আখলাক

মুসাফির ও মেহমানদারী

মুসাফির ও মেহমানদারী

লেখক: আবদুর রহমান।

অনুলিখন: পিস ইন ইসলাম

মানুষ আল্লাহ তা’আলার প্রিয় সৃষ্টি। তিনি তাঁর প্রিয় সৃষ্টির কল্যাণ ও সুখ-সমৃদ্ধির জন্য অনেক বিধি-বিধান নির্ধারণ করেছেন, যা একটিও অমান্য করলে মানুষের জীবনে অশান্তি অনিবার্য। তার মধ্যে মেহমানদারী একটি। মেহমানদারী বা আতিথেয়তার ইংরেজী Hospitality। ইংরেজী শব্দ Hospital (হাসপাতাল) হতে যার উৎপত্তি। হাসপাতালে একজন রোগীকে যেমন সেবা-শুশ্রুষা করা হয় ঠিক তেমনি একজন মুসাফিরকেও অনুরুপ সেবাদান করা বুঝায়। এজন্য এর নাম আতিথেয়তা (Hospitality)। মুসাফিরকে সেবাদান করা যরুরী এবং পুণ্যের কাজ।

musafir and hospitality

আল্লাহ বলেন,

لَّيْسَ الْبِرَّ أَن تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَٰكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَآتَى الْمَالَ عَلَىٰ حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَاهَدُوا

বড় সৎকাজ হল তারা ঈমান আনবে আল্লাহর উপর, ক্বিয়ামত দিবসের উপর, ফেরেশতাগণের উপর এবং সমস্ত নবী-রাসুলের উপর। আর তারাই মহব্বতে সম্পদ ব্যয় করবে আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন, মুসাফির, ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্য (বাক্বারাহ ১৭৭)।

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,

يَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنفِقُونَ ۖ قُلْ مَا أَنفَقْتُم مِّنْ خَيْرٍ فَلِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۗ وَمَا تَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ [٢:٢١٥]

লোকেরা তোমার কাছে জিজ্ঞাস করে, তারা কী ব্যয় করবে? তুমি বলে দাও যে বস্তুই তোমরা ব্যয় কর, তা হবে পিতা-মাতার জন্য আত্মীয়-স্বজনদের জন্য, ইয়াতীম ও মিসকিনের জন্য, অসহায় ও মুসাফিরের জন্য।আর তোমরা যে কোন সৎকাজ করবে, নিঃসন্দেহে তা অত্যন্ত ভালভাবেই আল্লাহর জানা রয়েছে। (বাক্বারাহ ২১৫)।

এভাবে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে ইয়াতীম ,নি:স্ব , অসহায়দের পাশাপাশি মুসাফিরের সাহায্য –সহযোগিতার প্রতি তাগিদ দেওয়া হয়েছে । তাছাড়া পৃথিবীর বহু সাহিত্যাকাশে, কবিতার ভুবনে এবং নানা ধর্ম গ্রন্থেও মুসাফিরদের সেবা-যত্নের কথা অনুরণিত হয়েছে। মুসলিম সাহিত্যে মুসাফিরের সেবা-যত্নকে মেহমানদারীর সাথে তুলনা করা হয়েছে।

মুসাফিরের ক্বদর ও মেহমানদারী :

মেহমানের সেবা-যত্নের জন্য পাচীন কাল থেকে আরব দেশের সুনাম রয়েছে। প্রাক ইসলামী যুগ থেকে ইসলামের আবির্ভাব পর্যন্ত এবং তারপর্রে আরবদের মেহমানদারির জুড়ি মেলা ভার। পবিত্র কুরআনে ইবরাহীম (আঃ) এর মেহমানদারির একটি ঘটনা বিবৃত হয়েছে।

ঘটনাটি নিম্নরুপঃ আল্লাহ তাআলা বলেন,

হে মুহাম্মাদ! তোমার কাছে ইবরাহীমের সম্মানিত মেহমানদের বৃত্তান্ত এসেছে কি? যখন তারা তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে বলল, সালাম, তখন সেও বলল, সালাম। এরা তো অপরিচিত লোক! অতঃপর সে গৃহে গেল এবং একটি ঘৃতপক্ব মোটা গো-বৎস নিয়ে হাযির হল। সে গো-বৎসটি তাদের সামনে রেখে বলল, তোমরা আহার করছ না কেন? (যারিয়াত ২৪-২৮)।
তারা খেলেন না। কেননা তাঁরা ছিলেন ফেরেশতা। উক্ত ঘটনা হতে আরবদের মেহমানদারির দৃষ্টান্ত জানা যায়। আরো জানা যায় যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) কোন দিন মেহমানের অপেক্ষা না করে খেতেন না।
প্রাক ইসলামী যুগেও মেহমানের যথেষ্ট সম্মান ও সেবা-যত্ন করা হত। মুসাফির-মেহমানকে আমানত মনে করা হত। মেহমান হাযার শত্রুতা করলেও তার মেহমানদারির কমতি হত না। এ মর্মে একটি মজার ঘটনা বিদ্যমান। একদা এক মেহমান এক আরব বেদুঈনের বাড়ীতে হাযির হয় এবং রাত্রি যাপন করে। খানাপিনা শেষে মেহমান কথা প্রসঙ্গে বলেন যে, বেশ কিছুদিন আগে আমি এক ব্যক্তিকে হত্যা করে অদ্যবধি পালিয়ে বেড়াচ্ছি। এতদশ্রবণে বেদুঈনের রক্ত টগবগ করে উঠে। কারণ নিহত ব্যক্তিটি ছিলেন তার পিতা এবং সেও পিতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্র্রহণের নেশায় হন্যে হয়ে হত্যাকারীকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। হত্যাকারী এখন তার হাতের মুঠোয় এবং প্রতিশোধ গ্রহণের মোক্ষম সুযোগ। এ সুযোগ সে হাতছাড়া করতে পারে না। ইত্যাদি সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে সে মেহমানের গৃহে প্রবেশ করে তাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে আস্তাবল হতে সবচেয়ে দ্রুতগামী একটি ঘোড়ায় চড়িয়ে তাকে বলে, সে যেন প্রত্যুষ হওয়ার পূর্বেই অত্র এলাকা ছেড়ে দূরদূরান্তে চলে যায়। বেদুঈন ভাবতে থাকে, এভাবে তাকে বিদায় করে না দিলে, তার হৃদয়পটে প্রতিশোধের আগুন ধপ করে জ্বলে উঠবে এবং মেহমানকে হত্যা করে ফেলবে। কিন্তু সে আল্লাহ কর্তৃক দেওয়া আমানতের খেয়ানত করতে পারে না।
রাসুলুল্লাহ (সা) এর দরবারে কোন মুসাফির আগমন করলে তাকে আপ্যায়নের জন্য ছাহাবীগণের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) নিজে ফয়ছালা করে দিতেন যে, অদ্যকার মেহমান অমুক ছাহাবীর বাড়ীতে যাবেন। এমনও দেখা যেত যে, ছাহাবীদের বাড়ীতে খাদ্যদ্রব্য আছে কি-না, না জেনেই তারা মেহমানকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। একদিনের ঘটনাঃ রাসুলুল্লাহ (সা) এর নিকটে আকজন ব্যক্তি এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (সা) আমি ক্ষুধায় কাতর। তখন তিনি তাঁর বিবিগনের নিকট পাঠালেন, কিন্তু তাদের নিকট খাওয়ার কিছুই পাওয়া গেল না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, তোমাদের কেউ আছ কি এই লোকটিকে মেহমানরুপে গ্রহণ করার? আল্লাহ তাআলা তার প্রতি রহমান করবেন। তখন আনছারগণের একজন দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা)! আমি আছি। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তিনি হলেন আবু তালহা (রা)।
অতঃপর তিনি মেহমানকে নিয়ে স্ত্রীর কাছে গিয়ে বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা) এর একটি মেহমান নিয়ে এসেছি ঘরে খাবার আছে কি? স্ত্রী উত্তরে বলল, আল্লাহর কসম! শিশু সন্তানের খাদ্য ছাড়া আমার নিকট কিছুই নেই। আনসারী সাহাবী বললেন, শিশুদেরকে খাওয়ার পূর্বেই ঘুমিয়ে দিবে। অতঃপর খাওয়ার সময় আমাকে ডাকিও আমি খেতে বসলে কোন কৌশলে বাতিটি নিভিয়ে দিবে। রাত্রে আমরা না খেয়ে খাকব। অতঃপর তার স্ত্রী তাই করলো এবং মেহমানকেই সব খানা খাওয়ালো।
অতঃপর ভোর হলে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, তোমাদের প্রতি আল্লাহ তাআলা খুবই খুশি হয়েছেন। তাদের সানে আয়াত অবতীর্ণ হয়-

وَالَّذِينَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِن قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ
”তারা নিজেদের উপর অন্যদের প্রাধান্য দেয় যদিও তারা নিজেরা ক্ষুধার্ত থাকে” (হাশর ৯, বুখারী হা-৪৮৮৯ ‘তাফসীর’ অধ্যায়; মুসলিম হা/২০৫৪ ‘পান করা’ অধ্যায়)। এসব ঘটনায় মুসলিম মিল্লাতের জন্য শিক্ষনীয় বিষয় রয়েছে।

মেহমানদারীতে আমাদের সমাজের অবস্থান

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে চেনা-অচেনা বহু মুসাফির আমাদের মাঝে আগমন করে থাকেন। কিন্তু তাদের মেহমানদারির জন্য আমরা কতটু কুেইবা ত্যাগ স্বকিার করে থাকি? পরিচিত শান-শওকতওয়ালা মেহমানের জন্য আমরা এতই উদ্বিগ্ন ও পেরেশান হয়ে উঠি যে, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। রাজকীয় মেহমানের জন্য তো রাজকীয়ভাবে ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। কিন্তু অচেনা অজানা ধূলায় ধূসরিত মেহমান, পথিকের মেহমানদারির জন্য আমরা কতটুকু তৎপর, কতটুকু নিবেদিত প্রাণ? মোটেও না। অথচ পবিত্র কুরআনে সেসব মেহমান-মুসাফিরের কথাই বলা হয়েছে। যারা সহায়-সম্বলহীন হয়ে রাস্তায় বেরিয়েছে বা সফরাবস্থায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। এসব মুসাফির সাধারণত মসজিদ-মাদরাসায় এসে আশ্রয় নেয় এবং মসজিদ ভরা মুছল্লীদের কাছে সাহয্য প্রার্থনা করে থাকে। কিন্তু অনেক মুছল্লীই সেদিকে কর্ণপাত করেন না। বরং নাক সিটকান। এমনকি নিয়মতি মুছল্লীই অঢেল সম্পত্তির মালিককে পর্যন্ত দেখা যায় মুসাফিরের হাতে দুই চার টাকা দিয়ে বাইরে যেয়ে নিতে বলেন। না হয় বলেন, অমুক বাড়ীতে গিয়ে দেখতে পারেন ইত্যাদি। ভাবখানা হল, They gave him good councel but none of their gold” অর্থাৎ ভাল ভাল উপদেশ দেন কিন্তু নিজ ঘরে ঠাঁই দিতে অপারগ।

আমাদের সমাজে এ কি হল! সমাজের মানুষ নিজেকে বড় মনে করে এবং মেহমানকে তুচ্ছ মনে করে। এটি আহংকারের নামান্তর। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন না” (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৪৭)।

অন্য এক হাদীসে এসেছে, ’পৃথিবীর অধিবাসীদের প্রতি দয়া কর। আকাশের অধিবাসী আল্লাহও তোমাদের প্রতি দয়া করবেন’ (আবু দাউদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/৪৯৬৯)

ইমাম গাযালী (রহ) বলেন, ’নিজকে উচ্চ এবং অন্যকে তুচ্ছ মনে করার নামই অহংকার অহমিকা’। তথাপিও আমরা মেহমানদারির মত উচু কাজকে হেয় মনে করি। একজন অমুসলিম চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেন, ‘প্রত্যেক আগন্তুকের সাথে এমন ব্যবহার কর, যেন তুমি একজন বড় মেহমানকে স্বাগত জানাচ্ছ’। একটি ইংরেজী কবিতায় বলা হয়েছে,

“None is born in this world
To engage himself for his end
All of us have to live for all
Each has to devote, for every bodies call.”

আল্লাহ আমাদেরকে মেহমানদারী করার এবং এ ব্যাপারে অন্যদেরকে উৎসাহ প্রদান করার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!

সূত্র: পুরনো  আত-তাহরীক পত্রিকা

মতামত দিন