি দাঁড়ালেন। ছাফিয়ার কক্ষ ছিল উসামা ইবনু যায়েদের ঘরের নিকটে। যখন তিনি উম্মে সালমার (রাঃ) দরজার সামনে অবস্থিত মসজিদের দরজা পর্যন্ত আসলেন, দু’জন আনছারী পুরুষের সাথে দেখা হ’ল। নবী করীম (ছাঃ)-কে দেখে তারা এগিয়ে চলল। নবী করীম (ছাঃ) তাদেরকে বললেন, তোমরা এগিয়ে এস। এই মেয়েটি ছাফিয়া বিনতে হুয়াই। তারা বলল, সুবহা-নাল্লাহ, ইয়া রাসূলাল্লাহ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, শয়তান মানবদেহে রক্তের মত চলাচল করে। আমার আশংকা হ’ল, সে তোমাদের মনে কোন কুধারণা সৃষ্টি করে দেয় কি-না’। [বুখারী, মুসলিম, আবু দাঊদ। ছহীহ আবু দাঊদ হা/২১৩৩, ২১৩৪; বুখারী ২/২৯১ পৃঃ হা/১৮৯৫]

আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ

‘নবী করীম (ছাঃ) মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত রামাযান মাসের শেষ দশকে ই’তেকাফ করেছেন। তারপর তাঁর স্ত্রীগণ (শেষ দশকে) ই’তেকাফ করতেন’। [বুখারী, মুসলিম দ্রঃ ইরওয়া হা/৯৬৬]

এই হাদীছে মহিলাদের ই’তেকাফ বৈধ হওয়ার দলীল পাওয়া যায়। তবে এর জন্য তাদের অভিভাবকগণের অনুমতি থাকতে হবে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হ’তে হবে এবং পুরুষদের সাথে মেলামেশার সম্ভাবনামুক্ত হ’তে হবে।

স্ত্রী সহবাস করলে ই’তেকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। আল্লাহ পাক বলেছেন,

وَلَا تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ ۗ تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَقْرَبُوهَا  ‘যতক্ষণ তোমরা ই’তেকাফ অবস্থায় মসজিদে অবস্থান কর, ততক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রীদের সাথে মিশো না’। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন,

‘যদি ই’তেকাফকারী স্ত্রী সহবাস করে তাহ’লে তার ই’তেকাফ নষ্ট হয়ে যাবে, তাকে আবার নতুন করে ই’তেকাফ করতে হবে’। [ইবনু আবি শায়বা ৩/৯২পৃঃ; আব্দুর রাযযাক ৪/৩৬৩ ছহীহ সনদ] তবে তার উপর কোনো কাফ্‌ফারা ওয়াজিব হবে না। কারণ নবী করীম (ছাঃ) এবং কোন ছাহাবী থেকে এর প্রমাণ নেই।

*** খত্বীব, আলী মসজিদ, বাহরাইন

[শায়খ আলবানী (রহঃ) রচিত ‘ক্বিয়ামে রামাযান ও ই’তেকাফ’ নামক পুস্তিকা অবলম্বনে লিখিত]

মতামত দিন