সিয়াম

রামাযানের দিনগুলি আমরা কিভাবে কাটাতে পারি তার পরিকল্পনা

রামাযানের দিনগুলি আমরা কিভাবে কাটাতে পারি তার পরিকল্পনা

রচনায় :- মোহাম্মদ সাইদুর রহমান, এম. এ. (ইসলামিক স্টাডিজ)
আস্-সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ্।

রামাযান মাস এলেই এ মাসকে স্বাগত জানানোর জন্য, রামাযানকে সুন্দরভাবে পালন করার জন্য আমরা কত রকম পরিকল্পনা করে থাকি এবং একই সাথে থাকে আগাম ঈদের বাড়তি আনন্দ। রামাযান পালন আর ঈদের আনন্দ এ সব কিছু মিলিয়ে প্রতিটা মুসলিমের মনে থাকে অন্যরকম একটা ভালো লাগা, আর এ ভালো লাগার পুরো আনন্দ পেতে সারা মাসব্যাপী থাকে ব্যস্ততা। কিন্তু অনেকেই রামাযানের শুরুতেই অপরিকল্পনার কারনে কিছুটা তালগোল পাকিয়ে ফেলেন; করি, করছি, করব, এ রকম করতে করতেই মাসটা শেষ হয়ে যায়, শেষে আফসোস থেকে যায়, ইসস! কিছুই করতে পারলাম না ।

সেজন্য আমাদের সব মুসলিমেরই উচিত কিছু নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা, যাতে আমরা রামাযান এবং ঈদের আনন্দ দু’টাই পুরোপুরি উপভোগ করে মনে প্রশান্তি লাভ করতে পারি। রামাযান যেহেতু আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে বিশেষ রহমত পাওয়ার মাস, তাই পুরু রামাযান কিভাবে পালন করে এ মাসটাকে অর্থবহ করে তোলা যায় তার জন্য চাই বিশেষ কিছু পরিকল্পনা। যেমনঃ

১) প্রতি ওয়াক্তের ফরজ সলাত নিয়মিত এবং সময়মত আদায় করার চেষ্টা করুন, সুন্নত এবং নফল ইবাদাত আপনার পক্ষে যতটা সম্ভব বাড়িয়ে দিন। সন্তানদেরকেও (যদি থাকে) ইবাদতে অভ্যাসী করে তুলুন। রামাযানের শেষ দশ দিনের ইবাদাত যেন বেশি বেশি করতে পারেন তার জন্য আল্লাহ্‌র কাছে দু’আ করুন।

২) শুধু মাত্র কোরআন খতমের দিকে লক্ষ্য না রেখে কোরআন অর্থসহ বুঝে পড়ার চেষ্টা করবেন যেন আমরা সকলেই অনুধাবন করতে পারি যে, আল্লাহ্‌ তা’আলা কেন আমাদের জন্য কোরআন নাযিল করেছেন, জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত অতিবাহিত করার জন্য এতে কি কি বিধি-বিধান দিয়েছেন ইত্যাদি।

৩) যারা বিবাহিত এবং সন্তানের জনক-জননী তারা তাদের সন্তানদেরকে রোজা রাখার জন্য তাগিদ দিবেন, গেমস, কম্পিউটার চালানো থেকে তাদের বিরত রেখে কোরআন পড়ার প্রতি উৎসাহ দিবেন এবং নিজেরা তাদের সাথে বসবেন।

৪) আমরা কেউ ভুল-ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে না। তাই নিজের দোষগুলি খুঁজে বের করুন, অন্যের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলুন এবং অন্যকে ক্ষমা করার চেষ্টা করুন। গীবত, চোগলখুরি আর ঝগড়া-বিবাদ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখুন।

৫) ইফতার, সাহরী এবং রাতের খাবার প্রস্তুতির কাজে পরিবারের সদস্যদের (স্ত্রী, মা, বোন কিংবা মেয়ে) এতটা ব্যস্ত রাখবেন না, যাতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং রাতের তারাবীহ সলাত আদায় করতে অলসতা বোধ করেন। তাই যতটা সম্ভব পরিবারের সদস্যদের দ্বারা খাবার তৈরিতে এবং পরিশ্রমের মাঝে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করবেন।

৬) সাহরী খাওয়াটা একটা সুন্নত, তাই রাতের একটা নির্দিষ্ট সময় ঘুমিয়ে ক্লান্তি দুর করুন এবং সাহরী খাওয়ার প্রতি সবাইকে উৎসাহিত করুন।

৭) অযথা সারা রাত জেগে থেকে দিনের অধিকাংশ সময় ঘুমিয়ে কাটানোর পরিকল্পনা বাদ দিন।

৮) নিজেদের ইফতার থেকে প্রতিদিন অন্তত একজন রোজাদারকে ইফতারী করানোর চেষ্টা করুন, অবশ্যই নিজেদের গরীব আত্মীয়-স্বজনদের থেকে আগে নির্বাচন করবেন, যতটা সম্ভব গরীব আত্মীয়-স্বজনদের সাথে যোগাযোগ রাখুন এবং তাদের সাহায্য সহযোগিতা করার চেষ্টা করুন।

৯) পরিবারের মহিলারা! আপনারা ইফতারীর সময় কিছুটা হাতে রেখে ইফতারী তৈরির কাজ শেষ করবেন যেন পরিবারের সবার সাথে বসে একসাথে ইফতারী করতে পারেন।

১০) আত্ন-সমালোচনা করে নিজের সকল গুনাহ, ভুল-ক্রুটির জন্য আল্লাহ্‌র কাছে খাঁটি মনে তওবা করুন এবং শিরক ও বিদআত থেকে মুক্ত থাকার জন্য আল্লাহ্‌র কাছে হিদায়াত প্রার্থনা করুন।

১১) নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এ মাসে দান সাদাকা করার চেষ্টা করুন। যাকাত ও ফিতরা আদায় করুন।

১২) ঘরের ও বাহিরের বিভিন্ন কাজের ফাঁকে ফাঁকে সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক বিভিন্ন জিকির-আযকার করে আপনার নেকির পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা করুন ।

১৩) একজন মুসলিম কিংবা মুসলিমাহর প্রাত্যহিক জীবন কেমন হওয়া উচিৎ এ সম্পর্কে দিনের একটা অবসর সময় বেছে নিয়ে আপনার কাছের বন্ধু কিংবা বান্ধবীদের সাথে বসে আলোচনা ও সমালোচনা করুন এবং নিজেদেরকে একজন উন্নত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একে অন্যকে অনুপ্রেরনা দিন।

১৪) সহীহ শুদ্ধ ভাবে দ্বীনের জ্ঞান লাভের চেষ্টা করুন। দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার কোন সুযোগ পেলে সেটা হাতছাড়া করবেন না এবং যথাসাধ্য চেষ্টা করুন কোরআন ও সহীহ হাদীস ভিত্তিক অন্যকে জানাতে।

১৫) রোজা থাকা অবস্থায় দোয়া কবুল হয়, তাই এ সময় বেশি বেশি করে দোয়া করুন, নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, বাবা-মায়ের জন্য, সকল মুমিন মুসলিমদের জন্য।

পরিশেষে, আরো একটি পরিকল্পনা থেকে যায় সেটা হল- এ মাসে নিজেকে যেভাবে চালিয়ে নিয়েছেন পরবর্তী দিনগুলিও যেন সেভাবে চালানোর চেষ্টা করতে পারেন এর জন্য একটা পরিকল্পনা। কিন্তু সে পরিকল্পনা হোক আপনাদের নিজেদের জীবনে যার যার সুযোগ সুবিধা মতো। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের সবার রমাযানকে কবুল করুন এবং আপনার দ্বীনের উপর অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। -আমীন

উত্স

মতামত দিন