সিয়াম

রমযানে উমরাহর ফযিলত

ইব্‌ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ থেকে এসে উম্মে সিনান আনসারিকে বলেন: তুমি কেন হজ করনি? সে বলল: অমুকের পিতা, অর্থাৎ তার স্বামীর কারণে। তার চাষাবাদের দু’টি উট ছিল, একটি দ্বারা সে হজ করেছে, অপরটি আমাদের জমি চাষ করেছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “নিশ্চয় রমযানের ওমরা আমার সাথে হজের সমান”।[1]

অপর বর্ণনায় আছে: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«فإِذاجَاءَرَمَضَانُفاعتَمرِيفإنَّعُمْرةًفيهتَعْدِلُحَجَّة».

“যখন রমযান আগমন করে ওমরা কর, কারণ তখনকার ওমরা হজের সমান”।[2]

উম্মে মাকাল রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছেন:

«اعْتَمرِيفيرَمَضَانَفإنَّهاكَحَجَّة»رواهأبوداود.

“রমযানে ওমরা কর, কারণ তা হজের ন্যায়”।[3]

অনুরূপ হাদিস বর্ণিত হয়েছে জাবের, আনাস, আবু হুরায়রা ও ওয়াহাব ইব্‌ন আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ থেকে।[4]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “রমযানের ওমরা হজের সমান”। ইব্‌ন বাত্তাল রহ. বলেন: “এর দ্বারা বুঝা যায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে যে হজের কথা বলেছেন, তা নফল ছিল, কারণ উম্মত এ বিষয়ে একমত যে, ওমরা কখনো ফরয হজের স্থলাভিষিক্ত হয় না। এখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী “হজের বরাবর” দ্বারা উদ্দেশ্যে সাওয়াব ও ফযিলত, যা মানুষের কিয়াস ও ধারণার ঊর্ধ্বে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তার অনুগ্রহ দান করেন”।[5]

শিক্ষা ও মাসায়েল:‎

এক. বান্দার ওপর আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ যে, তিনি অল্প আমলের বিনিয়ে অধিক সওয়াব দান করেন। এ জন্য আমরা আল্লাহর শোকর আদায় করি।

দুই. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতেন ও তাদের খবর নিতেন।আল্লাহ যাকে তার বান্দাদের দায়িত্ব দান করেন, তার উচিত অধীনদের সাথে দয়ার আচরণ করা, তাদের হিতকামনা করা ও খবরাখবর নেয়া এবং তাদের দ্বীন ও দুনিয়ার স্বার্থে কাজ করা।

তিন. ফরয হজের মোকাবেলায় যথেষ্ট নয় রমযানের ওমরা। অবশ্য সওয়াবের দিক থেকে সমান, কিন্তু এ কারণে ফরয আদায় হবে না। এ ব্যাপারে সবাই একমত।[6]

চার. সময়ের মর্যাদার কারণে আমলের সওয়াব বেড়ে যায়, যেমন বেড়ে যায় একাগ্রতা ও ইখলাসের কারণে।[7]

পাঁচ. এসব হাদিসের উদাহরণ, যেমন এসেছে সূরা ইখলাস কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান, অর্থাৎ সওয়াবের বিবেচনায়, কিন্তু সূরা ইখলাস তিলাওয়াত করা পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করার সমান নয়।

ষষ্ট. রমযানের মর্যাদার কারণে ওমরা হজের সমমর্যাদা লাভ করে, কারণ রমযান মাসে ওমরাকারী ওমরার ফযিলত ও রমযানের ফযিলত লাভ করে। এ বরকতপূর্ণসময় ও মক্কার পবিত্রতার কারণে ওমরা হজের সমান, যে হজ যিলহজ মাসের বরকতপূর্ণ সময় ও মক্কার পবিত্র স্থানে আদায় করা হয়।[8]

দ্বিতীয়ত রমযানের ওমরায় রয়েছে অধিক কষ্ট, কারণ সওম অবস্থায় আমল কষ্টকর, বা সফরের কারণে যদি সওম ত্যাগ করে, তবু সফরের কষ্ট কম নয়, পরবর্তীতে আবার কাযার কষ্ট। এরূপ কষ্ট রমযান ব্যতীত অন্য মাসে হয় না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওমরার নির্দেশ করে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে‎ বলেন:

«إِنَّهاعَلىقَدْرِنَصَبِك،أَوقَالَ: عَلىقَدْرِنَفَقَتِك»رواهمسلم.

“ওমরা হচ্ছে তোমার কষ্ট, অথবা বলেছেন: তোমার খরচ অনুপাতে”।[9]

সাত. রমযান মাসে ওমরাকারী এ সওয়াব অর্জন করবে, মক্কায় অবস্থান করুক, বা ওমরা শেষে বাড়ি ফিরুক।

আট. এ হাদিস প্রমাণ করে না যে, তানয়িম অথবা হেরেমের বাইরে গিয়ে একমাসে বারবার ওমরা করা, অথবা একদিনে বারবার ওমরা করা বৈধ, বর্তমান যুগে প্রচলিত এ আমল সুন্নত পরিপন্থী, সাহাবিদের আমলের বিপরীত, তাদের কারো থেকে বর্ণিত নেই যে, তারা এক সফরে একাধিক ওমরা করেছেন।[10]

নয়. রমযানে ওমরাকারী ও বায়তুল্লাহ শরীফে ইতিকাফকারীর কর্তব্য আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্তু থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হিফাজত করা। কারণ মক্কার পাপ অন্য স্থানের পাপের তুলনায় অধিক ক্ষতিকর, বিশেষভাবে যদি রমযানের মহান মাসে হয়।

দশ. পরিবার ও সন্তানসহ যে রমযান মাসে হারাম শরীফে অবস্থান করে, তার কর্তব্য পরিবার ও সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখা, যেন তারা হারামে লিপ্ত না হয়, অন্যথায় সে সওয়াবের পরিবর্তে পাপ ও গুনাসহ বাড়ি ফিরবে, যেহেতু সে তাদের প্রতি খেয়াল রাখেনি।

এগার. যখন রোযাবস্থায় ওমরার নিয়তে মক্কায় পৌঁছে, সে হয়তো সওম ভেঙ্গে ওমরা আদায় করবে, অথবা সূর্যাস্তের অপেক্ষা করে ইফতারের পর তা আদায় করবে। সওম ভঙ্গ করে ওমরা আদায় করাই উত্তম, কারণ ওমরার নিয়ম মক্কায় পৌঁছা মাত্র তা আদায় করা, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন।

তথ্যসূত্র :

[1] বুখারি: (১৭৬৪), মুসলিম: (১২৫৬)

[2] বুখারি: (১৬৯০), মুসলিম: (১২৫৬)

[3] আবু দাউদ: (১৯৮৯), নাসায়ি ফিল কুবরা: (৪২২৬), তিরমিযি: (৯৩৯), তিনি বলেছেন হাদিসটি হাসান, গরিব। ইব্‌ন খুযাইমাহ: (৩০২৫), ও হাকেম: (১/৬৫৬), সহিহ বলেছেন, হাকেম বলেছেন হাদিসটি সহিহ মুসলিমের শর্ত মোতাবেক।

[4] দেখুন: জামে তিরমিযি: (৩/২৭৬)

[5] শারহু ইব্‌ন বাত্তাল আলাল বুখারি: (৪/৪২৮), দেখুন: মিনহাতুল বারি: (৪/২৩৩)

[6] ফাতহুল বারি: (৩/৬০৪), তুহফাতুল আহওয়াযি: (৪/৭)

[7] দেখুন: ফাতহুল বারি: (৩/৬০৪), আউনুল মাবুদ: (৫/৩২৩), ফায়যুল কাদির: (৪/৩৬১)

[8] মাজমুউল ফাতাওয়া: (২৬/২৯৩)

[9] মুসলিম: (১২১১), দেখুন: আল-মুফহিম: (৩/৩৭০)

[10] মাজমুউল ফাতাওয়া: (২৬/২৯২), যাদুল মায়াদ: (২/৯৩), তাহযিবুস সুনান: (৭/৩৬)

মতামত দিন