জীবনী নারী

উম্মু কুলছূম বিনতে রাসূলিল্লাহ (সাঃ)-এর জীবনী

হযরত উম্মু কুলছূম (রাঃ) হযরত রাসূলে কারীমের (সাঃ) এর তৃতীয় মেয়ে। তবে এ ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের কিছুটা মতপার্থক্য আছে। ইমাম আয-যাহাবী তাকে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সন্তানদের মধ্যে চতুর্থ বলেছেন। (সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা, ২/২৫২)। যুবাইর ইবনু বাক্কার বলেছেন, উম্মু কুলছূম ছিলেন রুকাইয়্যা ও ফাতিমা (রাঃ) থেকে বড়। কিন্তু অধিকাংশ সীরাত লেখক এ মতের বিরোধিতা করেছেন। সঠিক ও বিশ্বাসযোগ্য মত এটাই যে, হযরত উম্মু কুলছূম (রাঃ) ছিলেন হযরত রুকাইয়্যার (রাঃ) ছোট। (সীরাতু ইবনু হিশাম, ১/১৯০) তাবারী রাসূলুল্লাহর (সাঃ) মেয়েদের জন্মের ক্রমধারা উল্লেখ করেছেন এভাবে।

‘যায়নাব, রুকাইয়্যা, উম্মু কুলছূম ও ফাতিমা জন্মগ্রহণ করেন।’ (তারীখ আত-তাবারী (লেইডেন) ৩/১১২৮)

হযরত রুকাইয়্যার (রাঃ) ছিলেন হযরত ‘উছমানের (রাঃ) স্ত্রী। হিজরী ২য় সনে তাঁর ইন্তেকাল হলে রাসূল (সাঃ) উম্মু কুলছূমকে (রাঃ)‘উছমানের (রাঃ) সাথে বিয়ে দেন। (তাবাকাত, ৮/৩৫) যদি উম্মু কুলছূম বয়সে রুকাইয়্যার বড় হতেন তাহলে ‘উছমানের (রাঃ) সাথে তাঁরই বিয়ে হত আগে, রুকাইয়্যার নয়। কারণ, সকল সমাজ ও সভ্যতায় বড় মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থাটা আগেই করা হয়। আর এটাই বুদ্ধি ও প্রকৃতির দাবী।

সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলীতে হযরত উম্মু কুলছূমের (রাঃ) জন্ম সনের কোন উল্লেখ দেখা যায় না। তবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নবুওয়াত লাভের ছয় বছর পূর্বে তাঁর জন্ম হয়েছিল বলে ধারণা করা যায়। কারণ, একথা প্রায় সর্বজন স্বীকৃত যে, নবুওয়াতের সাত বছর পূর্বে রুকাইয়্যার এবং পাঁচ বছর পূর্বে হযরত ফাতিমার (রাঃ) জন্ম হয়। আর এ কথাও মেনে নেয়া হয়েছে যে, উম্মু কুলছূম (রাঃ) ছিলেন রুকাইয়্যার ছোট ও ফাতিমার বড়। তাহলে তাদের দুইজনের মধ্যবর্তী সময় তাঁর জন্মসন বলে মেনে নিতেই হবে। আর এই হিসেবেই তিনি নবুওয়াতের ছয় বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। (সাহাবিয়াত-১২৯)

অনেকের মত উম্মু কুলছূমেরও (রাঃ) শৈশবকাল অজ্ঞতার অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গেছে। আরবের সেই সময়কালটা এমন ছিল যে, কোন ব্যক্তিরই জীবন কথা পূর্ণভাবে পাওয়া যায় না। এ কারণে তাঁর বিয়ের সময় থেকেই তাঁর জীবন ইতিহাস লেখা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নবুওয়াত লাভের পূর্বে আবু লাহাবের পুত্র ‘উতবার সাথে রুকাইয়্যার এবং তাঁর দ্বিতীয় পুত্র ‘উতাইবার সাথে উম্মু কুলছূমের বিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নবুওয়াত লাভের পর যখন আবু লাহাব ও তাঁর স্ত্রীর নিন্দায় সূরা লাহাব নাযিল হয় তখন আবু লাহাব, মতান্তরে আবু লাহাবের স্ত্রী তাঁর দুই ছেলেকে লক্ষ্য করে বলে, ‘তোমরা যদি তাঁর (মুহাম্মাদ সাঃ) মেয়েকে তালাক দিয়ে বিদায় না কর তাহলে তোমাদের সাথে আমার বসবাস ও উঠাবসা হারাম।’ (তাবাকাত ৮/৩৭)

হযরত রুকাইয়্যার (রাঃ) জীবনীতে (আসহাবে রাসূলের জীবনকথা, ৬নং খণ্ডের ২৬ পৃষ্ঠা দেখুন) আমরা উল্লেখ করেছি যে, পিতা-মাতার এরূপ কথায় এবং সামাজিক চাপে ‘উতবা তাঁর স্ত্রী রুকাইয়্যাকে তালাক দেয়। তেমনিভাবে ‘উতাইবাও মা-বাবার হুকুম তামিল করতে গিয়ে স্ত্রী উম্মু কুলছূমকে তালাক দেয়। এ হিসেবে উভয়ের তালাকের সময়কাল ও কারণ একই। (উসুদুল গাবা ৫/১২) উভয় বোনের বিয়ে হয়েছিল ঠিকই কিন্তু স্বামীর ঘরে যাবার পূর্বেই এ ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।

হিজরী ২য় সনে রুকাইয়্যা(রাঃ) মৃত্যুবরণ করলে হযরত ‘উছমান (রাঃ) স্ত্রীর শোকে বেশ বিষণ্ণ ও বিমর্ষ হয়ে পড়েন। তাঁর এ অবস্থা দেখে রাসূল (সাঃ) একদিন তাকে বললেন, ‘উছমান, তোমাকে বিমর্ষ দেখছি, কারণ কি? ‘উছমান (রাঃ) বললেন, আমি এমন বিমর্ষ না হয়ে কেমন করে পারি? আমার উপর এমন মুসীবত এসেছে যা সম্ভবতঃ কখনো কারো উপর আসেনি। রাসূলুল্লাহর (সাঃ) কন্যার ইন্তিকাল হয়েছে। এতে আমার মাজা ভেঙ্গে গেছে। রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সাথে যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল তা ছিন্ন হয়ে গেছে। এখন আমার উপায় কি? তাঁর কথা শেষ না হতেই রাসূল (সাঃ) বলে উঠলেন, জিবরীল (আ) আল্লাহর দরবার থেকে আমাকে হুকুম পৌঁছে দিয়েছেন, আমি যেন রুকাইয়্যার সমপরিমাণ মাহরের ভিত্তিতে উম্মু কুলছূমকেও তোমার সাথে বিয়ে দেই। (প্রাগুক্ত ৫/৬১৩)। অতঃপর রাসূল (সাঃ) হিজরী তৃতীয় সনের রবিউল আউয়াল মাসে হযরত ‘উছমানের(রাঃ) সাথে উম্মু কুলছূমের ‘আকদ সম্পন্ন করেন। (তাবাকাত ৮/৩৭) ‘আকদের দুই মাস পরে জামাদিউস ছানী মাসে তিনি স্বামী গৃহে গমন করেন। হযরত উম্মু কুলছূম (রাঃ) কোন সন্তানের মা হন নি। (প্রাগুক্ত)

একটি বর্ণনায় এসেছে, রুকাইয়্যার (রাঃ) ইন্তিকালের পর ‘উমার ইবন আল খাত্তাব (রাঃ) তাঁর মেয়ে হাফসাকে (রাঃ) উছমানের (রাঃ) সাথে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি কোন উত্তর না দিয়ে চুপ থাকেন। একথা রাসূল (সাঃ) জানতে পেরে ‘উমারকে বললেন, আমি হাফসার জন্য ‘উছমানের চেয়ে ভালো স্বামী এবং ‘উছমানের জন্য হাফসার চেয়ে ভালো স্ত্রী তালাশ করবো। তারপর তিনি হাফসাকে বিয়ে করেন এবং উম্মু কুলছূমকে ‘উছমানের সাথে বিয়ে দেন।(প্রাগুক্ত ৮/৩৮)

হযরত উম্মু কুলছূম (রাঃ) তাঁর মা উম্মুল মু’মিনীন হযরত খাদীজার (রাঃ) সাথেই ইসলাম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে অন্য বোনদের সাথে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) হাতে বাই‘আত করেন ।(প্রাগুক্ত ৮/৩৭)। রাসূলুল্লাহর (সাঃ) মদীনায় হিজরাতের পর তিনি পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে মদীনায় হিজরাত করেন। (সিয়ারু আ’লাম আন-নুবালা ২/২৫২, হায়াতুস সাহাবা ১/৩৬৯)

হযরত উম্মু কুলছূমের (রাঃ) ইনতিকালের পর রাসূল (সাঃ) বলেন, আমার যদি দশটি মেয়ে থাকতো তাহলে একের পর এক তাদের সকলকে ‘উছমানের (রাঃ) সাথে বিয়ে দিতাম। (আল-ইসতী’আব-৭৯৩) একটি বর্ণনায় দশটি মেয়ের স্থলে একশটি মেয়ে এসেছে। (তাবাকাত ৮/৩৮)

স্বামী ‘উছমানের (রাঃ) সাথে ছয় বছর কাটানোর পর হিজরী নবম সনের শা‘বান মাসে হযরত উম্মু কুলছূম (রাঃ) ইনতিকাল করেন। (সিয়ারু আ’লাম আন-নুবালা ২/২৫৩) আনসারী মহিলারা তাকে গোসল দেন। তাদের মধ্যে হযরত উম্মু ‘আতিয়্যাও ছিলেন। রাসূল (সাঃ) জানাযার নামায পড়ান। হযরত আবু তালহা, ‘আলী ইবন আবী তালিব, ফাদল ইবন আব্বাস ও উসামা ইবন যায়েদ (রাঃ) লাশ কবরে নামান।(তাবাকাত ৮/৩৮-৩৯)

হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) কন্যা হযরত উম্মু কুলছূমের (রাঃ) মৃত্যুতে ভীষণ ব্যথা পান। যখন কবরের কাছে বসেন তখন চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে। (সিয়ারু আ’লাম আন-নুবালা ২/২৫৩; বুখারী ৩/১২৬-১২৭,১৬৭)

একটি বর্ণনায় এসেছে, আনাস (রাঃ) উম্মু কুলছূমকে (রাঃ) রেখা অঙ্কিত রেশমের কাজ করা একটি চাদর গায়ে দেওয়া অবস্থায় দেখেছেন। (বুখারীঃ বাবুল হারীর লিন-নিসা; আবু দাউদ (২০৫৮), নাসাঈ ৮/১৯৭; ইবন মাজাহ (৩৫৯৮);তাবাকাত ৮/৩৮)

নরাধম ‘উতাইবা তাঁর জাহান্নামের অগ্নিশিখা পিতা আবু লাহাব এবং কাঠকুড়ানি মা উম্মু জামীল হাম্মালাতাল হাতাব-এর চাপে স্ত্রী উম্মু কুলছূমকে তালাক দানের পর রাসূলুল্লাহ(সাঃ) এর নিকট এসে চরম অমার্জিত আচরণ করেন। সে রাসূলকে(সাঃ) লক্ষ্য করে বলেঃ ‘আমি আপনার দীনকে অস্বীকার করি, মতান্তরে আপনার মেয়েকে তালাক দিয়েছি। আপনি আর আমার কাছে যাবেন না, আমিও আর আপনার কাছে আসবো না।’ একথা বলে সে গোয়ারের মত রাসূলুল্লাহর(সাঃ) উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাতে রাসূলুল্লাহর(সাঃ) জামা ছিঁড়ে যায়। এরপর সে শামের দিকে সফরে বেরিয়ে যায়। তাঁর এমন পশুসুলভ আচরনে রাসূল(সাঃ) ক্ষুব্ধ হয়ে বদ-দু’আ করেন এই বলেঃ ‘আমি আল্লাহর কাছে কামনা করি, তিনি যেন তাঁর কোন কুকুরকে তাঁর উপর বিজয়ী করে দেন।’

‘উতাইবা কুরাইশদের একটি বাণিজ্য কাফেলার সাথে শামের দিকে বেরিয়ে পড়লো। যখন তারা ‘আয-যারকা’ নামক স্থানে রাত্রি যাপন করছিল, তখন একটি নেকড়ে তাদের অবস্থান স্থলের পাশে ঘুর ঘুর করতে থাকে। তা দেখে ‘উতাইবার মনে পড়ে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) বদ-দু’আর কথা। সে তাঁর জীবন নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। সে বলতে থাকে, ‘আমার মা নিপাত যাক, মুহাম্মাদের কথা মত এ নেকড়ে তো আমাকে খেয়ে ফেলবে।’ যাহোক, কাফেলার লোকেরা তাকে সকলের মাঝখানে ঘুমানোর ব্যবস্থা করে ঘুমিয়ে পড়ে। নেকড়ে সকলকে ডিঙ্গিয়ে মাঝখান থেকে ‘উতাইবাকে উঠিয়ে নিয়ে যায় এবং কামড়ে , খামছে রক্তাক্ত করে তাকে হত্যা করে।

সূত্রঃ আসহাবে রাসূলের জীবনকথা, ৬নং খণ্ড, লেখক: ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ

অনুলিখন : মাকসুদ বিন আমাল

মতামত দিন